সরকারি কর্মীদের মুখ বন্ধের ফরমান, প্রশাসনিক ও কর্মিবিনিয়োগ দফতরের তরফে কড়া নির্দেশিকা

West Bengal government employees: প্রশাসনিক ও কর্মিবিনিয়োগ দফতরের নতুন কড়া নির্দেশিকায় সরকারি কর্মীদের কোন কোন বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে? কাদের জন্য এই নির্দেশিকা প্রযোজ্য? নির্দেশিকা ভাঙলে কী ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে?

inscript
৩ মিনিট
সরকারি কর্মীদের মুখ বন্ধের ফরমান, প্রশাসনিক ও কর্মিবিনিয়োগ দফতরের তরফে কড়া নির্দেশিকা

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রশাসনিক ও কর্মিবিনিয়োগ দফতরের তরফে সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন করে একগুচ্ছ কড়া নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে। নবান্ন থেকে প্রকাশিত এই নির্দেশিকায় সরকারি আধিকারিক ও কর্মীদের সংবাদমাধ্যমে মন্তব্য করা, প্রশাসনিক নথি বা তথ্য বাইরে প্রকাশ করা এবং প্রকাশ্যে সরকারবিরোধী মতামত দেওয়ার ক্ষেত্রে একাধিক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। মুখ্যসচিব মনোজ অগ্রবালের স্বাক্ষরিত এই নির্দেশিকা ইতোমধ্যেই রাজ্যের সমস্ত দফতর, জেলা প্রশাসন, কমিশনারেট এবং পুলিশ প্রশাসনের কাছে পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে অধীনস্থ প্রতিটি অফিসে দ্রুত তা কার্যকর করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

রাজ্য প্রশাসনের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সরকারি কর্মচারীর মন্তব্য, সামাজিক মাধ্যমে মত প্রকাশ এবং প্রশাসনিক তথ্য বাইরে চলে যাওয়া নিয়ে একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। সেই প্রেক্ষিতেই সরকারি আচরণবিধি আরও কঠোর ভাবে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এই নির্দেশিকা প্রকাশ্যে আসার পর রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এর ফলে সরকারি কর্মচারীদের মতপ্রকাশের পরিসর আরও কমে যেতে পারে।

নতুন নির্দেশিকায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, সরকারের অনুমতি ছাড়া কোনো সরকারি কর্মচারী সংবাদমাধ্যমে মন্তব্য করতে পারবেন না। কোনো টেলিভিশন আলোচনা, সংবাদমাধ্যমের অনুষ্ঠান, বিতর্কসভা বা বেসরকারি সংস্থার স্পনসর করা প্রোগ্রামে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রশাসনিক দফতরের বক্তব্য, সরকারি কর্মীদের প্রকাশ্য মন্তব্য যাতে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা বা সরকারি অবস্থানকে প্রভাবিত না করে, সে কারণেই এই নিয়ম জারি করা হয়েছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ডিটেক্ট ডিলিটি ডিপোর্ট নীতি কার্যকর মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ, কীভাবে প্রণয়ন?

Suvendu Adhikari: ‘ডিটেক্ট-ডিলিট-ডিপোর্ট’ নীতি কী? অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করা থেকে শুরু করে সরকারি নথি থেকে নাম বাদ দেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত দেশে ফেরত পাঠানোর পুরো প্রশাসনিক প্রক্রিয়া কীভাবে কাজ করে?

এই নির্দেশিকা শুধু উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের জন্য নয়। এর আওতায় আনা হয়েছে ডবলিউবিসিএস আধিকারিক, পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ সার্ভিসের কর্মী, বিভিন্ন দফতরের সরকারি কর্মচারী, জেল কর্মী, সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্মী, পুরসভা ও পুরনিগমের কর্মচারী, বোর্ড এবং বিভিন্ন স্বশাসিত সংস্থার কর্মীদেরও। অর্থাৎ রাজ্যের প্রশাসনিক কাঠামোর প্রায় সমস্ত স্তরের সরকারি কর্মচারীর ক্ষেত্রেই এই নিয়ম কার্যকর হবে।

কাদের জন্য এই নির্দেশিকা প্রযোজ্য, তা নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়েছে। স্থায়ী বা অস্থায়ী—যে কোনা সরকারি কর্মচারীকেই এই আচরণবিধি মেনে চলতে হবে। সরকারি বেতনভুক্ত কর্মী ছাড়াও যেসব প্রতিষ্ঠান সরকারি অনুদান পায় বা প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়, সেখানকার কর্মীরাও এই নিয়মের আওতায় পড়বেন। ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে স্থানীয় প্রশাসনিক সংস্থা, সর্বত্রই এই নির্দেশিকার প্রভাব পড়তে চলেছে।

কোন কোন বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে? প্রথমত, সরকারের অনুমতি ছাড়া কোনো সরকারি তথ্য বা নথি সংবাদমাধ্যমের কাছে দেওয়া যাবে না। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে প্রশাসনিক কাগজপত্র বাইরে পাঠানোও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, কোনো সরকারি কর্মচারী সংবাদপত্র, সাময়িকী বা অন্য কোনো প্রকাশনায় সরকারের অনুমতি ছাড়া লেখা লিখতে পারবেন না। কোনো পত্রিকার সম্পাদনা, পরিচালনা বা নিয়মিত প্রকাশনার সঙ্গেও যুক্ত থাকা যাবে না।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
আরজি করের সেই সেমিনার রুম সিল হবে আবার

ঘটনার দীর্ঘদিন পরেও সেই সেমিনার রুমটিকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে নানা প্রশ্ন, রহস্য আর আইনি লড়াই। সম্প্রতি কলকাতা হাইকোর্ট এই সেমিনার রুমটিকে আবার নতুন করে ও নিশ্ছিদ্রভাবে সিল করার নির্দেশ দিয়েছে।

রেডিয়ো, টেলিভিশন বা অন্য কোনো সম্প্রচার মাধ্যমে বক্তব্য পেশের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম কার্যকর করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রশাসনিক অনুমতি ছাড়া সরকারি কর্মচারীরা জনসমক্ষে কোনো মতামত রাখতে পারবেন না। সামাজিক মাধ্যমেও সরকারি আচরণবিধি মেনে চলার কথা বলা হয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সরকারি কর্মচারীদের প্রকাশ্যে কেন্দ্র বা রাজ্য সরকারের নীতি ও সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। নির্দেশিকায় উল্লেখ করা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারীর মন্তব্য যদি সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করে বা প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তা হলে সেটিকে শৃঙ্খলাভঙ্গ হিসেবে দেখা হবে। এমনকি বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, এমন মন্তব্য বা প্রকাশনাকেও শাস্তিযোগ্য বলে বিবেচনা করা হবে।

প্রশাসনিক মহলের একাংশের মতে, সরকারি কর্মচারীদের জন্য এই ধরনের আচরণবিধি নতুন নয়। কেন্দ্র ও বিভিন্ন রাজ্য সরকারের পরিষেবা নিয়মেও সরকারি কর্মচারীদের রাজনৈতিক মন্তব্য, সরকারি নথি প্রকাশ বা সংবাদমাধ্যমে অবস্থান জানানো নিয়ে বিধিনিষেধ আগে থেকেই রয়েছে। তবে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এই নতুন নির্দেশিকায় বিষয়গুলিকে আরও স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়েছে এবং তা কঠোর ভাবে কার্যকর করার বার্তা দেওয়া হয়েছে।

শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কথাও বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট ভাবে বলা হয়েছে। প্রশাসনিক ও কর্মিবিনিয়োগ দফতর জানিয়েছে, সরকারি কর্মচারীদের কার্যকলাপের উপর নিয়মিত পর্যবেক্ষণ চালানো হবে। কোনো কর্মচারী নির্দেশিকা লঙ্ঘন করলে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত শুরু হতে পারে। প্রয়োজনে বিচারবিভাগীয় ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।

প্রতিটি দফতরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাতে এই সার্কুলার সমস্ত অফিসে পৌঁছে দেওয়া হয় এবং কর্মচারীদের তা জানানো হয়। প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সরকারি তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষাই এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য বলে দাবি সরকারের। তবে বিরোধী মহলের একাংশের বক্তব্য, এই নির্দেশিকার ফলে সরকারি কর্মচারীদের স্বাধীন মতপ্রকাশের ক্ষেত্র কমে যেতে পারে এবং সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে প্রশাসনের স্বাভাবিক যোগাযোগেও প্রভাব পড়তে পারে।

রাজ্যের রাজনৈতিক পরিসরে এই নির্দেশিকা ইতোমধ্যেই নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। একদিকে সরকার প্রশাসনিক শৃঙ্খলার যুক্তি তুলে ধরছে, অন্যদিকে সমালোচকদের প্রশ্ন, সরকারি কর্মচারীদের উপর নজরদারি বাড়িয়ে কি মতপ্রকাশের পরিসর নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে?

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

আইডিবিআই বিক্রির সিদ্ধান্তে ক্ষোভ, রাহুলের চিঠিতে জোর পেল ব্যাঙ্ক কর্মীদের আন্দোলন

IDBI Bank on sale: কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার অনুমোদনে, আইডিবিআই ব্যাঙ্কের ৬০.৭২ শতাংশ মালিকানা কানাডার ফেয়ারফ্যাক্সের সহযোগী প্রতিষ্ঠানের কাছে ₹৫২,৮৭৮ কোটি টাকায় বিক্রির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। রাহুল গান্ধী ব্যাঙ্ক কর্মীদের পাশে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, লোকসানে থাকা ব্যাঙ্ক মুনাফায় ফেরার পর কেন বিক্রি করছে সরকার? ২ ও ৩ নভেম্বর দেশব্যাপী অনশনের ডাক ব্যাঙ্ক কর্মচারীদের।

জিও-র আইপিও: সাধারণ মানুষ শেয়ারহোল্ডার, কিন্তু ক্ষমতার ভাগীদার কতটা?

Jio Platforms IPO launch: ৩০,২১৩ কোটি টাকার জিও প্ল্যাটফর্মস আইপিও ভারতের ইতিহাসে বৃহত্তম। প্রমোটার রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের হাতে রয়েছে ৬৪.৫ শতাংশ শেয়ার। সত্যিই কি এর শেয়ারহোল্ডার হওয়া মানেই আম্বানিদের অর্থনৈতিক ক্ষমতার অংশীদার হওয়া?

হাঙ্গেরি থেকে ভারত: 'প্রজেক্ট ২০২৫'বিশ্ব দক্ষিণপন্থার নতুন বাইবেল?

Heritage Foundation's Project 2025: হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের ‘প্রজেক্ট ২০২৫’ কেবল আমেরিকার প্রশাসনিক নীলনকশা নয়, জাতীয়তাবাদ ও রক্ষণশীল মতাদর্শকে রাষ্ট্রক্ষমতায় রূপান্তরের মাধ্যমে এটি ক্রমশ আন্তর্জাতিক দক্ষিণপন্থী রাজনীতির এক প্রভাবশালী বৈশ্বিক নির্দেশিকা বা রূপক ‘বাইবেল’ হয়ে উঠছে।

এসআইআর: কতজন ঘুষপেটিয়া পাওয়া গেল?

SIR Process & Voter Deletions: অনুপ্রবেশকারীদের বের করার নামে এসআইআরে কোটি কোটি নাগরিকের নাম বাদ গেলেও বিদেশি মিলল মাত্র হাতে গোনা?

এসআইআর বাতিলের দাবি হিউম্যান রাইটস ওয়াচের, কী বলছে আন্তর্জাতিক সংস্থা?

Special Intensive Revision SIR: ভারতে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) প্রক্রিয়া অবিলম্বে বন্ধের দাবি জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। তথ্যগত ত্রুটির কারণে সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক কোটি কোটি মানুষের ভোটাধিকার এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধা হরণ হচ্ছে বলে সংগঠনটির অভিযোগ।

SRFTI-তে পুলিশ মোতায়েন ঘিরে বিতর্ক, হাইকোর্টে যাওয়ার হুঁশিয়ারি ছাত্রদের

পুলিশ মোতায়েনের আইনি ভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে ছাত্র সংসদ। ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা, ২০২৩-এর ১৬৮ থেকে ১৭২ ধারার উল্লেখ করে বলা হয়েছে, পুলিশের প্রতিরোধমূলক ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট আইনগত শর্ত পূরণ করা প্রয়োজন।

কর্পোরেট যুদ্ধ: আদানি-আম্বানির থেকে টাটারা পিছিয়ে পড়ছেন কীভাবে?

Tata group crisis 2026: নোয়েল টাটা সত্তর বছর বয়সে ছ'টি পর্ষদ ছাড়ছেন। সাম্প্রতিককালে তাঁদের ব্যবসায় ক্ষতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭,৮৫৪ কোটি টাকা। রাহুল গান্ধী অভিযোগ করছেন, আদানি আম্বানিকে বেশি সুবিধা দিয়ে সরকার, টাটাদের ধ্বংস করছে।

কেন ফের শাস্তির মুখে জাফর পানাহি?

Panahi on Trial: কান-জয়ী ইরানি পরিচালক জাফর পানাহিকে তেহরানের রেভোলিউশনারি কোর্ট নতুন মামলায় পাঁচ বছর এক মাসের কারাদণ্ড ও সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দিয়েছে। দু'বছরের বিদেশ ভ্রমণ ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে।