এই বিস্ফোরক চিঠি না লেখা হলে আজ একটিও সিংহ থাকত না ভারতে
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের পাশাপাশি তৎকালীন ভারতীয় রাজা ও নবাবরা লাগামহীনভাবে সিংহ শিকার করতেন। তাঁদের ক্ষমতা-বীরত্বর অপপ্রয়োগে এক সময় সারা ভারতে সিংহের সংখ্যা কুড়ির নীচে ঠেকে।

আজ ন্যাশনাল লায়নস ডে বা আন্তর্জাতিক সিংহ দিবস। এই দিনটির উদ্দেশ্য হলো সিংহদের বিষয়ে এবং এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে তাদের সংরক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো।
বর্তমানে কেবল গুজরাতের গির অরণ্যে এশিয়াটিক লায়নের দেখা পাওয়া যায়। অথচ একসময় সৌদি আরব থেকে শুরু করে উত্তর ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে এদের দেখা পাওয়া যেত। এমনকী, উনিশ শতক অবধি সৌদি আরব, পূর্ব তুরকি, ইরান, মেসোপটেমিয়া, পাকিস্তান-সহ সিন্ধু নদের পূর্বাংশ থেকে বাংলা অবধি রাজ করতো এশিয়াটিক লায়ন। উনিশ শতকের শুরুর দিকে পাঞ্জাব, গুজরাত, রাজস্থান, হরিয়ানা, বিহার, মধ্যপ্রদেশেও দেখা মিলত তাদের।
কিন্তু ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের পাশাপাশি তৎকালীন ভারতীয় রাজা ও নবাবরা লাগামহীনভাবে সিংহ শিকার করতেন। তাঁদের ক্ষমতা-বীরত্বর অপপ্রয়োগে এক সময় সারা ভারতে সিংহের সংখ্যা কুড়ির নীচে ঠেকে। হ্যাঁ, 'কিং অফ জাঙ্গল' বা বনের রাজার অবস্থা এতটাই শোচনীয় হয়েছিল তৎকালীন ক্ষমতাবানদের দাপটে।
১৮৫৭ সালে যখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি-র উত্থানের বিরুদ্ধে গর্জে উঠল ভারত, ঠিক সেই সময়েই একজন ব্রিটিশ অফিসার তিনশো সিংহ শিকার করেছিলেন। এবং উনিশ শতকের ছয়ের দশকে গোয়ালিয়র এবং রেওয়ার সমস্ত সিংহ শিকার করে ফেলা হয়। ১৮৭০-এর শেষের দিকে রাজস্থানে আর একটিও সিংহ বেঁচে থাকে না রাজস্থানে। ১৮৮০ সালের মধ্যে গুণা, দিসা, ও পালানপুর জেলায় সিংহ পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়। জুনাগড়ে তখন বেঁচে রয়েছে গুনে-গেঁথে এক ডজন মতো সিংহ।
কিন্তু একটি বিস্ফোরক চিঠি-ই হয়ে উঠল সিংহ সংরক্ষণের প্রথম পদক্ষেপ।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বেড়াল কেন কুকুরের মতো বন্ধুত্বপূর্ণ নয়? এবং কিছু বেড়াল কেন বেশি বন্ধুত্বপূর্ণ, আবার কেউ কেউ কেন আপন খেয়ালে থাকে; কেনই বা মানুষের ডাক বা আদরকে উপেক্ষা করে?
১৯০০ সাল। ভারতের ভাইসরয় তখন লর্ড কার্জ়ন। জুনাগড়ের নবাব রসুলকাঞ্জি সিংহ শিকারে নিমন্ত্রণ করলেন লর্ড কার্জ়নকে। সেই খবর শুনে বম্বের (বর্তমানে মুম্বাই) একটি সংবাদপত্রে একটি চিঠি প্রকাশ হয় কার্জ়নকে উদ্দ্যেশ্য করে। "ভাইসরয় না-কি ভ্যান্ডাল?"- ঠিক এই প্রশ্নই করা হয় চিঠিতে। চিঠিটি প্রকাশিত হতেই নবাব রসুলকাঞ্জির আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন কার্জ়ন। তারপর থেকেই শোনা যায় তিনি ও তাঁর স্ত্রী সিংহ সংরক্ষণের দিকে বিশেষভাবে নজর দেন। যদিও তার আগে বন্যপ্রাণী শিকারের ইতিহাস তাঁর আছে। লর্ড কার্জ়নের এই পদক্ষেপ দেখে তৎকালীন নবাবরাও সিংহ শিকারের যত আহ্বান পেতেন অন্যান্য রাজাদের থেকে, সেসব প্রত্যাখ্যান করা শুরু করেন।
১৯০৮ থেকে ১৯০৯ সালের মধ্যেই গির অরণ্য বন দফতরের হাতে চলে আসে, এবং গির অরণ্যের ৩২৬ স্কোয়ার কিলোমিটারের মধ্যে সিংহদের বাসযোগ্য একটি এলাকায় তৈরি করা হয় বন দফতরের উদ্যোগে। নবাব রসুলকাঞ্জির পুত্র স্যার তৃতীয় মহম্মদ মহাবত খানের উদ্যোগে যথাযথভাবে শুরু হল সিংহ সংরক্ষণ। তিনি ক্ষমতায় আসেন ১৯২১ সালে। তিনি সিংহ সংরক্ষণ নিয়ে নড়েচড়ে বসতে প্রায় পাঁচশোর কাছাকাছি পৌঁছয় সিংহের সংখ্যা।
যার নামে রঞ্জি ক্রিকেটের সূচনা, সেই নবনগরের মহারাজা জাম সাহেব রঞ্জিত সিংজি সিংহ শিকারের অনুমতি চেয়ে আবেদন পাঠালেন মহম্মদ মহাবত খানকে। আবেদন পাঠিয়েছিলেন বিকানেরের মহারাজা গঙ্গা সিংও। মহম্মদ মহাবত খান সেই সমস্ত আবেদন নির্দ্বিধায় খারিজ করেন।
রাজা-মহারাজদের এতই শিকারের লোভ ছিল যে, তাঁদের ঘন ঘন আবেদনে জর্জরিত হয়ে ওঠেন নবাব। বিরক্ত হয়ে একদিন তিনি চিঠি লিখে বসলেন তৎকালীন গভর্নর অফ বম্বের এজেন্ট ই ম্যাকোনচি-কে। নীচে রইল সেই ঐতিহাসিক চিঠির কিছু অংশ:
As a matter of fact the real point at issue is the ownership of lions and the political right of inviting distinguished visitors to Kathiawad for lion shikar. … what I complain of is that lions are tempted to stray outside by tying up buffaloes just over my borders … This is nothing more or less than poaching from which I think I have a right to be protected by [the Imperial] government. If I were to take the law into my own hands, the re¬sult would be a constant series of border affrays which would endanger the peace of this part of Kathiawad.
...
The preser¬vation of the forest which covers about 500 sq. miles [1295 km 2 ] of my territory is supposed to be of value to the province as a whole, not only as a constant source of grass and fire wood, but also because of its effect on rainfall. But what has undoubtedly weighed with the Nawabs of Junagadh in the past and carries weight also with me is that the forest is the last sanctuary of Indian lions.
তৃতীয় মহম্মদ মহাবত খানের লড়াই ১৯৪৭ অবধি জারি ছিল নিরন্তর। ১৯৪৭ সালেই বেনজি়র ভুট্টোর পিতামহ শাহ নাওয়াজ় ভুট্টোর পরামর্শে তিনি পাকিস্তানে চলে যান। তিনি চলে যাওয়ার পরেই ১৯৬৮ সালের মধ্যে সিংহের সংখ্যা নেমে ১৭৭-এ পৌঁছয়। তবে ইতিমধ্যেই ১৯৬৫ সালেই সিংহ (এশিয়াটিক লায়ন) সংরক্ষণের জন্যে বিশেষ উদ্যোগ নেয় বন দফতর এবং গির অরণ্যকে ন্যাশানাল পার্ক এবং অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৯৯০ সালে ২৮৪-তে এসে পৌঁছয় সিংহের সংখ্যা। ২০১৫ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে হয় ৫২৫ এবং ২০২০ সালে ভারতের মোট সিংহর সংখ্যা ছিল ৬৭৪টি।
বর্তমানে ভারতে এশিয়াটিক লায়নের অবস্থা জানার উদ্দেশ্যে সম্প্রতি কথোপকথন হয় ওয়াইল্ডলাইফ ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়ার গবেষক ড. কৌশিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে। "ভারতের স্বাধীনতা লাভ করার পরে গুজরাতের বন দফতর কঠোরভাবে সিংহ সংরক্ষণের বিষয়ে নজর দেন। নিষেধাজ্ঞা জারি হয় সিংহ শিকারের উপর। সিংহ সংরক্ষণের জন্যে এই ধাপটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গুজরাত সেই বিষয়ে বরাবরই মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে।" জানাচ্ছেন ড. মুখোপাধ্যায়, "শুধু তাই নয় যাতে অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে অস্বাভাবিক মৃত্যু না হয় সিংহের সেই বিষযে বরাবরই বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে এসেছে গুজরাট সরকার।"
"বর্তমানে ভারতে এশিয়াটিক লায়নের সংখ্যা সাতশো ছাড়িয়ে গেছে; গত পাঁচ বছরে সিংহের সংখ্যা দেখলে বোঝা যায়, প্রতি বছর দুই থেকে তিন শতাংশ হারে বৃদ্ধি (বায়োলজিক্যাল গ্রোথ) পেয়েছে সিংহের সংখ্যা। সেখানে দাঁড়িয়ে বলা যায়, ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার হচ্ছে ভারতে এশিয়াটিক লায়নের অবস্থা," জানালেন ড. বন্দ্যোপাধ্যায়।
"তবে বর্তমানে সাতশোর বেশি সংখ্যার সিংহদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যার সিংহ গির অরণ্যের বাইরে রয়েছে। গিরের বাইরে যে সমস্ত সিংহ আছে, তারা এমন জমিতে আছে, যা ইতিমধ্যেই ঘরবাড়ি তৈরি বা চাষ-আবাদের জন্য দখল করে নিয়েছে মানুষ। তবে সেই অঞ্চলের সিংহদের যাতে কোনও ক্ষতি না হয়, তার জন্য পর্যাপ্ত নজর দেওয়া হয়।" জানাচ্ছেন ড. বন্দ্যোপাধ্যায়।







