একদিনে প্রায় ৪০০ বজ্রপাত: কেন কলকাতায় এত বাজ পড়া বাড়ছে?
Kolkata Lightning: কলকাতায় ইদানীং আকাশ ভেঙে যে হারে বজ্রবিদ্যুৎ-সহ ঝড়-বৃষ্টি নামছে, তা আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবহাওয়ার এই খামখেয়ালিপনা আর হঠাৎ ধেয়ে আসা তীব্র বজ্রঝড় নিয়ে ইনস্ক্রিপ্ট কথা বলেছিল বিশিষ্ট পরিবেশবিদ ডঃ স্বাতী নন্দী চক্রবর্তী-র সঙ্গে।
মেট্রো রেলের লাইনে জল জমা, ব্যস্ত রাস্তায় আচমকা বিশালাকার গাছ উপড়ে পড়া কিংবা দিনের বেলাতেই ঘুটঘুটে অন্ধকার নেমে আসা— কলকাতার মানুষের কাছে জুন (২০২৬) মাসের স্মৃতিটা ঠিক এই রকমই। বিশেষ করে ২৩ এবং ২৫ জুনের সেই বিকেল দুটোর কথা শহরবাসী সহজে ভুলবেন না। একদিকে ঘণ্টায় ৭৫ কিলোমিটার বেগে কালবৈশাখীর মতো ঝড়, আর অন্যদিকে অবিরাম কানফাটানো বজ্রধ্বনি। স্থানীয় আবহাওয়া পর্যবেক্ষকরা একে স্রেফ বজ্রপাত বলতে নারাজ, তাঁদের মতে ওটা ছিল আক্ষরিক অর্থেই মেঘেদের “কার্পেট বম্বিং”। মাত্র কয়েক ঘণ্টায় কলকাতার বুকেই আছড়ে পড়েছিল ১৯৯টিরও বেশি জোরালো বজ্রপাত!
কিন্তু আমাদের প্রিয় তিলোত্তমা হঠাত্ এমন ভয়ংকর হয়ে উঠল কেন? কেনই বা শহর ও শহরতলির আকাশে ঘনিয়ে আসছে ১২ কিলোমিটার উঁচু মেঘের পাহাড়? এর পিছনে প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা যতটা আছে, তার চেয়ে অনেক বেশি দায়ী আমরা নিজেরাই।
পরিবেশবিদ ডঃ স্বাতী নন্দী চক্রবর্তী কী বলছেন?
কলকাতা ও শহরতলির এই হঠাৎ তীব্র বজ্রপাত বৃদ্ধি প্রসঙ্গে পরিবেশবিদ ডঃ স্বাতী নন্দী চক্রবর্তী স্পষ্ট জানালেন, এর পিছনে লুকিয়ে আছে শহরের দূষণ এবং কংক্রিটের আগ্রাসন। তাঁর কথায়:
"আমরা এখন শহরতলির অনেক জায়গাতেই প্রচণ্ড পরিমাণে হঠাৎ বাজ পড়তে দেখছি, যা দিন দিন আরও তীব্র হচ্ছে। এর মূল কারণ হলো আমাদের বাতাসে দূষণ কণার মাত্রা ভয়ানক রকম বেশি। বছরের প্রায় ৮০% দিনই এই এয়ার প্যারামিটারগুলি স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক উপরে (অ্যাবনরমাল রেঞ্জ) থাকছে। বাতাসে কার্বনের মাত্রাও খুব বেশি।"
"দ্বিতীয়ত, আমাদের শহরে যে পরিমাণ সবুজের ঘনত্ব থাকা উচিত, তা নেই। চারিদিক শুধু কংক্রিটের বহুতলে ভরে যাচ্ছে। এর ফলে শহরের আবহাওয়া বদলে যাচ্ছে। কোথাও হয়তো একদম বৃষ্টি নেই, আবার ঠিক ১০০ মিটার পরিধির মধ্যে মেঘ ফেটে অতিবৃষ্টি হচ্ছে— যাকে বলে মাইক্রো ক্লাউড বার্স্ট। এর পিছনে এল নিনোর প্রভাবও রয়েছে। বাতাসের এই ভারসাম্যহীনতার কারণেই বজ্রবিদ্যুৎ-সহ এই অতিবৃষ্টির প্রবণতা বেড়েই চলেছে।"
গবেষণার চোখে কলকাতার ‘বাজ’ পড়ার আসল রহস্য
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
El Niño 2026: ২০২৬ সালের সুপার এল নিনো ভারতের বর্ষা, কৃষি ও অর্থনীতির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে? প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণতা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং মৌসুমি বৃষ্টির জটিল সম্পর্ক কী ভাবে খাদ্য উৎপাদন, জলসম্পদ ও মূল্যস্ফীতিকে প্রভাবিত করতে পারে?
বিজ্ঞানী ও গবেষকদের সাম্প্রতিক (২০১৬-২০২৬) বিভিন্ন গবেষণা কিন্তু ডঃ চক্রবর্তীর এই আশঙ্কাকেই সিলমোহর দিচ্ছে। মূলত চারটি কারণকে কলকাতার এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী করা হচ্ছে:
১. মারাত্মক বায়ু দূষণ
আইআইটি খড়্গপুর এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নালের (যেমন: Science of the Total Environment) গবেষণা বলছে, বাতাসে যত বেশি ধূলিকণা, ধোঁয়া বা অ্যারোসল ভেসে বেড়ায়, মেঘের ভিতরে ঘর্ষণ তত বাড়ে এবং তার থেকে বেশি চার্জ তৈরি হয়।
লকডাউনের প্রমাণ: ২০২০ সালের একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, করোনাকালে লকডাউনের সময় কলকাতায় যখন দূষণ এক ধাক্কায় অনেক কমে গিয়েছিল, তখন প্রাক-বর্ষার বজ্রপাতও প্রায় ৪৯% কমে গিয়েছিল! অর্থাৎ, দূষণ সরাসরি বাজ পড়ার সংখ্যা বাড়িয়ে দেয়।
২. আরবান হিট আইল্যান্ড (UHI) বা ‘উষ্ণতার দ্বীপ’
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
আমেরিকার আবহাওয়া সংস্থা 'নোয়া' (NOAA)-এর মে ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, মে থেকে জুলাই মাসের মধ্যেই এই এল নিনো তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৮২ শতাংশ। শুধু তাই নয়, বছরের শেষের দিকে এটি এতটা শক্তিশালী রূপ নিতে পারে যা গত ১৫০ বছরের ইতিহাসকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।
কলকাতা এখন একটা গরম কংক্রিটের দ্বীপ। গাছপালা কেটে পুকুর বুজিয়ে যেভাবে বহুতল আর পিচের রাস্তা তৈরি হচ্ছে, তা দিনের বেলার তাপ ধরে রাখছে। এই গরম বাতাস যখন হু হু করে উপরে উঠে যায় (কনভেকশন প্রক্রিয়া), তখন খুব দ্রুত আকাশজুড়ে তৈরি হয় দানবীয় কিলিং ক্লাউড বা কিউমুলোনিম্বাস মেঘ। যার ফল— হঠাৎ ধেয়ে আসা তীব্র ঝড়।
৩. জলবায়ু পরিবর্তন ও বঙ্গোপসাগর
বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে সমুদ্রের জল গরম হচ্ছে। ফলে বঙ্গোপসাগর থেকে প্রচুর পরিমাণে জলীয় বাষ্প বা আর্দ্রতা কলকাতার বাতাসে ঢুকছে। একদিকে দুপুরের চড়া রোদ ও গরম (৩৪° সেলসিয়াস+), আর অন্যদিকে এই বিপুল আর্দ্রতা— এই দুইয়ে মিলে তৈরি হচ্ছে এক বিস্ফোরক পরিস্থিতি। গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ এখন বজ্রপাতের নতুন ‘হটস্পট’।
ক্ষয়ক্ষতির ভয়াবহ খতিয়ান
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
heatwave India: দিনের দাবদাহের চেয়ে কি রাতের বাড়তে থাকা তাপমাত্রাই এখন বেশি বিপজ্জনক? কেন শহরে গরমে বাড়ছে অসুস্থতা ও মৃত্যুহার?
এই তীব্র বজ্রঝড়ের খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। গত ২৩ জুনের ঝড়ে মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ানে গঙ্গা নদীতে নৌকো চড়ার সময় বজ্রপাতে ৪ জন মারা যান, আহত হন ১৫ জন। রাজ্যজুড়ে এই সংখ্যাটা ছিল আরও বেশি।
পরিসংখ্যান বলছে, ভারতে যত প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয় (বন্যা বা ভূমিকম্প), তার মধ্যে বজ্রপাতেই সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যান।
সরকারি হিসেব অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই বজ্রপাতে ১২৫৯ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ২০২৪ সালে পুরো ভারতে এই সংখ্যাটা ছিল প্রায় ২৮২৫।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, মৃতদের মধ্যে প্রায় ৭৭%-ই হলেন গ্রামীণ এলাকার মানুষ ও কৃষক, যাঁরা মাঠে কাজ করার সময় খোলা আকাশের নিচে এই বিপদের মুখে পড়েন। আর শহরে এর প্রভাব পড়ছে মূলত উপড়ে যাওয়া গাছ, ট্রাফিক জ্যাম ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের উপর।
বাঁচার উপায় কী? গবেষক ও আবহাওয়াবিদদের পরামর্শ
আবহাওয়া দপ্তর (IMD) জানাচ্ছে, আগামী দিনগুলিতেও দক্ষিণবঙ্গে এই ধরনের হঠাৎ ঝড়ের দাপট বজায় থাকবে। এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে বিশেষজ্ঞরা মূলত দুটি দিকে নজর দিতে বলছেন:
শহরের জন্য: অবিলম্বে দূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং শহর ও শহরতলিতে সবুজের পরিমাণ (গাছপালা) বহুগুণ বাড়াতে হবে, যাতে এই স্থানীয় তাপমাত্রা বা হিট আইল্যান্ড এফেক্ট কমানো যায়।
সচেতনতা ও প্রযুক্তি: গ্রামীণ এলাকায় ‘লাইটনিং অ্যারেস্টার’ (বজ্রনিরোধক দণ্ড) বসানো দরকার। সাধারণ মানুষকে সরকারি ‘দামিনী’ (Damini) অ্যাপ ব্যবহার করতে হবে, যা আগে থেকেই বাজের সতর্কতা দেয়।
ঝড়-বৃষ্টির আভাস পেলেই খোলা মাঠ, নদী বা বড় গাছের নিচে আশ্রয় নেওয়া বন্ধ করতে হবে। পাকা বাড়ির নিচে দাঁড়ান এবং ঘরের ভিতরের সমস্ত দামি ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রপাতির প্লাগ খুলে রাখুন।






