আমাদের বিয়ের দিনও বৃষ্টি, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতে বসেছিল কবিতাপাঠের আসর

Arpita Ghosh : একদিন কবিতা ছাড়াও আরও কতগুলো কথা বয়ে আনল ওই নীল কাগজ। শেষে লেখা, 'মুখে বলতে হলে তো চারবার লাগত, তাই লিখেই জানালাম!’ সেদিন চারিদিকে কয়লার কালোর মধ্যে দেখতে পেয়েছিলাম রামধনুকে!

Arpita Ghosh
২ মিনিট
আমাদের বিয়ের দিনও বৃষ্টি, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতে বসেছিল কবিতাপাঠের আসর

তখন সবে মফস্‌সল থেকে কলকাতার পড়তে এসেছি। স্কটিশ-এ পড়ি, AIWC হোস্টেলে থাকি। মাঝে মাঝে মেজ জেঠুর বাড়ি বেলঘরিয়ায় যাই। আমি আর ভাই (কৌশিক ঘোষ) পিঠোপিঠি ভাইবোন— তাই আমাদের মধ্যে বন্ধুত্বও জোরালো। একদিন সম্ভবত বেলঘরিয়াতেই একটা ছেলের সঙ্গে ভাই আলাপ করিয়ে দিল। বলল, ‘রাহুলদা, কবি', দেখলাম ঝকঝকে দুটো চোখ— খুব রোগা।

খুব ছোটোবেলা থেকে কবিতা বলা ও পড়ার অভ্যেস ছিল, তাই আমাদের দ্রুত বন্ধুত্ব হয়ে গেল। তবে আমি হস্টেলে থাকতাম বলে আমাদের দেখা-সাক্ষাৎ তেমন হত না। একমাত্র জেঠুর বাড়ি গেলেই রাহুল আসত— আমি, ভাই, রাহুল প্রভূত আড্ডা দিতাম। রাহুল বরাবরই খুব দ্রুত কথা বলত। আমি মজা করে বলতাম, ‘তুমি কাউকে প্রেম নিবেদন করলে অন্তত চারবার বলতে হবে, নাহলে সে-মেয়ে বুঝতেই পারবে না!' গ্ৰাজুয়েশনের পরে আমি উড়িষ্যায় চাকরি নিয়ে চলে গিয়েছিলাম, থাকতাম ভুবনেশ্বরে। কোল স্টকইয়ার্ড ম্যানেজার— একাই থাকতাম। সঙ্গী জীবনানন্দ দাশ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ, জয় গোস্বামী, এমন অনেক কবি! বিখ্যাত সব সাহিত্যিকরাও সঙ্গে ছিলেন।

কবি রাহুল পুরকায়স্থ

একদিন হঠাৎ-ই ওই কয়লার কালো-কালো হাত ছুঁয়ে পৌঁছে গেল একট নীল ইনল্যান্ড লেটার— তাতে দুটো কবিতার লাইন আর নীচে রাহুলের নাম লেখা। না রয়েছে সম্বোধন, না কুশল বিনিময়! ভাগ্যিস তখন মোবাইল ছিল না! আমিও উত্তর দিলাম নীল কাগজেই, অন্য কবির ধার-করা কবিতার পংক্তি! না সম্বোধন, না কুশল! নীল কাগজের গতি বাড়তে থাকল। সপ্তাহে দু-দিন তিনদিন আসত সে! তারপর একদিন কবিতা ছাড়াও আরও কতগুলো কথা বয়ে আনল ওই নীল কাগজ। শেষে লেখা, 'মুখে বলতে হলে তো চারবার লাগত, তাই লিখেই জানালাম!’ সেদিন চারিদিকে কয়লার কালোর মধ্যে দেখতে পেয়েছিলাম রামধনুকে!

কলকাতায় আসা-যাওয়া বাড়ল আমার! থিয়েটার দেখা থেকে কফি হাউস— বেলঘরিয়া থেকে বিরলাপুর, আমাদের অবিরাম শব্দেরা ভীড় করে আসত! ফিরে এলাম কলকাতায়। চাকরি নিলাম একটি বিজ্ঞাপন সংস্থায়। আমার সন্ধেবেলাগুলো ছিল কবির জন্য! রাহুলই আমাকে কবিতার সঙ্গে সম্যক পরিচয় করিয়েছিল— কবিদের সঙ্গেও। কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতে সাপ্তাহিক কবিতার আসরে যে কত কবিতা ও গদ্যের কাছাকাছি এসেছি তার ইয়ত্তা নেই! এভাবেই চলতে-চলতে, এইরকমই এক জুলাই মাসে আমরা পরস্পরের সঙ্গী হয়ে পথ চলার অঙ্গীকার করি। মনে আছে, সেদিন বীরেনদার (বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়) বাড়িতে কবিতাপাঠের আসর বসেছিল!

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
আলিপুর চিড়িয়াখানায় দুপুর কাটাতেন জীবনানন্দ

Jibanananda Das & Alipore Zoo: মৃগ, চিতা, বনহংস, সিংহ, সমুদ্র সারস, ঘোড়া, চিল, পেঁচা, উট, বাঘিনী- এত বন্য পশুপাখি আর কোনও কবির রচনায় খুঁজে পাওয়া যায় না।

নাট্যনির্দেশক ও অভিনেত্রী অর্পিতা ঘোষ

একসঙ্গে পথ চলা থেমে গিয়েছিল বছর দশেক পরে। সম্পর্কের জটিল বুনন ক্রমশ আলগা হয়েছে জীবনের স্রোতে— ঢেউয়ের ধাক্কায়! হাত ছেড়ে গেলে— কেউ রাহুলকে দোষারোপ করেছে, কেউ আমাকে! কিন্তু আমাদের মধ্যে তিক্ততা আসেনি কখনো! দুজনেই বন্ধু থেকে গেছি! নিয়মিত কথা হত আমাদের— আমার নতুন নাটক— ওর কবিতার বই! দেখাও হত কখনো-কখনো! শেষ দেখা রবীন্দ্রসদনে, বাংলা আকাদেমির পুরষ্কার প্রদান অনুষ্ঠানে, খুব কষ্ট পাচ্ছিল!

রাহুল যেদিন চলে গেল আকাশ ভাঙা বৃষ্টি, ঠিক যেমনটা আমাদের বিয়ের দিনে হয়েছিল! ভালো থেকো রাহুল...

এখানে দিনের— জীবনের স্পষ্ট বড় আলো নেই

ধ্যানের সনির্বন্ধ অন্ধকার এখানে আসেনি

চারিদিকে ভোরের কী বিকেলের কাকজ্যোৎস্না ছায়ার ভিতরে

আহত নগরীগুলো কোন এক মৃত পৃথিবীর

নিহত জিনিশ বলে মনে হয়, তবু,

মৃত্যু এক শান্ত দীন পবিত্রতা...

লিখেছেন
Arpita Ghosh
Arpita Ghosh
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।