একটি গাছেই ৩৫০ জাতের আম ফলান ভারতের ম্যাঙ্গো ম্যান পদ্মশ্রী কালিমুল্লাহ খান
উত্তরপ্রদেশের মালিহাবাদের কালিমুল্লাহ খান। দুনিয়া আজ তাঁকে একডাকে চেনে ‘ম্যাঙ্গো ম্যান অফ ইন্ডিয়া’ নামে। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি বা বিজ্ঞানাগারের প্রশিক্ষণ ছাড়াই তিনি আজ ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদ্যানপালক। তাঁর এই উদ্যানে সবচেয়ে বেশি বিখ্যাত হলো তাঁর ১২৫ বছরের এক বুড়ো আমগাছ। একটা-দুটো নয়, এই একটিমাত্র গাছের শরীরেই তিনি ৩৫০টিরও বেশি জাতের আম ফলিয়ে দেখিয়েছেন!
ইশকুলের সাত ক্লাসের গণ্ডিটাই পার হতে পারেননি ছেলেটা। কিন্তু ফেল করে যখন বাড়ি ফিরলেন, তখন নিশ্চয়ই চেনা মুখগুলি বাঁকা হাসি হেসে বোঝাতে চেয়েছিলেন— ‘একে দিয়ে কিচ্ছু হবে না!’ কিন্তু তখন কে জানত, পরীক্ষার খাতার পাতায় ফেল করা সেই ছেলেই একদিন প্রাতিষ্ঠানিক বৈজ্ঞানিক শিক্ষা ছাড়াই, ভারতের অন্যতম সুপরিচিত উদ্যানপালক হয়ে উঠবেন।
তিনি উত্তরপ্রদেশের মালিহাবাদের কালিমুল্লাহ খান। দুনিয়া আজ তাঁকে একডাকে চেনে ‘ম্যাঙ্গো ম্যান অফ ইন্ডিয়া’ নামে। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি বা বিজ্ঞানাগারের প্রশিক্ষণ ছাড়াই তিনি আজ ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদ্যানপালক। তাঁর এই উদ্যানে সবচেয়ে বেশি বিখ্যাত হলো তাঁর ১২৫ বছরের এক বুড়ো আমগাছ। একটা-দুটো নয়, এই একটিমাত্র গাছেই তিনি ৩৫০টিরও বেশি জাতের আম ফলিয়ে দেখিয়েছেন!
সপ্তম শ্রেণিতে ফেল করার পর কালিমুল্লাহ যখন বই-খাতা গুটিয়ে নিলেন, তখন তাঁর আশ্রয় হয়েছিল বাবা-দাদার তৈরি আমবাগান। ১৯৫০-এর দশকের শেষের দিক। কিশোর কালিমুল্লাহর মাথায় তখন অদ্ভুত সব ভাবনা। তাঁর মনে হয়েছিল, একটা গাছে একটা জাতের আম হবে— এ তো বড্ড চেনা, বড্ড একঘেয়ে নিয়ম! যদি একটা গাছের শরীরেই রকমারি আম ফলানো যায়?
যেমন ভাবা, তেমনি কাজ। কলম বা গ্রাফ্টিংয়ের কৌশল নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করলেন তিনি। প্রথম দিকের বেশ কয়েকটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা ব্যর্থ হয়েছিল। এর কিছুদিন পরেই নেমে আসে প্রাকৃতিক বিপর্যয়—তাঁর রোপণ করা প্রথম গাছটি বন্যায় নষ্ট হয়ে যায়।
ভেঙে পড়ার মতো পরিস্থিতি, কিন্তু কালিমুল্লাহ দমে যাওয়ার পাত্র ছিলেন না। তিনি নতুন করে সবকিছু শুরু করেন। কোনো ল্যাবরেটরি বা ডিগ্রি না থাকলেও তিনি মালিহাবাদের মাটির চরিত্র বুঝতে শুরু করলেন। জল নিকাশি ব্যবস্থা কেমন হওয়া উচিত, কিংবা আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনায় আম গাছ কীভাবে সাড়া দেয়— এগুলি তিনি নিজের চোখে দেখে শিখলেন। এরই পাশাপাশি তিনি তাঁর গ্রাফ্টিংয়ের পরীক্ষাও চালিয়ে যান। অবশেষে ১৯৮০-এর দশকে এসে তিনি বেছে নিলেন তাঁর দাদার আমলের লাগানো একটা পুরোনো আলফনসো গাছকে। আর সেটাকেই বানালেন তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মূল ভিত্তি। সেই একই গাছে বারবার কলম করতে করতে তিনি বুঝতে পারেন যে, এই একটিমাত্র গাছই আরও বহু জাতের আম উৎপাদনে পুরোপুরি সক্ষম।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
House without AC cooling: চেম্বুর এলাকার একটা বাড়ি যেন এক টুকরো ম্যাজিক! বাইরের তাপমাত্রা যখন ফুটছে, এই বাড়িটি তখন কোনো এসি বা ভারী যন্ত্রপাতি ছাড়াই চারপাশের চেয়ে প্রায় ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ঠান্ডা থাকছে।
গ্রাফ্টিং কী?
একটা গাছে প্রায় ৩৫০ জাতের আম হচ্ছে, এর পিছনের রহস্যটা কী? বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে ‘গ্রাফ্টিং’ বা কলম তৈরি করা। এটি এমন এক প্রাচীন কৃষি প্রযুক্তি যেখানে একটা গাছের ডাল কেটে অন্য একটা গাছের ডালের সঙ্গে নিখুঁতভাবে জুড়ে দেওয়া হয়।
আমগাছের ডালের ছালের ঠিক নিচে ‘ক্যাম্বিয়াম লেয়ার’ (Cambium Layer) নামের একটা পাতলা কোষের স্তর থাকে। এটি অত্যন্ত সক্রিয় বিভাজনক্ষম কোষ দিয়ে তৈরি। দুটো ভিন্ন ডালের এই স্তরটিকে যখন কাটার পর একসঙ্গে মিলিয়ে শক্ত করে বেঁধে দেওয়া হয়, তখন গাছ দুটো নিজেদের ক্ষত সারিয়ে তুলতে এক হয়ে যায়। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে ‘ক্যালাস’ (Callus) তৈরি হওয়া।
এই প্রক্রিয়ায় মূল গাছের শিকড় আর কাণ্ডটা নিচে একই থাকে, কিন্তু উপরের জুড়ে দেওয়া নতুন ডালটি নিজের জাতের বৈশিষ্ট্য বজায় রেখেই বড় হতে থাকে। ফলে একই শিকড় থেকে রসদ নিয়েও আলফনসো তার নিজস্ব রাজকীয় মিষ্টি স্বাদ বজায় রাখে, আবার ল্যাংড়া ধরে রাখে তার চেনা টক-মিষ্টি গন্ধ। এই কাজটি একটা বা দুটো ডালের সঙ্গে করা সহজ, কিন্তু ৩৫০টিরও বেশি জাতকে একটা বুড়ো গাছের শরীরে, ডাল থেকে উপডালে ধাপে ধাপে জুড়ে বছরের পর বছর বাঁচিয়ে রাখা? তার জন্য দরকার পড়ে অসীম ধৈর্য, নিখুঁত কোণ মেপে কাটার হাত আর জাদুকরি ছোঁয়া।
সচিন থেকে ঐশ্বর্য— গাছের ডালে যেন চাঁদের হাট!
কালিমুল্লাহ খানের এই ১২৫ বছরের পুরনো গাছটির দিকে তাকালে চোখ চড়কগাছ হতে বাধ্য। একই গাছের কোনো ডালে ঝুলছে টকটকে লাল আম, কোথাও আবার হালকা সবুজ বা হলুদের ছোঁয়া। কোনোটার সাইজ ছোট্ট, তো কোনোটা আবার ওজনে বেশ ভারী।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মাত্র একটা কটন টি-শার্ট তৈরি করতে জল লাগে প্রায় ২,৭০০ লিটার! খুব সহজ হিসাবে—আপনি সারাদিনে যে পরিমাণ জল পান করেন, সেই হিসাবে আপনার পুরো আড়াই থেকে তিন বছরের (প্রায় ৯০০ দিনের) খাওয়ার জল স্রেফ একটা টি-শার্টের পিছনে শেষ হয়ে যায়।
মজার বিষয় হলো, খান সাহেব তাঁর তৈরি করা অনেক হাইব্রিড বা সংকর জাতের আমের নামকরণ করেছেন দেশের বিখ্যাত সব তারকা আর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের নামে। যেমন:
ঐশ্বর্য রাই: এটিকে তিনি তাঁর অন্যতম সেরা সৃষ্টি বলেন। এই আমগুলি দেখতে যেমন চমৎকার ও নিখুঁত, ওজনেও এক একটি প্রায় এক কেজি!
সচিন তেন্ডুলকর: মাস্টার ব্লাস্টারের মতোই এই আমটি আকারে কিছুটা ছোট কিন্তু স্বাদে দারুণ মিষ্টি ও রসালো।
অমিতাভ বচ্চন: বিগ বি-র মতোই এই আম জাতটি আকারে বেশ লম্বা, অনেকটা তোতাপুরি আমের মতো।
আনারকলি: এটি আরেকটি আশ্চর্য সৃষ্টি। এই আমের খোসা দুই রকমের এবং এর ভিতরের শাঁস বা পাল্পের স্বাদও দুই রকমের হয়!
এছাড়াও তাঁর গাছে জায়গা করে নিয়েছে নরেন্দ্র মোদী, যোগী আদিত্যনাথ, অখিলেশ যাদব, অমিত শাহ কিংবা সোনিয়া গান্ধীর নামের আমও। এমনকী তাঁর নিজের ১৬ বছরের সাধনার ফল— দুসেহরি ও সিন্দুরির ক্রস জাতটির নাম দিয়েছেন ‘দুসেহরি কলিম’। আর গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালেও তিনি রাজনাথ সিং-এর সম্মানে একটি নতুন জাতের আমের নাম রেখেছেন ‘রাজনাথ আম’।
বছরের পর বছর ধরে খানের এই ফলের বাগানটি কেবল একটি সাধারণ খামার বা চাষের জমি হয়ে থাকেনি। এটিকে প্রায়শই সারা ভারতের আমের বৈচিত্র্যকে টিকিয়ে রাখার একটি অনন্য স্থান হিসেবে বর্ণনা করা হয়। জানা যায়, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নানাবৈচিত্র্যের আম সংগ্রহ করে এখানে আনা হয়েছে। এর ফলে, যে আমগুলি সাধারণত নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকত, সেগুলিকে এই একটি বাগানেই একসঙ্গে নিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে। এই সংগ্রহে এমন সব আম রয়েছে যা তাদের মিষ্টি স্বাদ, কড়া সুবাস, শাঁসের উজ্জ্বল রঙ কিংবা দীর্ঘ সময় ভালো থাকার গুণের জন্য পরিচিত।
আব্দুল্লাহ নার্সারি
কালিমুল্লাহর এই ২২ একরের বাগানটি (যার নাম আব্দুল্লাহ নার্সারি) আজ আর পাঁচটা সাধারণ বাগানের মতো নয়। এটি আসলে ভারতের আমের বৈচিত্র্যকে টিকিয়ে রাখার এক জীবন্ত জাদুঘর। কলকাতা, মুম্বই, দিল্লি বা বেঙ্গালুরু— দেশের যেখানেই কোনো অভিনব আমের খোঁজ মিলেছে, কালিমুল্লাহ সেখান থেকে ডাল সংগ্রহ করে এনে সযতনে জুড়ে দিয়েছেন তাঁর এই বাগানে।
ভারতে প্রায় হাজার খানেক জাতের আম আছে, যার একটা বড় অংশকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচিয়ে রেখেছে এই বাগান। এর ফলে, যে আমগুলি সাধারণত নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকত, সেগুলিকে এই একটি বাগানেই একসাথে দেখতে পাওয়া যায়। তাই খান সাহেব গর্ব করে একে বলেন, “বিশ্বের সবচেয়ে বড় আমের কলেজ।”
আর এই কাজের স্বীকৃতিও মিলেছে হাতেনাতে। ২০০৮ সালে ভারত সরকার তাঁকে দেশের অন্যতম সম্মানজনক ‘পদ্মশ্রী’ উপাধিতে ভূষিত করে। এছাড়াও ‘লিমকা বুক অফ রেকর্ডস’-এ জ্বলজ্বল করছে তাঁর নাম। মিলেছে চারশোরও বেশি পুরস্কার। এমনকী ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনের মুঘল গার্ডেনেও পরম যত্নে স্থান পেয়েছে তাঁর বাগানের আমগাছ। দূর-দূরান্তের দেশ, যেমন ইরান ও দুবাই থেকেও গবেষক আর কৃষকেরা মালিহাবাদে আসেন তাঁর এই গ্রাফ্টিংয়ের কৌশল শিখতে।
বয়স এখন ৮৫ ছুঁইছুঁই। শরীর আগের মতো সায় দেয় না। তাই বাগানের রোদ-জল-কাদার দৈনন্দিন খাটুনি আর কলম করা গাছগুলির দেখভালের দায়িত্ব এখন নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন তাঁর ছেলে নাজিমুল্লাহ খান। বাবার মতোই তিনিও দ্বাদশ শ্রেণির পর পড়াশোনা ছেড়ে আমগাছদের সেবায় নিজেকে সঁপে দিয়েছেন।
কালিমুল্লাহ খান মনে করেন, আম গাছ কাটা চরম অপরাধ। গাছকে তিনি সন্তানের মতো ভালোবাসেন। তিনি প্রায়ই বলেন, “আম হলো ঠিক মানুষের মতো, প্রত্যেকের নিজস্ব একটা চরিত্র, মেজাজ আর বৈশিষ্ট্য আছে। আমি কোনো স্ব-শিক্ষিত বিজ্ঞানী নই, এই গাছগুলিই আমাকে সব শিখিয়েছে।” তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস, মানুষের সঠিক চেষ্টা আর ভালোবাসা থাকলে মরুভূমির বুকেও নাকি মিষ্টি আম ফলানো সম্ভব!
প্রকৃতির এই রূপকার মানুষের শেষ ইচ্ছেটাও বড় অদ্ভুত আর সুন্দর। তিনি চান, মৃত্যুর পর যেন বাইরের কোনো গোরস্থানে নয়, বরং তাঁর সাধের সেই ১২৫ বছরের পুরনো বুড়ো গাছটার ছায়ায়, তার পাশেই যেন তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।






