অর্গানিক, ন্যাচারাল, ইকো-ফ্রেন্ডলি: প্যাকেটের এই শব্দগুলি কি সত্যিই বিশ্বাসযোগ্য?
Organic products: ‘অর্গানিক’, ‘ন্যাচারাল’, ‘ইকো-কনশাস’, ‘সাসটেইনেবলি সোর্সড ইনগ্রেডিয়েন্টস’, ‘প্লাস্টিক-নিউট্রাল প্যাকেজিং’—এই লেবেলগুলি কি সত্যিই আমাদের স্বাস্থ্যের কিংবা প্রকৃতির কোনো উপকার করছে, নাকি পুরোটাই আমাদের পকেট কাটার একটা কর্পোরেট মার্কেটিং কৌশল?
দেবাঞ্জলী সুপারমার্কেটে গোটা মাসের যাবতীয় কেনাকাটা করতে গিয়ে লক্ষ্য করল হলুদের প্যাকেটের গায়ে, বড় বড় অক্ষরে লেখা রয়েছে ‘অর্গানিক’। তারপর শ্যাম্পুর বোতলটি হাতে তুলে নিয়ে দেখল, সেটি নাকি একদম ‘ন্যাচারাল’। কাপড়ের সেকশনে যেতেই নজরে পড়ল একটি বিছানার চাদরের ব্র্যান্ড, যারা নিজেদের বুক ফুলিয়ে বলছে ‘ইকো-কনশাস’। আবার পছন্দের স্ন্যাক্সের প্যাকেটে লেখা দেখল ‘সাসটেইনেবলি সোর্সড ইনগ্রেডিয়েন্টস’ এবং তার ঠিক পাশের অন্য একটি বোতল প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে ‘প্লাস্টিক-নিউট্রাল প্যাকেজিং’-এর। সে জিনিসগুলি নিশ্চিন্ত হয়ে কিনে নিল।
যখন ফোনে কোনো অনলাইন শপিং অ্যাপ খোলা হয়, রূপচর্চার জিনিস খোঁজা হয়, জামাকাপড়ের লেবেল ওল্টানো হয় তখন এই শব্দগুলি যেন ইদানীং ছায়ার মতো পিছু পিছু ঘোরে। শব্দগুলি শুনতে বেশ চেনা, ইতিবাচক আর ভীষণ ভরসাযোগ্যও মনে হয়। আর ঠিক এই কারণেই, কোনো কিছু লুফে নেওয়ার আগে এগুলি আমাদের মতো সাধারণ ক্রেতাদের অন্তত এক সেকেন্ডের জন্য হলেও একটু থামিয়ে দেয়, মনে একটা পজিটিভ ভাব তৈরি করে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই লেবেলগুলি কি সত্যিই আমাদের স্বাস্থ্যের কিংবা প্রকৃতির কোনো উপকার করছে, নাকি পুরোটাই আমাদের পকেট কাটার একটা কর্পোরেট মার্কেটিং কৌশল?
কার কী আসল মানে?
অনেক ক্রেতার কাছেই এই লেবেলগুলি হলো কোনো জিনিস ভালো নাকি মন্দ—তা বেছে নেওয়ার প্রথম ধাপ। এই শব্দগুলি মূলত পণ্যের স্বাস্থ্যগুণ, চারপাশের পরিবেশের উপর তার প্রভাব, কাঁচামাল কোথা থেকে আসছে, প্যাকেজিং কেমন, প্রাণীদের উপর পরীক্ষা করা হয়েছে কি না কিংবা পণ্যটি ঠিক কীভাবে তৈরি—এই বিষয়গুলির দিকে ইশারা করে। তবে মুশকিল হলো, একেকটি শব্দ একেক রকম অর্থ প্রকাশ করে এবং সব শব্দের স্পষ্ট ব্যাখ্যা কিন্তু সমানভাবে থাকে না।
১. অর্গানিক
পরিবেশ-বান্ধব শব্দগুলির মধ্যে ‘অর্গানিক’ হলো এমন একটি শব্দ, যা সরাসরি সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক শংসাপত্র ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত—বিশেষ করে খাবার এবং কৃষির ক্ষেত্রে। সহজ কথায়, অর্গানিক চাষাবাদ মানে হলো এমন এক পদ্ধতি যেখানে কোনো রকম কৃত্রিম বা রাসায়নিক কীটনাশক, কেমিক্যাল সার, জিনগতভাবে পরিবর্তিত উপাদান (GMO) এবং কৃত্রিম হরমোন বা গ্রোথ রেগুলেটর ছাড়াই ফসল ফলানো হয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Anurag Bhandari: আমাদের চারপাশে আজ পরিবেশ সচেতনতা বা ‘সাসটেইনেবিলিটি’ নিয়ে কত বড় বড় কথা হয়। কিন্তু অনুরাগ সেটাকে স্রেফ মুখের কথায় আটকে না রেখে বাস্তবে করে দেখিয়েছেন। ভারতের ফার্নিচার ইন্ডাস্ট্রি থেকে প্রতি বছর লাখ লাখ টন বর্জ্য তৈরি হয়, যার বেশিরভাগটাই জমা হয় আবর্জনার স্তূপে। অনুরাগ এই অপচয় কমানোর লড়াইয়ে নেমেছেন।
ভারতে অর্গানিক খাদ্যদ্রব্যগুলি সাধারণত NPOP বা PGS-India-র মতো সরকারি ব্যবস্থার অধীনে সার্টিফায়েড হয়। এছাড়া, বাজারে থাকা সবুজ রঙের ‘জৈবিক ভারত’ লোগোটি দেখেও ক্রেতারা সহজে চিনে নিতে পারেন যে খাবারটি নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে তৈরি কি না।
তবে ‘অর্গানিক’ লেবেলটি মূলত আপনাকে জানায় যে ফসল বা উপাদানটি কীভাবে চাষ করা হয়েছে। কিন্তু পণ্যটি ঠিক কীভাবে আপনার হাতের মুঠোয় এসে পৌঁছল, তার পুরো গল্পটা এখানে জানা যায় না। যেমন ধরুন, একটি অর্গানিক আপেল হয়তো কোনো দোকানে পৌঁছনোর আগে হাজার মাইল পথ জাহাজে বা ট্রাকে পাড়ি দিয়ে এসেছে, যার ফলে প্রচুর জ্বালানি পুড়ে পরিবেশ দূষণ হয়েছে। আবার একটি পণ্য পুরোপুরি অর্গানিক হলেও সেটির প্যাকেজিং হয়তো সাধারণ প্লাস্টিকেরই হতে পারে!
২. ন্যাচারাল এবং কেমিক্যাল-ফ্রি
রূপচর্চা ও প্রসাধন পণ্যের গায়ে সবচেয়ে বেশি যে দুটি শব্দ দেখা যায়, তা হলো ‘ন্যাচারাল’ (প্রাকৃতিক) এবং ‘কেমিকাল-ফ্রি’ (রাসায়নিক-মুক্ত)। ‘ন্যাচারাল’ শব্দটির মানে সাধারণত বোঝায় যে, পণ্যের কিছু উপাদান গাছপালা বা খনিজ থেকে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই ধরনের উপাদান ঠিক কত শতাংশ আছে এবং সেগুলি প্রক্রিয়াজাত করার জন্য কোন কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়েছে, তা কিন্তু কোম্পানিগুলি খোলসা করে না।
আর ‘কেমিকাল-ফ্রি’ শব্দটির ব্যাপারে তো আরও বেশি সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। বিজ্ঞানের দিকে তাকালে দেখা যাবে, প্রকৃতির সব জিনিসই আসলে রাসায়নিক যৌগ দিয়ে তৈরি। এমনকী আমরা যে জল খাই, তার বৈজ্ঞানিক নামও তো হাইড্রোজেন ডাই অক্সাইড, অর্থাৎ সেটিও একটা কেমিক্যাল! তাই বাজারে যখন ‘কেমিকাল-ফ্রি’ কথাটি লেখা হয়, তখন বুঝতে হবে যে পণ্যটিতে বিশেষ কিছু নির্দিষ্ট ক্ষতিকর উপাদান (যেমন সালফেট, প্যারাবেন কিংবা কৃত্রিম সুগন্ধি) ব্যবহার করা হয়নি। কিন্তু সামনের দিকের চটকদার লেবেলে সবসময় এই বিষয়টি পরিষ্কার করে লেখা থাকে না।
৩. ইকো-ফ্রেন্ডলি
‘ইকো-ফ্রেন্ডলি’ শব্দটির মানে হলো, পণ্যটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যা পরিবেশের উপর ক্ষতির প্রভাব কিছুটা হলেও কমায়। এই সুবিধাটা নানা রকমের হতে পারে—যেমন বর্জ্য বা আবর্জনা কমানো, পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদান ব্যবহার করা, রিফিল করার মতো বোতল দেওয়া কিংবা একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের বিকল্প তৈরি করা। একটি বাঁশের তৈরি টুথব্রাশ বা বারবার ব্যবহারযোগ্য কাপড়ের শপিং ব্যাগ—এই সব কিছুকেই ইকো-ফ্রেন্ডলি বলা যেতে পারে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
চিকিৎসাবিজ্ঞানের আধুনিক গবেষণা বলছে, অনিয়মিত জীবনযাপন এবং ভুল খাদ্যাভ্যাসের কারণে আমাদের অজান্তেই শরীরের ভিতরে বাসা বাঁধে এক নীরব ঘাতক, যার নাম ‘ক্রনিক ইনফ্ল্যামেশন’ বা দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ। আর এই ঘাতককে গোড়া থেকে উপড়ে ফেলার সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামাটরি ব্রেকফাস্ট
তবে আসল রহস্যটা লুকিয়ে থাকে এর ‘কীভাবে’-র মধ্যে। পণ্যটি কি প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাচ্ছে? এটি কি মাটিতে মিশে যায়? নাকি এর প্যাকেজিংটি সহজে রিসাইকেল করা যায়? যে ব্র্যান্ডগুলি সৎ, তারা শুধু ‘ইকো-ফ্রেন্ডলি’ শব্দটা বসিয়েই থেমে থাকে না; বরং তাদের পণ্যটি ঠিক কীভাবে প্রকৃতির উপকার করছে, সেই নির্দিষ্ট সুবিধাটির কথা পরিষ্কার করে বুঝিয়ে লেখে।
৪. গ্রিন
আজকাল আবাসন শিল্প, পর্যটন, ফ্যাশন থেকে শুরু করে নিত্যব্যবহার্য জিনিসপত্র—সব জায়গাতেই ‘গ্রিন’ শব্দটি দেদারে ব্যবহৃত হচ্ছে। একটি ফ্ল্যাট বা বাড়ি নিজেদের ‘গ্রিন’ বলতে পারে কারণ সেখানে সৌরবিদ্যুৎ বা বৃষ্টির জল ধরে রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। আবার একটি কাপড়ের ব্র্যান্ড এই শব্দটি ব্যবহার করতে পারে কারণ তারা রিসাইকেল করা সুতো বেছে নিয়েছে। যেহেতু ‘গ্রিন’ শব্দটি দিয়ে অনেক রকমের ভালো উদ্যোগকে বোঝানো যেতে পারে, তাই এর পিছনে আসল কারণ বা বিস্তারিত তথ্য দেওয়া না থাকলে শব্দটির কোনো দামই থাকে না।
৫. সাসটেইনেবল
পরিবেশ-সচেতনতার দুনিয়ায় ‘সাসটেইনেবল’ বা টেকসই হলো সবচেয়ে বড় এবং গভীর অর্থবহ একটি শব্দ। এই শব্দটির মাধ্যমে পরিবেশগত, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক—এই তিনটি দিককেই একসঙ্গে বিবেচনা করা হয়। পণ্যের কেবল একটিমাত্র গুণের উপর নজর না দিয়ে, এটি মূলত একটি পণ্যের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত পুরো জীবনচক্রকে দেখে।
এর মধ্যে পণ্যের কাঁচামাল, শক্তির ব্যবহার, জলের অপচয় রোধ, বর্জ্য তৈরি না করা, শ্রমিকদের ন্যায্য পারিশ্রমিক ও নিরাপত্তা, পণ্যটির দীর্ঘস্থায়িত্ব এবং পরিবেশের উপর তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের মতো সমস্ত বড় বড় বিষয়গুলি জড়িয়ে থাকে। আমাদের দৈনন্দিন কেনাকাটার ক্ষেত্রে এই শব্দটি তখনই বেশি অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে, যখন ব্র্যান্ডটি পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দেয় যে তারা আসলে পণ্যের ঠিক কোন অংশটিকে টেকসই বা সাসটেইনেবল বলছে।
অন্যান্য কিছু লেবেল, যা আপনার চিনে রাখা দরকার
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বয়স ধরে রাখা বা চিরযৌবন পাওয়ার গবেষণায় কোটি কোটি টাকা খরচ করে বিশ্বজুড়ে খবরের শিরোনামে এসেছিলেন প্রযুক্তি ব্যবসায়ী (টেক এন্টারপ্রেনার) ব্রায়ান জনসন। তবে বহু বছর ধরে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ ঢালার পর, নিজের এই দীর্ঘ পথচলা থেকে তিনি বেশ অদ্ভুত এবং সহজ একটি শিক্ষা পেয়েছেন।
আপনি যখন পণ্যের লেবেলগুলি একটু খুঁটিয়ে পড়তে শুরু করবেন, তখন আরও কয়েকটি শব্দ আপনার চোখে বারবার পড়বে। যেমন—‘ফেয়ার ট্রেড’ (Fair Trade), এটি পণ্যের গুণের চেয়ে বেশি জোর দেয় মানুষের উপর। অর্থাৎ, যে গরিব চাষী বা শ্রমিকরা কফি, চা, চকোলেট বা হস্তশিল্প তৈরি করছেন, তারা সঠিক পারিশ্রমিক এবং কাজের ভালো পরিবেশ পেয়েছেন কি না—তা এই লেবেল নিশ্চিত করে।
আবার ‘কার্বন নিউট্রাল’ (Carbon Neutral) শব্দটির মানে হলো কোনো কোম্পানি বা পণ্য তৈরি করতে গিয়ে বাতাসে যতটুকু ক্ষতিকর গ্রিনহাউসগ্যাস বা কার্বন ডাই অক্সাইড ছেড়েছে, ঠিক ততটুকুই অন্য কোনো উপায়ে (যেমন গাছ লাগিয়ে বা সৌর প্রকল্পে টাকা দিয়ে) বাতাস থেকে শুষে নেওয়ার ব্যবস্থা করেছে।
লিপস্টিক, ক্রিম বা শ্যাম্পুর বোতলে লাফানো খরগোশের ছবিসহ ‘ক্রুয়েলটি-ফ্রি’ (Cruelty-free) লেখাটি থাকার মানে হলো—পণ্যটি তৈরি বা পরীক্ষা করার সময় কোনো নিরীহ প্রাণীর উপর ল্যাবরেটরি টেস্ট বা নিষ্ঠুর অত্যাচার করা হয়নি।
একইভাবে ‘প্লাস্টিক-নিউট্রাল’ (Plastic-neutral)-এর সহজ অর্থ হলো—একটি ব্র্যান্ড তাদের প্যাকেজিংয়ে যতটুকু প্লাস্টিক ব্যবহার করছে, ঠিক সমপরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য তারা পরিবেশ থেকে কুড়িয়ে রিসাইকেল করার দায়িত্ব নিচ্ছে। আর ‘সাসটেইনেবলি সোর্সড’ (Sustainably sourced) শব্দটি মূলত পণ্যের কাঁচামাল প্রকৃতি থেকে কীভাবে আনা হচ্ছে তার দিকে নির্দেশ করে। যেমন—মাছ ধরার সময় সমুদ্রের অন্য প্রাণীদের ক্ষতি না করে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে মাছ ধরা হয়েছে কি না।
আপনি ‘গ্রিনওয়াশিং’-এর শিকার হচ্ছেন না তো?
এবার আসি সবচেয়ে জরুরি কথায়। এতক্ষণ যে সুন্দর সুন্দর শব্দগুলির কথা শুনলেন, অনেক কোম্পানি কিন্তু এগুলিকে স্রেফ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আমাদের বোকা বানায়। একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘গ্রিনওয়াশিং’ (Greenwashing)। সহজ কথায়, গ্রিনওয়াশিং হলো কোনো পণ্যের আসল রূপ লুকিয়ে, মিথ্যা বা অতিরঞ্জিত তথ্য দিয়ে তাকে জোর করে পরিবেশ-বান্ধব হিসেবে ক্রেতাদের সামনে তুলে ধরা। কোম্পানিগুলি জানে যে আজকের দিনে মানুষ পরিবেশ নিয়ে ভাবছে এবং একটু ভালো পণ্যের জন্য বেশি টাকা দিতেও রাজি। আর এই আবেগকে কাজে লাগিয়েই চলে প্রতারণা।
গ্রিনওয়াশিং চেনার জন্য আপনাকে কয়েকটি বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। প্রথমত, অস্পষ্ট কথার ফুলঝুরি—প্যাকেটের গায়ে বড় করে লেখা ‘১০০% ন্যাচারাল’ বা ‘পরিবেশের বন্ধু’, কিন্তু কীভাবে বন্ধু তার কোনো প্রমাণ বা ব্যাখ্যা নেই। দ্বিতীয়ত, নকল লোগোর ফাঁদ—সরকারি কোনো আসল সার্টিফিকেট বা লোগো (যেমন Jaivik Bharat বা GOTS) না রেখে নিজেদের মতো করে একটা সবুজ পাতা বা পৃথিবীর ছবি এঁকে লোগো বানিয়ে রাখা। তৃতীয়ত, আংশিক সত্যি—একটি খাতার পাতা হয়তো রিসাইকেল করা কাগজ দিয়ে তৈরি, কিন্তু সেটা বানাতে গিয়ে কারখানার বিষাক্ত রাসায়নিক সরাসরি নদীতে ফেলা হয়েছে। আর সবশেষে রয়েছে রং আর ছবির জাদু—প্যাকেটের গায়ে সবুজ রঙ, বনের ছবি, বা সুন্দর পাখির ছবি দিয়ে এমন একটা আবহ তৈরি করা যাতে আপনার অবচেতন মন ওটাকে এমনিতেই ‘ভালো’ বলে ধরে নেয়।
দৈনন্দিন কেনাকাটার একটি সহজ চেকলিস্ট
লেবেল আমাদের সাহায্য করতে পারে ঠিকই, কিন্তু সেটা আসলে পুরো গল্পের একটা অংশ মাত্র। পরের বার যখন সুপারমার্কেটে কেনাকাটা করতে যাবেন, তখন কোনো দাবিকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করার আগে নিজের মনে কয়েকটি ছোট প্রশ্ন করে নিন।
যেমন—দাবিটি কি সুনির্দিষ্ট, নাকি কেবল বড় বড় অস্পষ্ট কথা? কোনো স্বীকৃত সরকারি বা নিরপেক্ষ সংস্থার শংসাপত্র আছে কি? ব্র্যান্ডটি কি তাদের ওয়েবসাইটে বা কিউআর কোডের মাধ্যমে শব্দটির আসল মানে বুঝিয়ে বলেছে? প্যাকেটের পিছনের উপাদানের তালিকাটি (ingredient list) কি সামনের চটকদার দাবির সঙ্গে মিলছে? পণ্যটি কি দীর্ঘস্থায়ী, নাকি দুদিন পরেই ফেলে দিতে হবে? এটি কি রিফিল বা রিসাইকেল করা যায়? পরিবেশ-বান্ধব হওয়ার দাবিটি কি পুরো পণ্যটির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, নাকি শুধু তার প্যাকেজিংয়ের উপর? এবং ব্র্যান্ডটি কি তাদের শ্রমিকদের অধিকার বা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে কোনো খোলাখুলি তথ্য শেয়ার করে?
তাই, ‘সাসটেইনেবিলিটি’ বা টেকসই হওয়ার বিষয়টি প্যাকেটের গায়ে লেখা একটা ফ্যাশনেবল শব্দ দিয়ে মাপা যায় না। পণ্যটি কীভাবে তৈরি হচ্ছে, কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং ব্যবহারের পর তা ডাস্টবিনে ফেলার পর মাটির সঙ্গে মিশছে কি না—তার উপর এটি নির্ভর করে। একই সঙ্গে এই পুরো যাত্রাপথের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষ আর প্রকৃতির সম্পদও এর বড় অংশ।
আমরা ক্রেতারা যত বেশি সচেতন হব, এই শব্দগুলির আসল মানে যত বেশি বুঝতে শিখব—কোম্পানিগুলির গ্রিন অয়াশিং করা ততটাই কঠিন হয়ে পড়বে।






