যিনি শিখিয়েছিলেন ‘জাত’ মানে শুধু ধর্ম নয়, জাত মানে ক্ষমতা: আন্দ্রে বেতেঁই স্মরণে

Andre Beteille: ১৯৬৫ সালে তাঁর গবেষণা ‘Caste, Class and Power’ যখন প্রকাশিত হলো, তখন তা প্রথাগত সমাজতত্ত্বের সাজানো বাগানটাকেই ওলটপালট করে দিল। তিনি চোখে আঙুল দিয়ে দেখালেন, কেবল ধর্মীয় শুচিতা দিয়ে আর আধুনিক ভারতের জাতি-রাজনীতিকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।

inscript
৬ মিনিট
যিনি শিখিয়েছিলেন ‘জাত’ মানে শুধু ধর্ম নয়, জাত মানে ক্ষমতা: আন্দ্রে বেতেঁই স্মরণে

ভারতীয় সমাজতত্ত্বের আলোচনায় এম.এন. শ্রীনিবাসের পরেই যার নামটি অবধারিতভাবে আসে, তিনি আন্দ্রে বেতেঁই। গত ৩রা ফেব্রুয়ারি তাঁর প্রয়াণ ঘটেছে। কিন্তু এই শোকসংবাদের চেয়েও বড় হলো তাঁর রেখে যাওয়া কাজের প্রাসঙ্গিকতা। গত ছয় দশক ধরে তিনি নিরলসভাবে একটি কথাই প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন, আধুনিক ভারতে ‘জাতি’ (Caste) আর ধর্মীয় অনুশাসনে আটকে নেই; বরং এটি এখন পুরোপুরি রাজনীতি ও ক্ষমতার সমীকরণ।

তিনিই প্রথম আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিলেন, সমাজে একজন মানুষের অবস্থান কেবল তার জন্মগত পরিচয় দিয়ে ঠিক হয় না। জমি, চাকরি এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা কীভাবে জাতব্যবস্থার চিরাচরিত কাঠামোকে ভেঙে দিচ্ছে, সেটাই ছিল তাঁর গবেষণার মূল বিষয়।

বেতেঁইয়ের আগে পর্যন্ত সমাজতত্ত্বের ক্লাসরুমে একটা কথাই আপ্তবাক্যের মতো শেখানো হতো, ভারতের জাতিব্যবস্থা অনড়, অচল এবং কঠোর। লুই ডুমো-র মতো ফরাসি তাত্ত্বিকরা আমাদের বুঝিয়েছিলেন, এই দেশে মানুষ বাঁচে কেবল ‘পবিত্রতা ও অপবিত্রতা’-এর (Purity and Pollution) ধর্মীয় নিয়মে। অর্থাৎ, তাঁদের মতে, একজন ব্রাহ্মণ পুজো করেন, নিরামিষ খান, এবং ধর্মীয় আচার-বিচার মেনে চলেন। তাঁদের এই ‘ধর্মীয় শুচিতা’ই তাঁদের সমাজের মাথায় বসিয়েছে। অন্যদিকে, সমাজের তথাকথিত নিচু জাত বা দলিতরা নিচে থাকেন কারণ ডুমোর মতে, তাঁরা ‘দূষিত’ বা ‘অপবিত্র’ কাজ করেন (যেমন—মৃতদেহ সৎকার, চামড়ার কাজ, নর্দমা পরিষ্কার ইত্যাদি)। এই কাজগুলো ধর্মীয় দৃষ্টিতে ‘অশুচি’ বা ‘দূষণ’ সৃষ্টিকারী।

কিন্তু আন্দ্রে বেতেঁই এই সহজ সমীকরণটা মেনে নিতে পারেননি। তিনি বললেন,

বইয়ের পাতা থেকে মুখ তুলে একটু মাঠের দিকে তাকান।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ভারতীয়ত্বের খোঁজে রতন থিয়ামের ‘রবীন্দ্রনাথ’

Ratan Thiyam: একসময়ের শান্তিনিকেতনের নিত্যযাত্রী রতন থিয়ামের জীবনে রবীন্দ্রনাথ শুধু একজন নাট্যকার নন, এক দার্শনিক মার্গদর্শক।

১৯৬৫ সালে তাঁর গবেষণা ‘Caste, Class and Power’ যখন প্রকাশিত হলো, তখন তা প্রথাগত সমাজতত্ত্বের সাজানো বাগানটাকেই ওলটপালট করে দিল। তিনি চোখে আঙুল দিয়ে দেখালেন, কেবল ধর্মীয় শুচিতা দিয়ে আর আধুনিক ভারতের জাতি-রাজনীতিকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।

শ্রীপুরম ডায়েরি

দক্ষিণ ভারতের তাঞ্জোর জেলার ছোট্ট এক গ্রাম শ্রীপুরম। এই গ্রামটিই ছিল বেতেঁইয়ের ল্যাবরেটরি। তিনি সেখানে গিয়ে দেখলেন এক অদ্ভুত ভোলবদল। একটা সময় ছিল যখন গ্রামের সব জমিজমা ছিল ব্রাহ্মণদের দখলে, তাই গ্রামের শেষ কথাও বলতেন তাঁরাই। তাঁদের মুখের কথাই ছিল আইন।

কিন্তু বেতেঁই দেখলেন, সেই দিন আর নেই। গণতন্ত্র আর ভূমি সংস্কারের (Land Reforms) ধাক্কায় জমি এখন আর কেবল ব্রাহ্মণদের কুক্ষিগত নয়। তা হাতবদল হয়ে চলে যাচ্ছে মধ্যবর্তী ও তথাকথিত নিচু বর্গের চাষিদের হাতে। আর সোজা কথা হলো, যার হাতে জমি, যার হাতে ভোটব্যাংক, ক্ষমতা এখন তার হাতেই। গ্রামের মন্দিরে ব্রাহ্মণ হয়তো এখনও পুজো পাচ্ছেন, কিন্তু পঞ্চায়েতের চেয়ারে আর তাঁর একচ্ছত্র দাপট খাটে না।

বেতেঁই প্রমাণ করলেন, ‘Caste’ (জাতি), ‘Class’ (শ্রেণি) এবং ‘Power’ (ক্ষমতা)—এই তিনটি জিনিস ভারতে আর একরেখায় নেই। একজন তথাকথিত নিচু বর্ণের মানুষও এখন বিত্তবান বা রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাধর হতে পারেন। আজ আমাদের কাছে এটা খুব সাধারণ মনে হতে পারে, কিন্তু ষাটের দশকে দাঁড়িয়ে এটা বলা ছিল এক প্রকার বিপ্লব।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
নীরবতার ভেতর মানুষের কণ্ঠ : ম্যানুয়াল পুইগ ও বেঁচে থাকার গল্প

Manuel Puig: তাঁর চরিত্ররা খুব কমই উচ্চস্বরে কথা বলে; তারা ফিসফিসিয়ে কথা বলে, অন্ধকার ঘরে বসে স্বপ্ন দেখে, পুরনো সিনেমার পর্দার দিকে তাকিয়ে নিজেদের হারিয়ে যাওয়া জীবন খুঁজে বেড়ায়।

অস্পৃশ্যতা দূর হয়েছে, কিন্তু জাতিভেদের চরিত্র?

বেতেঁই বারবার একটা বিষয়ে আমাদের সতর্ক করেছেন। আইন করে অস্পৃশ্যতা দূর করা গেছে ঠিকই, কিন্তু জাতিভেদের চরিত্রটা কি বদলেছে? তাঁর মতে, আগে জাতি ছিল একটি ‘সামাজিক কাঠামো’, যা সমাজকে ধরে রাখত। আর এখন তা হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘স্বার্থের সংঘ’ (Interest Group)।

তিনি খুব স্পষ্ট ভাষায় লিখেছিলেন, রাজনীতিতে জাতির এই ব্যবহার ভারতীয় গণতন্ত্রের জন্য এক অশনিসংকেত। তিনি দেখালেন আমাদের অদ্ভুত এক দ্বৈত সত্তা—আমরা পাবলিক লাইফে (অফিসে, বাসে-ট্রামে) দিব্যি আধুনিক, জাত- পাত মানি না; কিন্তু ড্রইংরুমে বা প্রাইভেট লাইফে (বিয়ে বা আত্মীয়তায়) আমরা সেই পুরনো সংস্কারের কাছেই ফিরে যাই। আধুনিক ভারতীয় সমাজের এই ভণ্ডামিটাকেই তিনি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিলেন।

সুযোগের সমতা থাকলেও থাকে না ফলাফলের সমতা

সংরক্ষণ (Reservation)-এর প্রসঙ্গ এলেই বেতেঁইয়ের কলম ছিল আপসহীন। তিনি বিশ্বাস করতেন, সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষকে টেনে তোলার জন্য সংরক্ষণের প্রয়োজন আছে। কিন্তু তিনি এও মনে করিয়ে দিতে ভুলতেন না যে, ‘ফলাফলের সমতা’ (Equality of Result) জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যায় না।

তাঁর ‘The Idea of Natural Inequality’ বইয়ে তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন, সব মানুষকে জোর করে সমান বানাতে গিয়ে যেন আমরা ‘মেধা’ বা ‘প্রতিভা’র বলি না দিই। তাঁর এই অবস্থান নিয়ে প্রচুর জলঘোলা হয়েছে, বিতর্ক হয়েছে, কিন্তু তিনি তাঁর যুক্তিতে অটল ছিলেন।

চন্দননগরের ফরাসি আবহে বড় হওয়া এই মানুষটি আজীবন যুক্তিবাদী ছিলেন। তিনি আবেগের বশে জাতিভেদকে কেবল ‘খারাপ’ বলে গালি দেননি, বরং ছুরি চালিয়ে দেখিয়েছেন সমাজের শরীরে কোথায় কোথায় এই ক্যান্সার ছড়িয়ে আছে।

আজকের ভারতে যখন জাতি-রাজনীতি নতুন করে মাথাচাড়া দিচ্ছে, যখন ভোটের অঙ্ক কষা হচ্ছে কেবল পদবি দেখে, তখন আন্দ্রে বেতেঁই বড় বেশি প্রাসঙ্গিক। তিনি নেই, কিন্তু তাঁর শেখানো সেই ‘অসমতার জ্যামিতি’ আজও ভারতীয় সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সত্য হয়ে আছে।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।