অলিপাব কাণ্ড: ধর্মের নামে আর কতদূর যাব আমরা?
Influencer beef controversy: যে রেস্তোরাঁতে এরকম ঘটনার নাজির বিগত ৭৮ বছরে নেই এবং যেখানে বিফ, মটন, পর্ক, চিকেন সব পাওয়া যায় এবং পাশাপাশি টেবিলে বসে মানুষজন তা খেয়েও থাকেন, সেই রেস্তোরাঁতে কাকতলীয় হলেও, ওই রাতে সবথেকে আগে যে মিডিয়া পৌঁছে গেছিল সেই মিডিয়াই কিন্তু কিছুদিন আগে ভোটার সংশোধনের আবহে অনুপ্রবেশকারী খুঁজছিল।
অদ্ভুত একটা রাজ্যে বাস করছি, যেখানে বিজেপির শাসন না থাকলেও, বিজেপিরই নিয়ম চলে। এমন একটা রাজ্যে আমরা আছি, যেখানে একজন ইনফ্লুয়েন্সার, যিনি নিজেকে আবার অভিনেতা বলে দাবি করেন, তিনি সাজিয়ে গুছিয়ে একটি কলকাতার বিখ্যাত রেস্তোরাঁ কাম পাবে গিয়ে না বুঝেই গোমাংস খেয়ে সেখানকার মুসলমান ওয়েটারকে অপমান করেন, সেই ভিডিও ছড়িয়ে দেন এবং পরে কমেন্ট অফ করে দেন, তারপরে ভিডিওটিও সরিয়ে নিয়ে বলেন, যে তাঁর নাকি কোনো খারাপ উদ্দেশ্য ছিল না, দাঙ্গা লাগানোর কোনো অভিপ্রায় নাকি তাঁর ছিল না। অথচ ঐ সংখ্যালঘু মানুষটিকেই পুলিশ গ্রেফতার করে ঐ 'ইনফ্লুয়েন্সারে'র অভিযোগের ভিত্তিতে। তাই প্রশ্ন উঠছে, আইন কি সবার জন্য সমান? নাকি প্রভাবশালী ব্যক্তিদের জন্য একরকমের আইন, আর রেস্তোরাঁর গরিব কর্মীর জন্য অন্য আইন?
প্রশ্ন উঠছে, এই রাজ্যের পুলিশ কি এখন নাগপুরের নির্দেশে চলছে? এখন কেউ বলতেই পারেন, তৃণমূল আর বিজেপির কোনো তফাৎ নেই, কিন্তু প্রশাসনটাও কি তাই? তাহলে বুক ফুলিয়ে ‘আমরাই একমাত্র বিজেপি বিরোধী’ এই কথাগুলো না বলাই ভালো নয় কি? এই ধরনের ঘটনা কিন্তু প্রথম নয়, এর আগেও এই ধরনের ঘটনা আমাদের গর্বের, বহু সংস্কৃতির ধারক বাহক কলকাতা শহরে ঘটেনি এমনটা নয়। এই রাজ্যে গরিব মুসলমান প্যাটি বিক্রেতাকে যাঁরা হেনস্থা করে, তাঁরা ড্যাং ড্যাং করে ঘুরে বেড়ায়, তাঁদের নামে এফআইআর অবধি হয় না। সেইদিন অভিযোগ কী ছিল? গীতাপাঠের অনুষ্ঠানে নাকি ভেজ বলে এক ‘হিন্দু’ ব্যক্তিকে চিকেন প্যাটি খাইয়ে দেওয়া হয়েছে। তাতে ঐ ‘হিন্দু’ ব্যক্তির ভাবাবেগে আঘাত লেগেছিল।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Chicken Patties Fact Check: ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, বাক্সে একদিকে তিন কোনা প্যাটি (যেগুলো সাধারণত ভেজ প্যাটি হয়), আরেক দিকে চৌকো (চিকেন প্যাটি) রয়েছে।
আর এখন অভিযোগ পার্কস্ট্রিটের অলিপাবে মটন বলে গোমাংস খাওয়ানো হয়েছে। যিনি অভিযোগ করেছেন, তিনিই সেই সমাজমাধ্যমের প্রভাবশালী বা ইনফ্লুয়েন্সার। ঐ রেস্তোরাঁর ওয়েটার বা বেয়ারাটি ভুল স্বীকার করলেও, কিন্তু ছাড় পাননি, উল্টে তাঁর ধর্ম জিজ্ঞেস করে, তাঁকেই হেনস্থা করা হয়েছে। একজন মানুষকে তাঁর ধর্ম বা জাত জিজ্ঞেস করাই ভারতের সংবিধানে আইনত অপরাধ হয়তো নয় কিন্তু যখন ঐ কাজটিই করা হয় অন্য কোনো অসৎ উদ্দেশ্যে, তখন তা ভারতীয় ন্যায়সংহিতার ২৯৫ ধারায় দণ্ডনীয়। যখন ঐ ইনফ্লুয়েন্সার অলিপাবের বেয়ারাকে বলতে দেখা যায় যে, ‘আপনি তো ধর্মে মুসলমান, আপনাকে যদি জোর করে শুয়োর খাইয়ে দেওয়া হয়, তাহলে আপনার কেমন লাগবে?’ তখন সেটাই অন্য ধর্মকে ছোট করা হয়। ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ২৯৫এ ধারায় বলা হয়েছে যদি প্রশ্নটি অপমান, লাঞ্ছনা বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার বিদ্বেষপূর্ণ উদ্দেশ্যে করা হয়—বিশেষ করে প্রকাশ্য এবং ইচ্ছাকৃতভাবে উস্কানিমূলকভাবে—তাহলে এটি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে ধরে নেওয়া হবে এবং তার জন্য শাস্তির বিধানও আছে। ২৯৫এ ধারাটি শব্দ, লিখিত বিবৃতি, চিহ্ন বা দৃশ্যমান উপস্থাপনার মাধ্যমে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার উদ্দেশ্যে কোনো ধর্মকে অপমান করা বা অপমান করার প্রচেষ্টাকে অন্তর্ভুক্ত করে।
বিষয়টা কিন্তু শুধু গোমাংসতে সীমাবদ্ধ আছে বা থাকবে এমনটা নয়। গত দুর্গাপুজোর সময় 'আয়াত' নামক একটি বিরিয়ানি রেস্তোরাঁর বিজ্ঞাপন নিয়েও সমস্যা হয়েছিল। ঐ বিজ্ঞাপনে ছিল, বিরিয়ানি থেকে ধোঁয়া উঠছে এবং ঐ রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষ সমস্ত বাঙালিদের দুর্গাপুজো উপলক্ষ্যে আহ্বান করেছিল ঐ বিজ্ঞাপন দিয়েই। ঐ বিজ্ঞাপনে দুর্গার একটি অবয়বও ছিল। এক হিন্দিভাষী বিজেপি যুব মোর্চার মনে হয়েছিল, যে ঐ বিজ্ঞাপনটি নাকি হিন্দু ভাবাবেগে আঘাত করেছিল। বিরিয়ানির ছবি থেকে ওঠা ধোঁয়া নাকি দুর্গাঠাকুরের অবয়বের নাকে প্রবেশ করছিল। এই অভিযোগ নিয়ে ঐ বিজেপি কর্মী থানায় যায়, আর অবাক করে দিয়ে রাতারাতি সারা কলকাতায় যত জায়গায় ঐ বিজ্ঞাপনটি টাঙানো হয়েছিল তা নামিয়ে নেওয়া হয়। দুর্গাপুজোর সময় বেশিরভাগ বাঙালিই আমিষ খায় সাধ্যমতো, সেদিনের ঐ ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছিল, বাংলার বা কলকাতার সমাজে নিরামিষাশীদের প্রভাব কতটা বেড়েছে। হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানের সমসত্ত্বের রাজনীতির সামাজিক প্রভাবও কীভাবে বেড়েছে, তা সেদিনই বোঝা গিয়েছিল। এখনই যে এর বিরুদ্ধে আওয়াজ আরও মজবুত করতে হবে, তা বেশ বোঝা যাচ্ছে, না হলে যে আমাদের সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদই আক্রমণের মুখে পড়বে তা বলাই বাহুল্য।
‘সৃষ্টি’ শব্দটির আজকের সোশ্যাল মিডিয়া-সর্বস্ব যুগে ইংরেজি তর্জমা দাঁড়িয়েছে ‘কন্টেন্ট’। কিন্তু যিনি এই কাজটি করছেন, তাঁকে কি আদৌ ‘স্রষ্টা’ বলা চলে? এই নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। আদতে তিনি শুধুই একজন ‘কন্টেন্ট ক্রিয়েটার’; তাঁর বিষয় বা কন্টেন্টের মধ্যে প্রকৃত সৃষ্টির কোনো ছাপ নেই। একজন স্রষ্টা যা সৃষ্টি করেন, তার সবটার লক্ষ্য কি বাজার? কিছু লাইক, কিছু শেয়ার? নাকি দ্রুত ভাইরাল হওয়াই আজকের সমস্ত কন্টেন্টের একমাত্র উদ্দেশ্য? তাহলে সৃষ্টির মাহাত্ম্য কোথায়? একজন স্রষ্টা তো নিজের আনন্দের জন্যও সৃষ্টি করেন। আজকের অলিপাবের ঘটনা নিয়ে যে বিতর্কিত ভিডিও একজন কন্টেন্ট ক্রিয়েটার বানিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ছাড়লেন, তার মধ্যে সৃষ্টিসুখ কোথায়? আজকের সময়ে এই ধরনের কন্টেন্ট ক্রিয়েটারকে অনেকে আবার সামাজিক মাধ্যমের প্রভাবশালীও অর্থাৎ বলে থাকেন, ইংরেজিতে যার একটা গালভরা নাম ও আছে- ইনফ্লুয়েন্সার। এই ইনফ্লুয়েন্সারদের কী কাজ? এঁদের কাজ সমাজকে ইনফ্লুয়েন্স অর্থাৎ প্রভাবিত করা। অলিপাবের ঘটনাতেও তিনি তাঁর কাজটিই করেছেন, তিনি প্রভাবিত করেছেন, কিন্তু সেটা করেছেন খারাপভাবে। তিনি সমাজের মধ্যে বিভাজন তৈরি করার কাজটা করেছেন এবং সেটা সচেতনভাবেই করেছেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Gita recitation event controversy: রিয়াজুলের অভিযোগ, আক্রমণকারীরা প্রথমেই জানতে চেয়েছিল তিনি মাংস বিক্রি করছেন কি না। তিনি হ্যাঁ বলতেই তারা একটা কথাও শুনতে চায়নি। তর্ক-বিতর্ক তো দূরের কথা।
যদিও সমাজমাধ্যমেই এর বিরুদ্ধে আওয়াজ উঠেছে এবং তা অন্যান্য কন্টেন্ট ক্রিয়েটার থেকে শুরু করে অনেকেই করেছেন, কিন্তু এই ধরনের ঘটনা ঘটলে যে প্রশাসনকে আরও নিরপেক্ষ ভূমিকা নিতে হবে তা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। সমাজে প্রভাবশালী ব্যক্তির জন্য এক নিয়ম আর পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য অন্য নিয়ম বা আইন এই শহর কোনোদিনই মেনে নেয়নি। আজও নেবে না। তাই বেশ কিছু সংগঠন এবং ব্যক্তিরা অলি পাবের বেয়ারার গ্রেফতারির প্রতিবাদে রাস্তায় নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যদিও যখন গীতাপাঠের আসরে হেনস্থাকারী ব্যক্তিকে রাজ্যের বিরোধী দলনেতা যখন মালা পরিয়ে সংবর্ধনা দিয়েছিলেন, তার বিরুদ্ধে কোনো স্বর শোনা যায়নি, কিন্তু তবুও আজকে ঐ বেয়ারাকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে রাস্তায় নামার সিদ্ধান্ত অত্যন্ত সময়োপযোগী। নাহলে গর্ব করার মতো এই শহরের আর কিছুই থাকবে না।
মনে পড়ছে একবার অল্ট নিউজের প্রতিষ্ঠাতা কর্ণধার প্রতীক সিনহা একটি ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় বলেছিলেন, তিনি গুজরাতে বড় হলেও, তাঁর প্রাথমিক কাজের জায়গা আমেদাবাদ হলেও, তিনি কলকাতা শহরটাকে এত পছন্দ করেন, কারণ এই শহরটার মধ্যে সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে চলার একটা প্রবণতা আছে, যা এই মূহুর্তে দেশের অন্য কোনো শহরে নেই। আজকে একজন কন্টেট ক্রিয়েটার বা সমাজ মাধ্যমের প্রভাবশালী একজন ব্যক্তির জন্য যদি এই শহরটার দুর্নাম হয়, তাহলে তখন কাকে দোষ দেওয়া উচিত? নাকি এই গোটা ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে আরও বড় কোনো ষড়যন্ত্র? যে রেস্তোরাঁতে এরকম ঘটনার নাজির বিগত ৭৮ বছরে নেই এবং যেখানে বিফ, মটন, পর্ক, চিকেন সব পাওয়া যায় এবং পাশাপাশি টেবিলে বসে মানুষজন তা খেয়েও থাকেন, সেই রেস্তোরাঁতে কাকতলীয় হলেও, ওই রাতে সবথেকে আগে যে মিডিয়া পৌঁছে গেছিল সেই মিডিয়াই কিন্তু কিছুদিন আগে ভোটার সংশোধনের আবহে অনুপ্রবেশকারী খুঁজছিল। এটা সেই পোর্টাল যারা কোনো রাখঢাক না রেখেই সরাসরি বিজেপির দালালি করে, সমাজে সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়িয়ে বেড়ায় এবং ইসলামবিদ্বেষ প্রচার করে। ভেবে দেখুন তারা হঠাৎ করে ঐ কন্টেন্ট ক্রিয়েটারের মধ্যে এমন কী দেখল যে, তাঁর হাতে বর্ষসেরা কনটেন্ট ক্রিয়েটারের পুরস্কার তুলে দিল কিছুদিন আগেই। তাই যে প্রশ্নটা বারেবারে ফিরে আসছে, গোটা ঘটনাটাই প্রি-প্ল্যানড বা সাজানো নয় তো? প্রথমেই যে তিনি বিফ স্টেকই অর্ডার করেননি তার প্রমাণ আছে? নাহলে অন ক্যামেরা ওয়েটারের ধর্ম জিজ্ঞাসা করা এবং নিজের ব্রাহ্মণ আইডেন্টিটি জাহির করা। অঙ্কগুলো ঠিক যেন মিলছে না। একটা সময়ে আমরা পড়েছি,
শরীর শরীর, তোমার মন নাই কুসুম?
এখন বলতে ইচ্ছে করছে, শুধুই লাইক, শেয়ার, ভাইরাল হওয়া? তোমার কন্টেট নাই ক্রিয়েটার? তোমার মানবিক মুখ নেই স্রষ্টা?





