E20 পেট্রোল নিয়ে ভয় নয়, পুরনো গাড়িতেও নিরাপদ বলছে মারুতি-টোয়োটা
E20 petrol: E20 পেট্রোল কি সত্যিই পুরনো গাড়ির ইঞ্জিনের ক্ষতি করে, নাকি সবই ভুল ধারণা? মারুতি সুজুকি, টয়োটা এবং জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, E20 জ্বালানি নিরাপদ, বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষিত এবং ভারতের তেল আমদানির নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি দূষণও কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
দেশজুড়ে ধাপে ধাপে E20 পেট্রোলের ব্যবহার বাড়ছে। তবে এই নতুন ধরনের জ্বালানি নিয়ে সাধারণ গাড়িচালকদের মধ্যে নানা প্রশ্নও তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালের আগে তৈরি গাড়িতে E20 পেট্রোল ব্যবহার করলে ইঞ্জিনের ক্ষতি হবে কি না, গাড়ির আয়ু কমে যাবে কি না বা মাইলেজ কমে যাবে কি না—এই সব বিষয় নিয়ে বহু জল্পনা চলছে। সেই সমস্ত সংশয় দূর করতেই শনিবার একটি সাংবাদিক বৈঠকে একসঙ্গে হাজির হয়েছিলেন দেশের শীর্ষ গাড়ি নির্মাতা সংস্থার প্রতিনিধিরা এবং জ্বালানি ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের দাবি, E20 পেট্রোল নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। দীর্ঘ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরই এই জ্বালানি বাজারে আনা হয়েছে এবং এটি পুরনো ও নতুন—উভয় ধরনের গাড়ির জন্যই নিরাপদ।
মারুতি সুজুকি ইন্ডিয়ার কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স বিভাগের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অফিসার রাহুল ভারতী জানান, ২০২৩ সালের আগে বাজারে আসা, অর্থাৎ E10 পেট্রোলের জন্য তৈরি গাড়িগুলির উপরও E20 পেট্রোল ব্যবহার করে বিস্তৃত পরীক্ষা চালানো হয়েছে। সেই পরীক্ষায় ইঞ্জিনের কার্যক্ষমতা, যন্ত্রাংশের স্থায়িত্ব, ক্ষয়, মরচে পড়া কিংবা অন্য কোনো প্রযুক্তিগত সমস্যার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাঁর কথায়, E20 ব্যবহারের ফলে পুরনো গাড়ির ইঞ্জিন বা জ্বালানি ব্যবস্থার কোনো ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা নেই।
রাহুল ভারতী বলেন, গত কয়েক দিনে ইথানল মিশ্রিত জ্বালানি নিয়ে অনেক বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়েছে। ফলে অনেক গাড়ির মালিক চিন্তায় পড়েছেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, ২০২৩ সাল থেকে ভারতে E20-সমর্থিত গাড়ি এবং E20 পেট্রোল— দুটিই বাধ্যতামূলকভাবে চালু হয়েছে। কিন্তু অনেকের প্রশ্ন, তার আগে তৈরি গাড়িতে যদি E20 ব্যবহার করা হয়, তাহলে কী হবে? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়েই তিনি জানান, সংস্থার পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে এবং E20 ব্যবহারের ফলে পুরনো গাড়ির ইঞ্জিন বা যেসব অংশ সরাসরি জ্বালানির সংস্পর্শে আসে, সেগুলির কোনো ক্ষতি হয় না।
E20 পেট্রোল বলতে বোঝায় এমন একটি জ্বালানি, যেখানে ২০ শতাংশ ইথানল এবং ৮০ শতাংশ সাধারণ পেট্রোল থাকে। ইথানল মূলত আখ, ভুট্টা, শস্য-সহ বিভিন্ন কৃষিজ পণ্য থেকে তৈরি একটি জৈব জ্বালানি। এটি পুনর্নবীকরণযোগ্য হওয়ায় পরিবেশবান্ধব বলেই ধরা হয়। পেট্রোলের সঙ্গে ইথানল মিশিয়ে ব্যবহার করলে জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরতা কমে এবং যানবাহন থেকে নির্গত ক্ষতিকর দূষণও অনেকাংশে হ্রাস পায়। এই কারণেই বিশ্বের বহু দেশ ধীরে ধীরে ইথানল মিশ্রিত জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর দিকে এগোচ্ছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Organic products: ‘অর্গানিক’, ‘ন্যাচারাল’, ‘ইকো-কনশাস’, ‘সাসটেইনেবলি সোর্সড ইনগ্রেডিয়েন্টস’, ‘প্লাস্টিক-নিউট্রাল প্যাকেজিং’—এই লেবেলগুলি কি সত্যিই আমাদের স্বাস্থ্যের কিংবা প্রকৃতির কোনো উপকার করছে, নাকি পুরোটাই আমাদের পকেট কাটার একটা কর্পোরেট মার্কেটিং কৌশল?
সরকারের ন্যাশনাল মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত ওই সাংবাদিক বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্ডিয়া লিমিটেডের প্রাক্তন চেয়ারপার্সন ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর বর্তিকা শুক্লাও। তিনি বলেন, E20 পেট্রোল একদিনে চালু করা হয়নি। এটি ধাপে ধাপে প্রয়োগ করা হয়েছে। তার আগে দুই চাকার এবং চার চাকার অসংখ্য গাড়ির উপর দীর্ঘ সময় ধরে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা চালানো হয়েছে। সেই পরীক্ষার ফলাফল সন্তোষজনক হওয়ার পরই দেশজুড়ে E20 চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বর্তিকা শুক্লার মতে, E20 কেবল একটি নতুন জ্বালানি নয়, বরং এটি ভারতের কার্বন নিঃসরণ কমানোর বড় উদ্যোগের অংশ। জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায় পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। সেই দিক থেকে E20 একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
তিনি অবশ্য স্বীকার করেন, কিছু ক্ষেত্রে ইঞ্জিনের পারফরম্যান্সে সামান্য পরিবর্তন অনুভূত হতে পারে। তবে সেটি সব গাড়ির ক্ষেত্রে একরকম নয়। গাড়ি চালানোর ধরন, রাস্তার অবস্থা, যানজট কিংবা গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণের উপরও এর প্রভাব নির্ভর করে। তাই কোনো নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতাকে সব গাড়ির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলে ধরা ঠিক হবে না।
বর্তিকা শুক্লা আরও জানান, ২০১৮ সালে কেন্দ্র সরকার যে ইথানল ব্লেন্ডেড পেট্রোল (EBP) কর্মসূচি চালু করেছিল, সেটি দীর্ঘ আলোচনা এবং বিভিন্ন অংশীদারের মতামতের ভিত্তিতেই তৈরি হয়েছিল। জ্বালানি সংস্থা, গাড়ি নির্মাতা, গবেষক এবং প্রযুক্তিবিদদের সঙ্গে একাধিক দফা আলোচনার পর এই নীতি তৈরি করা হয়। পাশাপাশি তেল বিপণন সংস্থাগুলিও নির্ধারিত গুণমান ও নিরাপত্তার সমস্ত মান মেনে E20 বাজারে সরবরাহ করছে। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, এই মান নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোনো বৈজ্ঞানিক ঘাটতি নেই।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বায়োকেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক বিকাশ কুমার দুবের নেতৃত্বে একটি গবেষক দল এই কৃতিত্ব দেখিয়েছে। গবেষক শিবকুমার এবং রাজ বাহাদুর সিং-এর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে তাঁরা এমন একটি রাসায়নিক যৌগ চিহ্নিত করেছেন, যা ল্যাবরেটরির নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে স্তন ক্যানসারের কোষগুলিকে সুনির্দিষ্টভাবে নিশানা করতে পারে।
টোয়োটা কির্লোস্কার মোটরের কান্ট্রি হেড এবং এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট বিক্রম গুলাটি বলেন, ইথানল এমন একটি জ্বালানি যা শুধু পরিবেশবান্ধব নয়, বরং উচ্চ কর্মক্ষমতাসম্পন্নও। ভারতের মতো দেশে, যেখানে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়, সেখানে ইথানলের ব্যবহার বাড়লে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা অনেকটাই শক্তিশালী হবে।
তিনি সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে বলেন, কয়েক মাস আগে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তা ভারতকে আবার মনে করিয়ে দিয়েছে যে আমদানি-নির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ঝুঁকি কতটা বড়। তাই বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
গুলাটি আরও জানান, ইথানল মূলত কৃষিজ পণ্য থেকে তৈরি হয়। ফলে এটি ব্যবহার বাড়লে দেশের কৃষকরাও লাভবান হবেন। আখ, ভুট্টা এবং অন্যান্য কৃষিপণ্যের চাহিদা বাড়বে। এর ফলে কৃষকদের আয় বৃদ্ধির নতুন সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতিও আরও শক্তিশালী হবে। অর্থাৎ E20 শুধু পরিবেশ রক্ষা করবে না, কৃষি ও অর্থনীতিকেও সহায়তা করবে।
সাংবাদিক বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ভারত পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (BPCL) প্রাক্তন ডিরেক্টর (রিফাইনারিজ) আর. রামচন্দ্রন এবং ইন্দ্রপ্রস্থ গ্যাস লিমিটেডের (IGL) প্রাক্তন চেয়ারম্যান রাজ কুমার দুবেও। তাঁরা E20 নিয়ে প্রচলিত নানা ভুল ধারণার জবাব দেন।
রামচন্দ্রন বলেন, অনেক চালক অভিযোগ করছেন যে E20 ব্যবহারের ফলে গাড়ির মাইলেজ প্রায় ১০ শতাংশ কমে যাচ্ছে। কিন্তু বিভিন্ন সরকারি ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষায় এমন কোনো বড় ধরনের প্রভাবের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাঁর মতে, অনেক সময় পুরনো গাড়ি, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, ইঞ্জিনের স্বাভাবিক ক্ষয় কিংবা শহরের ঘন যানজটে গাড়ি চালানোর কারণে জ্বালানির ব্যবহার বেড়ে যায়। সেই অভিজ্ঞতাকেই অনেকেই ভুলভাবে E20-এর প্রভাব বলে মনে করছেন।
রাজ কুমার দুবে বলেন, আসলে দেশের বহু মানুষ গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে অজান্তেই ইথানল মিশ্রিত পেট্রোল ব্যবহার করছেন। কিন্তু সম্প্রতি বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ার পর অনেকেই হঠাৎ করে মাইলেজ কমে যাওয়ার অভিযোগ তুলছেন। তাঁর মতে, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার ফলাফলকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত, ব্যক্তিগত ধারণা বা বিচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করা ঠিক নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের ভবিষ্যতের জ্বালানি নীতিতে E20 একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এটি একদিকে যেমন বিদেশি তেলের উপর নির্ভরতা কমাবে, তেমনি পরিবেশ দূষণ কমাতে সাহায্য করবে। পাশাপাশি কৃষকদের জন্য নতুন বাজার তৈরি করবে এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকেও আরও শক্তিশালী করবে। তাই E20 নিয়ে অযথা ভয় বা বিভ্রান্তির পরিবর্তে বৈজ্ঞানিক তথ্যের উপর আস্থা রাখাই উচিত বলে মত তাঁদের।





