কেমোথেরাপির বিকল্প? IIT-BHU-এর আবিষ্কারে ক্যানসার চিকিৎসায় আশার আলো
বায়োকেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক বিকাশ কুমার দুবের নেতৃত্বে একটি গবেষক দল এই কৃতিত্ব দেখিয়েছে। গবেষক শিবকুমার এবং রাজ বাহাদুর সিং-এর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে তাঁরা এমন একটি রাসায়নিক যৌগ চিহ্নিত করেছেন, যা ল্যাবরেটরির নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে স্তন ক্যানসারের কোষগুলিকে সুনির্দিষ্টভাবে নিশানা করতে পারে।
বহু বছর ধরে ক্যানসার গবেষণার মূল লক্ষ্যই ছিল একটি নিখুঁত বিকল্প খুঁজে বের করা—যা শরীরের অন্য কোনো সুস্থ কোষের ক্ষতি না করে কেবল ক্যানসার আক্রান্ত কোষগুলিকেই সুনির্দিষ্টভাবে ধ্বংস করতে পারবে। উত্তরপ্রদেশের বারাণসীতে অবস্থিত ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (IIT-BHU)-এর গবেষকেরা সম্প্রতি এমন এক আবিষ্কারের কথা প্রকাশ করেছেন, যা এই লক্ষ্য অর্জনের পথকে অনেকটাই সহজ করে তুলেছে।
বায়োকেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক বিকাশ কুমার দুবের নেতৃত্বে একটি গবেষক দল এই কৃতিত্ব দেখিয়েছে। গবেষক শিবকুমার এবং রাজ বাহাদুর সিং-এর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে তাঁরা এমন একটি রাসায়নিক যৌগ চিহ্নিত করেছেন, যা ল্যাবরেটরির নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে স্তন ক্যানসারের কোষগুলিকে সুনির্দিষ্টভাবে নিশানা করতে পারে। যৌগটি ক্যানসার কোষের বৃদ্ধিতে লাগাম টানার সঙ্গে সঙ্গে সেগুলিকে নিজে থেকেই ধ্বংস হয়ে যাওয়ার দিকে ঠেলে দেয়। সবথেকে বড় বিষয় হলো, এই পুরো প্রক্রিয়ায় শরীরের কোনো সুস্থ টিস্যুর সামান্যতম ক্ষতিও হয় না।
আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটির প্রতিষ্ঠিত জার্নাল 'বায়োকেমিস্ট্রি'-তে প্রকাশিত এই গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বিজ্ঞানীরা 'জিংক' (ZINC) ডাটাবেসে থাকা লক্ষ লক্ষ রাসায়নিক যৌগ বিশ্লেষণ করে 'ZINC-000002107582' নামের একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় অণু চিহ্নিত করতে সফল হয়েছেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
India fertility rate: ভারতের মোট প্রজনন হার প্রথমবারের মতো রিপ্লেসমেন্ট লেভেল ২.১-এর নিচে নেমে এসেছে। একসময় জনসংখ্যা নিয়ে উদ্বিগ্ন দেশ এখন কেন জন্মহার কমে যাওয়ায় চিন্তিত?
'জিংক ডাটাবেস' হলো বাণিজ্যিকভাবে সহজলভ্য রাসায়নিক যৌগগুলির একটি উন্মুক্ত ভাণ্ডার, যা বিশ্বজুড়ে ওষুধ আবিষ্কারের গবেষণায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এই ভাণ্ডারে থাকা উপাদানগুলিকে কম্পিউটার প্রযুক্তির সাহায্যে নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে। জীবদেহের নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর সঙ্গে এই অণুগুলি কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়, তা আধুনিক প্রযুক্তিতে মডেল তৈরি করে দেখা হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী বা প্রথাগত পদ্ধতিতে এই ধরনের উপাদান খুঁজে পেতে যেখানে দশকের পর দশক সময় লেগে যেত, সেখানে এই আধুনিক পদ্ধতি বিজ্ঞানীদের কাজকে অনেক সহজ এবং দ্রুত করে তুলেছে। ল্যাবরেটরিতে স্তন ক্যানসারের কোষের উপর এই যৌগটির পরীক্ষা চালিয়ে অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক ফলাফল পাওয়া গিয়েছে, যার গুরুত্ব বর্তমান ভারতের প্রেক্ষাপটে অপরিসীম। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, ভারতে স্তন ক্যানসারে আক্রান্তের সংখ্যা ২০১৯ সালের ২,০০,২১৮ থেকে ক্রমাগত বেড়ে ২০২৩ সালে ২,২১,৫৭৯-এ দাঁড়ায়। একই সময়ে এই রোগে মৃত্যুর সংখ্যাও ৭৪,৪৮১ থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ৮২,৪২৯-এ। বর্তমানে ভারতীয় নারীদের মধ্যে সবথেকে বেশি যে ক্যানসারটি শনাক্ত হয়, তা হলো স্তন ক্যানসার। চিকিৎসার ক্ষেত্রে নানা অগ্রগতি সত্ত্বেও, একদম শেষ পর্যায়ে গিয়ে রোগ নির্ণয় হওয়াটাই আজ বড় চ্যালেঞ্জ।
ক্যানসার কোষের বিনাশ
আইআইটি বিএইচইউ-এর গবেষকদের আবিষ্কৃত নতুন রাসায়নিক যৌগটি মূলত স্তন ক্যানসারের কোষগুলিকে ভিতরে থেকে নিঃশেষ করে দেয়। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, এই যৌগটি 'UVRAG' এবং 'BAX' নামের দুটি প্রধান প্রোটিনের কার্যকলাপে সরাসরি বাধা সৃষ্টি করে। ক্যানসার কোষের বেঁচে থাকা এবং সেগুলির দ্রুত বংশবৃদ্ধির ক্ষেত্রে এই দুটি প্রোটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই প্রোটিনগুলি ক্যানসার আক্রান্ত কোষগুলিতে পুষ্টির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখে, যার ফলে রোগটি শরীরের ভিতরে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পায়। নতুন আবিষ্কৃত যৌগটি এই UVRAG এবং BAX প্রোটিনের পারস্পরিক বন্ধন ভেঙে দিয়ে এদের ভিতরের যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মাত্র পাঁচ বছরে দিল্লিতে সময়ের আগে শিশু জন্মের সংখ্যা ৫১ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। হারের দিক থেকে বিচার করলে এই বৃদ্ধি ২১ শতাংশেরও বেশি। সহজ ভাষায় বললে, দিল্লির বুকে জন্ম নেওয়া প্রতি ৮ জন শিশুর মধ্যে ১ জন শিশু এখন প্রি-টার্ম বা সময়ের আগেই জন্মাচ্ছে।
এই বন্ধন ভেঙে যাওয়ার ফলে ক্যানসার কোষগুলি সরাসরি আঘাত পায়। প্রোটিনের যোগাযোগ বন্ধ হওয়া মাত্রই ক্যানসার কোষগুলি তাদের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হয়। এর ফলে প্রথমে তাদের বৃদ্ধি থমকে যায় এবং ধীরে ধীরে কোষগুলি নিষ্ক্রিয় হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। এখানেই শেষ নয়, এই রাসায়নিক যৌগটির আরও একটি আক্রমণাত্মক কার্যপদ্ধতি রয়েছে। এটি ক্যানসার কোষের ভিতরে 'রিঅ্যাক্টিভ অক্সিজেন স্পিসিস' (ROS)-এর মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে কোষগুলির ভিতরে চরম মানসিক চাপ তৈরি হয়, যা কোষগুলিকে নিজে থেকেই ধ্বংস হয়ে যেতে বাধ্য করে। সহজ কথায়, এই যৌগটি একই সঙ্গে ক্যানসার কোষকে অনাহারে মারে এবং তার আত্মহননের পথটি সচল করে দেয়—দুটি ভিন্ন উপায়ে চূড়ান্ত লক্ষ্য কিন্তু একটাই, ক্যানসারের সম্পূর্ণ বিনাশ।
ল্যাবরেটরি থেকে মানুষের শয্যাপাশ
গবেষক দল এই বিশেষ রাসায়নিক যৌগটির স্বত্বাধিকারের জন্যও আবেদন জানিয়েছে। অধ্যাপক দুবে জানিয়েছেন, প্রচলিত কেমোথেরাপির মতো এই যৌগটি ঢালাওভাবে শরীরের সব কোষকে আক্রমণ করে না, বরং এটি সুনির্দিষ্টভাবে কেবল ক্যানসার আক্রান্ত কোষে গিয়েই কাজ করে। এর ফলে ভবিষ্যতের ক্যানসার চিকিৎসা যেমন একদিকে আরও বেশি কার্যকর হবে, ঠিক তেমনই অন্যদিকে রোগীদের শারীরিক ও মানসিক ধকল এবং যন্ত্রণা অনেকটাই কমে যাবে।
তবে এই আশার আলোর মাঝেও কিছু বাস্তব সত্য আমাদের মনে রাখতে হবে। এখন পর্যন্ত এই রাসায়নিক যৌগটি ল্যাবরেটরির নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের ভিতরে কেবল স্তন ক্যানসারের কোষের উপর পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে। সাধারণ ক্যানসার রোগীদের জন্য এটিকে চূড়ান্ত ওষুধ হিসেবে বাজারে আনার আগে, এটিকে এখনও এক দীর্ঘ পথ পার করতে হবে। ল্যাবরেটরির সাফল্যের পর নিয়ম অনুযায়ী প্রথমে প্রাণীদের উপর এই যৌগের কার্যকারিতা পরীক্ষা (in vivo) করা হবে এবং তা সফল হলে মানুষের শরীরে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বা পরীক্ষামূলক প্রয়োগ শুরু হবে। একটি সম্ভাবনাময় ল্যাবরেটরি গবেষণার ফল থেকে শুরু করে বাজারে প্রেসক্রিপশনের ওষুধ হয়ে ওঠা পর্যন্ত দূরত্বটা অনেকখানি লম্বা এবং এই ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত জটিল ও কঠোর। তবে ক্যানসারের মতো একটি মারণব্যাধির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের আসল যাত্রাটা ঠিক এইভাবেই শুরু হয়—যেখানে প্রথমে একটি নির্দিষ্ট অণুকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়, ল্যাবরেটরিতে তার সুনির্দিষ্ট কার্যকারিতা প্রমাণ করা হয় এবং সহকর্মী বিজ্ঞানীদের দ্বারা তা পর্যালোচিত হয়ে জার্নালে প্রকাশিত হয়।
বিজ্ঞানীদের এই আবিষ্কার ক্যানসার চিকিৎসায় এক নতুন যুগের ইঙ্গিত দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশের কোটি কোটি সাধারণ নাগরিক কি শেষ পর্যন্ত এই গবেষণার সুফল পাবেন? এর আগে বহু আন্তর্জাতিক ক্যানসার প্রতিরোধী ওষুধের পেটেন্ট যেভাবে বহুজাতিক ওষুধ প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলির একচেটিয়া বাণিজ্যের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে, এই দেশীয় আবিষ্কারও কি সেই একই করপোরেট মুনাফার গ্রাসে হারিয়ে যাবে? প্রশ্নগুলি কিন্তু থেকেই যায়।






