'বন্দে মাতরম' বলে উঠলেন পুলিশের গাড়িতে, কেমন ছিল ক্ষুদিরামের জীবনের শেষ কয়েক ঘণ্টা?

Khudiram Bose: গাড়িতে উঠে সে চিৎকার করে বলে উঠেছিল, বন্দে মাতরম। নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় নির্ভীকভাবে দেশের বন্দনা করা এই ছেলেটির নাম ক্ষুদিরাম বসু।

Raktim Dey
৩ মিনিট
'বন্দে মাতরম' বলে উঠলেন পুলিশের গাড়িতে, কেমন ছিল ক্ষুদিরামের জীবনের শেষ কয়েক ঘণ্টা?

২ মে, ১৯০৮। ইংরেজি দৈনিক সংবাদপত্র স্টেটসম্যানের একটি খবরের অনুবাদ করলে জানা যায় যে, ছেলেটিকে দেখতে রেল স্টেশনে মানুষের ভিড় উপচে পড়েছিল। ছেলেটার বয়স খুব বেশি হলে আঠারো অথবা উনিশ বছর হবে। ছেলেটি ট্রেনের কামরা থেকে বেরিয়ে স্টেশনের বাইরের রাখা পুলিশের গাড়ির দিকে দীপ্ত চিত্তে এগিয়ে গিয়েছিল। গাড়িতে উঠে সে চিৎকার করে বলে উঠেছিল, বন্দে মাতরম। নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় নির্ভীকভাবে দেশের বন্দনা করা এই ছেলেটির নাম ক্ষুদিরাম বসু।

১৮৮৯ সালে ৩ ডিসেম্বর ক্ষুদিরাম বসু জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন ত্রৈলোক্যনাথ বসু এবং লক্ষ্মীপ্রিয়া দেবীর চতুর্থ সন্তান। ক্ষুদিরামের জন্মের আগেই তাদের দুই পুত্রসন্তান শৈশবে মারা যাওয়ার কারনে প্রথা অনুসারে ক্ষুদিরামের দীর্ঘায়ুর উদ্দেশ্য তাকে তার দিদির কাছে খুদ-এর বিনিময়ে প্রতীকী বিক্রি করা হয়েছিল। এই কারণেই তার নাম হয় ক্ষুদিরাম। হয়তো সেই প্রথা তাকে দীর্ঘায়ু করতে পারেনি, কিন্তু তার কাজের মধ্য দিয়ে তিনি অমর হয়ে গিয়েছেন। ক্ষুদিরামের যখন ছয় বছর বয়স, তখন তাঁর মাকে হারিয়েছিলেন। এক বছরের মধ্যেই তাঁর বাবাকে হারিয়ে অনাথ ক্ষুদিরাম দিদির আশ্রয়লাভ করেছিলেন। ১৯০২ সালে ঋষি অরবিন্দ ঘোষের বক্তৃতা শুনে তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগদানে আগ্রহী হয়েছিলেন। সেই আগ্রহের ফলস্বরূপ তিনি অনুশীলন সমিতিতে যোগদান করেছিলেন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
আত্মহত্যা না খুন? স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরেও রহস্যে মোড়া প্রফুল্ল চাকীর মৃত্যু

প্রফুল্ল চাকী আত্মহত্যা করেছিলেন- প্রচলিত এই কথাটি আজও কি বিনা সংশয়ে মেনে নেবে দেশ? তাঁর দেহে হত্যার লক্ষণই প্রকট। সঙ্গে নির্যাতন।

ক্ষুদিরামের যখন পনেরো বছর বয়স, তখন তিনি প্রথমবার গ্রেফতার হয়েছিলেন। তখন তিনি অনুশীলন সমিতির সদস্য। অনুশীলন সমিতির বিভিন্ন চিন্তাধারা সম্বলিত প্যামফ্রেট বিলি করতে গিয়ে তিনি ব্রিটিশদের হাতে ধরা পড়েছিলেন। পুলিশের হাতে ধরা পড়ে যাওয়ার ফলে ভয়ের পরিবর্তে তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামের কাজে আবারও ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। অনুশীলন সমিতি তখন ম্যাজিস্ট্রেট ডগলাস কিংসফোর্ডকে হত্যা করার পরিকল্পনা করছিল। তাদের পরিকল্পনামতো হেমচন্দ্র কানুনগোর তৈরি বই-বোমা বিপ্লবী পরেশ মল্লিক কিংসফোর্ডের বাড়িতে দিয়ে এসেছিলেন। যদি কিংসফোর্ড সেই বই সেদিন খুলতেন, তাহলে হয়তো ক্ষুদিরামকে নিজের প্রাপ্য সম্মানের জন্য অপেক্ষা করতে হতো। কিংসফোর্ড বদলি হয়ে যাওয়ার কারণে সেই বই খুলে দেখার সুযোগ হয়নি। তার ফলে ক্ষুদিরামের কাছে সুযোগ চলে এসেছিল। অনুশীলন সমিতি মুজাফফরপুরে কিংসফোর্ডকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল। সেইমতো ক্ষুদিরাম বসু এবং প্রফুল্ল চাকী মুজাফফরপুরে পৌঁছে নাম বদলে একটি ধর্মশালায় থাকতে শুরু করেছিলেন। এই পরিকল্পনার কথা পুলিশ জানতে পেরে গিয়েছিল। কলকাতার পুলিশের তরফে ক্ষুদিরাম বসু এবং প্রফুল্ল চাকীর নাম এবং পরিকল্পনা মুজাফরপুরে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু মুজাফরপুর থেকে তার মারফত জানানো হয় যে, সেই নামে কেউ সেখানে নেই। আসলে হরেন সরকার এবং দীনেশচন্দ্র রায় ছদ্মনাম পুলিশ জানত না।

পরিকল্পনা মতো নির্দিষ্ট দিনে সন্ধে নাগাদ ক্ষুদিরাম বসু এবং প্রফুল্ল চাকী ইউরোপীয় ক্লাবের বাইরে কিংসফোর্ডের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। সাড়ে আটটা নাগাদ কিংসফোর্ড তাঁর স্ত্রী, মিসেস কেনেডি এবং মিস কেনেডি ক্লাব থেকে বেরিয়ে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হওয়া মাত্র বিপ্লবীরা বোমা ছুঁড়েছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত, কিংসফোর্ড এবং কেনেডি-রা একই ধরনের গাড়ি ব্যবহার করার কারণে বিপ্লবীরা ভুল করে মিসেস এবং মিস কেনেডির গাড়িতে বোমা মেরেছিলেন। এই ঘটনার পরে ক্ষুদিরাম বসু এবং প্রফুল্ল চাকী সেখান থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন। সারা রাত প্রায় পঁচিশ মাইল হেঁটে স্টেশনের কাছে পৌঁছে একটি দোকানে জল খেতে চাইলে দোকান উপস্থিত পুলিশদের ক্ষুদিরামের ওপর সন্দেহ হয়েছিল। প্রথমে জিজ্ঞাসাবাদ এবং পরে ধস্তাধস্তির সময় ক্ষুদিরামের কাছে থাকা একটি বন্দুক মাটিতে পড়ে যায়।

গ্রেফতার করে ক্ষুদিরাম বসুকে পুনরায় মুজাফফরপুরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে বিচারের পরে তাকে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়। ১১ অগাস্ট সকাল ছ'টা নাগাদ ক্ষুদিরাম বসু ফাঁসির দড়িতে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। ফাঁসির মঞ্চে ওঠার সময় শহিদ ক্ষুদিরাম প্রশ্ন করেছিলেন, "ফাঁসির দড়িতে মোম দেওয়া হয় কেন?" বোঝা যায় কৈশোরের গন্ধ তার মন থেকে তখনও যায়নি। বিভিন্ন নথি থেকে জানা যায় যে, সেইদিন সকাল পাঁচটা থেকে বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ হাতে ফুলের মালা নিয়ে এসে সেই এলাকায় জমায়েত করেছিল। ক্ষুদিরাম বসুর শেষ যাত্রায় ভিড় নিয়ন্ত্রণ করতে পুলিশকে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল।

নিত্যদিনের ব্যস্ততার এবং ইতিহাস বিস্মৃতির কারণে ক্ষুদিরামের জন্ম বা ফাঁসির কথা ধামাচাপা পড়ে থাকে, নৈমিত্তিক রাজনীতির পাঁকে গুরুত্ব হারায় কিশোরের জেদ। ক্ষুদিরাম বসুর নাম উঠলেই তবু মনে পড়ে, "একবার বিদায় দে মা, ঘুরে আসি..।" ক্ষুদিরাম বসু বলেছিলেন, ফিরে আসবেন। তিনি এই দেশকে মনে রাখতে চেয়েছিলেন। আমরা কি তাঁকে মনে রাখি?

লিখেছেন
Raktim Dey
Raktim Dey
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।