হিমাচলের পাহাড়ে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ডাক পৌঁছে দেন শ্রুতি ঠাকুর
Mountain Postwoman: শ্রুতি ঠাকুর কোনো পর্বতারোহী নন। তিনি হিমাচল প্রদেশের একটি প্রত্যন্ত গ্রামের ‘গ্রামীণ ডাক সেবক’ (Assistant Branch Postmaster)। কিন্তু এই দুর্গম পাহাড়ে বসবাসকারী অজস্র মানুষের কাছে তিনি কেবল একজন সরকারি কর্মী নন, তিনি হলেন এক টুকরো আশা আর ভরসার নাম।
হিমালয়ের দুর্গম পাহাড়ি পথ। কোথাও পায়ের নিচে আলগা পাথর, কোথাও বুক কাঁপানো উতরাই চড়াই। শীতকালে চারপাশ ঢেকে যায় তিন-থেকে চার ফুট বরফে, আর বর্ষায় পাহাড়ি নদীগুলি হয়ে ওঠে ভয়ঙ্কর। যেখানে সাধারণ মানুষের যাতায়াত থমকে যায়, ঠিক সেখান থেকেই শুরু হয় শ্রুতি ঠাকুরের প্রতিদিনের পথ চলা।
শ্রুতি ঠাকুর কোনো পর্বতারোহী নন। তিনি হিমাচল প্রদেশের একটি প্রত্যন্ত গ্রামের ‘গ্রামীণ ডাক সেবক’ (Assistant Branch Postmaster)। কিন্তু এই দুর্গম পাহাড়ে বসবাসকারী অজস্র মানুষের কাছে তিনি কেবল একজন সরকারি কর্মী নন, তিনি হলেন এক টুকরো আশা আর ভরসার নাম।
হিমাচল প্রদেশের রামপুর ডিভিশনের অন্তর্গত একটি ছোট্ট, প্রত্যন্ত গ্রাম ‘ফাঞ্চা’। শ্রীখণ্ড মহাদেবের কোলে লুকিয়ে থাকা এই গ্রামটি আর পাঁচটা সাধারণ জায়গার মতো নয়। এখানে নেই চওড়া রাস্তা, নেই যানবাহনের কোলাহল। আধুনিক পৃথিবীর অনেক সুযোগ-সুবিধাই এখানে পৌঁছয়নি।
এই ফাঞ্চা ব্রাঞ্চ পোস্ট অফিসেই কর্মরত শ্রুতি। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে তাঁর প্রথম কাজ হলো গ্রামের দুর্গা মন্দিরে যাওয়া। মন্দিরে পুজো দিয়ে, আশীর্বাদ নিয়ে কাঁধে ডাকের ব্যাগটি ঝুলিয়ে নেন তিনি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Clay Speaker: কোনো তার নেই, কোনো ব্লুটুথ কানেকশন নেই, এমনকী চার্জ দেওয়ারও ঝক্কিও নেই। শুনতে একটু অবিশ্বাস্য হলেও, কেরলের এক প্রতিভাবান শিল্পী ঠিক এই জাদুটিই বাস্তবে ঘটিয়ে দেখিয়েছেন।
সেখান থেকে শুরু হয় তাঁর আসল লড়াই। ফাঞ্চা, কান্দি, তিক্কর আর নন্দী—এই চার-চারটি গ্রামের মানুষের কাছে সরকারি পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব তাঁর একার কাঁধে।
ব্যাগে শুধু চিঠি থাকে না, থাকে বেঁচে থাকার রসদ
আজকের ডিজিটাল যুগে আমরা হয়তো ভাবি, পোস্ট অফিসের কাজ তো শুধু চিঠি বা পার্সেল বিলি করা। কিন্তু শ্রুতির ক্ষেত্রে গল্পটা একদম আলাদা। তাঁর ব্যাগে চিঠির চেয়েও বেশি থাকে মানুষের বেঁচে থাকার জরুরি উপাদান। গ্রামের বৃদ্ধরা, যাঁরা হেঁটে অনেক দূরে যেতে পারেন না, শ্রুতি তাঁদের বাড়িতে গিয়ে আঙুলের ছাপ (Biometric) মিলিয়ে পেনশনের টাকা হাতে তুলে দেন। পাহাড়ি এলাকায় ভালো হাসপাতাল বা ওষুধের দোকান পেতে গেলে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ কিলোমিটার দূরে যেতে হয়। শ্রুতি শহর থেকে অর্ডার করা সেই সব জীবনদায়ী ওষুধ পাহাড়ি পথ ভেঙে সরাসরি রোগীদের ঘরে পৌঁছে দেন। আধার কার্ড থেকে শুরু করে একশো দিনের কাজের (MGNREGA) টাকা—সবই গ্রামবাসীরা পেয়ে যান ঘরের দোরগোড়ায়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
গত পাঁচ বছর ধরে তাঁর বাড়িতে কোনো ডাস্টবিন বা আবর্জনার বালতি নেই! শুনলে অবাক লাগাই স্বাভাবিক, কিন্তু এই ব্যস্ত শহরের বুকেই এক ফোঁটা আবর্জনা না জমিয়ে সম্পূর্ণ ‘জিরো-ওয়েস্ট’ বা বর্জ্যহীন জীবন কাটানো যে সম্ভব, তা হাতেনাতে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন এই মিডিয়া কর্মী।
স্থানীয় পঞ্চায়েত প্রধানের কথায়, এই অঞ্চলটি এই ব্লকের সবচেয়ে দুর্গম অংশ। শ্রুতি যদি এই দায়িত্ব না নিতেন, তবে একেকটি কাজের জন্য গ্রামবাসীদের ২০-২৫ কিলোমিটার পাহাড়ি পথ ভেঙে নিচে নামতে হতো।
শ্রুতি যে পথ দিয়ে হাঁটেন, তা প্রতি মুহূর্তে ধৈর্যের পরীক্ষা নেয়। গত বছর এক ভয়াবহ বন্যায় নন্দী গ্রামের প্রধান স্থায়ী সেতুটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। ভেসে যায় ১০১টি বাড়ি, প্রাণ হারান বহু মানুষ। বর্তমানে যাতায়াতের জন্য গ্রামবাসীরা একটি অস্থায়ী নড়বড়ে কাঠের সেতু তৈরি করেছেন। সেই খ্যাপাটে নদীর উপর আলগা কাঠের সেতু দিয়ে প্রতিদিন নিজের ভারসাম্য বজায় রেখে, কাঁধে ভারী ব্যাগ নিয়ে পার হন শ্রুতি।
আবার শীতকাল এলে এই লড়াইয়ের রূপ বদলে যায়। চারপাশ যখন তিন-চার ফুট বরফে ঢেকে যায়, তখন প্রতিটি পদক্ষেপ হয়ে ওঠে পিছল আর বিপজ্জনক। কনকনে ঠান্ডায় যেখানে ঘরের বাইরে বের হওয়াই দায়, সেখানে শ্রুতি বরফ ভেঙে এগিয়ে চলেন।

শ্রুতি তাঁর এই ভালবাসার গ্রামটিকেও খুব সুন্দর করে চেনেন। কাজের ফাঁকে তিনি গল্প করেন পাহাড়ের প্রকৃতির। পাহাড়ে ফুটে থাকা উজ্জ্বল লাল রঙের ‘বুরানশ’ (Buransh) ফুল দেখিয়ে তিনি জানান, এই ফুলের যেমন ঔষধি গুণ আছে, তেমনই স্থানীয় মানুষ এটি দিয়ে চমৎকার চাটনি আর জুস তৈরি করেন।
তিনি দর্শকদের পরিচয় করিয়ে দেন ঐতিহ্যবাহী ‘ঘারাট’-এর সঙ্গে। এটি হলো জলশক্তির সাহায্যে চলা পাহাড়ি অঞ্চলের এক প্রাচীন আটার কল। বিদ্যুৎ ছাড়াই ঝরনার জলের তোড়ে যেখানে গম, যব বা ভুট্টা প্রাকৃতিকভাবে পিষে আটা তৈরি হয়।
ইন্ডিয়া পোস্টের (India Post) অফিশিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে শ্রুতির এই কাহিনিটি আসার পর থেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় এটি তুমুল ভাইরাল হয়। লক্ষ লক্ষ মানুষ তাঁর এই নিষ্ঠা দেখে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছেন। অনেকে তাঁকে ‘হিমালয়ের জীবনরেখা’ বা ‘হিমাচলের মেয়ে’ বলে ডাকছেন।
তুষারাবৃত পথের শেষে শ্রুতির জন্য কোনো লাল গালিচা পাতা থাকে না। কাঁধে ওষুধের ব্যাগ নিয়ে যখন তিনি ওই বিপজ্জনক কাঠের সেতু পার হন, তখন হাততালি দেওয়ার মতো কেউ থাকে না। কোনো বড় সংবাদপত্রের প্রথম পাতাতেও হয়তো তাঁর নাম ছাপা হয় না। কিন্তু প্রতিদিন কোনো এক প্রত্যন্ত ঘরের বৃদ্ধ যখন তাঁর হাত থেকে পেনশনের টাকাটা পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন, কিংবা কোনো রোগী যখন সঠিক সময়ে ওষুধটা হাতে পান—ঠিক তখনই সফল হয় শ্রুতির প্রতিদিনের এই নীরব যাত্রা।






