একশো বছরে টেলিভিশন আমাদের যে পথে নিয়ে গেল
ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে আজ বুঝতে অসুবিধে হয় না যে, যার কাছে টিভি আছে আর যার কাছে নেই—এই দুই শ্রেণির মানুষকেই নিয়ন্ত্রণ করছিল এই যন্ত্রটি। এই নিয়ন্ত্রণ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার যেন কোনো উপায় ছিল না। আমাদের মনের মধ্যে এক ধরনের বিক্ষিপ্ততা ও অস্থিরতা তৈরির সেই তো শুরু।
টেলিভিশন নামক আশ্চর্য বস্তুটির আবিষ্কারক হিসেবে একক কোনো ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা কঠিন হলেও, জন লগি বেয়ার্ডের হাত ধরেই আজ থেকে ঠিক একশো বছর আগে প্রকাশ্য জনসমাবেশে এর প্রথম সার্থক আবির্ভাব ঘটে। আজ এটি সর্বজনস্বীকৃত সত্য। তবে এই বিপ্লবের নেপথ্যে রয়েছে দীর্ঘ এক ইতিহাস, যা শুরু হয়েছিল উনিশ শতক থেকেই।
দুই শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ১৯০০ সালে কনস্টানটিন পারস্কি সর্বপ্রথম তাঁর পঠিত একটি প্রবন্ধে ‘টেলিভিশন’ শব্দটি উল্লেখ করেন। পারস্কি যখন এই নামটির প্রস্তাব দিচ্ছেন, তখনো দূরবর্তী কোনো ছবিকে পর্দায় ফুটিয়ে তোলার বিষয়টি ছিল সম্পূর্ণ পরীক্ষাধীন। এই লক্ষ্য পূরণে তখন বহু বিজ্ঞানী নিরলস সাধনায় যুক্ত ছিলেন।
এই তালিকায় বিশেষভাবে স্মরণীয় লি দ্য ফরেস্ট কিংবা আর্থার কর্নের নাম। তবে এডোয়ার্ড বেলিনের অবদান অনস্বীকার্য, যিনি ১৯২১ সাল নাগাদ সর্বপ্রথম বেতার তরঙ্গ ব্যবহার করে ছবি পাঠানোর প্রক্রিয়াটি বাস্তবে রূপদান করেছিলেন। বিজ্ঞানীদের এই ধারাবাহিক প্রচেষ্টাই আজকের আধুনিক দৃশ্যমাধ্যমের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছে।
বিশ শতকের বিশের দশকেই টেলিভিশনের আবিষ্কারক হিসেবে জন বেয়ার্ডের নামের সঙ্গে উঠে আসে আরও অনেকের নাম। জন বেয়ার্ড যে বছর প্রকাশ্য সমাবেশে টেলিভিশনের প্রদর্শনী করলেন, ঠিক সেই একই বছর ইলেকট্রনিক টেলিভিশন ডিজাইন করে তার পেটেন্ট করিয়েছিলেন হাঙ্গেরির বিজ্ঞানী কালমান তিহানি।
এই তালিকায় ফিলো ফার্নসওয়ার্থ বা আরও কয়েকজনের নাম যুক্ত করা যায়। তবে মূল কথা হলো, টেলিভিশন নামক চার দেয়ালের মধ্যে নানা দৃশ্য দেখার এই বিস্ময়কর যন্ত্র আবিষ্কারের এক শতক আজ পূর্ণ হতে চলেছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Doraemon: আমরা দেখেছি নোবিতা ছিল সমাজ থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন। তার অত্যধিক 'ঘুমে চোখ বুজে থাকা', যেন এই বহমান অশান্ত পৃথিবীর থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকা।
বিবিসি কর্তৃক প্রথম পাবলিক সম্প্রচারের ইতিহাসকেও যদি নজরে রাখি, তবে দেখা যাবে সেটিও গত শতকের বিশের দশকেরই ঘটনা; অর্থাৎ তারও একশো বছর হতে চলল। এরপর সেই স্কটিশ বিজ্ঞানী জন বেয়ার্ডই ক্রমশ সাদাকালো ছবিকে রঙিন করার জাদুকরী কৌশল দেখালেন। মাঝে বিশ্বযুদ্ধের বিরতি। তারপর থেকে রমরমিয়ে শুরু হলো ‘পুরো দুনিয়া’-কে চোখের সামনে নিয়ে আসার এক নতুন খেলা।
সে এমনই এক আকর্ষণ, যা দেখে একদিকে মেতে উঠলেন আমজনতা, আর অন্যদিকে প্রমাদ গুনলেন সাহিত্যিকরা। প্রযুক্তি মাঝে মাঝেই সাহিত্যকে এমন একেকটি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করায়। সাহিত্যিকদেরও বোধহয় তখন মনে পড়ে যে, সাহিত্য বিনোদনেরও বস্তু বটে।
এই প্রসঙ্গে রোয়াল্ড ডাল ১৯৬৪ সাল নাগাদ একটি আস্ত কবিতাই লিখে ফেললেন, যেখানে টেলিভিশনকে ‘বোকা বাক্স’ (Idiot Box) অভিধা দেওয়া হলো। এই তকমাটি অবশ্য আগে থেকেই লোকমুখে ঘুরছিল, রোয়াল্ড ডাল তাতে চূড়ান্ত সিলমোহর লাগালেন।
ছয় এবং সাতের দশকের মধ্যে টেলিভিশন যখন পাকাপাকিভাবে পৃথিবীজুড়ে প্রায় সব দেশেই নিজের ঘাঁটি গেড়ে ফেলল, তখন থেকেই শুরু হলো এক নতুন অধ্যায়। এই অধ্যায় হলো ছোট্ট ঘরে বসে দুনিয়াকে হাতের মুঠোয় আনার অধ্যায়। আজকের ইন্টারনেটের যুগে আঙুলের ছোট্ট একটি চাপে যে খুলে যাচ্ছে একের পর এক ভার্চুয়াল জগতের পাতা, তার বীজ বোধহয় লুকিয়ে ছিল টেলিভিশনের মধ্যেই।
আমরা এখন ডিজিটাল যুগে কোনো এক স্থানে থেকেও হাজারো স্থান ও সময়ের মধ্যে বসবাস করি; আমাদের এই বহু স্থানিক ও বহু মাত্রিক যাপনের ভিত তো টেলিভিশনই গড়ে দিয়েছিল। ছাদে বীরদর্পে দাঁড়িয়ে থাকা সেই অ্যান্টেনা যেন মানব সভ্যতার টিকি বেঁধে ফেলেছিল। একটি নতুন প্রজন্ম তৈরি হচ্ছিল যারা বেড়ে উঠছিল টিভির সঙ্গে সঙ্গে, আর তাদের চোখের সামনে পুরো পৃথিবীটা অন্য ভাষায় অনূদিত হচ্ছিল।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Double Slit Experiment: মাল্টিভার্স তত্ত্ব বলে যে আমাদের মহাবিশ্বই একা নয়, এর অনেকগুলো দোসর রয়েছে, যারা একে অপরের সঙ্গে সমান্তরালভাবে থাকতে পারে
কী আশ্চর্য সমাপতন! বিংশ শতাব্দী ছিল খ্রিস্ট পরবর্তী হাজার বছরের শেষ শতক, আর সেই শতকের শুরুতেই ‘টেলিভিশন’ শব্দটির প্রথম ব্যবহার হলো। সেই টেলিভিশনই আজ আমাদের বর্তমান ভার্চুয়াল বিশ্বের সঙ্গে অচ্ছেদ্য সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করছে।
এটি ছিল এক নতুন সময়ের সূচনা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী পৃথিবীতে নতুন করে তৈরি হওয়া রাজনীতির আঙিনা, নতুন অর্থনৈতিক চিন্তা এবং ব্যক্তিমানসের আত্মজিজ্ঞাসা—এই সবকিছুর কেন্দ্রে চলে এল একটি নতুন ইলেকট্রনিক গ্যাজেট: দূরদর্শন।
ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে আজ বুঝতে অসুবিধে হয় না যে, যার কাছে টিভি আছে আর যার কাছে নেই—এই দুই শ্রেণির মানুষকেই নিয়ন্ত্রণ করছিল এই যন্ত্রটি। এই নিয়ন্ত্রণ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার যেন কোনো উপায় ছিল না। আমাদের মনের মধ্যে এক ধরনের বিক্ষিপ্ততা ও অস্থিরতা তৈরির সেই তো শুরু।
রোজনামচার মধ্যে হাজার মাইল দূরের খবর থেকে শুরু করে নানা দেশের সংস্কৃতি ও বিনোদন—সবই যেমন ঘরের জিনিস হয়ে উঠতে শুরু করল, তেমনই শুরু হলো ‘তথ্য বিস্ফোরণ’। তথ্যের বিকৃতি চিরকালই ছিল, তবে টেলিভিশন আসার পর থেকে এর ব্যাপক বৃদ্ধি ঘটে; যা আজকের দিনে প্রতি সেকেন্ডে অজস্র তথ্য বিকৃতিতে এসে ঠেকেছে। এই তথ্য বিস্ফোরণ আমাদের মস্তিষ্কে এক নতুন প্রবণতা তৈরি করেছে—নিমেষের মধ্যে সব জেনে ফেলতে না পারলে বা সব তথ্য ধারন করতে না পারলেই যেন এক ধরণের পরাজয়বোধ কাজ করে। মূলত ‘আপ-টু-ডেট’ থাকার এই তীব্র প্রতিযোগিতার যুগ শুরু হলো তখন থেকেই।
ইন্টারনেট এই মানসিক অবস্থাকে পরিপূর্ণ রূপ দিলেও এর প্রাথমিক ধারক ছিল সেই টেলিভিশন। একই ছাদের তলায় একাধিক মানুষকে একসঙ্গে বসিয়েও যে তাঁদের পৌঁছে দেওয়া যায় ভিন্ন ভিন্ন জগতে, তৈরি করে দেওয়া যায় মানসিক দূরত্ব—তা তো টেলিভিশনেরই অবদান। বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে টেলিভিশন মূলত জমি তৈরি করে দিয়েছিল একুশ শতকের এই নতুন ‘ভার্চুয়াল’ খেলার জন্য। বর্তমানের এই ডিজিটাল বাস্তবতার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে আজ আর লাভ নেই; কারণ এটাই এখনকার ধ্রুব ‘সত্য’।
স্কুলে শিশুদের আজও দশ নম্বরের রচনার জন্য লিখতে দেওয়া হয়—‘টেলিভিশন আশীর্বাদ না অভিশাপ’। মুখস্থ করা বাক্যে তারা লেখে—বিজ্ঞাপনের ভাষার ক্ষতিকর দিক কিংবা চোখে ও মস্তিষ্কে টিভির রশ্মির কুপ্রভাবের কথা। কিন্তু এভাবে তো আর কোনো বস্তুর ভালো-মন্দের বিচার করা যায় না, বিশেষত যেখানে সেই বস্তুটি গোটা মানবজাতির কিছু মৌলিক পরিবর্তনকে আহ্বান জানাল।
আজকের দিনে মোবাইলের অতিরিক্ত ‘স্ক্রিন টাইম’ নিয়ে যে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় এবং তার ফলে ক্রমশ ‘ক্যালাস’ বা অনুভূতিহীন হতে থাকা প্রজন্মের প্রথম ভার্চুয়াল বিশ্বের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে এই টেলিভিশন নামক গ্যাজেটটির হাত ধরেই। কিন্তু প্রযুক্তির মজাটা এখানেই—সমস্ত ঋণাত্মক দিক সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হওয়া সত্ত্বেও একে অস্বীকার করতে না পারা। এটাই মানব সভ্যতার ভবিতব্য।
সভ্যতার ইতিহাসে টেলিভিশন কত বড় একটি বাঁক ছিল, তা আজ প্রশ্নাতীত। আজ টেলিভিশনের একশো বছরে দাঁড়িয়ে আমরা বুঝতে পারি—এটি সভ্যতার মুখোমুখি এমন এক চ্যালেঞ্জিং গ্যাজেট ছিল, যা আমাদের নিজেদের অবস্থান ও অস্তিত্বের অনুভবহীনতাকে পর্যন্ত চিহ্নিত করে দিয়ে যায়। আমাদের যাপিত জীবনের এই পরিবর্তনকে অস্বীকার করার কোনো উপায় আর অবশিষ্ট নেই।







