মাৎস্যন্যায়: নবীন শক্তিতে স্বমহিমায় মিনার্ভা

Matsyanyay review: নাটকে আমরা দেখি মহীয়সী(?) মূলার দুই (কু) পুত্র পুন্ডবর্মা এবং কীর্তিবর্মা মায়েরই নিপাট সম্মতিতে ললন্তিকাকে ভোগ করে। ভোগ করে ওরই প্রেমিকের নিশ্চল নিথর শরীরের উপর রেখে।

Avi Chakraborty
৭ মিনিট
মাৎস্যন্যায়: নবীন শক্তিতে স্বমহিমায় মিনার্ভা

ব্রাত্য বসুর 'মাৎস্যন্যায়' পড়েছিলাম সম্ভবত, সদ্য-অতীত করোনা মহামারীকালের, প্রথম পুজোর সময়। তখন পারিপার্শ্বিক ভয়ার্ত, দমবন্ধ, স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধে বাতাস ম ম করছে। দিনভর অ্যাম্বুলেন্সের নাছোড়বান্দা সাইরেনের শব্দ। শঙ্কা আর আতঙ্কের পরত গায়ে জড়িয়ে থাকত আমাদের, হিলহিলে আদিম সরীসৃপের মতো। রাষ্ট্র তখন নিদান ঘোষণা করত, ফতোয়া জারি করত নানানরকম। মাস্কের আড়ালে, পিপিই কিটের অন্তরে ভয়ার্ত চোখগুলো শুধু একটা নিরোগ সময় অন্বেষণের জন্য অক্লান্ত হয়ে ছুটে মরছিল বা দমবন্ধ হয়ে যাপন করছিল বাধ্যতামূলক অন্তরিনকাল।

সেইসময় ব্রাত্য বসুর 'মাৎস্যন্যায়' পড়া এবং রাষ্ট্রের আদি-অন্ত মুখের সঙ্গে আবার মুখোমুখি বসা। যদিও ততদিনে আমরা বুঝেছি, বলা ভালো ইতিহাস আমাদের বুঝিয়েছে যে, রাষ্ট্র আসলে মোটামুটি কাজ চালানোর মতো একটা সাময়িক প্রশাসনিক ব্যবস্থা। যেখানে নৈমিত্তিক নৈরাজ্যসহ বিবিধ ন্যায় অন্যায় গুলিয়ে যাবে, প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতার মিছিল চলে যাবে, একের পর এক। খুন, জখম এবং গণহত্যা হবে। সঙ্গে জুড়বে বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তির উত্থান এবং সেই শক্তিকে বিনাশ করার জন্য রাষ্ট্রীয় দমন, সন্ত্রাস ও নিপীড়ন। এসবকে তাপ্পি টাপ্পি দিয়ে, ইতিহাসের নানান অনুষঙ্গ এনে জাস্টিফাই করে টোরে আবার গণতান্ত্রিক জোট, ভোট এবং সাময়িক স্থিতাবস্থা নিয়ে শুরু হবে অন্য, নতুন কোনো শাসনকাল তথা প্রতারণার পর্ব। মানচিত্র নির্বিশেষে এ ইতিহাস একই। তাই 'মাৎস্যন্যায়' বঙ্গ ইতিহাসের একটি বিশেষ সময়কালকে (আনুমানিক ৬৫০ থেকে ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত) চিহ্নিত করলেও তা আজও একই গতিতে নানান আকারে, নানান বেশে চিরপ্রবহমান।

উইলিয়াম শেক্সপিয়রের অন্যতম ট্র্যাজেডি "টাইটাস অ‍্যান্ড্রনিকাস", যার রচনাকাল ১৫৮৮-১৫৯৩ এর মধ্যে এবং বাণভট্টের ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষকাল থেকে সপ্তম শতাব্দীর পূর্বার্ধে লেখা গদ্যকাব্য "হর্ষচরিত" অবলম্বনে ব্রাত্য বসু লিখেছেন এই নাটক। কিন্তু আমরা যারা তাঁর লেখার ভিন্ন এবং বহুস্তরীয় পরতের বিবিধ অনুষঙ্গের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে অনেকদিন থেকে জড়িত, তারা জানি এই অবলম্বনের মধ্যে কী অনায়াসে সমকালের আলখাল্লা জড়িয়ে, সযত্নে জমানো নিজস্ব সমকালীন অভিজ্ঞতা এবং অস্মিতাকে সম্বল করে ঘুরে বেড়ান তিনি। তাঁর এই অনায়াস এবং অতিলৌকিক, জ্যোতির্ময় অথচ প্রান্তিক পদচারণা ইতিপূর্বে আমরা অবলোকন করেছি প্রায় তাঁর প্রত্যেক রচনায়, যেখানে তিনি কখনো অলিখিত ইতিহাসকে ঢেলে দিয়েছেন সমকালের গরম তাওয়ায়। কখনো বিস্মৃত রাজনৈতিক ঘটনা এবং ঘনঘটাকে এনে স্থাপন করেছেন এই সময়ে আবার কখনো দিব্যোন্মাদ কোনো ব্যক্তিজীবনকে দেখিয়েছেন প্রিজমের মধ্য দিয়ে। চিলতে আলো পড়েছে কখনো কাল্পনিক কমিকস চরিত্রে আবার কখনো অন্য কোনো মহান নাট্যের মধ্য দিয়ে নিজের সময়কে এফোঁড়-ওফোঁড় করে খুঁড়েছেন তিনি।

নাট্যকার ব্রাত্য বসুর এই শৈলী এবং কৌশল সহজাত, অবাধ এবং তীব্রভাবে নিজস্ব। বিষয়গত বৈচিত্র্যময় পাজলের মধ্য দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তিনি প্রাচীন পীরের মতো, বৌদ্ধ পরিব্রাজকের মতো, ধ্যানী সন্তের মতো, নিষ্ঠ প্রত্নতাত্বিকের মতো একলা খুঁজে বেড়ান এইসময়কে ধরে ফেলার খোলস, যা হয়তো ইতিহাসের অচল এবং অচ্ছ্যুত ভাগশেষের মতো রয়ে গেছে। শ্যাওলা ধরা সেই অচ্ছ্যুত খোলসের বিবর্ণ সময়চিহ্নের মধ্যে, যাবতীয় দংশনের মধ্যে ধীরে ধীরে ঢুকে পড়েন তিনি। তখন তিনি একেবারেই নির্জন এক আত্মমগ্ন সাধক। বিকেলের সূর্যাস্তের আচ্ছন্নতায় একলা উন্মাদ কবি। আত্মধ্বংসে মেতে ওঠা গর্জনশীল কথক। যিনি কথা বলে চলেছেন নিজের সঙ্গে নিজেই।

তাঁর প্রতি নাট্যেই এই আত্মোন্মচনের অভাবনীয় এবং তুলনারোহিত বয়ান এবং গর্জন, নৈঃশব্দ এবং বিষাদ আমরা পড়েছি। দেখেছিও। তাঁর এই আত্মনির্মাণের উড়ালে, সংলাপ রচনাকালে তিনি আর সংলাপকে কলোকিয়াল হতেই হবে এই প্রথাগত তত্ত্ব মানছেন না। বরং ভেঙেচুরে তৈরি করছেন নাটক লেখার নতুন এবং নিজস্ব এক শৈলী। নাটককে নিয়ে ফেলছেন উপন্যাসধর্মীতায় বা কাব্যের গড়নে, আবার কখনো কখনো প্রবন্ধের ভাষায় তিনি কথা বলছেন নাটকে, তৈরি করে নিচ্ছেন স্বপরিসর।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
নধরের ভেলা: গতিময়তার বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদ

Nadharer Bhela Review: প্রদীপ্ত ভট্টাচার্যের ছবিতে বারবার উঠে এসেছে গ্রাম্য লোকের ছাপোষা জীবন, মফসসলের মানুষদের খুচরো পয়সার যাপন, সর্বহারাদের এক মহাকাশ ভালবাসার কথা।

তুমি নতজানু হয়ে কী চাইছ? ঈশ্বরের কাছে কী প্রার্থনা করছ? তোমার কি মনে হচ্ছে ঈশ্বর আর আমাদের কথা শুনবেন? দেখো মা দেখো, আমার সম্রাটকে দেখো। আমাদের দুঃখ বস্তুত তাঁর কাছে ক্রীড়ার বস্তু। আমাদের সংকল্প তাঁর কাছে উপহাসের বস্তু। হায় কন্যা, ঈশ্বরও কি রাজার মতোই নন? তিনিও কি কোনো ত্যাগ, অপমান, বেদনা, সংগ্রাম... এসবের যথার্থ মূল্য বোঝেন?

এই প্রশ্ন মহাবাহু তাঁর মেয়ে ললন্তিকাকে করছেন। 'মাৎস্যন্যায়' নাটকে। যা সম্প্রতি অর্পিতা ঘোষের পরিচ্ছন্ন এবং বুদ্ধিদীপ্ত নির্দেশনায় প্রযোজনা করেছে মিনার্ভা নাট্য সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র।

নাটকে আমরা দেখি মহীয়সী(?) মূলার দুই (কু) পুত্র পুন্ডবর্মা এবং কীর্তিবর্মা মায়েরই নিপাট সম্মতিতে এই ললন্তিকাকে ভোগ করে। ভোগ করে ওরই প্রেমিকের নিশ্চল নিথর শরীরের উপর রেখে। যে শরীরকে, মজা নদীর মত নিশ্চল, আতঙ্কের মতো ঠান্ডা করেছে এই কুপুত্রদ্বয়। এরপরে প্রমাণ না রাখার জন্য জিভ কেটে নেওয়া হয় ললন্তিকার। মূলাকে প্রবল অনুনয়ের পরেও রক্ষা পায়না ললন্তিকা, ধর্ষণ তার অবশ্যম্ভাবী শাস্তি হয়ে ওঠে। কারণ মূলার ছেলে দন্তিবর্মাকে হত্যা করেছিল ললন্তিকার পিতা মহাবাহু। অর্থাৎ সেই রাজায় রাজায় যুদ্ধ! কিন্তু এই প্রতিশোধের মাঝে পড়ে এক নারীর হাহাকার, কাতর ক্রন্দন এক যুগ থেকে আরেক যুগে এনে ফেলে আমাদের।

আমরা দেখি মণীষা বাল্মিকীর ধর্ষিত শরীর মধ্যরাতে পুড়িয়ে দিচ্ছে প্রশাসন, নিশ্চিহ্ন করে দিতে চাইছে ধর্ষণের চিহ্ন বা প্রমাণকে। মহা সমারোহে চিতা জ্বলে ওঠে একসঙ্গে। আগুনের রং লালচে হলদে। বোঝা যায়না অগ্নি কাকে গ্রাস করে ছাই করে দিচ্ছে, কে বোবা হয়ে বাঁচতে চাইছে? ললন্তিকা নাকি মণীষা নাকি উন্নাও এর সেই মেয়েটি, যে কাজ চাইতে গিয়ে লাগাতার ধর্ষিত হয়? তারপর ধর্ষক কুলদীপ সেঙ্গারের জামিন এবং তার হাসিমুখের ছবি সমাজে ঘুরতে থাকে, যেভাবে 'মাৎস্যন্যায়ে' ঘুরে বেড়ায় মূলার দুই পুত্র এবং একের পর এক ষড়যন্ত্র রচনা করে তান্ত্রিক গুণাঢ্য। কাল-মহাকাল-সমকাল এক হয়ে যায়, সর্বগ্রাসী আগুনের লেলিহান শিখায়।

অর্পিতা ঘোষের থিয়েটার দেখছি আমি অনেকদিন থেকেই। অর্পিতা ঘোষ আত্মবিশ্বাসী এবং সচেতন পরিচালক। তিনি থিয়েটারকে নির্বোধ বিনোদনের উল্লাসিত প্রতিবিম্ব ভাবেননি কখনোই। তাই তাঁর থিয়েটার নির্মাণে বিশ্বের একাধিক মূল্যবান সাহিত্য, টেক্সট থেকে রবীন্দ্রনাথ এমনকি জীবনানন্দও উঠে এসেছেন। এইসব ক্লাসিককে তিনি কৌশলে এনে ফেলেছেন সমকালের তপ্ত তাওয়ায়। এক্ষেত্রে উল্লেখ করা যায় তাঁর নাট্যগুরু শাঁওলী মিত্রের কথা, যিনি মহাকাব্যের উপস্থাপনায় আজকের সময়কে স্থাপন করতেন স্বকীয় দক্ষতায় এবং অনায়াসে। অর্পিতা ঘোষ সেই ধারারই আধুনিক এবং স্পষ্ট স্বর।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
শশী তোমার শরীর নাই, ঘর নাই? পুতুলনাচের ইতিকথা ছবির নিবিড়পাঠ

Putul Nacher Itikatha: আজকের দুনিয়ায় মানুষ আধুনিকতার যান্ত্রিক উন্নাসিকতায়, তার গণনানির্ভর জীবনে বার বার ভুলে যায় বিপন্ন প্রকৃতি ও মানুষকে, এমনকি দায়ে না পড়লে সে ভুলে থাকে নিজের রোগ ব্যাধি জড়া সম্বলিত বিপন্ন শরীরটিকেও।

'মাৎস্যন্যায়'কে ব্রাত্য বসু যে মুন্সিয়ানায় বঙ্গজ করেছেন, অর্পিতা ঘোষ টেক্সটের সেই দেওয়াল কুঁদে, গভীরে গিয়ে তৈরি করেছেন নির্দেশনার অলোক-সামান্য, উচ্চাকাঙ্খী এক চলমান স্থাপত্য। সংলাপের তৎসম শব্দের আধিক্য, বাক্যগঠনের জটিল বিন্যাস, ঘটনার এবং ঘটনা উদ্ভুত দৃশ্যরাজির তুমুল ঘনঘটার সংশ্লেষকে চারটে মাত্র চলমান সিঁড়ির, মসৃণ অবস্থান পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে একাধিক লোকেলের এই মহানাটককে অর্পিতা ঘোষ আত্মধ্যানী মঞ্চপাঠে এবং অভিজ্ঞতায় বাঙ্ময় করে তুলেছেন। দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে। নাট্যমুহূর্ত তৈরি করেছেন মুহুর্মুহু। মিনার্ভা রেপার্টারির ছেলেমেয়েদের চরিত্র নির্মাণে চূড়ান্ত সৎ প্রচেষ্টা, আত্মকে ছাপিয়ে চরিত্রের অন্দরে, অন্তরে ঢুকে পড়ার আপ্রাণ অভীপ্সা আমাদেরকে নাট্যে থাকতে বাধ্য করছে। ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় উদ্বেল হয়েছে দর্শক।

নির্দেশক-নির্মিত আলো মঞ্চের সঙ্গে এমন পরিমিত ও যথার্থ সাযুজ্য নির্মাণ করছে এবং দিশারির আবহ নাটককে যেভাবে এক দৃশ্য থেকে আরেক দৃশ্যে নিয়ে আসছে বা বিশেষ কোনো দৃশ্যাংশকে বা মুহুর্তকে উত্তুঙ্গে তুলে নিয়ে গেছে, তাতে তৈরি হচ্ছে এক প্যারা টেক্সট। যেখানে পরিচালকের দীপ্ত পদচারণা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ফলত নাট্যকারের টেক্সটের গঠনকে সম্পূর্ণ মর্যাদা দিয়ে এই নির্মাণ এই সময়ের উল্লেখ্য বয়ান হয়ে উঠতে পেরেছে। বিশেষত গৌড়রাজ শশাঙ্ক যখন বঙ্গ দেশের শ্রেষ্ঠ অস্ত্র শলাকা সম্পর্কে আমাদের অবহিত করেন, এবং বিস্মিত কৃষ্ণবর্ধনকে বলেন,

হ্যাঁ। শল্লকীর শল্লসম একটি ক্ষুদ্র শলাকা। এই শলাকা প্রতিপক্ষের পায়ুমুখে নিঃশব্দে প্রবেশ করাতে আমরা গৌড়বাসীরা সিদ্ধহস্ত। অন্য সর্ববিষয়ে আমরা অকিঞ্চন হলেও, এই একটি ক্ষেত্রে আমাদের এই গোপন সিদ্ধবিদ্যা এতটাই ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছে যে, সমগ্র জনপদে আজ তা প্রবাদপ্রতিম। আর যেহেতু এই শলাকার কোনো নির্দিষ্ট রূপ নেই, তা অরূপ, ফলে তাকে আমরা যথা ইচ্ছা যত্রতত্র ব্যবহার করতে অতীব পারঙ্গম।

এই সংলাপ বাঙালি জাতির অবস্থাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। যুগ থেকে অন্য যুগে এই জাতি চরিত্রকে উন্মুক্ত করেন নাট্যকার।

যুদ্ধ, হত্যা, খুন, জখম, ধর্ষণ, পলায়ন, রাজ্যাভিষেকের মতো একাধিক ভিড়ের দৃশ্যে সোমা গিরির সুষম কোরিওগ্রাফিও এ নাট্যের প্রশংসনীয় উপাদান এবং নাট্যের চলনের গুরুত্বপূর্ণ অংশভাগ হয়ে উঠেছে, জেগে থাকেনি পৃথক টিলার মতো। এখানেই অর্পিতা ঘোষের সাফল্য, তিনি অভিনয় ব্যতীত নাট্যনির্মাণের বাকি অনুষঙ্গগুলিও প্রশ্নাতীত দক্ষতায় একত্র করেছেন, অভিনেতাদের এমন এক পরিবেশ ও প্রতিবেশ দিয়েছেন যেখানে তাদের সামগ্রিক সীমাবদ্ধতা এবং পারদর্শিতা সহ স্ফুরণ ঘটেছে। অভিনেতৃদলকে একই সুর-তাল-লয়-ছন্দে বাঁধতে পেরেছেন, এ বিষয়ে তাঁর আত্ম-অর্জিত শিক্ষা মিনার্ভা রেপার্টারির নতুন ব্যাচের মধ্যে নিষ্ঠ চর্চার মাধ্যমে সঞ্চারিত হয়েছে।

মহাবাহুর আরেকটি সংলাপ-অংশ উল্লেখ করার লোভ সামলাতে পারছি না। তিনি মূলাকে বলেন,

দেখুন রানি, আমার একমাত্র প্রতিবন্ধী কন্যা ললন্তিকা। শুক্রাচার্য-কন্যা দেবযানীর চেয়েও, ধৃষ্টদ্যুম্ন-ভগিনী পাঞ্চালীর চেয়েও, প্রবীর পত্নী জনার চেয়েও আমার এ মেয়ে অধিক কষ্ট ও নির্যাতন সহ্য করেছে। ওর এতখানি নির্মমতা প্রাপ্য ছিল কি? বলুন রানি, ছিল কি? ছিল না। আমি সৈন্যদের একটু পরে গিয়ে শেখাব নির্মমতাকে, হিংস্রতাকে শরীর থেকে নির্গলনের আগে নিজেকে মাধুর্যপূর্ণ করা সমীচীন, পবিত্রতার স্তোত্রপাঠ করা সমীচীন, এক স্নিগ্ধশীতল দীপনছটায় নিজেকে অনঘ নিষ্কলুষ করা সমীচীন, আর তাই মা আমার, আমার ললন্তিকা...

এরপরেই নাটকে আমরা দেখি তলোয়ার নিয়ে ললন্তিকাকে হত্যা করেন মহাবাহু। মূলা সভয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন। এই দৃশ্যের অভিঘাতও আমাদের মধ্যে থেকে যাবে বহুদিন। থেকে যাবে রাজ্যবর্ধনের মৃত্যু দৃশ্য, কৃষ্ণবর্ধনকে হত্যা করে গুহায় ফেলে দেওয়ার দৃশ্য বা দৃশ্যান্তরের বহুকৌণিক কম্পোজিশান।

নাটকের আরেকটি অংশে আমরা দেখি, নিজের পেটে তলোয়ার ঢুকিয়ে দেন মহাবাহু। সবাই স্তব্ধ। মহাবাহু ছটফট করেন। বলেন,

তা হলে এসো প্রতারণা এসো। তার ভ্রাতা চক্রান্ত তুমিও এসো। তুমি জয়যুক্ত হও। এসো মধ্যমেধা এসো। ঈশ্বরের বরপুত্র হয়ে তুমি প্রতিজন্মে যেন নবজন্ম লাভ করো মিথ্যা, শঠতা আর নিষ্ঠুরতার মাঝে। এসো চাটুকারিতা, প্রবঞ্চনা, আর কুৎসাকারী এসো, জয়ী হও। মানুষ হয়ে অন্য মানুষকে ভর করে, ব্যবহার করে বেঁচে থাকা ভীরু ক্ষমতাজীবীর দল। এসো জন্মে-জন্মে, যেন তোমরা প্রতিবার জয়যুক্ত হও, আজ সেই প্রার্থনা করি। এসো মৃত্যু এসো, তুমি আলিঙ্গন করো আমাকে। তুমি জেনে রেখো, জয়ী হতেই শুধু মানুষ তরবারি ধরে না, সংগ্রাম তার স্বধর্ম বলেও সে তরবারি ধরে। হেরে যাবে জেনেও সে লড়ে, লড়তে হবে বলে সে লড়ে।

এইরকম একাধিক দৃশ্য-সংলাপ-মুহূর্তরাশির সহযোগে কালশিটে পড়া ক্যানভাসের পেইন্টিং সিরিজের গ্যালারি গড়ে তোলেন নাট্যকার-নির্দেশক। যুগ-কালের সীমা পেরিয়ে তা বয়ে যেতে থাকে একটা নদীর মতো। সঙ্গে সমান তালে তাল দিয়ে যান, মিনার্ভা রেপার্টারির এই নবীন ব্যাচ। যা আমাদের আগামীদিনের গুরুত্বপূর্ণ অভিনেতার উন্মেষের ব্যাপারে খানিক নিশ্চিত করে। নির্দেশকের আন্তরিকতা এবং একাত্মতা থাকলে নতুনদের নিয়েও এমন স্ফুরণ ঘটতে পারে। 'মুম্বই নাইটস'-এর পর আবার স্বমহিমায় মিনার্ভা।

লিখেছেন
Avi Chakraborty
Avi Chakraborty
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

দেশভাগের ক্ষত বুকে নিয়েই গড়ে উঠেছিল ঢাকা কালীবাড়ি, দক্ষিণ কলকাতার মন্দিরের ইতিহাস

Dhaka Kalibari: দেশভাগের পর বরিশাল থেকে কলকাতায় এসে নিজের শিকড়ের স্মৃতি ধরে রাখতে মন্দির গড়ে তুলেছিলেন ননীগোপাল চক্রবর্তী। দক্ষিণ কলকাতার প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোডের এই মন্দিরই আজ পরিচিত ঢাকা কালীবাড়ি নামে। মাটির প্রতিমা থেকে কষ্টিপাথরের বিগ্রহ, কালীপুজোর বিশেষ ভোগ—মন্দিরটির ইতিহাসে মিশে রয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাস ও দেশভাগের স্মৃতি। কী ভাবে?

বইয়ের জন্য হাঁটতে হয় কেন?

Walk for Books 2026: প্রায় পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে বইমেলাকে মনে করে বইয়ের জন্য একবার হেঁটেছিল বাঙালি। তারপর দীর্ঘ বিরতি পেরিয়ে আবার এই ৩১ অক্টোবর, ২০২৬-এ দেখা গেল সেই ছবি। হুড়দুড় করে ছেলেবুড়োমেয়েমদ্দ সব রাস্তায় নেমে এল—এ কী আজব খেলা রে ভাই!

ঋত্বিক: ফিরে দেখা

Ritwik Ghatak: আমরা যখন ছোট ছিলাম, মানে ষাটের দশকের সেই শেষ দিকে বা সত্তরের দশকে, তিনি কত না অদ্ভুতভাবে আমাদের প্রভাবিত করতেন। যেমন একদিন আমাদের রবীন্দ্রসদনের সামনে দেখতে পেয়ে তিনি হঠাৎ বললেন, আমাকে একটা ট্যাক্সি ধরে দেবে?

কলকাতায় চালু হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস

West Bengal School of Magic: মুখ্যমন্ত্রী ‘পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক, ইল্যুশন অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস’ স্থাপনের প্রস্তাবে অনুমোদন করেছেন। পুজোর পর উপদেষ্টা কমিটির সদস্যরা বৈঠক করবেন।

বিভূতিভূষণের উপন্যাস কেবল দৃশ্যের নয়, শব্দেরও এক জগৎ তৈরি করে

Bibhutibhushan Bandyopadhyay: বাংলা সাহিত্যে বিভূতিভূষণকে আমরা সাধারণত প্রকৃতির কবি বলেই চিনি। তাঁর বর্ণনায় নদী, মাঠ, বন, আকাশ, ঋতু আর গ্রামীণ জীবনের যে ছবি ফুটে ওঠে, তা নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তাঁর সাহিত্যকে যদি একটু অন্য দিক থেকে দেখা যায়? যদি আমরা শুধু দৃশ্যের দিকে না তাকিয়ে শোনার চেষ্টা করি?

স্ট্যাচু অব লিবার্টি ও আমেরিকার অভিবাসন: আমেরিকার ইতিহাসে আশ্রয়প্রার্থীদের জায়গা কোথায়?

Statue of Liberty: স্ট্যাচু অব লিবার্টির ধারণার সূত্রপাত ১৮৬৫ সালে। ফরাসি রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এদুয়ার্দ দ্য লাবুলে আমেরিকার স্বাধীনতার শতবর্ষ এবং ফ্রান্স-আমেরিকার বন্ধুত্বকে স্মরণ করে স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ধারণা দেন।

এশিয়ার সেরা মিউজিয়ামের স্বীকৃতি পাটনার, কীভাবে বিশ্বসেরাদের টেক্কা দিল বিহার মিউজিয়াম?

Patna Outranks paris: বিশ্বের সেরা ১০০টি মিউজিয়ামের তালিকায় নবম স্থান অর্জন করে কীভাবে ল্যুভর ও মেটের মতো বিখ্যাত জাদুঘরকে পিছনে ফেলে এশিয়ার সেরা মিউজিয়াম হয়ে উঠল পাটনার বিহার মিউজিয়াম?

দেশভাগের ইতিহাসকে নারীর চোখে দেখা: অংশুমান করের ‘হিরণবালা’

Hiranbala Novel Review: বাংলা উদ্বাস্তু-আখ্যানের বড় অংশে দেশভাগের অভিজ্ঞতা এসেছে পুরুষের জীবন, তার মনস্তত্ত্ব ও তার গতিবিধির ভিতর দিয়ে। ‘হিরণবালা’ প্রথমেই এই কাঠামো ভেঙে দেয়। উদ্বাস্তু পরিবারের গল্পে একজন নারীকে নিষ্ক্রিয় বা পরোক্ষ ভূমিকায় না দেখিয়ে, উদ্বাস্তু হওয়ার অভিজ্ঞতাটিকে প্রত্যক্ষভাবে বুনে দেয় নারীটির জীবন। দেশভাগকে প্রায় অদৃশ্য করে হিরণকে উদ্বাস্তু করা শুরু হয় ১৯৪৬ সালে, বিয়ের মধ্য দিয়ে।