আপাতত ছাড় শিক্ষক-অধ্যাপকদের, অনুমতি ছাড়া সংবাদমাধ্যমে মন্তব্যে নয়া নির্দেশিকা নবান্নের
Bengal government order: সংবাদমাধ্যমে মন্তব্যে সরকারি নির্দেশিকায় কী বদল করা হলো? কারা থাকছেন এই নিয়মের আওতায়?
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রশাসনিক ও কর্মিবিনিয়োগ দফতরের সাম্প্রতিক নির্দেশিকা ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কের পর অবশেষে অবস্থান কিছুটা স্পষ্ট করল নবান্ন। প্রথমে যে নির্দেশিকা প্রকাশিত হয়েছিল, সেখানে সরকারি কর্মচারীদের সংবাদমাধ্যমে মন্তব্য করা, প্রশাসনিক তথ্য বাইরে প্রকাশ করা কিংবা প্রকাশ্যে সরকারবিরোধী মত দেওয়ার ক্ষেত্রে একাধিক কড়াকড়ির কথা বলা হয়েছিল। সেই নির্দেশিকা সামনে আসতেই প্রশ্ন উঠেছিল, এই নিয়ম ঠিক কাদের জন্য প্রযোজ্য? শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক থেকে শুরু করে পুরসভা, অনুদানপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান ও স্বশাসিত সংস্থার কর্মীরাও কি এই তালিকার মধ্যে পড়ছেন?
এই বিতর্কের মধ্যেই ২১ মে নতুন একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে সরকার জানিয়ে দিল, আগের নির্দেশিকার পরিধি এতটা বিস্তৃত নয়। নতুন ব্যাখ্যায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, এই নির্দেশিকা মূলত রাজ্য সরকারের নিয়মিত কর্মরত অফিসার ও কর্মচারীদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ, সরকারি দফতরের স্থায়ী কর্মী, বোর্ড, কর্পোরেশন, আন্ডারটেকিং এবং বিভিন্ন প্যারাস্ট্যাটাল সংস্থার কর্মীরা এই নিয়মের আওতায় থাকবেন। তবে আপাতত শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী এবং কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের এই তালিকার বাইরে রাখা হয়েছে বলেই প্রশাসনিক মহলে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।
আগের নির্দেশিকায় সরকারি কর্মচারীদের সংবাদমাধ্যমে মন্তব্য করা নিয়ে কড়া অবস্থান নেওয়া হয়েছিল। সরকারের অনুমতি ছাড়া কোনো সংবাদমাধ্যমে কথা বলা, টেলিভিশনের বিতর্কসভায় যোগ দেওয়া বা প্রশাসনিক তথ্য বাইরে প্রকাশ করার উপর নিষেধাজ্ঞার কথা উল্লেখ ছিল। এমনকি সামাজিক মাধ্যমেও সরকারি আচরণবিধি মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। সরকারের যুক্তি ছিল, সরকারি কর্মীদের মন্তব্য যাতে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা বা সরকারের অবস্থানকে প্রভাবিত না করে, সে কারণেই এই নিয়ম কঠোর ভাবে কার্যকর করা প্রয়োজন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
West Bengal government employees: প্রশাসনিক ও কর্মিবিনিয়োগ দফতরের নতুন কড়া নির্দেশিকায় সরকারি কর্মীদের কোন কোন বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে? কাদের জন্য এই নির্দেশিকা প্রযোজ্য? নির্দেশিকা ভাঙলে কী ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে?
কিন্তু প্রথম নির্দেশিকায় যেভাবে সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পুরসভা, বিভিন্ন স্বশাসিত সংস্থা এবং বিস্তৃত প্রশাসনিক কাঠামোর প্রায় সব স্তরের কর্মীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, তাতেই বিভ্রান্তি তৈরি হয়। শিক্ষক সংগঠন ও সরকারি কর্মচারীদের একাংশ প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্র কি আরও সংকুচিত হতে চলেছে? বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও অধ্যাপকদের ক্ষেত্রেও যদি একই নিয়ম কার্যকর হয়, তা হলে একাডেমিক পরিসর এবং জনপরিসরে মতামত প্রকাশের স্বাধীনতার উপর তার প্রভাব পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
এই পরিস্থিতিতেই নতুন বিজ্ঞপ্তি এনে সরকার কার্যত আগের অবস্থান কিছুটা সংশোধন করল। নতুন বিজ্ঞপ্তিতে আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা শিক্ষাকর্মীদের সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি। জোর দেওয়া হয়েছে নিয়মিত সরকারি প্রশাসনিক কাঠামোর উপর। নবান্নের বক্তব্য, সংবাদমাধ্যমে তথ্য প্রচার সংক্রান্ত আচরণবিধি বহাল থাকছে ঠিকই, তবে তা সবার জন্য নয়। শুধুমাত্র সরকারি প্রশাসনের নির্দিষ্ট অংশের ক্ষেত্রেই এই নিয়ম কার্যকর হবে।
ইতোমধ্যেই এই নির্দেশ জেলার জেলাশাসক, পুলিশ প্রশাসন এবং বিভিন্ন দফতরের কর্তাদের কাছেও পাঠানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সমস্ত দফতরকে নিজেদের অধীনস্থ কর্মীদের এই নতুন ব্যাখ্যা জানিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে বিতর্ক পুরোপুরি থেমে যায়নি। প্রশাসনিক মহলের একাংশ মনে করিয়ে দিচ্ছে, সরকারি কর্মচারীদের জন্য আচরণবিধি নতুন কিছু নয়। কেন্দ্র ও রাজ্য—দুই স্তরেই পরিষেবা নিয়মে সরকারি তথ্য প্রকাশ, সংবাদমাধ্যমে অবস্থান জানানো বা রাজনৈতিক মন্তব্য নিয়ে আগেও বিধিনিষেধ ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক এই নির্দেশিকাকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা থেকে স্পষ্ট, সরকারি কর্মীদের মতপ্রকাশের সীমা কোথায় শেষ হবে, সেই প্রশ্ন এখনও রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে রয়েছে।








