আলো-বাতাসের খেলায় দেশের সেরা স্থাপত্য গড়েছেন তিনিই! দেশ ভুলেছে যে শিল্পীকে
Architect BV Doshi: জ্যামিতিক নকশার বাইরে গিয়ে তিনি 'আমদাবাদ নি গুফা' (গুজরাতি ভাষায় 'আহমেদাবাদের গুহা') নামে একটি ভূগর্ভস্থ আর্ট গ্যালারির ধারণাও তৈরি করেন।

চলতি বছরের গোড়াতেই চলে গিয়েছেন বি ভি দোশি। দেশের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ স্থপতি বলেই মানুষ চেনেন দোশিকে, অনেকেই চেনেনও না। তবে তাঁর কীর্তিকে চেনেন, কীর্তির তারিফ করেন শিল্পপ্রেমী থেকে শুরু করে আম আদমি সকলেই। ২৪ জানুয়ারি ৯৫ বছরে প্রয়াত হয়েছেন বি.ভি. দোশি। স্থাপত্যশিল্পকে ভারতে এক নতুন বাঁকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন দোশি। স্থাপত্য মানেই ইট-কাঠ-কংক্রিটের আবর্জনা নয়। দোশির চিন্তনে সমস্ত স্থাপত্য এক শিল্প হয়ে উঠেছে আক্ষরিক অর্থেই। বালকৃষ্ণ বিথলদাস দোশি, পরিচিত অবশ্য বি ভি দোশি নামেই। ২০২২ সালে RIBA রয়্যাল গোল্ড মেডেল দিয়ে সম্মান জানায় এই শিল্পীকে। দ্বিতীয় ভারতীয় স্থপতি হিসেবে এই সম্মান অর্জন করেন দোশি। রিচার্ড রজার্স, জাহা হাদিদ, শিগেরু বান এবং রেম কুলহাসের মতো বিশ্বমানের স্থপতিদের মধ্যে নিজের জায়গা করে নেন দোশি, স্থাপত্যের অগ্রগতিতে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য ২০১৮ সালে প্রিটজকার আর্কিটেকচার পুরস্কার পাওয়া একমাত্র ভারতীয় স্থপতি তিনিই।
সাল ১৯৪৭। ঔপনিবেশিক পরিচয় থেকে বেরিয়ে স্বতন্ত্র পথে এগোতে চলেছে দেশ। ঠিক তখনই দোশিও স্থাপত্য শিক্ষা নিয়ে পড়াশোনা শুরু করলেন। ১৯৫০ সালে ইউরোপে চলে গেলেন দোশি। বিখ্যাত স্থপতি লে করবুসিয়ারের সঙ্গে সেখানে কাজ শুরু করেন। চার বছর পরে ভারতে ফিরে এসে আগামী কয়েক বছরে আহমেদাবাদে কর্বুসিয়ারের প্রকল্পের তত্ত্বাবধান করেন এবং আহমেদাবাদের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টের ক্যাম্পাসের নকশায় স্থপতি লুই কানের সঙ্গে সহযোগিতাও করেন।

তার সবচেয়ে পরিচিত একটি স্থাপত্যশিল্প হলো সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল প্ল্যানিং অ্যান্ড টেকনোলজি (CEPT বিশ্ববিদ্যালয়), যা মূলত আহমেদাবাদে স্কুল অব আর্কিটেকচার হিসাবেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই ভবনের নকশা দেখলেই বোঝা যায়, পশ্চিমি স্থপতিদের ভাবনার সঙ্গে মিল রয়েছে বেশ। এই স্থাপত্যের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ফানেলের মতো সিঁড়ির ধাপ। প্রকৃতির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়াতে অফিশিয়াল এবং আন অফিশিয়াল জায়গাগুলির মধ্যেকার সীমানাকে অস্পষ্ট করার জন্য খোলামেলা বাড়ি তৈরিই ছিল মূল উদ্দেশ্য। তাই বাড়ির সম্মুখভাগ উন্মুক্ত ইট এবং কংক্রিট দিয়ে তৈরি। দোশির বেশিরভাগ কাজেই এই জিনিসটি লক্ষ্যণীয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Meghnad Saha: চরকায় সুতো কেটে যে ভারতের উন্নতি ঘটানো যাবে না তা মেঘনাদ প্রকাশ্যেই বলতেন। ফলে নেহেরুর সঙ্গে তাঁর মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়।

তাঁর আরেকটি বিখ্যাত কাজ হলো 'সংগাথ’। সংগাথ আসলে তাঁর ফার্ম, বাস্তু শিল্প কনসালট্যান্টসের অফিস। সংগাথ শব্দের অর্থ হল সহভাগিতা। গোটা বাড়ির নকশাও সেই কথাকে মাথায় রেখেই। বাড়িটি খিলানযুক্ত ছাদ, রিফ্লেকটিং পুল এবং নানা নিচু জায়গা নিয়ে গঠিত। প্রাথমিকভাবে কংক্রিটের তৈরি এই উপাদানগুলি বাইরের সঙ্গে ভিতরকে অদ্ভুতভাবে মিলিয়ে দিয়েছে। এই বাড়ির ভিতর বায়ুচলাচল এবং তাপীয় ব্যবস্থাপনাও দুর্দান্ত!

ইন্দোরে দোশির তৈরি অরণ্য লো কস্ট হাউজিংয়ের নকশা ১৯৯৬ সালে স্থাপত্যের জন্য আগা খান পুরস্কার অর্জন করে। এই জটিল মাস্টারপ্ল্যানে একটি টয়লেট, জল এবং বিদ্যুতের মতো মৌলিক সুযোগ-সুবিধা সহ ৬,৫০০ টি আবাসনের নকশা ছিল। কাজ শুরু হয়েছিল ৬০টি ঘর দিয়ে। শুধুই মাথা গোঁজার আশ্রয় নয়, কীভাবে এই কমিউনিটির মধ্যেই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র শুরু করা যায় তার পরিকল্পনাও ছিল এই নকশায়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
West Bengal Civil Service : চলতি মাসের ২ তারিখ ২০২০ সালের WBCS পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে সারা বাংলায় এক্সিকিউটিভ ‘এ’ বিভাগে ২৭ তম স্থান দখল করেছেন হরিশ্চন্দ্রপুরের কেশব দাস।
জ্যামিতিক নকশার বাইরে গিয়ে তিনি 'আমদাবাদ নি গুফা' (গুজরাতি ভাষায় 'আহমেদাবাদের গুহা') নামে একটি ভূগর্ভস্থ আর্ট গ্যালারির ধারণাও তৈরি করেন। এই গ্যালারিতে শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেনর চিত্রশিল্প শোভা পায়। ছবিগুলি ফ্রেমে প্রদর্শনের পরিবর্তে গুহার মতো স্থানের দেওয়াল ও কলামে আঁকা হয়েছে। বাইরে চিনামাটির টাইলস দিয়ে ঢাকা ফেরোসিমেন্ট ঢিবি দেখতে পাওয়া যায়। এই ঢিবির মধ্যের বেশ কয়েকটি স্কাইলাইটের মাধ্যমে আলো নিচে প্রবেশ করে স্পটলাইটের মতো কাজ করে।

বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টের নকশাও দোশির তৈরি। দক্ষিণ ভারতের মন্দিরগুলি থেকে অনুপ্রাণিত এই বিল্ডিংটিতে বেশ কয়েকটি উঠোন এবং ছায়াঘেরা হাঁটার পথ রয়েছে যাতে আলোর ব্যবস্থা বিভিন্ন রকমের। বিল্ডিংয়ের বাইরের দেয়ালে লতানো গাছপালা একে আরও অপরূপ করে তোলে। দোশির অন্যান্য নকশার মতোই এখানেও সহজে বায়ুচলাচলের স্থান প্রচুর।

দোশির সমস্ত কাজ ভারতীয় স্থাপত্যকে তার সাংস্কৃতিক শিকড়ের সঙ্গে জুড়ে দেয়। কর্মজীবনের প্রথম দিকে ইউরোপীয় স্থাপত্যের সঙ্গে পরিচিতি হওয়াতে নকশায় মর্ডানিজম এবং ব্রুটালিজমের ছাপও মেলে। ছায়াঘেরা পথ, উঠোন এবং প্রকৃতির আলোকে নানাভাবে ব্যবহার করা এবং বায়ুচলাচল ব্যবস্থার উপর জোর দেওয়াও তাঁর দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই শিল্পেরই বৈশিষ্ট্য।

৯৫ বছরের জীবন জুড়ে ভারতের এক অনন্য স্থপতি শুধু নয়, শিল্পী হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন দোশি। ভারতীয় স্থপতিদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তিনিই ছিলেন মহীরুহ। পরিবেশগত নকশায় গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি বাস্তু-শিল্প ফাউন্ডেশনও প্রতিষ্ঠা করেন। পদ্মভূষণ, গ্লোবাল অ্যাওয়ার্ড, পদ্মশ্রী এবং অফিসার অফ দ্য অর্ডার অফ আর্টস অ্যান্ড লেটারের সম্মানও রয়েছে ভারতের এই স্থপতির ঝুলিতে।







