ভারতের অন্ধকার গুহায় লুকিয়ে ভবিষ্যতের অ্যান্টিবায়োটিক? বিজ্ঞানীদের গবেষণায় নতুন আশা

দিনের পর দিন বহু ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া আমাদের চেনা অ্যান্টিবায়োটিকগুলির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলছে। ডাক্তারদের ভাষায় একে বলে 'অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স'। সাধারণ ইনফেকশন বা সংক্রমণও এখন অনেক সময় আর ওষুধে সারতে চাইছে না। এই চরম সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে বিজ্ঞানীরা এবার নজর দিয়েছেন মাটির গভীরে, এক অদ্ভুত অণুজীব জগতের দিকে।

inscript
৪ মিনিট
ভারতের অন্ধকার গুহায় লুকিয়ে ভবিষ্যতের অ্যান্টিবায়োটিক? বিজ্ঞানীদের গবেষণায় নতুন আশা

মাটির নিচে, নিচ্ছিদ্র অন্ধকারের বুকে লুকিয়ে আছে এক অচেনা পৃথিবী। আমাদের মনে হয়, বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় বড় আবিষ্কারগুলি বোধহয় আধুনিক ল্যাবরেটরির টেস্টটিউব আর যন্ত্রপাতির ভিতরেই ঘটে। কিন্তু কেমন হবে, যদি মানবজাতিকে বাঁচানোর পরবর্তী যুগান্তকারী ওষুধটি কোনো ল্যাবরেটরিতে নয়, বরং লুকিয়ে থাকে ভারতের কোনো অন্ধকার গুহার দেওয়ালে?

চিকিৎসা বিজ্ঞানের সামনে এখন একটা মস্ত বড় দেওয়াল। দিনের পর দিন বহু ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া আমাদের চেনা অ্যান্টিবায়োটিকগুলির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলছে। ডাক্তারদের ভাষায় একে বলে 'অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স'। সাধারণ ইনফেকশন বা সংক্রমণও এখন অনেক সময় আর ওষুধে সারতে চাইছে না। এই চরম সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে বিজ্ঞানীরা এবার নজর দিয়েছেন মাটির গভীরে, এক অদ্ভুত অণুজীব জগতের দিকে।

সম্প্রতি ‘জিওমাইক্রোবায়োলজি জার্নাল’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্র বিজ্ঞানীদের মনে নতুন আশার আলো জাগিয়েছে। গোয়ার উদ্ভিদবিদ্যার অধ্যাপক ড. সুজাতা ডাবোলকরের করা এই সমীক্ষা বলছে— ভারতের গুহাগুলির দেওয়ালে নিঃশব্দে বেড়ে ওঠা কিছু অনুবীক্ষণিক ছত্রাকই হতে পারে আমাদের ভবিষ্যতের জীবনদায়ী ওষুধের আসল চাবিকাঠি।

ভারতে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১,৫০০টিরও বেশি গুহা রয়েছে। মেঘালয়ের বিশাল চুনাপাথরের গুহা, অন্ধ্রপ্রদেশের বিখ্যাত বোরা গুহা, ছত্তিশগড়ের কোটুমসার, কিংবা গোয়া ও দাক্ষিণাত্যের প্রাচীন গুহাগুলির পরিবেশ পৃথিবীর বাকি অংশের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।

এখানে কোনো সূর্যের আলো পৌঁছয় না। সারা বছর ধরে একই রকম স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া আর চরম পুষ্টির অভাব। সাধারণ কোনো জীব সেখানে দুদিনও টিকতে পারবে না। কিন্তু প্রকৃতির কী আশ্চর্য নিয়ম! এই চরম প্রতিকূলতাকেই আপন করে নিয়েছে একদল অণুবীক্ষণিক ছত্রাক। গবেষকেরা ভারতের গুহায় Aspergillus, Penicillium, Cladosporium-এর মতো বেশ কিছু বিশেষ ছত্রাক গোষ্ঠীর সন্ধান পেয়েছেন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কেমোথেরাপির বিকল্প? IIT-BHU-এর আবিষ্কারে ক্যানসার চিকিৎসায় আশার আলো

বায়োকেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক বিকাশ কুমার দুবের নেতৃত্বে একটি গবেষক দল এই কৃতিত্ব দেখিয়েছে। গবেষক শিবকুমার এবং রাজ বাহাদুর সিং-এর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে তাঁরা এমন একটি রাসায়নিক যৌগ চিহ্নিত করেছেন, যা ল্যাবরেটরির নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে স্তন ক্যানসারের কোষগুলিকে সুনির্দিষ্টভাবে নিশানা করতে পারে।

এই ছত্রাকগুলি বেঁচে থাকার জন্য চারপাশের পাথরের সঙ্গে প্রতিনিয়ত বিক্রিয়া করে চলেছে। নিজেদের শরীর থেকে এক ধরনের বিশেষ অ্যাসিড আর এনজাইম তৈরি করে এরা শক্ত পাথরকে গলিয়ে দেয়, খনিজ ভেঙে ফেলে। সহজ কথায়, এরা শুধু গুহার বাসিন্দা নয়, গুহাগুলির ভিতরের রূপ তৈরি করতেও এদের মস্ত বড় হাত রয়েছে।

বিজ্ঞানীদের কাছে এই ছত্রাকগুলির টিকে থাকার লড়াইটাই সবচেয়ে আকর্ষণীয়। হাজার হাজার বছর ধরে বাইরের জগত থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে, প্রায় কোনো খাবার ছাড়া এই অন্ধকূপে এরা বেঁচে আছে কীভাবে?

বেঁচে থাকার এই নির্মম লড়াইয়ে অন্য শত্রু জীবাণুদের হাত থেকে নিজেদের বাঁচাতে এই ছত্রাকগুলি নিজেদের শরীরে এক ধরনের শক্তিশালী রাসায়নিক ঢাল তৈরি করে নিয়েছে। এদের তৈরি এই প্রাকৃতিক রাসায়নিক যৌগগুলিই চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরবর্তী প্রজন্মের অ্যান্টিবায়োটিক তৈরিতে দারুণভাবে সাহায্য করতে পারে। যেহেতু এরা সাধারণ পরিবেশের চেয়ে বহুগুণ কঠিন পরিস্থিতিতে টিকে থাকে, তাই এদের ভিতরের এনজাইমগুলিও অত্যন্ত শক্তিশালী। শিল্পক্ষেত্রে বা ওষুধ তৈরিতে যা অভাবনীয় বিপ্লব এনে দিতে পারে।

অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, ভারতের ১,৫০০ গুহার মধ্যে মাত্র সামান্য কয়েকটি গুহার অণুজীব নিয়েই এ পর্যন্ত গবেষণা হয়েছে। সিংহভাগ জগতটাই আমাদের কাছে আজও এক মস্ত বড় ধাঁধা।

এই ছত্রাকগুলির ক্ষমতা কেবল পৃথিবীর বুকেই সীমাবদ্ধ নয়, এদের দৌড় টেক্কা দিতে পারে মহাকাশ বিজ্ঞানকেও। গুহার ভিতরে অতি বেগুনি রশ্মি বা বিকিরণ সহ্য করে এবং নামমাত্র পুষ্টিতে বেঁচে থাকার যে ক্ষমতা এদের রয়েছে, তা হুবহু মিলে যায় মঙ্গল গ্রহ কিংবা বৃহস্পতির বরফে ঢাকা উপগ্রহ ‘ইউরোপা’-র পরিবেশের সঙ্গে।

তাই পৃথিবীর বাইরের গ্রহগুলিতে প্রাণের সম্ভাবনা কেমন হতে পারে, তা বুঝতে মহাকাশ-জীববিজ্ঞানীরা এখন ভারতের এই গুহা-ছত্রাকদের নিয়ে দারুণ উৎসাহী। ভবিষ্যতের দূরপাল্লার মহাকাশ মিশনগুলিতে নভোচারীদের সুরক্ষা বা বর্জ্য পরিশোধনেও এই লড়াকু ছত্রাকদের ব্যবহার করা যেতে পারে।

তবে গুহা থেকে এই অমূল্য সম্পদ তুলে আনা মোটেও সহজ কাজ নয়। প্রথমত, গুহার ভিতরের এই অণুবীক্ষণিক পরিবেশ বা ইকোসিস্টেম অত্যন্ত সংবেদনশীল। মানুষের যাতায়াত বা ভুল পদ্ধতিতে নমুনা সংগ্রহ করলে এই আদিম পরিবেশ চিরতরে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, এই ছত্রাকগুলির অনেকগুলিই ল্যাবরেটরির কৃত্রিম পরিবেশে বাঁচানো যায় না। তার জন্য প্রয়োজন আধুনিক জেনোমিক্স ও প্রযুক্তির সাহায্য।

পাশাপাশি রয়েছে আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব। গুহা থেকে পাওয়া এই প্রাকৃতিক সম্পদ যাতে অপব্যবহার না হয় এবং কোনো সফল ওষুধ তৈরি হলে তার সুফল যাতে স্থানীয় মানুষ ও দেশ সঠিকভাবে পায়, তা নিশ্চিত করাও বড় দরকার।

ভারতের এই অন্ধকার গুহাগুলি আসলে বিজ্ঞানের এক একটা না-খোলা খনি। যে মাটির নিচের জগতকে আমরা এতদিন মৃত বা জনমানবহীন বলে ভেবে এসেছি, তারই অন্ধকারের বুকে লুকিয়ে রয়েছে মানবজাতির ভবিষ্যৎ বাঁচানোর মহৌষধ। ছোট্ট এই অণুজীবগুলিই হয়তো খুব চটজলদি আমাদের বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় বড় প্রশ্নের উত্তর দিতে চলেছে।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

চিনির বিকল্প স্টেভিয়া! ঘরের বাগানে রাখা যায় যে ‘মধু পাতা’

Stevia benefits: গাছ থেকে সদ্য তোলা কাঁচা পাতা কিংবা রোদে শুকিয়ে নেওয়া পাতা সরাসরি চা বা যেকোনো পানীয়ের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা যায়। এতে চিনির মতো একই রকম মিষ্টতা পাওয়া যায়। স্টিভিয়ার নির্যাস থেকে তৈরি মিষ্টান্ন ডায়াবেটিস রোগীরা খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকি থাকে না বললেই চলে।

ফুটপাথের ধারের সেই খাবার যেভাবে হয়ে উঠল কলকাতার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

Kolkata Street food history: সুতানুটি-গোবিন্দপুর-কলিকাতার শ্রমজীবী মানুষের তৃপ্তির জন্য জন্ম হয়েছিল ফুটপাতের খাবারের। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের 'সংবাদ প্রভাকর' থেকে হুতোম প্যাঁচার নকশা, এফএও সমীক্ষা থেকে এফএসএসএআই আইন হয়ে ২০২৫ সালে রাসেল স্ট্রিটে প্লাস্টিক-মুক্ত ফুড হাবের জন্ম। কলকাতার স্ট্রিট ফুড আজও এই শহরের প্রাণ। এই শহরের অন্যতম ঐতিহ্য।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি কেন আরশোলার মৃত্যুতে দুঃখ পেয়েছিলেন?

Sanae Takaichi cockroach story: ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ। সরকারি বাসভবনে গভীর রাতে একা কাজ করতে গিয়ে তিনি একটি আরশোলা দেখতে পেয়েছিলেন। সচরাচর আরশোলা দেখলে তিনি চিৎকার করে ওঠেন, কিন্তু সেদিন তিনি সেটিকে মারেননি।

স্ট্রেস কি সবসময় খারাপ? কখন স্বাভাবিক চাপ হয়ে ওঠে মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি?

mental stress: একটি ইঁদুরের উপর পরীক্ষা করতে গিয়ে তারা দেখেছেন, একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ইঁদুরটির মধ্যে স্ট্রেস বাড়ানোর সঙ্গে তার কাজকর্মের মান আরও উন্নত হয়েছে। কিন্তু নির্দিষ্ট সীমা পার করবার পর পরই তার ফলাফল করার সর্বোচ্চ সম্ভাবনা ক্রমশ কমতে কমতে শেষে সেটা প্রায় শূন্যতে নেমে গিয়েছে।

নিজের সর্বস্ব দিয়ে হাসপাতাল গড়েছিলেন রাধাগোবিন্দ কর

History of RG Kar Medical College and Hospital: আজ যে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল বারবার খবরের শিরোনামে, তার দীর্ঘ ইতিহাস কী? কে ছিলেন রাধাগোবিন্দ কর, যিনি নিজের সম্পত্তি বিক্রি করে গরিব মানুষের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল গড়ে তুলেছিলেন? প্লেগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, বাংলায় চিকিৎসাবিজ্ঞান চর্চা ও সমাজসেবায় তাঁর অবদান আজ কতটা মনে রাখা হয়েছে?

হিরোশিমা-নাগাসাকির আগুন থেকে বেঁচে যাঁরা, কেমন ছিল তাঁদের পরের জীবন?

Hiroshima, Nagasaki: বিস্ফোরণের বহু বছর পর এমিকোর ঘরে মেয়ে এল, আর তারও পর জন্ম নিল এমিকোর নাতনি কাজুমি কুওয়াহারা। নবজাতক নাতনিকে দেখে চিকিৎসকেরা পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, "এই বাচ্চা তিন দিনের বেশি বাঁচবে না।" জিনের ভিতরে লুকিয়ে থাকা কোনো অজানা দুর্বলতা যেন জন্ম থেকেই জাপটে ধরেছিল ছোট কাজুমিকে।

কেন কম ঘুমেও কেউ সুস্থ, কেউ হারাচ্ছেন স্মৃতি? জানালেন গবেষকরা

sleep deprivation and brain health: গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে AQP4 (Aquaporin-4) নামে একটি জিন। এই জিনকে অনেকটা মস্তিষ্কের 'সাফাই কর্মী' বলা যায়। আমরা যখন গভীর ঘুমে থাকি, তখন মস্তিষ্কে শুরু হয় এক বিশেষ পরিষ্কার করার কাজ। সারাদিনে জমে থাকা বর্জ্য এবং আলঝাইমার্স রোগের সঙ্গে যুক্ত ক্ষতিকর প্রোটিন এই সময় ধীরে ধীরে শরীর থেকে বেরিয়ে যেতে সাহায্য করে। আর সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজে বড় ভূমিকা পালন করে AQP4 জিন।

সুপারমার্কেটের শাকে নয়, বুনোশাকেই রয়েছে বেশি পুষ্টিগুণ

Wild leafy greens: Scientific Reports (2024)-এর গবেষণা বলছে, বাণিজ্যিক উপায়ে চাষ করা সাধারণ সবজির চেয়ে এই বুনো শাকগুলিতে আয়রন, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, ভিটামিন এ ও সি এবং ফাইবার অনেক বেশি থাকে। এমনকী কর্ণাটকের সোলিগা উপজাতির মহিলারা গর্ভবতী মায়েদের রক্তশূন্যতা দূর করতে বিশেষ কিছু বুনো শাক ব্যবহার করে আসছেন যুগের পর যুগ।