সাধ্যের মধ্যে সাবেকি স্বাদ, ৯০ বছর পার করে এসেও যেভাবে বাঙালির প্রিয় 'বড়ুয়া বেকারি'

Baruya Bakery : যুগের পর যুগ ধরে বাঙালির রসনা-ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করছে কলকাতার বড়ুয়া বেকারি

Kankana Mukherjee
৩ মিনিট
সাধ্যের মধ্যে সাবেকি স্বাদ, ৯০ বছর পার করে এসেও যেভাবে বাঙালির প্রিয় 'বড়ুয়া বেকারি'

রাত পোহালেই বড়দিন। শহর কলকাতার ঘিঞ্জি অলিগলি থেকে শুরু করে খোদ পার্কস্ট্রিট চত্বর কিংবা শহরতলির আনাচে কানাচে এখন সাজো সাজো রব। রং বেরঙের আলোর রোশনাই আর লাল টুপির শহরে বাড়তি পাওনা হল পেটপুজো। বাঙালির যে এই বারো মাসে তেরো পার্বণের ভুত কবেই চোদ্দ পনেরো ষোলো কাটিয়ে হাজার পার্বণের দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়ে তা এখন আর আঁচ করা মুশকিল। বিবিধের মাঝে পড়ে বাংলার এখন হাঁসফাঁস অবস্থা। সব ধর্মকে মাথায় করে রাখার সবটুকু ইচ্ছে কেবল গিয়ে ঠেকেছে উৎসবে আর খানাপিনায়। বড়দিন তার ব্যতিক্রম নয়।

ডিসেম্বরের শহরে এমনিতেই বড় বেশি উত্তেজনা। আর এর শেষটুকু জমিয়ে রাখে ক্রিসমাস। এ সময় শহর এবং শহরতলির রাস্তায় উপচে পড়ে কেকের ভিড়। পথ চলতি ছোট বড় দোকান থেকে শুরু করে নামজাদা বেকারি সবেতেই ঠাসা কেক। কাপ কেক, বাটি কেক, বাপুজি কেকের থেকে খানিক আলাদা। নানা রঙের অ্যালুমিনিয়াম ফয়েলে মোড়া কেক। কোনোটা চৌকো, কোনটা গোল। তার ওপরে আবার নানা রঙের ডেকোরেশন। এতেই মজেছে আট থেকে আশি।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কেক বানাতে পারেন? শখ পেশা হলে উপার্জন লাখে, কীভাবে জানুন

চায়ের দোকানের কাটা কেক বা বাপুজী-র পাশাপাশি লাফিয়ে বাড়ছে ফ্যান্সি, ডেকরেটেড কেকের চাহিদা। তাই আপনি যদি এই সময় কোনও স্টার্ট আপ শুরু করতে চান, তাহলে কেকের কথাটা একেবারে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।

হাল আমলে কেক খাওয়া অবশ্য একটা ফ্যাশন। বছরভর দেদার ভিড় জমে দোকানে। যেকোনো উৎসবেই কেক কাটা দস্তুর। কিন্তু বড়দিনের কেক একটা অন্য আমেজ। আর এই নস্টালজিয়ায় জাঁকিয়ে বসে আছে বড়ুয়া বেকারি। শতাব্দীর দোরগোড়ায় এসেও দিব্যি টগবগে মেজাজে কলকাতার রসনা তৃপ্তির জোগান দিচ্ছে বড়ুয়ার দোকান।

বৌবাজার সংলগ্ন বো ব্যারাকের জে এন বেকারি ওরফে বড়ুয়া বেকারি। আধুনিকতার ভিড়ে আজও পাল্লা দিচ্ছেন এনারা। কলকাতার এই যে কেক ব্যবসা, তাতে অবশ্য অ্যাংলো ইন্ডিয়ানদের প্রাধান্যই বেশি ছিল। কিন্তু তাতে বিশেষ অসুবিধা হয়নি বড়ুয়াদের। তাঁদের ব্যবসার আসল এসেন্স হল গুণমান এবং সবেকিয়ানা। যা দীর্ঘ ৯০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাঙালির মুখে হাসি ফুটিয়ে আসছে। বড়ুয়ার কেক মানেই চিরন্তন একটা ফিরে দেখা। এ ফিরে দেখায় ভিড় করে আসে অজস্র ইতিহাস। যে ইতিহাসের পরতে পরতে রয়েছে নানা রকম খাবারে স্বাদ। হাল আমলের অতি প্রিয় অভ্যাসে যে টিফিন কেকের নাম শোনা যায়, তার স্রষ্টাও এঁরাই।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ডাকাতরা না থাকলে জন্মই হত না কেকের? বড়দিনে কেক কাটার যে কারণ অনেকেরই অজানা...

Christmas 2022: কোচি শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার ভেতরে গেলেই রয়েছে ম্যাটানচেরি নামে এক অদ্ভুত শহর।

সময়টা ১৯৩০ সাল। পূর্ববঙ্গের চট্টগ্রাম থেকে কলকাতায় প্রথম পা রাখলেন ছিন্নমূল মনোতোষ বড়ুয়া। শুরুতেই অবশ্য ব্যবসা জমানোর অর্থ হাতে ছিল না। তাছাড়া এই কেকের ব্যবসার কারিগরিও বিশেষ জানতেন না তিনি। তাই নামমাত্র বেতনে শিক্ষানবিশ হয়ে যোগ দিলেন তৎকালীন সম্ভ্রান্ত এক প্রতিষ্ঠানে। নাম ‘ফারপো’। কেক ব্যবসায় তাঁর আগ্রহ ছিল পুরোদস্তুর। তাই কম দিনের মধ্যেই আয়ত্ত করে ফেললেন কেক প্রস্তুতির খুঁটিনাটি। একদিকে পরিবারের দায়ভার অন্যদিকে নিশ্চিন্ত চাকরির আশ্রয় ছেড়ে ব্যবসা, কী করবেন বুঝতে পারেননি মনোতোষ। কিন্তু চোখে তখন ভিড় করে এসেছে হাজার রঙের স্বপ্ন। তাই আত্মবিশ্বাসের ওপর ভর করে চাকরি ছেড়ে নেমে পড়লেন ব্যবসায়। ঝুঁকি ছিল ঠিকই তবে মনের জোরে জয় করলেন সেই কঠিন পথ। মনোতষ ছিলেন খুবই পরিশ্রমী এক ব্যক্তিত্ব। তাই উচ্চতার শিখরে পৌঁছতেও বেশি সময় লাগল না তাঁর। অল্প সময়ের মধ্যেই কলকাতার অন্দরে জমিয়ে রাজ করল ‘বড়ুয়া বেকারি’।শহরবাসীর মুখে লেগে গেল বড়ুয়া বেকারির কেক পেট্রিসের লোভনীয় স্বাদ। ফ্রুট কেক থেকে শুরু প্লাম কেক খোদ বনেদি বাড়িতেও একটাই নাম, তা হল বড়ুয়ার কেক।

পারিবারিক গোলযোগ, মতের অমিল ব্যবসাকে ভেঙে দেয় পরবর্তী সময়ে। কলকাতায় এখন বড়ুয়া বেকারির চারটি শাখা। কিন্তু নামের জোরে যে পিছুটান আছে তা ফিকে হয়নি একটুও। যে বেকিং ব্যবসা শুরু করেছিলেন মনোতোষ বড়ুুয়া তা আরও এগিয়ে যায় তাঁর দুই উত্তরাধিকার সুধীর বড়ুয়া ও মনোরঞ্জন বড়ুয়ার হাত ধরে।

মধ্য কলকাতায় দীর্ঘ ৯০ বছর ধরে মধ্যবিত্তের মুখে হাসি ফুটিয়ে এসেছে বড়ুয়া বেকারী। সারা বছর অবশ্য কেক সেভাবে পাওয়া যায় না। বছরের এই সময়টাতে পাউরুটির ব্যবসায় জাঁকিয়ে বসে বড়ুয়ার কেক। এই ২০ দিনই মেলে এই কেকের দেখা। ডিসেম্বর এর শুরু থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত চলে কেকের রমরমা। যদিও আধুনিকতার ভিড়ে আজ বেশ খানিকটা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে বড়ুয়াড়া। তার ওপর নোট বন্দি, করোনা, এবং সর্বোপরি পরবর্তী প্রজন্মের ব্যবসায় অনীহা প্রতিযোগিতার বাজারে বড়ুয়া বেকারিকে বেশ খানিকটা পিছনে ঠেলে দিয়েছে। কোনোরকমে ঘুপচি ঘরে আজও শ্বাস ফেলছে বড়ুয়া বেকারি। কিন্তু দাম সেই ২৩০ এই আটকে। ওটাই সর্বোচ্চ কেকের মূল্য। সাধ্যের মধ্যে সাবেকি স্বাদ।

ব্যবসায় আগের রমরমা আর নেই ঠিকই তবু আবেগের সঙ্গে সবেকিয়ানার মিশেলে আজও বাঙালি ফিরে যায় বড়ুয়াদের দোকানে। আর বড়ুয়ারাও বাঙালির আবেগের দাম দিতে স্বল্প মূল্যেই হাতে তুলে দেন বড়ুয়ার কেক। পুরনো স্বাদে আজও লেগে রয়েছে সেকেলে ঐতিহ্যের রেশ। তাছাড়া আজকের আধুনিক কেকের বাজারে বড়ুয়ার মতো পকেটের এমন বন্ধু আর কে আছে!

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

মাছ-ভাত খেয়ে দেবী বরণ আর কী কী বিশেষ রীতি পালন করা হয় ২২০ বছরের রাজকৃষ্ণ মিত্র বাড়ির দুর্গাপুজোয়?

Rajkrishna Mitra House Durga Puja: দর্জিপাড়ার রাজকৃষ্ণ মিত্রের বাড়ির শতাব্দীপ্রাচীন দুর্গাপুজোতে ২২০ বছর ধরে একই রীতি মেনে পুজো হয়ে আসছে। তবে এই পুজোর বিশেষত্ব শুধু তার প্রাচীনত্বে নয়, দেবীর ভোগ, নৈবেদ্য, পারিবারিক খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে দশমীর বরণ; প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে নিজস্ব কিছু নিয়ম। যার মধ্যে অন্যতম, দশমীর দিন মাছ-ভাত খেয়ে দেবীকে বরণ করেন বাড়ির মহিলারা। আবার যে পুজোয় একসময় বলির রীতি ছিল, সেই পুজোতেই এখন বলির পরিবর্তে দেওয়া হয় চিনির নৈবেদ্য।

ইস্টবেঙ্গলের জয়ে কোমা ভেঙে চোখ মেলেছিলেন শচীনকর্তা

S D Burman's love for East Bengal: শচীনকর্তার একমাত্র পুত্র ‘পঞ্চম’ বাবার কানের কাছে চিৎকার করে উঠলেন— “বাবা… ইস্টবেঙ্গল জিতসে… পাঁচ-শূন্য!” আর তারপরই ... যে মানুষটি নির্জীব পড়েছিলেন, যাঁর স্নায়ু কোনো ডাকে সাড়া দিচ্ছিল না—তাঁর চোখের কোণ সামান্য কেঁপে উঠল। ধীরে ধীরে শচীনকর্তা তাঁর অক্ষিপট মেলে তাকালে। ব্যাস, ওইটুকুই। এর পর আর কোনোদিন তিনি চোখ খোলেননি।

যে দুর্গাপুজোয় সাধারণের প্রবেশ ছিল নিষেধ, সেখান থেকেই যেভাবে হলো সর্বজনীন পুজোর শুরু

history of Durga Puja in Kolkata: ব্রিটিশ কলকাতায় সেই পুজোর ধরন বদলাতে শুরু করল; বদলাল গেট-টুগেদারের ধরনও। আর কলকাতার দুর্গাপুজো আদতে হয়ে উঠল কোম্পানির পুজো। মানে কোম্পানির লোকেদের তোয়াজের জন্য করা পাঁচ দিনের অনুষ্ঠান। সেই পুজোর থেকে ইংরেজদের মনোরঞ্জন করা প্রধান উদ্দেশ্য ছিল।

প্রেমে, ঈর্ষায়, ভ্রমণে মারিয়া কোদামার চোখে কেমন ছিলেন বোর্হেস?

Jorge Luis Borges: ২০১৯ সালে প্রকাশিত এই সাক্ষাৎকারে লেখকের বিধবা স্ত্রী মারিয়া কোদামা তাঁদের অনন্য সম্পর্ক ও একান্ত যাপনের স্মৃতিচারণ করেছিলেন। মারিয়া কোদামা মৃত্যুবরণ করেন ২০২৩ সালের ২৬ মার্চ। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছিলেন পাবলো হিয়েনেরা। এটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ২০১৯ সালে, পরে লা নাসিয়ন (La Nacion) পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ২০২৩ সালের ২৫ মার্চ। সাক্ষাৎকারটি স্প্যানিশ থেকে অনুবাদ করেছেন স্প্যানিশ সাহিত্য ও বোর্হেসবিশেষজ্ঞ কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক রাজু আলাউদ্দিন।

এনসিইআরটি-র নতুন ইতিহাসের বই হিন্দুত্ববাদী ইতিহাসচর্চাকে নতুন জায়গা করে দিচ্ছে?

NCERT Class 9 Book controversy: নবম শ্রেণির সমাজবিজ্ঞান বই 'আন্ডারস্ট্যান্ডিং সোসাইটি'-র 'রেজিস্ট্যান্স অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স' অধ্যায়ে সপ্তম শতক থেকে ভারতীয় উপমহাদেশে আরব, তুর্কি, মুঘল ও ইউরোপীয় আক্রমণের ধারাবাহিকতা, ধর্মীয় উদ্দেশ্য ও হিন্দু রাজাদের দেবী-প্রদত্ত তলোয়ারের উল্লেখ রয়েছে। মুসলিমদের বিরুদ্ধে জাঠ-শিখ-রাজপুত-অহোম প্রতিরোধের বর্ণনা। হিন্দুত্ববাদী লেখক জে. সাই দীপকের 'মধ্যপ্রাচ্যের ঔপনিবেশিকতা'র ধারণা ও হিন্দুত্ববাদী ইতিহাসবিদ মীনাক্ষী জৈনের গবেষণার ছায়ায়, এভাবেই তৈরি হচ্ছে নতুন সাম্প্রদায়িক ইতিহাসচর্চার পরিসর।

‘গ্রাহক পঞ্চায়েত’-এর সভায় ছুরি কোথা থেকে এল?

SRFTI Kolkata clash: সমাজমাধ্যমে যে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়েছে, তা লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে—এক ব্যক্তি হঠাৎ পিছন থেকে এসে এক শিক্ষার্থীকে সজোরে লাথি মারছে। অথচ ঠিক সেই মুহূর্তেও পিছনের দেওয়ালে ভারতমাতা ও স্বামী বিবেকানন্দের ছবি দেওয়া ব্যানারটি সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় ঝুলছিল। অর্থাৎ, যে ব্যানার ছেঁড়ার অভিযোগকে সামনে এনে এত প্রচার চালানো হচ্ছে, তখনো পর্যন্ত সেই ব্যানারে কোনো আঁচড়ও পড়েনি।

চার-পাঁচ বছর নিয়েছিল তৃণমূল, বিজেপি মাত্র চারমাস

SRFTI incident: গোটা দেশে যখন মানুষের বিজেপির প্রতি মোহভঙ্গ ঘটতে শুরু করেছে, তখন আশ্চর্যজনকভাবে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় এল। অথচ একসময় গর্বের সঙ্গে বলা হতো—“হোয়াট বেঙ্গল থিঙ্কস টুডে, ইন্ডিয়া থিঙ্কস টুমরো।” আজ তা যেন উল্টে গিয়েছে।

মাতঙ্গিনী হাজরা ও তমলুকের বিদ্রোহ: এক বৃদ্ধার মৃত্যু যেভাবে বদলে দিয়েছিল আন্দোলনের গতিপথ

Matangini Hazra death: ২৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৪২। তমলুক শহরের দিকে পাঁচ দিক থেকে ধেয়ে এল জনতার উত্তাল মিছিল। সরকারি দপ্তর ঘিরে ফেলতে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় হাজার মানুষের এক বিরাট বাহিনী এগিয়ে আসছিল শহরের উত্তর দিক থেকে—ফৌজদারি আদালতের পথ ধরে। আর সেই বাহিনীর পুরোভাগে ছিলেন প্রায় বাহাত্তর বছর বয়সি মাতঙ্গিনী হাজরা।