শুধু ক্ষুদিরামের সহযোদ্ধা নন: অমর ক্ষণজন্মা প্রফুল্ল চাকী
Prafulla Chaki: মৃত্যুর পর, তাঁর মাথা শরীর থেকে আলাদা করে কলকাতায় পাঠানো হয়, যাতে ক্ষুদিরাম বসু তাঁকে শনাক্ত করতে পারেন।

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মাথায় দুটো গুলি, তারপর সব শেষ...
ঊনিশ শতকের শেষের দিকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বাংলার মাটিতে যে অগ্নিযুগের সূচনা হয়েছিল, তার প্রথম শহিদ প্রফুল্ল চাকী। জন্ম ১০ ডিসেম্বর ১৮৮৮ সালে, তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার (বর্তমান বাংলাদেশের) বগুড়া জেলার বিহার গ্রামে। একটি স্বচ্ছল জোতেদার পরিবারে জন্মগ্রহন করেছিলেন তিনি। পিতা রাজনারায়ণ চাকী ছিলেন বগুড়ার নবাবের এস্টেটের কর্মচারী, মাতা স্বর্ণময়ী দেবী। মাত্র দু'বছর বয়সে পিতৃহারা হন প্রফুল্ল। মায়ের কাছেই পড়াশোনার হাতেখড়ি। ছোটবেলা থেকেই শান্ত, মিতভাষী, অথচ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন প্রফুল্ল।
বগুড়ার নামুজা জ্ঞানদা প্রসাদ ইংলিশ স্কুল নামক একটি ইংরেজী মাধ্যম বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষার পর দাদার হাত ধরে রংপুরে আসেন প্রফুল্ল। দাদা প্রতাপ চন্দ্র চাকীর শ্বশুরমশাই ছিলেন রংপুরের বিশিষ্ট ব্যক্তি। প্রফুল্ল রংপুরে এসে ভর্তি হন রংপুর জিলা স্কুলে। সেখানেই যোগ দেন 'বান্ধব সমিতি' নামক একটি গোপন সংগঠনে, যা ছিল বিপ্লবী চেতনা গঠনের অন্যতম প্ল্যাটফর্ম। ২০০ জন ছাত্রের সঙ্গে তিনিও কার্লাইল সার্কুলারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশ নেন, ফলে নবম শ্রেণিতে পড়াকালীন বিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয় তাঁকে। এরপর যোগ দেন রংপুর ন্যাশনাল স্কুলে, যেখানে বিপ্লবীদর্শনে উদ্বুদ্ধ হন এবং জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেন—স্বাধীনতা অর্জন নচেৎ মৃত্যু।
রংপুরে থাকাকালীন বারীন ঘোষের সঙ্গে পরিচয় হয় প্রফুল্লর। বারীন তাকে কলকাতায় নিয়ে আসেন এবং যুগান্তর দলে অন্তর্ভুক্ত করেন। প্রথম অভিযানে তাঁকে নিয়োগ করা হয় পূর্ববঙ্গ ও আসামের লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার জোসেফ ব্যামফিল্ড ফুলারকে হত্যার পরিকল্পনায়। কিন্তু, ফুলারের সফরসূচি বাতিল হওয়ায় পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Khudiram Bose: গাড়িতে উঠে সে চিৎকার করে বলে উঠেছিল, বন্দে মাতরম। নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় নির্ভীকভাবে দেশের বন্দনা করা এই ছেলেটির নাম ক্ষুদিরাম বসু।
এরপর ১৯০৮ সালে বিহারের মুজফফরপুরের ম্যাজিস্ট্রেট ডগলাস কিংসফোর্ডকে হত্যার দায়িত্ব দেওয়া হয় প্রফুল্ল ও ক্ষুদিরাম বসুকে। কিংসফোর্ড, এর পূর্বে ছিলেন, কলকাতার চীফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট। কিংসফোর্ড ছিলেন ব্রিটিশদের অনুগত। সেই সময় তিনি বাংলার তরুণ রাজনৈতিক কর্মী তথা বিপ্লবীদের কঠোর এবং নির্মম শাস্তি দেওয়ার জন্য কুখ্যাত ছিলেন। তাঁকে হত্যার জন্য দুই যুবক মুজাফফরপুরে গিয়ে তাঁর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন। ১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল সন্ধ্যায় ইউরোপিয়ান ক্লাবের সামনে কিংসফোর্ডের গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিলেন ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল। একটি গাড়ি বের হতেই তাঁরা বোমা ছুড়ে মারেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত গাড়িটিতে কিংসফোর্ড ছিলেন না, বরং ছিলেন ব্যারিস্টার প্রিন্গল কেনেডির স্ত্রী ও কন্যা। বোমার আঘাতে কেনেডির কন্যা ঘটনাস্থলেই মারা যান, আর স্ত্রী পরে মৃত্যুবরণ করেন।

ঘটনার পর দুজনে দুটি আলাদা পথে পালানোর সিদ্ধান্ত নেন। প্রফুল্ল ট্রেনে করে কলকাতার দিকে রওনা হন। তিনি ট্রেনের যে কামরায় ছিলেন, সেই একই কামরায় ছিলেন নন্দলাল বন্দ্যোপাধ্যায়কে নামে এক পুলিশ সাব-ইন্সপেক্টর। সমস্তিপুর স্টেশনে নন্দলালের সন্দেহ হয় প্রফুল্লের উপর এবং মোকামা ঘাট স্টেশনে গ্রেফতারের চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রফুল্ল ধরা দেননি। বরং নিজের রিভলবার দিয়ে নিজের মাথায় গুলি করে আত্মাহুতি দেন। মৃত্যুর পর, তাঁর মাথা শরীর থেকে আলাদা করে কলকাতায় পাঠানো হয়, যাতে ক্ষুদিরাম বসু তাঁকে শনাক্ত করতে পারেন। অন্যদিকে, ক্ষুদিরামকেও গ্রেফতার করা হয় এবং ফাঁসি দেওয়া হয়। প্রফুল্ল চাকী হন বিপ্লবী বাংলার প্রথম শহিদ যুবক। প্রফুল্ল চাকীর মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে, এবং বাংলার সন্তান হয়েও ব্রিটিশদের তাবেদারি করার জন্য, অন্য দুই বিপ্লবী যুবক শিরীষ পাল ও রনেন গঙ্গোপাধ্যায় হত্যা করেন নন্দলাল বন্দ্যোপাধ্যায়কে।
প্রফুল্ল চাকীর আত্মত্যাগ ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে নতুন উন্মাদনা সৃষ্টি করে। কিন্তু আজও তিনি, তাঁর যোগ্য স্বীকৃতি পাননি। মোকামা জংশনের নাম প্রফুল্ল চাকীর নামানুসারে করার প্রস্তাব করা হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। কলকাতার কাঁকুড়গাছি এলাকায় একটি উদ্যান তাঁর ও ক্ষুদিরামের নামে হলেও নামকরণে প্রথমে প্রফুল্লের নাম আসেনি। ইতিহাস বইয়ের পৃষ্ঠাতেও অতি স্বল্প স্থান তাঁর জন্য বরাদ্দ। এই যুবক ১৯ বছর বয়সে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছিলেন স্বাধীনতার জন্য।
প্রফুল্ল চাকী ছিলেন সেই বীর যিনি কথায় নয়, কাজে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, "ফলের আশায় নয়, কর্তব্যের তাগিদে কাজ করতে হবে।" তাঁর জীবন আজও যুবসমাজের জন্য প্রেরণাদায়ক— কেউ যদি জাতির জন্য জীবন দিতে পারে, তবে সেটাই প্রকৃত বিপ্লব।






