এসি ছাড়াই ঠান্ডা! মুম্বইয়ের এই বাড়ি শেখাচ্ছে পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন
House without AC cooling: চেম্বুর এলাকার একটা বাড়ি যেন এক টুকরো ম্যাজিক! বাইরের তাপমাত্রা যখন ফুটছে, এই বাড়িটি তখন কোনো এসি বা ভারী যন্ত্রপাতি ছাড়াই চারপাশের চেয়ে প্রায় ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ঠান্ডা থাকছে।
মুম্বইয়ের তীব্র গরমের কথা ভাবলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে চড়া রোদ, গলদঘর্ম পরিস্থিতি, চারপাশের কংক্রিটের বহুতল এবং তাতে ভ্যাপসা গরম। এসি চালিয়েও যেন শান্তি নেই। উলটে এসির কারণে মাসের শেষে বিদ্যুতের বিল দেখে মাথায় হাত পড়ে। কিন্তু মুম্বইয়ের এই চেনা ছবির বাইরে চেম্বুর এলাকার একটা বাড়ি যেন এক টুকরো ম্যাজিক! বাইরের তাপমাত্রা যখন ফুটছে, এই বাড়িটি তখন কোনো এসি বা ভারী যন্ত্রপাতি ছাড়াই চারপাশের চেয়ে প্রায় ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ঠান্ডা থাকছে।
কীভাবে সম্ভব হচ্ছে এইরকম অসম্ভব একটা ঘটনা?
বাড়িটির মালিক চেতন সোরেনজি। পেশায় তিনি টাটা রিয়েলটির মতো এক বড় কর্পোরেট সংস্থার প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট লিড। ২০১৭ সালে, মুম্বইয়ের চড়া গরম থেকে বাঁচতে তিনি প্রথমে নিজের বাড়ির ছাদ আর দেওয়ালে গাছ লাগানোর কথা ভাবেন, যাকে চলতি কথায় বলে ‘গ্রিন রুফিং’।
চেতন সোরেনজি
নানারকম গাছ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর তিনি দেখলেন, প্যাশনফ্রুট বা ঝুমকো লতার গাছ এখানে দারুণ কাজ করছে। এই লতানো গাছ খুব দ্রুত বাড়ে আর দেখতে দেখতে পুরো বাড়িটাকে একটা ঘন সবুজ পাতায় মুড়ে ফেলে। লোহা আর কংক্রিটের দেওয়ালকে আটকে দেয় প্রকৃতির এই জীবন্ত বর্ম।
ধীরে ধীরে চেতন তাঁর বাড়ির চারপাশে তৈরি করে ফেললেন একটি ‘মাইক্রো ফরেস্ট’ বা ছোটখাটো জঙ্গল। ফরেস্ট গার্ডেনিং-এর নিয়ম মেনে বড় গাছ, মাঝারি গাছ, ঝোপঝাড় আর লতানো গাছ—সবকিছু ধাপে ধাপে সাজিয়ে নিলেন তিনি। তাঁর এই এক চিলতে জায়গায় রয়েছে বাঁশ, নারকেল, তুঁত (মালবেরি), পেঁপে আর আতার মতো প্রায় ২০টি দেশি প্রজাতির গাছ।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মাত্র একটা কটন টি-শার্ট তৈরি করতে জল লাগে প্রায় ২,৭০০ লিটার! খুব সহজ হিসাবে—আপনি সারাদিনে যে পরিমাণ জল পান করেন, সেই হিসাবে আপনার পুরো আড়াই থেকে তিন বছরের (প্রায় ৯০০ দিনের) খাওয়ার জল স্রেফ একটা টি-শার্টের পিছনে শেষ হয়ে যায়।
চেতন এই গাছগুলির বেশিরভাগই লাগিয়েছেন বাড়ির দক্ষিণ ও পশ্চিম দিকে। কারণ এই দুই দিক দিয়েই সারাদিন সবচেয়ে বেশি চড়া রোদ আসে। ফলে প্রখর রোদ সরাসরি বাড়ির দেওয়ালে লাগতেই পারে না, আটকে যায় গাছের গায়ে। ঘরও থাকে চমৎকার ঠান্ডা।
চেতন শুধু নিজের ঘর ঠান্ডা করার কথা ভাবেননি, তাঁর এই ছোট্ট জঙ্গল এখন শহরের বুকে এক টুকরো আস্ত বাস্তুতন্ত্র বা ইকোসিস্টেম। যেখানে চেম্বুরের মতো দূষণভরা এলাকায় পাখিদের দেখাই মেলে না, সেখানে চেতনের এই সবুজ আশ্রয়ে রোজ পাখিদের মেলা বসে।
প্যাশনফ্রুট ফুলের একটা বড় গুণ হলো, এগুলি বর্ষাকালে ফোটে—যখন অন্য গাছে সাধারণত ফুল থাকে না। আর এই ফুলের টানেই মেঠো মৌমাছি থেকে শুরু করে কার্পেন্টার বি, শ্বেতাক্ষী (ওরিয়েন্টাল হোয়াইট-আই), মুনিয়া আর বুলবুলির মতো অজস্র পাখি আর প্রজাপতি ডানা মেলে আসে এখানে। তখন কংক্রিটের জঙ্গলের মাঝে চেতনের বাড়ি যেন হয়ে ওঠে এক টুকরো আসল অরণ্য!
চেতন সোরেনজির ছাদ বাগান
গাছপালার পাশাপাশি জলের অপচয় রুখতেও চেতন এক দারুণ কাণ্ড ঘটিয়েছেন। তাঁর বাড়িতে রয়েছে একটি ৫০ ফুট গভীর বোরওয়েল এবং চমৎকার রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং ব্যবস্থা।
বর্ষাকালে এই ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রায় ১০ লক্ষ লিটার বৃষ্টির জল জমিয়ে ফেলা যায়। পুরো মরসুমে সংগৃহীত এই বিপুল পরিমাণ জল শুধু যে চেতনের নিজের বাড়ির কাজে লাগে তা নয়, এটি মাটির নিচে গিয়ে আশেপাশের ভূগর্ভস্থ জলের স্তর বাড়াতেও সাহায্য করে। এমনকী এই জল দিয়ে আশেপাশের রাস্তা আর ফুটপাথও পরিষ্কার করা হয়। প্রকৃতির থেকে নেওয়া সম্পদ এভাবেই প্রকৃতিকে ফিরিয়ে দেন তিনি।
‘ফরেস্ট নেক্টার’
গাছপালা আর মৌমাছিদের এই মেলবন্ধন চেতনকে এক নতুন ঠিকানায় পৌঁছে দিয়েছে। ‘আন্ডার দ্য ম্যাঙ্গো ট্রি সোসাইটি’ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সাহায্যে তিনি বীকিপিং বা মৌমাছি পালন শুরু করেন। শুরুতে অনেকেই ভেবেছিলেন শহুরে দূষণের মধ্যে মৌমাছি টিকবে না, কিন্তু চেতন সবাইকে অবাক করে দিয়েছেন।
বর্তমানে তিনি ‘ফরেস্ট গার্ডেন মাইক্রোফার্মস ইন্ডিয়া’ নামের একটি উদ্যোগ চালাচ্ছেন এবং নিজের তৈরি ব্র্যান্ড ‘ফরেস্ট নেক্টার’ (@forestnectar_) এর অধীনে খাঁটি মধু ও প্যাশনফ্রুট পিউরি তৈরি করছেন। তাঁর এই খাঁটি মধুর স্বাদ এতটাই চমৎকার যে মুম্বইয়ের ‘The Table’, ‘Americano’ কিংবা ‘Mag St Café’-র মতো নামী-দামী রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে দিল্লির তাজ সাস্তাক্রুজ ও গুরুগ্রামের গ্র্যান্ড হায়াত হোটেলের শেফদের রান্নাঘরেও তা পৌঁছে গিয়েছে। এমনকী মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত বিচারক গ্যারি মেহিগানও এই মধুর স্বাদ নিয়ে প্রশংসা করেছেন।
চেতন সোরেনজির এই বাড়ি আজ আর শুধু একটা বাড়ি নয়, এটি একটি উদাহরণ। যে সময়ে দাঁড়িয়ে জলবায়ু পরিবর্তন বা বিশ্ব উষ্ণায়ন নিয়ে আমরা রোজ চিন্তা করি, সেই সময়ে দাঁড়িয়ে চেতন দেখালেন যে বড় বড় কর্পোরেট চাকরি সামলেও চাইলে নিজের মতো করে একটা বড় বদল আনা সম্ভব।
চেতন প্রায়ই বলেন, “চেম্বুরের মতো দূষিত এলাকায় যদি এটা করা সম্ভব হয়, তবে ভারতের যেকোনো প্রান্তে এটা করা সম্ভব।”
শহরের তাপমাত্রা কমানো থেকে শুরু করে জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনা—সবকিছুর সমাধান কিন্তু প্রকৃতির বুকেই লুকিয়ে আছে। আমাদের শুধু ঘরের দরজাটা একটু খুলে দিতে হবে, বাকি কাজটা প্রকৃতি নিজেই করে নেবে।






