ডিলিমিটেশন: একটি আসনও কমবে না, অমিত শাহের দাবি কেন মানছে না দক্ষিণ ভারত?

Delimitation: দক্ষিণের রাজ্যগুলির লোকসভা আসন কি সত্যিই কমবে না? কেন্দ্রের এই আশ্বাস কি উত্তর-দক্ষিণ বিভাজনের আশঙ্কা কমাতে পারবে? ডিলিমিটেশন, জনসংখ্যা এবং আসন পুনর্বিন্যাস নিয়ে কেন বাড়ছে রাজনৈতিক বিতর্ক?

inscript
৪ মিনিট
 ডিলিমিটেশন: একটি আসনও কমবে না, অমিত শাহের দাবি কেন মানছে না দক্ষিণ ভারত?

লোকসভায় ভাষণে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ দাবি করেছেন, আসন্ন ডিলিমিটেশন বা আসন পুনর্বিন্যাসে দক্ষিণ ভারতের কোনো রাজ্যের ক্ষতি হবে না। তাঁর বক্তব্য, দক্ষিণের রাজ্যগুলির একটি আসনও কমবে না, বরং লোকসভায় তাদের প্রতিনিধিত্ব বাড়বে। কিন্তু এই বক্তব্য ঘিরেই নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

ডিলিমিটেশন মানে হলো জনসংখ্যার ভিত্তিতে লোকসভা ও বিধানসভার আসন নতুন করে ভাগ করা। ভারতে শেষবার ডিলিমিটেশন হয়েছিল ১৯৭১ সালের জনগণনার ভিত্তিতে। পরে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে উৎসাহ দিতে ১৯৭৬ সালে আসন পুনর্বিন্যাসে স্থগিতাদেশ আনা হয়। পরে সেই স্থগিতাদেশ বাড়িয়ে ২০২৬ পর্যন্ত করা হয়। ফলে গত কয়েক দশকে দেশের জনসংখ্যা অনেক বদলালেও লোকসভার আসন সংখ্যা একই থেকেছে। বর্তমানে লোকসভায় ৫৪৩টি আসন রয়েছে। নতুন সংসদ ভবনে অবশ্য ৮৮৮টি আসনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে আসন সংখ্যা বাড়ার ইঙ্গিত বলেই ধরা হচ্ছে।

সমস্যা তৈরি হচ্ছে কারণ উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এক নয়। উত্তর ভারতের রাজ্যগুলিতে, বিশেষ করে উত্তর প্রদেশ ও বিহারে জনসংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। অন্যদিকে তামিলনাড়ু, কেরালা, কর্ণাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানা তুলনামূলকভাবে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে। দক্ষিণের রাজ্যগুলির অভিযোগ, তারা পরিবার পরিকল্পনা সফলভাবে কার্যকর করেছে বলেই আজ তাদের শাস্তি পেতে হতে পারে। কারণ জনসংখ্যার অনুপাতে যদি আসন ভাগ হয়, তাহলে উত্তর ভারতের রাজ্যগুলি অনেক বেশি আসন পাবে এবং দক্ষিণের রাজনৈতিক গুরুত্ব তুলনামূলকভাবে কমে যাবে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মহিলা সংরক্ষণ বিলের আড়ালে ২০২৯-এর রাজনৈতিক অঙ্ক কষছে কেন্দ্র?

Delimitation: ডিলিমিটেশন ও আসন বৃদ্ধির প্রস্তাবে কেন বাড়ছে উত্তর-দক্ষিণ বিভাজনের আশঙ্কা? মহিলাদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোই কি আসল লক্ষ্য, নাকি এর আড়ালে রয়েছে বড় রাজনৈতিক হিসাব?

এম কে স্ট্যালিন প্রথম থেকেই এই প্রশ্নে সরব। তাঁর অভিযোগ, ডিলিমিটেশন দক্ষিণ ভারতের উপর 'ঝুলন্ত তলোয়ার'-এর মতো। তিনি সব বিরোধী দলকে নিয়ে বৈঠকও ডাকেন। তাঁর বক্তব্য, দক্ষিণের রাজ্যগুলি দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখে, কর বেশি দেয়, শিক্ষায় ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এগিয়ে, অথচ শুধুমাত্র জনসংখ্যা কম থাকার কারণে তাদের সংসদীয় শক্তি কমে গেলে তা অন্যায় হবে।

এই পরিস্থিতিতে অমিত শাহ দাবি করেন, দক্ষিণের কোনো রাজ্যের একটি আসনও কমবে না। তাঁর কথায়, দক্ষিণের রাজ্যগুলির লোকসভা আসন সংখ্যা জনসংখ্যার অনুপাতে কমিয়ে দেওয়া হবে না। তিনি এমনও বলেছেন যে দক্ষিণ ভারতের পাঁচটি রাজ্যের লোকসভা আসন ১২৯ থেকে বেড়ে ১৯৫ হতে পারে।

কিন্তু এখানেই আপত্তি তুলছে বিরোধীরা। তাদের বক্তব্য, শুধুমাত্র আসন সংখ্যা বাড়লেই হবে না, দেখতে হবে মোট লোকসভায় সেই রাজ্যের অংশ কতটা থাকছে। উদাহরণস্বরূপ, যদি লোকসভার মোট আসন ৫৪৩ থেকে বেড়ে ৮০০-র বেশি হয়, তাহলে দক্ষিণের রাজ্যগুলির আসন সংখ্যা কিছুটা বাড়লেও উত্তর ভারতের রাজ্যগুলির আসন অনেক বেশি হারে বাড়তে পারে। ফলে দক্ষিণের মোট প্রতিনিধিত্বের শতাংশ কমে যাবে। অর্থাৎ কাগজে-কলমে আসন বাড়লেও সংসদে তাদের আপেক্ষিক রাজনৈতিক ক্ষমতা কমতে পারে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ডিলিমিটেশন কী, কেন করা হয়, কেন এখন আবার আলোচনায়?

West Bengal delimitation controversy: ডিলিমিটেশন নিয়ে কেন হঠাৎ এত বিতর্ক? কেন্দ্র কি সত্যিই বাংলাকে ভাগ করার পরিকল্পনা করছে? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কী অভিযোগ করেছেন? জনগণনা ছাড়াই ডিলিমিটেশন হলে কী বদল আসতে পারে দেশের নির্বাচনী মানচিত্রে?

প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী পি চিদম্বরম এই আশঙ্কাই সামনে এনেছেন। তাঁর মতে, ডিলিমিটেশনের পরে দক্ষিণ ভারতের প্রতিনিধিত্ব ২৪ শতাংশ থেকে নেমে প্রায় ২০ শতাংশে চলে যেতে পারে।

বিরোধীদের আরও একটি বড় প্রশ্ন হলো জনগণনা ছাড়া কীভাবে ডিলিমিটেশন হবে। দেশের শেষ জনগণনা হয়েছিল ২০১১ সালে। ২০২১ সালের জনগণনা এখনও হয়নি। ফলে ১৫ বছর আগের তথ্যের ভিত্তিতে নতুন করে আসন ভাগ করা হলে তা বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে মিলবে না। অনেকেই বলছেন, আগে জনগণনা করতে হবে, তারপর সেই তথ্যের ভিত্তিতে আলোচনা হওয়া উচিত।

এই বিতর্কের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নারী সংরক্ষণ বিলও। কারণ মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণের আইন কার্যকর হবে নতুন জনগণনা ও ডিলিমিটেশনের পরে। ফলে ডিলিমিটেশন যত দেরি হবে, নারী সংরক্ষণও তত পিছোবে। আবার ডিলিমিটেশন হলে নতুন আসন বণ্টনের সঙ্গে নারী সংরক্ষণ কার্যকর করা হবে।

বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ফেডারেল কাঠামো। দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলির আশঙ্কা, জনসংখ্যার ভিত্তিতে আসন বণ্টন হলে উত্তর ভারতের রাজনৈতিক প্রভাব অনেক বেড়ে যাবে। এমনিতে উত্তর প্রদেশ একাই ৮০টি লোকসভা আসন নিয়ে দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি। ভবিষ্যতে সেই সংখ্যা আরও বাড়লে জাতীয় রাজনীতিতে উত্তর ভারতের দাপট আরও বাড়তে পারে। এতে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কেও ভারসাম্যহীনতা তৈরি হতে পারে।

এই কারণেই অমিত শাহর আশ্বাসে এখনও পুরোপুরি ভরসা করতে পারছেন না দক্ষিণ ভারতের নেতারা। এখন প্রশ্ন হলো, ডিলিমিটেশন কি শুধুই জনসংখ্যার ভিত্তিতে হবে, না কি জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক অবদান, উন্নয়নের সূচক এবং ফেডারেল ভারসাম্যের মতো বিষয়ও বিবেচনা করা হবে? সেটাই দেখার।

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

মানুষ টাকা পেয়ে গেলে ভুলে যাবে, অন্নপূর্ণা যোজনা নিয়ে ক্ষোভ-বিক্ষোভ সম্পর্কে বললেন বিজেপি বিধায়ক সজল

Sajal Ghosh interview: ‘ভয় ছাড়া ভক্তি আসে না’— আইন-শৃঙ্খলা, দুর্গাপূজা বিতর্ক এবং তৃণমূলের দলবদল নিয়ে নিজের মতামত জানালেন বিজেপি নেতা সজল ঘোষ।

ভারতের রাজনীতি কতটা বদলে দিয়েছেন মোদী?

25 years of Narendra Modi: ২৫ বছরে মোদী কতটা বদলে দিয়েছেন ভারতের রাজনীতি? উন্নয়ন, নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক প্রচারের ধরন থেকে শুরু করে গণতন্ত্র, ধর্মীয় মেরুকরণ এবং জাতীয় পরিচয়ের ধারণা—কীভাবে বদলেছে দেশের রাজনৈতিক চালচিত্র?

ব্রাজিল থেকে আমেরিকা যে কারণে দক্ষিণপন্থীদের শাস্তি দিচ্ছে শান্তিকামী মানুষ

The Alt - right Tide Turns: বিশ্বজুড়ে দক্ষিণপন্থী জনতুষ্টিবাদের ভিত্তি কেঁপে উঠেছে। হাঙ্গেরিতে ১৬ বছরের অরবান-শাসনের অবসান, সার্বিয়ায় ছাত্র আন্দোলনের নির্বাচনী বিজয়, ব্রাজিলে প্রথম রাউন্ডে পিছিয়ে থেকেও লুলার জয়, আমেরিকায় মিডটার্মে ডেমোক্র্যাটদের সংসদের দুই কক্ষ দখল, সব মিলিয়ে বিশ্বজুড়ে অতি-দক্ষিণপন্থী জোয়ারে ভাটার সুর। তবে ফ্রান্স, পোল্যান্ড, ইতালিতে দক্ষিণপন্থা এখনও টিকে আছে। সেগুলির বিরুদ্ধেও চলছে জেনজিদের, শ্রমজীবী অভিবাসী মানুষদের বিক্ষোভ।

ডানাছাঁটা ট্রাম্প-নেতানিয়াহু, বিশ্ব রাজনীতি কোন দিকে যাবে?

Trump midterm defeat: আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির পরাজয় এবং ইজরায়েলের নির্বাচনে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানো—দুটি ঘটনাই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই পরাজয়ের পর ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ কী হবে? আমেরিকা-ইজরায়েল সম্পর্কের সমীকরণ কি বদলাবে? আর বিশ্ব রাজনীতিতে তার প্রভাবই বা কতটা পড়বে?

ট্রাম্পের হারের ৫ কারণ: কেন মুখ ফিরিয়ে নিলেন মার্কিন ভোটাররা?

US Midterm Elections: আমেরিকার মিডটার্ম নির্বাচনে বড় ধাক্কা খেল ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি।জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধি থেকে শুরু করে ট্রাম্পের নীতি—রিপাবলিকানদের ভরাডুবির পাঁচটি মূল কারণ কী কী?

পিস বন্ড কী, কেন দিতে হয়? নেহা বোরার আপত্তিতে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ঔপনিবেশিক আমলের আইন

Peace Bond: শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করলেই কি দিতে হবে পিস বন্ড? AISA-র জাতীয় সভাপতি নেহা বোরার আপত্তিতে নতুন করে বিতর্কে ঔপনিবেশিক আমলের প্রতিরোধমূলক আইন। ব্রিটিশ আমল থেকে স্বাধীন ভারত, CrPC থেকে BNSS—কীভাবে বদলেছে এই আইনি ব্যবস্থা? কেন কাউকে ১০ হাজার টাকার মুচলেকা দিতে বলা হয়? কী বলছে আইন?

রামলীলা ময়দানের সভায় ভিড় দেখাতে এআই ছবি? কতটা সত্যি?

Ramlila Maidan AI image controversy: দিল্লির রামলীলা ময়দানে ১ নভেম্বরের ‘ইন্ডিয়া’ জোটের সমাবেশে ভিড় ও এআই ছবি ব্যবহার নিয়ে বিজেপি ও কংগ্রেসের মধ্যে বিতর্ক তুঙ্গে। ভাইরাল ছবিগুলোর সত্যতা কী?

আবের কাওয়াস: প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান মুসলিম মহিলা নিউ ইয়র্কের সিনেটে

Aber Kawas: নিউ ইয়র্কের ১২ নম্বর সিনেট ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয়ী হয়ে ইতিহাস গড়লেন আবের কাওয়াস। নিউ ইয়র্ক স্টেট আইনসভায় তিনি প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান এবং প্রথম হিজাব পরিহিত মুসলিম মহিলা প্রতিনিধি।