'হিন্দু না ওরা মুসলিম?' স্কুল কলেজেও যে প্রশ্নের সামনে ভারতের পড়ুয়ারা
Muslim students in India : দোকানের নাম কী রাখবে, সেটাও মাথা ব্যথার কারণ। দাঙ্গা বাঁধলে যে ওই নাম দিয়েই ‘চিহ্নিত’ করা হবে মানুষকে!

মাত্র কয়েকদিন আগের কথা। ২৬ নভেম্বর ছিল মুম্বই হামলার ১৪ তম বর্ষপূর্তি। গোটা দেশ সেদিন সেই জঙ্গি হামলায় নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানায়। তারই মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় উঠে আসে একটি ভিডিও। ঘটনাটি বেঙ্গালুরুর মণিপাল ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি কলেজের। ক্লাস রুমে দিব্যি বসে আছেন ছাত্র ছাত্রীরা। অধ্যাপকও নিজের কাজ শুরু করেছেন। হঠাৎই এক ছাত্রের সঙ্গে তাঁর বচসা শুরু হয়। শিক্ষক-ছাত্র সংঘাতের মতো ঘটনা খবরের কাগজ খুললেই সামনে আসে। এক্ষেত্রে কী ঘটেছে? ভিডিওয়ে দেখা গেল, বচসা চলাকালীন হঠাৎই ওই অধ্যাপক, ছাত্রটিকে ‘সন্ত্রাসবাদী’ বলছেন। কেন? ঘটনাটি একটু তলিয়ে দেখা মাত্রই জানা গেল, ওই ছাত্রটি মুসলিম। সরাসরি আজমল কাসভের সঙ্গে তুলনা করছেন ওই অধ্যাপক। ছাত্রটিও বারবার বলছেন, এভাবে কারও ধর্ম পরিচয় নিয়ে ‘ইয়ার্কি’ মারা ঠিক নয়। এবং খেয়াল করুন, দিনটি ছিল ২৬ নভেম্বর। মুম্বইয়ের সন্ত্রাসবাদী হামলার ১৪ বছর পরের একটি দিন…
২০১০ সালে বলিউডের একটি সিনেমার প্রসঙ্গ মনে পড়ে যাচ্ছে। শাহরুখ খানের ‘মাই নেম ইজ খান’। সেই সিনেমারই একটি ডায়লগ অনেকের মনে দাগ কাটে। ‘মাই নেম ইজ খান, অ্যান্ড আই অ্যাম নট আ টেররিস্ট।’ ৯/১১-য় আমেরিকার টুইন টাওয়ার ধ্বংস, বিমান হাইজ্যাক করে হামলা – সমস্ত ব্যাপারে নাম উঠে আসে ওসামা বিন লাদেনের জঙ্গিগোষ্ঠী আল কায়দার। তারপর থেকে আমেরিকা জুড়ে মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের ওপর নেমে আসে অত্যাচার। ‘মাই নেম ইজ খান’-এর ডায়লগ সেই আইডেন্টিটি পলিটিক্সের প্রসঙ্গই তুলে ধরে। অর্থাৎ, পদবি খান না কর্মকার, বন্দ্যোপাধ্যায় না মণ্ডল, শবর – কেবলমাত্র তাই দিয়েই ‘পরিচয়’ নির্ধারণ করা হবে।
নাসিরুদ্দিন শাহ, অনুপম খের অভিনীত ‘আ ওয়েডনেসডে’ সিনেমাটিতেও সেই ‘পরিচয়’-এর কথাই এক লব্জে উঠে এসেছে। সেখানে নাসিরুদ্দিন শাহের ডায়লগ, দাড়ি বাড়ানোর আগেও দু’বার ভাবতে হয় মানুষকে। দোকানের নাম কী রাখবে, সেটাও তাঁর মাথা ব্যথার কারণ। দাঙ্গা বাঁধলে যে ওই নাম দিয়েই ‘চিহ্নিত’ করা হবে মানুষকে!
A Professor in a class room in India calling a Muslim student ‘terrorist’ - This is what it has been to be a minority in India!
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Karnataka professor Suspended: এতখানি অবিশ্বাস, এতখানি সন্দেহ কি শুধু একটি ঘটনার ফসল? নাকি এই অবিশ্বাস, এই সন্দেহ আমাদের ভিতরে ছিলই...
— Ashok Swain (@ashoswai)
বেঙ্গালুরুর কলেজের ঘটনা তেমন ইঙ্গিতই কি বহন করছে না? ২৬/১১ ভারতের ইতিহাসের অন্যতম কলঙ্কজনক অধ্যায়। জঙ্গিদের তাণ্ডবে আতঙ্কের ভিত তৈরি হয় গোটা দেশে। নিহত সাধারণ মানুষ, বিদেশি, পুলিস অফিসার প্রত্যেককেই শ্রদ্ধা জানিয়ে এসেছেন আপামর দেশবাসী। তারপরও ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম, ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?’ মুসলিম মানেই জঙ্গিবাদ, হিন্দু মানেই গো-বলয়ের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অংশ – এমন অদ্ভুত বাইনারির সংজ্ঞাই কি দেশজুড়ে ছড়িয়ে আছে?
মণিপাল ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির ঘটনা বিক্ষিপ্ত কোনও ছবি নয়। ২০১৯ সালে হামজা সিদ্দিকির সঙ্গেও একই ঘটনা ঘটেছিল। সেই সময় মিরাটে এনআরসি ও নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের (Citizenship Ammendment Act) বিরুদ্ধে প্রতিবাদে জড়ো হয় বেশকিছু মানুষ। অভিযোগ, সেখানেই পুলিস গুলি চালায়। মারা যায় পাঁচজন মানুষ। এর বাইরে গিয়ে পরিচয়, মৃতরা সবাই মুসলিম। সেই সময় হামজা সিদ্দিকির ক্লাসরুমেও এই ঘটনার রেশ পড়ে। সিএএ বিরোধী আন্দোলন অবশ্য গোটা দেশেই রেশ ফেলেছিল। যাই হোক, সেই সময় ক্লাসরুমে ছিলেন এক শিক্ষক। হঠাৎই হামজার দিকে ফিরে তিনি বললেন, ‘এরা’ দেশের কোনও আইনকানুন মানেনি। এখনও মানে না। হামজার বক্তব্য, সেই কথা শুনে ক্লাসের অন্যান্য পড়ুয়ারা তাঁর দিকে তাকিয়ে হেসে ওঠে।
আরও একটি ঘটনার দিকে যাওয়া যাক। মণিপাল কলেজের ঘটনাটি ঘটার মাত্র কয়েকদিন আগের ঘটনা। রাজস্থানের বালোত্রার একটি কলেজে পড়াশোনা করেন ২১ বছর বয়সী হাসিনা বানো। তখন দিল্লি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সদ্য সামনে এসেছে। শ্রদ্ধা ওয়ালকরকে তাঁর প্রেমিক আফতাব পুনাওয়ালা খুন করে টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলে। ঘটনার বীভৎসতার বর্ণনা এখানে আবার দেওয়া অনাবশ্যক। সেই ঘটনার পরই আরও একটি ঘটনা ঘটে রাজস্থানের এই বালোত্রায়। কলেজের ক্লাসরুমে হঠাৎই হাসিনা বানোর দিকে তাকিয়ে কু-কথা বলে ওঠেন তাঁর শিক্ষক। তাঁর বক্তব্য, ‘এদের’ মধ্যে দয়া মায়া বলে কোনও বস্তু নেই। তাই ‘এদের’কেও দয়া দেখানো যাবে না। একজন হিন্দুকে মারলে ‘এরা’ একবার হজ যাত্রার ‘পুণ্য অর্জন করে’! হাসিনা প্রতিবাদ করতে গেলেই সেই শিক্ষকই বলেন, এসব কোরানেই লেখা আছে। ‘এরা’ জঙ্গি, পাকিস্তানি। হিন্দুরা অবশ্য খুন করে না। একটি পিঁপড়েকে মারলেও তাঁদের কষ্ট হয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Hijab controversy Iran: এই বিক্ষোভের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ইরানে প্রচলিত কিছু রীতি রেওয়াজ, যা বছরের পর বছর ধরে দমিয়ে রেখেছিল সে দেশের নারীদের। ইরানে জনপরিসরে নারীদের বাধ্যতামূলক হিজাব পরাসহ রয়েছে কঠোর পর্দাবিধি।
A Muslim student in MBR College, Balotra, Rajasthan alleges that her History professor Padam Singh made Islamophobic remarks and called Muslims terrorist and Pakistani.
Student Haseena Bano says that no action has been taken against teacher.
— Ahmed Khabeer احمد خبیر (@AhmedKhabeer_)
২০২০ সালের ঘটনা। ২৪ বছরের হাসান দিল্লির ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ মাস কমিউনিকেশনে সাংবাদিকতা নিয়ে পড়াশোনা করছিলেন। সেই সাংবাদিকতা, যাকে গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়। সেখানে তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল সংবাদমাধ্যম মুসলিমদের কী চোখে দেখছে, কী ভাবে বয়াঁ করছে। সেখানে হাসানের একটি পয়েন্ট ছিল, এর জন্য ইসলামোফোবিয়া বা ক্রমশ বেড়ে চলা মুসলিম বিদ্বেষ দায়ী। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে তাঁর শিক্ষিকা তাঁকে বলেন, তোমাদের ‘সম্প্রদায়ের’ এমন ভাবনা থেকে তোমাকে বেরিয়ে আসতে হবে। হাসানকে জিজ্ঞেস করা হয়, কোথা থেকে স্নাতকস্তরের পড়াশোনা করেছেন। হাসান বলেন, দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া থেকে। সেই শিক্ষিকাও সঙ্গে সঙ্গেই বলেন, সে জন্যই এমন সব ‘ভাবনাচিন্তা’।
আরও বহু ঘটনার উদাহরণ হাতের সামনেই মজুত রয়েছে। বেশি দূরে যেতে হবে না, বিগত ৩-৪ বছরের ঘটনা প্রবাহ দেখলেই হবে। এখন প্রশ্ন, এই ‘এরা’ কারা? এখানে আমরা-ওরার যে বাইনারি উঠে আসছে, সেটা কীসের? হাসিনা, হাসান, হামজা প্রত্যেকের পরিচয়ের একটা দিক একই। এরা প্রত্যেকেই মুসলিম সম্প্রদায়ের। আরও একটু এগিয়ে বললে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের।
এই ‘সংখ্যালঘু’ শব্দটিকে নিয়ে ভাবা দরকার। কেবল মুসলিমরাই নন, আদিবাসী, তফশিলি, নিম্নবর্গের মানুষজন, এলজিবিটি কমিউনিটি – প্রত্যেকেই এই বিশেষ শ্রেণীর অন্তর্গত। কখনও হিন্দুত্ববাদ, কখনও ব্রাহ্মণ্যবাদ, কখনও পুরুষতন্ত্র, আমরা ওরার বাইনারি আটকে আছে এখানেই। সন্দেহের বাতাবরণ বেড়েই চলেছে চারপাশে। কাজ নয়; আইডেন্টিটি, সম্প্রদায়, ধর্ম, জাতি, লিঙ্গ – এসবই ‘মুখ্য পরিচয়পত্র’ বহন করছে। ভোটার, আধার কার্ড এলে চোখ এড়িয়ে দেখে নেওয়া পাশের মানুষটির ‘পরিচয়’। খোঁজ নিয়ে তালিকা তৈরি করলে দেখা যাবে, বেঙ্গালুরুর মতো ঘটনা গোটা ভারতে প্রতিদিন, প্রতিটা মুহূর্তে ঘটে চলেছে। প্রাইম টাইমের অ্যাংকররাও ‘পদবীদের যুদ্ধ’তেই বেশি আগ্রহী। গণতন্ত্রের সমস্ত স্তম্ভ মিলে একটা একমুখী প্রবাহ তৈরি করেছে দেশজুড়ে।
‘মাই নেম ইজ খান, অ্যান্ড আই অ্যাম নট আ টেররিস্ট’ এখন আর নিছক ডায়লগ নয়। নিজের পরিচয় নিয়ে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার পরিস্থিতি আদৌ কতটা রয়েছে ভারতে, সেটা নিয়ে বারবার প্রশ্ন তোলা দরকার। প্রশ্ন তোলা উচিত। নয়তো খুনি, আততায়ী, সিরিয়াল কিলার, জঙ্গি, নাশকতা, সন্ত্রাসবাদ – যাবতীয় কুকীর্তিগুলির গায়েও একটি নির্দিষ্ট তকমা পড়ে যাবে। সংখ্যাগুরুর দমননীতি আরও চেপে বসবে সংখ্যালঘুদের ঘাড়ে। কে বলতে পারে, সেই রক্তের আঁচ আমার আপনার গায়ে এসে পড়বে না?







