এসি ছাড়াই ঠান্ডা! মুম্বইয়ের এই বাড়ি শেখাচ্ছে পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন

House without AC cooling: চেম্বুর এলাকার একটা বাড়ি যেন এক টুকরো ম্যাজিক! বাইরের তাপমাত্রা যখন ফুটছে, এই বাড়িটি তখন কোনো এসি বা ভারী যন্ত্রপাতি ছাড়াই চারপাশের চেয়ে প্রায় ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ঠান্ডা থাকছে।

inscript
৪ মিনিট
এসি ছাড়াই ঠান্ডা! মুম্বইয়ের এই বাড়ি শেখাচ্ছে পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন

মুম্বইয়ের তীব্র গরমের কথা ভাবলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে চড়া রোদ, গলদঘর্ম পরিস্থিতি, চারপাশের কংক্রিটের বহুতল এবং তাতে ভ্যাপসা গরম। এসি চালিয়েও যেন শান্তি নেই। উলটে এসির কারণে মাসের শেষে বিদ্যুতের বিল দেখে মাথায় হাত পড়ে। কিন্তু মুম্বইয়ের এই চেনা ছবির বাইরে চেম্বুর এলাকার একটা বাড়ি যেন এক টুকরো ম্যাজিক! বাইরের তাপমাত্রা যখন ফুটছে, এই বাড়িটি তখন কোনো এসি বা ভারী যন্ত্রপাতি ছাড়াই চারপাশের চেয়ে প্রায় ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ঠান্ডা থাকছে।

কীভাবে সম্ভব হচ্ছে এইরকম অসম্ভব একটা ঘটনা?

বাড়িটির মালিক চেতন সোরেনজি। পেশায় তিনি টাটা রিয়েলটির মতো এক বড় কর্পোরেট সংস্থার প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট লিড। ২০১৭ সালে, মুম্বইয়ের চড়া গরম থেকে বাঁচতে তিনি প্রথমে নিজের বাড়ির ছাদ আর দেওয়ালে গাছ লাগানোর কথা ভাবেন, যাকে চলতি কথায় বলে ‘গ্রিন রুফিং’।

চেতন সোরেনজি

নানারকম গাছ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর তিনি দেখলেন, প্যাশনফ্রুট বা ঝুমকো লতার গাছ এখানে দারুণ কাজ করছে। এই লতানো গাছ খুব দ্রুত বাড়ে আর দেখতে দেখতে পুরো বাড়িটাকে একটা ঘন সবুজ পাতায় মুড়ে ফেলে। লোহা আর কংক্রিটের দেওয়ালকে আটকে দেয় প্রকৃতির এই জীবন্ত বর্ম।

ধীরে ধীরে চেতন তাঁর বাড়ির চারপাশে তৈরি করে ফেললেন একটি ‘মাইক্রো ফরেস্ট’ বা ছোটখাটো জঙ্গল। ফরেস্ট গার্ডেনিং-এর নিয়ম মেনে বড় গাছ, মাঝারি গাছ, ঝোপঝাড় আর লতানো গাছ—সবকিছু ধাপে ধাপে সাজিয়ে নিলেন তিনি। তাঁর এই এক চিলতে জায়গায় রয়েছে বাঁশ, নারকেল, তুঁত (মালবেরি), পেঁপে আর আতার মতো প্রায় ২০টি দেশি প্রজাতির গাছ।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
আপনার একটা টি-শার্ট তৈরিতে লাগে ২,৭০০ লিটার জল!

মাত্র একটা কটন টি-শার্ট তৈরি করতে জল লাগে প্রায় ২,৭০০ লিটার! খুব সহজ হিসাবে—আপনি সারাদিনে যে পরিমাণ জল পান করেন, সেই হিসাবে আপনার পুরো আড়াই থেকে তিন বছরের (প্রায় ৯০০ দিনের) খাওয়ার জল স্রেফ একটা টি-শার্টের পিছনে শেষ হয়ে যায়।

চেতন এই গাছগুলির বেশিরভাগই লাগিয়েছেন বাড়ির দক্ষিণ ও পশ্চিম দিকে। কারণ এই দুই দিক দিয়েই সারাদিন সবচেয়ে বেশি চড়া রোদ আসে। ফলে প্রখর রোদ সরাসরি বাড়ির দেওয়ালে লাগতেই পারে না, আটকে যায় গাছের গায়ে। ঘরও থাকে চমৎকার ঠান্ডা।

চেতন শুধু নিজের ঘর ঠান্ডা করার কথা ভাবেননি, তাঁর এই ছোট্ট জঙ্গল এখন শহরের বুকে এক টুকরো আস্ত বাস্তুতন্ত্র বা ইকোসিস্টেম। যেখানে চেম্বুরের মতো দূষণভরা এলাকায় পাখিদের দেখাই মেলে না, সেখানে চেতনের এই সবুজ আশ্রয়ে রোজ পাখিদের মেলা বসে।

প্যাশনফ্রুট ফুলের একটা বড় গুণ হলো, এগুলি বর্ষাকালে ফোটে—যখন অন্য গাছে সাধারণত ফুল থাকে না। আর এই ফুলের টানেই মেঠো মৌমাছি থেকে শুরু করে কার্পেন্টার বি, শ্বেতাক্ষী (ওরিয়েন্টাল হোয়াইট-আই), মুনিয়া আর বুলবুলির মতো অজস্র পাখি আর প্রজাপতি ডানা মেলে আসে এখানে। তখন কংক্রিটের জঙ্গলের মাঝে চেতনের বাড়ি যেন হয়ে ওঠে এক টুকরো আসল অরণ্য!

চেতন সোরেনজির ছাদ বাগান

গাছপালার পাশাপাশি জলের অপচয় রুখতেও চেতন এক দারুণ কাণ্ড ঘটিয়েছেন। তাঁর বাড়িতে রয়েছে একটি ৫০ ফুট গভীর বোরওয়েল এবং চমৎকার রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং ব্যবস্থা।

বর্ষাকালে এই ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রায় ১০ লক্ষ লিটার বৃষ্টির জল জমিয়ে ফেলা যায়। পুরো মরসুমে সংগৃহীত এই বিপুল পরিমাণ জল শুধু যে চেতনের নিজের বাড়ির কাজে লাগে তা নয়, এটি মাটির নিচে গিয়ে আশেপাশের ভূগর্ভস্থ জলের স্তর বাড়াতেও সাহায্য করে। এমনকী এই জল দিয়ে আশেপাশের রাস্তা আর ফুটপাথও পরিষ্কার করা হয়। প্রকৃতির থেকে নেওয়া সম্পদ এভাবেই প্রকৃতিকে ফিরিয়ে দেন তিনি।

‘ফরেস্ট নেক্টার’

গাছপালা আর মৌমাছিদের এই মেলবন্ধন চেতনকে এক নতুন ঠিকানায় পৌঁছে দিয়েছে। ‘আন্ডার দ্য ম্যাঙ্গো ট্রি সোসাইটি’ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সাহায্যে তিনি বীকিপিং বা মৌমাছি পালন শুরু করেন। শুরুতে অনেকেই ভেবেছিলেন শহুরে দূষণের মধ্যে মৌমাছি টিকবে না, কিন্তু চেতন সবাইকে অবাক করে দিয়েছেন।

বর্তমানে তিনি ‘ফরেস্ট গার্ডেন মাইক্রোফার্মস ইন্ডিয়া’ নামের একটি উদ্যোগ চালাচ্ছেন এবং নিজের তৈরি ব্র্যান্ড ‘ফরেস্ট নেক্টার’ (@forestnectar_) এর অধীনে খাঁটি মধু ও প্যাশনফ্রুট পিউরি তৈরি করছেন। তাঁর এই খাঁটি মধুর স্বাদ এতটাই চমৎকার যে মুম্বইয়ের ‘The Table’, ‘Americano’ কিংবা ‘Mag St Café’-র মতো নামী-দামী রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে দিল্লির তাজ সাস্তাক্রুজ ও গুরুগ্রামের গ্র্যান্ড হায়াত হোটেলের শেফদের রান্নাঘরেও তা পৌঁছে গিয়েছে। এমনকী মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত বিচারক গ্যারি মেহিগানও এই মধুর স্বাদ নিয়ে প্রশংসা করেছেন।

চেতন সোরেনজির এই বাড়ি আজ আর শুধু একটা বাড়ি নয়, এটি একটি উদাহরণ। যে সময়ে দাঁড়িয়ে জলবায়ু পরিবর্তন বা বিশ্ব উষ্ণায়ন নিয়ে আমরা রোজ চিন্তা করি, সেই সময়ে দাঁড়িয়ে চেতন দেখালেন যে বড় বড় কর্পোরেট চাকরি সামলেও চাইলে নিজের মতো করে একটা বড় বদল আনা সম্ভব।

চেতন প্রায়ই বলেন, “চেম্বুরের মতো দূষিত এলাকায় যদি এটা করা সম্ভব হয়, তবে ভারতের যেকোনো প্রান্তে এটা করা সম্ভব।”

শহরের তাপমাত্রা কমানো থেকে শুরু করে জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনা—সবকিছুর সমাধান কিন্তু প্রকৃতির বুকেই লুকিয়ে আছে। আমাদের শুধু ঘরের দরজাটা একটু খুলে দিতে হবে, বাকি কাজটা প্রকৃতি নিজেই করে নেবে।

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ভুটানে হড়পা বানের জেরে উত্তরবঙ্গে আতঙ্ক, কী পরিস্তিতি এখন?

Bhutan Flash Flood: ভুটানের শিনতাফু হ্রদ ভেঙে হড়পা বানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাস্তা ও পর্যটনকেন্দ্রের পরিকাঠামো। বন্যার আশঙ্কায় আলিপুরদুয়ারের কুমারগ্রামে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষকে নিরাপদ জায়গায় সরানোর উদ্যোগ নেয় প্রশাসন। শুক্রবার সকালে সংকোশ নদীর জলস্তর না বাড়ায় কিছুটা স্বস্তি ফেরে। পরিস্থিতি এখন কেমন?

মাত্র ১০০ বই থেকে ১০ হাজার! অসমের চা-বাগানের শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ছেন অনিন্দিতা

Assam Library Initiative: মাত্র ১০০টি বই নিয়ে ২০২০ সালে অসমের চা-বাগান এলাকার শিশুদের জন্য লাইব্রেরি শুরু করেছিলেন অনিন্দিতা গগৈ। আজ তিনটি লাইব্রেরিতে বইয়ের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। পরিবারের ৪০ লক্ষ টাকারও বেশি বিনিয়োগে এগিয়ে চলেছে এই উদ্যোগ। কীভাবে শিশুদের পড়াশোনা ও সৃজনশীলতার সুযোগ তৈরি করছেন অনিন্দিতা?

Cyclone Arnab: কোথায় আছড়ে পড়ল অর্ণব, কতটা ক্ষয়ক্ষতি? বাংলায় কতটা প্রভাব?

Cyclone Arnab: অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলে আছড়ে পড়েছে ঘূর্ণিঝড় অর্ণব। ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটার বেগে দমকা হাওয়া, ভারী বৃষ্টি ও জল জমার জেরে বিপর্যস্ত একাধিক এলাকা। ৮৪ হাজারেরও বেশি মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরানো হয়েছে। বাংলার কোন কোন জেলায় ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস, আর কতটা প্রভাব পড়তে পারে ঘূর্ণিঝড়ের?

অ্যানথ্রোপিকের মতো এআই সংস্থাগুলি যেভাবে হয়ে দাঁড়াচ্ছে জলবায়ু সংকটের কারণ

The AI Carbon Bill: অ্যানথ্রোপিকের আইপিও ফাইলিংয়ে জলবায়ু পরিবর্তনকে বড় ব্যবসায়িক ঝুঁকি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলো। ডেটা সেন্টার ঠান্ডা করতে বিদ্যুৎ-জলের ব্যয় বাড়ছে। ২০২৫-এ ডেটা সেন্টারগুলিতে ঘণ্টা প্রতি বিদ্যুৎ ব্যবহার, ৪৪৮ টেরাওয়াটে পৌঁছবে।

লুলার জয়ের পরেও কেন স্বস্তিতে নেই 'পৃথিবীর ফুসফুস' আমাজন?

lula's amazon policy: প্রথম পর্বে পিছিয়ে থাকার পর, কুড়ি দিনে এক কোটিরও বেশি ভোট বাড়িয়ে লুলা দা সিলভা চতুর্থবার ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেন। লুলার আমলে, আমাজনের জঙ্গল উজাড় হওয়া ৭১% কমেছে, তবু আইনসভায় ডানপন্থীদের শক্তিবৃদ্ধি হওয়ায়, আমাজনের সংকটজনক সীমার খুব কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ার আশঙ্কা রয়ে গেলই।

ঘূর্ণিঝড় অর্ণব : কোথায় রয়েছে, বাংলায় কতটা দুর্যোগের আশঙ্কা?

Cyclone Arnab: বঙ্গোপসাগরে শক্তি বাড়িয়ে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়েছে অর্ণব। বুধবার অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলে আছড়ে পড়তে পারে এই ঝড়। সরাসরি বাংলায় আঘাত না হানলেও মঙ্গলবার থেকে দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় ভারী বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উত্তরবঙ্গেও বৃষ্টি হতে পারে। কোন কোন জেলায় দুর্যোগের আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি?

রেকর্ড ভাঙা সমুদ্রের উষ্ণতা: কতটা বিপদের মুখে পৃথিবী?

super el nino 2026: অক্টোবরে নিনো ৩.৪ অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার পার্থক্য, ২০১৫-১৬-র রেকর্ড ভেঙে ৩.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়াতে চলেছে। ডব্লিউএমও বলছে, এই এল নিনো ২০২৭ পর্যন্ত প্রভাব ফেলবে। ভারতে বর্ষায় ১৩% ঘাটতি, ৩৯.৮% কৃষিজমিতে খরা, ফসল উৎপাদন ৪% কমার আশঙ্কা রয়েছে।

ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’? কোন কোন জেলায় ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস?

Cyclone Arnab: ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’-এর প্রভাবে বুধবার ও বৃহস্পতিবার দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস। দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রামে বৃষ্টি বাড়তে পারে। উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলাতেও ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা। কলকাতা-সহ বিভিন্ন জেলায় বইতে পারে ঝোড়ো হাওয়া। কোন উপকূলবর্তী জেলাগুলিতে ভারী বৃষ্টির সতর্কতা জারি হয়েছে?