ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে ট্রাম্পের মাদক পাচারের অভিযোগ কতটা সত্য?

US Venezuela relations: জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দফতরের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে বড় কোকেন বাজার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

Tanvia Barua
৩ মিনিট
ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে ট্রাম্পের মাদক পাচারের অভিযোগ কতটা সত্য?

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার সম্পর্ক বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক সংবাদ ও কূটনৈতিক বিশ্লেষণের কেন্দ্রবিন্দু। এক সময়, দু’দেশের মধ্যে তেল ও জ্বালানির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তবে রাজনৈতিক মতাদর্শের পার্থক্য, নেতৃত্বের পরিবর্তন এবং বিদেশের চাপের কারণে সম্পর্ক ধীরে ধীরে অবিশ্বাস এবং সংঘাতের দিকে এগোতে থাকে। বিশেষ করে মাদুরো সরকারের সময়ে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বারবার ভেনেজুয়েলাকে ‘নার্কো-স্টেট’ আখ্যা দিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, মাদুরো সরকারের অধীনে দেশটি মাদক পাচারের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে।

কিন্তু তথ্য বলছে, ভেনেজুয়েলা সরাসরি মাদক পাচারে খুব বেশি জড়িত নয়। দেশটি মূলত মধ্যবর্তী পথ হিসেবে কাজ করে; মাদক এখানে উৎপাদিত হয় না, শুধু অন্য দেশ থেকে আসা মাদক দেশটি দিয়ে অন্যত্র যায়। কলম্বিয়া বিশ্বের প্রধান কোকেন উৎপাদনকারী দেশ। এর অধিকাংশ কোকেন প্রশান্ত মহাসাগরের পথ ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছায়। ফেন্টানিল, যা হেরোইনের চেয়ে ৫০ গুণ শক্তিশালী এবং যুক্তরাষ্ট্রে ওপিওয়েড অতিরিক্ত সেবনের প্রধান কারণ, মূলত মেক্সিকোতে তৈরি হয় এবং স্থলপথে দক্ষিণ সীমান্ত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আসে। ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ডিইএ)-এর ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে দেখা গিয়েছে, ভেনেজুয়েলার নাম ফেন্টানিল বা কোকেনের মূল উৎস হিসেবে নেই।

জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দফতরের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে বড় কোকেন বাজার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। অর্থাৎ মাদক সমস্যা কেবল উৎপাদনকারী দেশগুলোয় সীমাবদ্ধ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের বাজার এত বড় যে, অন্য দেশ থেকে আসা মাদকও এখানে পৌঁছাতে পারে। ফলে দায়ের অনেকাংশ যুক্তরাষ্ট্রের উপরও আসে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মাদুরো থেকে চাভেস: যেভাবে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বারবার হস্তক্ষেপ

US Venezuela relations: একবিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে দৃশ্যপট নাটকীয়ভাবে বদলাতে শুরু করে। ভেনিজুয়েলার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট উগো চাভেস ক্ষমতায় এসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অবস্থানকে রাষ্ট্রনীতিতে পরিণত করেন।

মাদক পাচারের আন্তর্জাতিক রুটও বোঝা জরুরি। ৮০-এর দশকে কলম্বিয়ার কার্টেলগুলো মূলত ক্যারিবিয়ান সাগরপথ ব্যবহার করত। সেই সময় পথ তুলনামূলকভাবে নিরাপদ ছিল। একুশ শতকে এই পথ নিরাপদ না থাকায় পাচারকারীরা স্থলপথ অবলম্বন করে। পানামা, কোস্টা রিকা, নিকারাগুয়া, গুয়েতেমালা দিয়ে নতুন করিডর তৈরি হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে এই দেশগুলিতেও নজরদারি বেড়ে যাওয়ায় আবার ইকুয়েডর ও ভেনেজুয়েলার পথে ফোকাস বেড়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ মূলত মাদুরো সরকারের উপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে চায়। ২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রশাসন ক্যারিবীয় অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বড় আকারে বাড়ায়। উন্নত প্রযুক্তির যুদ্ধজাহাজ, নজরদারি বিমান এবং হাই-টেক অপারেশনগুলি ভেনেজুয়েলার উপকূলের কাছে অবস্থান করে। ওয়াশিংটনের দাবি ছিল, এটি আন্তর্জাতিক মাদক চক্র দমন এবং নৌপথে অপরাধ প্রতিরোধের অংশ। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপের আসল উদ্দেশ্য ছিল শক্তি দেখানো ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি করা; এটি শুধু অভিযানের বিষয় ছিল না। বিশেষ করে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মাদুরোকে গ্রেফতারের জন্য পুরস্কারের অঙ্ক বাড়িয়ে দেয় এবং সরকারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তখন এই মহড়াকে কেবল মাদকবিরোধী অভিযান বলা যায় না।

কারাকাস দাবি করেছিল, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ করছে এবং মূল লক্ষ্য সরকারকে অস্থিতিশীল করা। মাদুরো ঘোষণা করেছিলেন, প্রয়োজন হলে দেশকে ‘প্রতিরোধের প্রজাতন্ত্র’ হিসেবে গড়ে তোলা হবে। যদি বিদেশি হস্তক্ষেপ হয়, সর্বোচ্চ সামরিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে। এই কঠোর অবস্থানই ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপ আরও কড়া করেছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
প্যালেস্টাইন থেকে ভেনেজুয়েলা: হানাদার ট্রাম্পের নোবেল শান্তি পুরস্কার চাই!

Donald Trump: ট্রাম্পের প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায়ও কখনও সফল হয়নি। তিনি ২০১৭ সালে জেরুজালেমকে ইজরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা করেছিলেন, যা প্যালেস্টাইনিদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভেনেজুয়েলার মূল ভূমিকা মাদক পাচারে ছোট। দেশটি শুধু মধ্যবর্তী পথ হিসেবে কাজ করে। কোকেনের উৎপাদন হয় কলম্বিয়া, ফেন্টানিল মূলত মেক্সিকোতে তৈরি হয়, এবং মার্কিন বাজার সবচেয়ে বড়। তাই দায় ও দোষের ভার মূলত উৎপাদনকারী দেশ, পরিবহণ পথ এবং ব্যবহারকারী বাজার— এই তিনটির মধ্যে ভাগ হওয়ার কথা।

এখানে ফেন্টানিলের প্রসঙ্গও গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি সিনথেটিক মাদক, যা হেরোইনের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ট্রাম্প মার্কিন সামরিক নেতাদের বলেছেন, নৌকাগুলিতে "সাদা গুঁড়োর ব্যাগ স্তূপ করে রাখা হয়েছে, যা মূলত ফেন্টানিল ও অন্যান্য মাদক।" ১৫ ডিসেম্বর তিনি নির্বাহী আদেশে ফেন্টানিলকে 'গণবিধ্বংসী অস্ত্র' বলে ঘোষণা করেন। যুক্তি দেন, এটি কেবল মাদক নয়, বরং রাসায়নিক অস্ত্রের মতো প্রভাব ফেলে। তবে ফেন্টানিল মূলত মেক্সিকোতে উৎপাদিত হয় এবং স্থলপথে যুক্তরাষ্ট্রে আসে। ডিইএ-এর ২০২৫ সালের প্রতিবেদনেও ভেনেজুয়েলার নাম উল্লেখ হয়নি। ডিইএ (United States Drug Enforcement Administration) যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান সংঘটিত আইনশঙ্খলা পরিষদ, যারা দেশজুড়ে ও আন্তর্জাতিকভাবে ঔষধবিরোধী নীতি ও তথ্য সংগ্রহ করে।

প্রসঙ্গত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণে ভেনেজুয়েলার সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। খবর ও ঔষধের অভাব, মুদ্রাস্ফীতি, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সংকট— সব মিলিয়ে মানুষের জীবন এমনি বিপর্যস্ত ছিলই। সামরিক উত্তেজনা এই দুর্ভোগ আরও বাড়াবে, শরণার্থী সংকট বৃদ্ধি পাবে, মানবাধিকার লঙ্ঘন তীব্র হবে, সীমান্তবর্তী দেশগুলিও প্রভাব অনুভব করবে বলে মনে করছে বিশেষজ্ঞ মহল। রাজনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকেও পরিস্থিতি জটিল। রাশিয়া ও চিন ভেনেজুয়েলার পাশে দাঁড়িয়েছে। তারা প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের সমালোচনা করছে।

তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, যে সমস্যার উৎপাদন এক দেশে, পরিবহণ আরেক দেশে, আর সবচেয়ে বড় বাজার অন্য আরেকটি দেশে, তার দায় কি শুধু একটি দেশের ঘাড়ে চাপানো যায়? ভেনেজুয়েলাকে ‘নার্কো-স্টেট’ আখ্যা দেওয়া কি বাস্তব তথ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ? ডিইএ ও জাতিসংঘের প্রতিবেদন যেখানে ভিন্ন ছবি তুলে ধরছে, সেখানে সামরিক চাপ ও রাজনৈতিক হুমকি কি সত্যিই সমস্যার সমাধান করবে? নাকি এই কৌশল আরও অস্থিতিশীলতা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাই বাড়াবে?

লিখেছেন
Tanvia Barua
Tanvia Barua
7 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেন তুলে দিতে হচ্ছে মাদ্রাসা কমিশন? প্রশ্ন শিক্ষামহলের

West Bengal decides to merge Madrasah Service Commission: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।

আমার উৎসব, ওঁদের আরও একটা দীর্ঘ কাজের দিন

Durga Puja for Gig Workers: গিগ কর্মীদের দুর্গাপুজোর চার দিন কীভাবে কাটে? বাড়তি উপার্জনের আশায় ব্যক্তিগত আনন্দ, উৎসবের আমেজ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর সময় থেকে কতটা বিসর্জন দিতে হয় তাঁদের?

বাংলাদেশে রবীন্দ্র-বিরোধিতা নিয়ে কী বলছেন বুদ্ধিজীবীরা?

Tagore graffiti vandalism Bangladesh: বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? বুদ্ধিজীবীরা কী বলছেন?

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? সরকার বদলায়, কেন বদলায় না মন?

Rabindranath Tagore Targeted in Bangladesh: বাংলাদেশে বারবার কেন নিশানা হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর? হাসিনা থেকে ইউনূস, সরকার বদলালেও কেন থামছে না তাঁর সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার মুছে ফেলার চেষ্টা? জাতীয় সঙ্গীতের স্রষ্টাকেই কেন বারবার প্রত্যাখ্যানের মুখে পড়তে হচ্ছে?

যন্তর মন্তরে ঢুকে বিক্ষোভ, পাঁচ দিনের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে সিজেপি-র দুই নেতা

Jantar Mantar protest: যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের জেরে সিজেপি নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে পাঁচ দিনের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠাল আদালত। নির্বাচন কমিশন, এসআইআর এবং প্রতিবাদের অধিকার ঘিরে বাড়ছে বিতর্ক।

দিল্লিতে মহিলা বিক্ষোভকারীদের হেনস্থার অভিযোগ, পুলিশের ভূমিকা নিয়ে উঠছে যে সব প্রশ্ন

Delhi protest: দিল্লিতে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ ঘিরে মহিলা আন্দোলনকারীদের একাংশ পুলিশের বিরুদ্ধে হেনস্থা ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছেন। এই ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা ও প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে উঠছে একাধিক প্রশ্ন।

২৩ দিনের অনশন থেকে জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন, রাজপথই নেহা বোরার হয়ে ওঠার সাক্ষী

Neha Bora: ২৩ দিন ধরে অনশন করে যেমন তিনি সংবাদমাধ্যমের নজরে এসেছিলেন, তেমনই সম্প্রতি দিল্লির রাজপথে পুলিশের বাধা অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টাও তাঁকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।