দিল্লির বিষাক্ত বাতাসে জন্মের আগেই মৃত্যুর লড়াই, বাড়ছে প্রি-টার্ম শিশুর সংখ্যা
মাত্র পাঁচ বছরে দিল্লিতে সময়ের আগে শিশু জন্মের সংখ্যা ৫১ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। হারের দিক থেকে বিচার করলে এই বৃদ্ধি ২১ শতাংশেরও বেশি। সহজ ভাষায় বললে, দিল্লির বুকে জন্ম নেওয়া প্রতি ৮ জন শিশুর মধ্যে ১ জন শিশু এখন প্রি-টার্ম বা সময়ের আগেই জন্মাচ্ছে।
শীতের সকাল। দিল্লির একটা ছোট ফ্ল্যাটের জানালা বন্ধ। কিন্তু সেই বন্ধ জানালার ফাঁক গলে ঘরের ভিতরে ঢুকে পড়েছে এক চিলতে হালকা ধোঁয়ার গন্ধ। সাতাশ বছরের তরুণী পূজা একটু আগেভাগেই নিজের হাসপাতালের ব্যাগ গুছিয়ে রাখছিলেন। পরের জন্য ফেলে না রেখে। কিছুক্ষণ আগেই স্বামীর সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়েছে নতুন শিশুর জন্য জামাকাপড় কেনা হয়নি বলে। পূজার স্বামী আর শাশুড়ি মিলে শিশুর নাম ঠিক করার আলোচনায় মশগুল। আর তো মাত্র দেড় মাস। পরিবারের সবাই অপেক্ষা করছিল সেই নির্দিষ্ট দিনের জন্য—কখন হাসপাতালে যাওয়া হবে, কে প্রথম কোলে নেবে শিশুটিকে, এই আনন্দঘন মুহূর্তগুলির দিন গুনছিল সবাই।
কিন্তু দেড় মাস পরে যে দিন আসার কথা, সেই দিন এত তাড়াতাড়ি চলে আসবে ভাবতে পারেনি পরিবারের কেউই। কিন্তু তারপর এক কনকনে ঠান্ডা ভোরে আচমকাই শুরু হলো তীব্র শ্বাসকষ্ট। প্রথমে সাধারণ কাশি, তারপর বুকের ভিতরে একটা বেশ ভারী ভারী ভাব। তাড়াহুড়ো করে নিয়ে যাওয়া হলো হাসপাতালে। চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে বুঝলেন, গর্ভস্থ শিশুর জল ভেঙে গেছে, আর অপেক্ষা করা সম্ভব নয়। সময়ের অনেক আগেই, নির্ধারিত তারিখের দেড় মাস আগে পৃথিবীতে এল এক নবজাতক। জন্মের পর তাকে কোলে নেওয়ার, তার কান্না ঠিকমতো শোনার আগেই নার্সরা দ্রুত তাকে নিয়ে চলে গেলেন এনআইসিইউ-তে (NICU)। ছোট্ট, অপরিপক্ব শরীরটার সঙ্গে তখন জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে অক্সিজেনের নল আর মনিটরের তার। পূজা শুধু কাচের ওপার থেকে শিশুকে দেখতে পারেন।
এই দৃশ্যটা এখন আর দিল্লির কোনো হাসপাতালে ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়। Newslaundry-এর একটি সাম্প্রতিক ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানী রিপোর্টে সাংবাদিক আস্থা সব্যসাচী (Astha Savyasachi) এবং আকাঙ্ক্ষা রাউত (Akankhya Rout) এই ভয়ঙ্কর বাস্তবকে সামনে এনেছেন। তাঁরা এক মাসের বেশি সময় নিয়ে হাসপাতাল, চিকিৎসক, সরকারি নথি এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলির অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে এরকম বিভিন্ন ঘটনা দেখতে পেয়েছেন।
দিল্লির বাতাস যত বিষাক্ত হচ্ছে, ততই যেন বাড়ছে সময়ের আগে জন্ম নেওয়া শিশুর (Preterm Birth) সংখ্যা।
Newslaundry-এর সংগৃহীত তথ্যে উঠে এসেছে এক মারাত্মক পরিসংখ্যান। তথ্যের অধিকার আইনে (RTI) পাওয়া সরকারি তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে:
২০২১ সালে দিল্লিতে প্রি-টার্ম জন্মের সংখ্যা ছিল ২১,১৩৪।
২০২৫ সালে সেই সংখ্যাটি লাফিয়ে দাঁড়িয়েছে ৩১,৯৬৩-এ।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বয়স ধরে রাখা বা চিরযৌবন পাওয়ার গবেষণায় কোটি কোটি টাকা খরচ করে বিশ্বজুড়ে খবরের শিরোনামে এসেছিলেন প্রযুক্তি ব্যবসায়ী (টেক এন্টারপ্রেনার) ব্রায়ান জনসন। তবে বহু বছর ধরে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ ঢালার পর, নিজের এই দীর্ঘ পথচলা থেকে তিনি বেশ অদ্ভুত এবং সহজ একটি শিক্ষা পেয়েছেন।
অর্থাৎ, মাত্র পাঁচ বছরে দিল্লিতে সময়ের আগে শিশু জন্মের সংখ্যা ৫১ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। হারের দিক থেকে বিচার করলে এই বৃদ্ধি ২১ শতাংশেরও বেশি। সহজ ভাষায় বললে, দিল্লির বুকে জন্ম নেওয়া প্রতি ৮ জন শিশুর মধ্যে ১ জন শিশু এখন প্রি-টার্ম বা সময়ের আগেই জন্মাচ্ছে।
চিকিৎসক এবং গবেষকদের মতে, এই ভয়াবহ পরিস্থিতির নেপথ্যে রয়েছে দিল্লির বায়ুদূষণ। দিল্লির সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দূষণের মরসুম সাধারণত নভেম্বর থেকে জানুয়ারি মাস। আর ঠিক তার কয়েক মাস পর, অর্থাৎ জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে দিল্লির হাসপাতালগুলির নবজাতক বিভাগে (NICU) প্রি-টার্ম জন্মের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে শুরু করে।
চিকিৎসকেরা বলছেন, এটা কোনো নিছক কাকতালীয় ঘটনা বা দুর্ঘটনা নয়। গর্ভাবস্থার প্রথম ত্রৈমাসিক (First Trimester) বা শুরুর সময়টা যখন দিল্লির এই শীতকালীন চরম দূষণের সঙ্গে মিলে যায়, তখনই ভ্রূণের উপর এর প্রথম মারণ আঘাতটি আসে।
আইআইটি দিল্লি (IIT Delhi) এবং ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর পপুলেশন সায়েন্সেস (IIPS) মুম্বই-এর ২০২৫ সালের একটি যৌথ গবেষণায় এই আশঙ্কাই সত্য প্রমাণিত হয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে PLOS Global Public Health নামক আন্তর্জাতিক জার্নালে “In-utero exposure to PM2.5 and adverse birth outcomes in India: Geostatistical modelling using remote sensing and demographic health survey data 2019–21” শিরোনাম নিয়ে প্রকাশিত হয় এক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা। সেখানে দেখা গিয়েছে:
বাতাসে প্রতি ১০ মাইক্রোগ্রাম/ঘনমিটার PM2.5 বৃদ্ধিতে প্রি-টার্ম জন্মের ঝুঁকি ১২ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।
অতিরিক্ত দূষণের মধ্যে থাকা গর্ভবতী মহিলাদের ক্ষেত্রে প্রিম্যাচিওর ডেলিভারির ঝুঁকি ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি হতে পারে।
একই সঙ্গে শিশুর কম ওজন নিয়ে (Low Birth Weight) জন্মানোর ঝুঁকিও প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়ে যায়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
যাদের পাকা বাড়ি আছে, বাড়িতে ল্যান্ডলাইন ফোন বা ফ্রিজ আছে, কিংবা যাদের পরিবারে দুই, তিন বা চার চাকার গাড়ি রয়েছে, তারা সাধারণত এই প্রকল্পের বাইরে থাকেন। এছাড়া কিষাণ ক্রেডিট কার্ডে ৫০,০০০ টাকার বেশি সীমা থাকলেও এই সুবিধা পাওয়া যায় না।
গবেষকরা এর কারণ হিসেবে বলছেন, PM2.5 অতিক্ষুদ্র কণাগুলি মায়ের ফুসফুসের গভীরে ঢুকে রক্তে মিশে যায়। এতে শরীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস এবং প্রদাহ তৈরি হয়। নাড়ি (প্লাসেন্টা)-তে সমস্যা দেখা দেয়। ফলে শিশুর কাছে অক্সিজেন ও পুষ্টি কম পৌঁছয়। এর ফলে গর্ভাবস্থার সময়কাল ছোট হয়ে যায় এবং শিশুর বৃদ্ধি ব্যাহত হয়।
NFHS-5 অনুসারে ভারতে প্রায় ১৩% শিশু সময়ের আগে জন্মায় এবং ১৭% শিশু কম ওজন নিয়ে জন্মায়। উত্তর ভারতে এই সমস্যা অনেক বেশি তীব্র। এটি ভারতে প্রথম বড় আকারের গবেষণা, যেখানে জেলা পর্যায়ে PM2.5-এর সঙ্গে প্রি-টার্ম জন্মের সরাসরি যোগসূত্র দেখানো হয়েছে। এই গবেষণাটি Newslaundry-এর রিপোর্টে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, কারণ দিল্লির বাস্তব অবস্থার সঙ্গে এর ফলাফল পুরোপুরি মিলে যায়।
PM2.5 নামের এই অতিক্ষুদ্র দূষণ কণাগুলি এতটাই ছোট যে খালি চোখে একেবারেই দেখা যায় না। অথচ এই অদৃশ্য কণাগুলোই দিল্লির বাতাসকে বিষাক্ত করে তুলছে।
দিল্লিতে বার্ষিক গড় PM2.5-এর মাত্রা সাধারণত ৮০–১২০ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ঘনমিটারের উপরে থাকে — যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর নিরাপদ সীমার চেয়ে ১৬ থেকে ২৪ গুণ বেশি। WHO-এর মতে, মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ সীমা মাত্র ৫ µg/m³। আর শীতকালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়। তখন দিল্লির বাতাসে PM2.5-এর মাত্রা ২০০ থেকে ৫০০ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ঘনমিটারেরও বেশি হয়ে যায়। অনেক দিন এটি ৬০০–৯০০ পর্যন্তও উঠে যায়।
গাড়ি, শিল্পাঞ্চল, ধুলো আর প্রতিবেশী রাজ্যগুলির খড় পোড়ানোর ধোঁয়া মিশে যখন এই বাতাস তৈরি হয়, তখন তা গর্ভবতী মায়েদের ফুসফুস বেয়ে সরাসরি রক্তে মিশে যায়। চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, এই দূষণ কণাগুলি প্লাসেন্টা বা গর্ভনালীর ভিতরে প্রবেশ করে তীব্র প্রদাহ (Inflammation) এবং অক্সিডেটিভ স্ট্রেস তৈরি করে। ফলে প্লাসেন্টার স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা নষ্ট হয়, গর্ভস্থ শিশুর শরীরে অক্সিজেন ও পুষ্টি সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে যায় এবং হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে সময়ের আগেই প্রসব বেদনা বা 'প্রি-টার্ম লেবার' শুরু হয়ে যায়।
অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্সেস (AIIMS)-এর চিকিৎসকদের মতে, গর্ভাবস্থার শেষ কয়েকটা সপ্তাহ একটি শিশুর শারীরিক গঠনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়েই মূলত শিশুর ফুসফুস পুরোপুরি তৈরি হয়, সে বাইরের পৃথিবীর প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করার শক্তি সঞ্চয় করে। কিন্তু দূষণের কারণে কোনো শিশু যদি তার অনেক আগেই জন্মগ্রহণ করে, তবে তার ফুসফুস অপরিপক্ব থেকে যায়। ফলে জন্মের পর থেকেই শুরু হয় বেঁচে থাকার কঠিন লড়াই।
দিল্লির হাসপাতালগুলির নবজাতক বিভাগে গেলে এখন শীতের মরসুমের পর এক আলাদা এবং যন্ত্রণাদায়ক ব্যস্ততা চোখে পড়ে। একটার পর একটা ইনকিউবেটর, নীলচে আলোর নিচে শুয়ে থাকা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শরীর, অক্সিজেনের নল, আর প্রতিনিয়ত বেজে চলা মনিটরের শব্দ।
হাসপাতালে থাকা এই নতুন মায়েদের, তাঁর সন্তানকে প্রথমবার কোলে নেওয়ার আগে শিখতে হয় মনিটরের বিচিত্র শব্দগুলি শুনতে এবং চিনতে। কোন শব্দটা বিপদের আর কোন শব্দটা স্বাভাবিক—সেটা বুঝতে বুঝতেই কেটে গিয়েছিল তাঁর মাতৃত্বের প্রথম কয়েকটি দিন। তাঁরা সন্তান জন্মানোর পর তিনি তাকে ছুঁতে পর্যন্ত ভয় পান পাছে কিছু ভুল করে ফেলেন তারা, এই ভয়ে। এত নল আর তার জড়িয়ে থাকে সেই ছোট্ট শরীরে!
এই গভীর আতঙ্ক এখন দিল্লির বহু গর্ভবতী মহিলার নিত্যদিনের সঙ্গী। শীতের আমেজ এলেই সাধারণ মানুষ যখন উৎসবের প্রস্তুতি নেন, দিল্লির হবু মায়েরা তখন তীব্র আশঙ্কায় দিন গোনেন। কেউ বাইরে বেরোনো সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেন, কেউ ঘরের জানালা সব বন্ধ করে দিনরাত এয়ার পিউরিফায়ার চালিয়ে রাখেন, কেউ বা ঘরের ভিতরেও মাস্ক পরে ঘুমোতে যান। কারণ তাঁরা জানেন, তাঁরা শুধু নিজেদের জন্য শ্বাস নিচ্ছেন না; তাঁদের শরীরের ভিতরে আরও একটা ছোট্ট ফুসফুস বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু যে বাতাস নিচ্ছে, সেই বাতাসই আজ বিষ।
দিল্লির বায়ুদূষণ নিয়ে এতদিন ধরে কেবল রাজনৈতিক তরজা হয়েছে, স্কুলের ছুটি কিংবা জোড়-বিজোড় সংখ্যার গাড়ি চলাচলের মতো সাময়িক সমাধান খোঁজা হয়েছে। কিন্তু Newslaundry-এর এই অনুসন্ধানী রিপোর্ট প্রমাণ করে দিচ্ছে, দিল্লির দূষণ এখন আর শুধু পরিবেশের কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা বা খবরের কাগজের হেডলাইন নয়। এটা এখন হাসপাতালের করিডরের গল্প, এনআইসিইউ-র স্যাঁতসেঁতে অন্ধকারের গল্প, আর মায়ের কোল খালি করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখা এক অদৃশ্য মহামারীর বাস্তব প্রতিচ্ছবি।
একটি নিষ্পাপ শিশু পৃথিবীতে আসার আগেই যে বিষাক্ত বাতাসের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করতে বাধ্য হচ্ছে, তার দায় কোনো একক পরিবারের নয়। এই দায় আমাদের সমাজ, প্রশাসন ও সার্বিক ব্যবস্থার।






