ভেনেজুয়েলায় আগ্রাসনের পর ট্রাম্পকে নোবেল: মাচাদোর আসল স্বার্থ কোথায়?
Nobel Peace Prize controversy Maria Corina Machado: মাচাদোর রাজনৈতিক অতীত খতিয়ে দেখলে নোবেল শান্তি পুরস্কারের সঙ্গে একাধিক মৌলিক অসঙ্গতি চোখে পড়ে। ২০১৮ সালে তিনি সরাসরি ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে চিঠি লিখে ভেনেজুয়েলার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপসারণের জন্য বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপের আবেদন জানিয়েছিলেন।
অবশেষে নোবেল পেলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুদ্ধ থামানোর দাবিতে একাধিকবার নিজেকে ‘শান্তি নোবেল’ সম্মানের দাবিদার বলেছিলেন তিনি। তাঁর সেই ইচ্ছা শেষমেষ পূরণ হলো। ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রী মারিয়া করিনা মাচাদো নিজের নোবেল পুরস্কার তুলে দিলেন ট্রাম্পের হাতে। যা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠছে বৈশ্বিক রাজনৈতিক অঙ্গনে। সম্প্রতিই ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে সে দেশের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে আটক করে আমেরিকা। সেই আগ্রাসনের সামনেই কি মাথা নত করলেন ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রী? নাকি এর পিছনে লুকিয়ে তাঁর কোনো রাজনৈতিক স্বার্থ?
গত বছর ১০ অক্টোবর নোবেল কমিটির ঘোষণা করে, ২০২৫ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার পাচ্ছেন ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো। নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান জর্জেন ওয়াটনে ফ্রাইডনেসের ব্যাখ্যা ছিল, দীর্ঘদিন বিভক্ত থাকা ভেনেজুয়েলার বিরোধী শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং অবাধ নির্বাচন ও প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারের দাবিকে সামনে আনার ক্ষেত্রে মাচাদোর ভূমিকা ‘ঐতিহাসিক’। কিন্তু পুরস্কার ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে, এই ‘শান্তি’ ঠিক কোন রাজনীতির প্রতিনিধিত্ব করছে?
মাচাদোর রাজনৈতিক অতীত খতিয়ে দেখলে নোবেল শান্তি পুরস্কারের সঙ্গে একাধিক মৌলিক অসঙ্গতি চোখে পড়ে। ২০১৮ সালে তিনি সরাসরি ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে চিঠি লিখে ভেনেজুয়েলার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপসারণের জন্য বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপের আবেদন জানিয়েছিলেন। শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক সংগ্রামের বদলে সামরিক আগ্রাসনের আহ্বান, নোবেল শান্তি পুরস্কারের ঘোষিত আদর্শের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
US Venezuela relations: জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দফতরের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে বড় কোকেন বাজার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
২০২০ সালের ২১ জুলাই মাচাদোর দল ‘ভেন্তে ভেনেজুয়েলা’ ইজরায়েলের ক্ষমতাসীন দল লিকুদের সঙ্গে একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তি সই করে। সেই চুক্তিতে কেবল রাজনৈতিক বা মতাদর্শগত সহযোগিতাই নয়, বরং ‘স্ট্র্যাটেজিক, ভূ-রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিষয়ক’ অংশীদারিত্বের কথাও স্পষ্ট ভাবে উল্লেখ ছিল। এই জোটের সময়কালও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ভেনেজুয়েলা ২০০৯ সালে গাজায় ইজরায়েলি অভিযানের প্রতিবাদে তেল আভিভের সঙ্গে সমস্ত কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল। মাচাদোর অবস্থান কার্যত সেই ঐতিহাসিক রাষ্ট্রনীতির সম্পূর্ণ বিপরীত।
২০২২ সালের জানুয়ারিতে মাচাদো ও প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী এদমুন্দো গোনসালেস ইজরায়েলের বিদেশমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। এই বৈঠকটি নিকোলাস মাদুরোর সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী দলের আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের প্রচেষ্টার একটি অংশ ছিল, কারণ ইজরায়েল মাদুরোর বিজয়কে স্বীকৃতি দেয়নি। এই ঘটনাগুলি মাচাদোর আন্তর্জাতিক অবস্থানকে আরও স্পষ্ট করে যে, তিনি ভেনেজুয়েলাকে পশ্চিমা ও ইজরায়েলি বলয়ের অংশ করতে আগ্রহী।
মাচাদোর বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলির একটি ২০০২ সালের ভেনেজুয়েলার ব্যর্থ অভ্যুত্থানের সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতা। গণতান্ত্রিক ভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট উগো সাভেজকে উৎখাতের সেই চেষ্টায় তিনি ‘কারমোনা ডিক্রি’-তে সই করেছিলেন; যে ডিক্রি সংবিধান বাতিল করে রাতারাতি সমস্ত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ভেঙে দেয়। এরপর বহু বছর ধরে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ে ভেনেজুয়েলার শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন জোগানোর কাজ করেছেন তিনি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Donald Trump: ট্রাম্পের প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায়ও কখনও সফল হয়নি। তিনি ২০১৭ সালে জেরুজালেমকে ইজরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা করেছিলেন, যা প্যালেস্টাইনিদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করে।
এই প্রেক্ষাপটেই সবচেয়ে বিতর্কিত ঘটনা ঘটে গেল ২০২৬ সালের ১৫ জানুয়ারি। মাচাদো তাঁর প্রাপ্ত নোবেল শান্তি পুরস্কারের পদক তুলে দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে। তাঁর যুক্তি, ভেনেজুয়েলায় ‘স্বাধীনতা’ ফেরানোর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার জন্য ট্রাম্প এই সম্মানের যোগ্য। কয়েক দিন আগেই মার্কিন সেনা অভিযানে প্রেসিডেন্ট মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে আটক করে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হয়। মাচাদো সেই সামরিক অভিযানকেই ‘স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা’ হিসেবে দেখেছেন।
হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের পর মাচাদোর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হন ট্রাম্প নিজেও। যদিও নোবেল কমিটি আগেই স্পষ্ট করেছিল, নোবেল শান্তি পুরস্কার কোনো ভাবেই হস্তান্তরযোগ্য নয়। পুরস্কার প্রাপকের নাম একবার ঘোষিত হলে তা চূড়ান্ত।
ট্রাম্পকে সমর্থন করার নেপথ্যে লুকিয়ে মাচাদোর কোন স্বার্থ? বিশ্লেষকদের মতে, মাচাদোর রাজনৈতিক লক্ষ্য স্পষ্ট। ভেনেজুয়েলায় সরকার বদল, রাষ্ট্রীয় সম্পদের বেসরকারিকরণ এবং পশ্চিমা কর্পোরেট ও সামরিক স্বার্থের জন্য দেশকে উন্মুক্ত করা। তেল, জল ও পরিকাঠামো বেসরকারি মালিকানার হাতে তুলে দেওয়ার যে নীতি তিনি সমর্থন করছেন, তা নব্বইয়ের দশকের লাতিন আমেরিকার নয়া-উদারনীতিক পরীক্ষারই পুনরাবৃত্তি। নিকোলাস মাদুরোকে মার্কিন সেনা আটক করলেও, মাচাদোর উদ্দেশ্য পূরণ হয়নি এখনও। ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী সরকার চালাচ্ছে সেদেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ। ক্ষমতার মসনদে বসতেই কি মরিয়া মাচাদো ট্রাম্পকে খুশি করতে নোবেল পুরস্কার তুলে দিলেন তাঁর হাতে?
গাজায় চলমান গণহত্যার প্রেক্ষাপটে; যেখানে সরকারি হিসেবেই লক্ষাধিক হতাহত, হাজার হাজার শিশু নিহত, হাসপাতাল ও পরিকাঠামো ধ্বংস তখন নেতানিয়াহুকে সমর্থনকারী মাচাদোর মতো নেত্রী যিনি একদা বলেছেন,
ভেনেজুয়েলার সংগ্রাম ইজরায়েলের সংগ্রাম
তাঁকে শান্তির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা নোবেল কমিটির নিরপেক্ষতা নিয়েই প্রশ্ন উঠে যায়। সব মিলিয়ে প্রশ্নটা থেকেই যায়, মারিয়া কোরিনা মাচাদো কি আদৌ ‘শান্তির দূত’! নাকি ওয়াশিংটন-কেন্দ্রিক আগ্রাসী রাজনীতির এক ঝকঝকে মুখ? এই প্রশ্নের উত্তরই আজ নোবেল শান্তি পুরস্কারকে ঘিরে সবচেয়ে বড় বিতর্ক।






