মঙ্গলে পার্সিভেরেন্স রোভারের এক বছর - কী লাভ হল শেষমেশ?

Madhurima Pattanayak
৪ মিনিট
মঙ্গলে পার্সিভেরেন্স রোভারের এক বছর - কী লাভ হল শেষমেশ?

গত এক বছরে মঙ্গলের বুকে হেঁটে ১.৮ মাইলের বেশি হেঁটে পৃথিবীর বুকে ৫০ গিগাবাইটের বেশি ডেটা পাঠিয়েছে সে; সাথে লাল গ্রহের এক লাখের বেশি ছবি, আবার দুটি নিজস্বীও। মঙ্গলের বুকে এ যাবৎ হেঁটে বেড়ানো সব থেকে দ্রুত যান সে। এরই মধ্যে মঙ্গলের আকাশে প্রথম পাঠানো হেলিকপ্টারের উড়ান সে রেকর্ড করেছে। ঠিক এক বছর আগে ১৮ই ফেব্রুয়ারি সে প্রথম পা রেখেছিলো মঙ্গলের জেজে়রো খাদে, যা কিনা মঙ্গলের নিরক্ষরেখার একটু দক্ষিণে। সেই পার্সিভেরেন্স রোভারের মঙ্গলের বুকে এক বছর পূর্ণ হল, দেখতে দেখতেই।

মাঝে পৃথিবীর সাথে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছিলো সাময়িক, সবার আদরের "পার্সি" তখন ছুটি কাটাচ্ছে মঙ্গলের বুকে। ভালো কাজের শেষে একটু ছুটি তো আমাদের সকলেরই লাগে, পার্সি আর কী দোষ করলো! সে ছুটি কাটাবে না কেন? তার কিছুদিন আগে, অর্থাৎ ৬ই সেপ্টেম্বর তো সে ইতিহাস রচনা করে ফেলেছে মঙ্গলের বুক থেকে সর্বপ্রথম পাথরের নমুনা সংগ্রহ করে। এর আগে সে কাজ কেউ করেনি।

মঙ্গলের বুকে একটি দিন অর্থাৎ একটি মার্শিয়ান ডে-তে এ যাবৎ সবচেয়ে বেশী দৈর্ঘ্য অতিক্রম করতে পেরেছে সে-ই। এবং গত একটি বছরে সে মোট ছটি পাথরের নমুনা জোগাড় করতে পেরেছে মঙ্গলের বুক থেকে।

বেশ কিছু পাথরের নমুনা ভেঙেও গেছে সংগ্রহের পর। নাসার জেট প্রোপালশান ল্যাবোরেটরিটি অবস্থিত দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায়। সেই ল্যাবের গবেষকরা প্রথমে এই ঘটনায় মুষড়ে পড়লেও আদতে দেখা যাচ্ছে, আদতে এই ঘটনা গবেষকদের তাদের লক্ষ্যের দিকেই নিয়ে যাচ্ছে।

কী লক্ষ্য গবেষকদের? হ্যাঁ মঙ্গলের ভৌগোলিক গঠন সম্পর্কে জানা এই পাথরের নমুনা থেকে, লাল গ্রহের পাথর ও মাটির রাসায়নিক গঠন জানা এবং তার থেকে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সেখানে কোনো এক সময়ে আদৌ প্রাণের স্পর্শ ছিলো কি-না। এছাড়াও জানা লাল গ্রহের অতীতের আবহাওয়া, এবং বোঝা বর্তমানের লাল গ্রহ আদৌ মানুষের বাসযোগ্য কিনা!

শুধু কি তাই? মঙ্গলের জমির বর্তমান রাসায়নিক গঠন জানান দিয়ে দেবে লাল গ্রহের বুকে এখনও আণুবীক্ষণিক জীব আছে কি-না। অন্য গ্রহে যা বাস করে, তা-ই এলিয়েন। আদতে আমাদের ফ্যান্টাসি জগতের এলিয়েনের সাথে মিলিয়ে দেবে এই পার্সিভারেন্স রোভারের সংগ্রহ করা এই পাথরের স্যাম্পেলই।

কিন্তু তার সাথে ভেঙে যাওয়া পাথরের কী সম্পর্ক? প্রিজারভেরেন্সের প্রজেক্ট সায়েন্টিস্ট কেন ফার্লির মতে মঙ্গলের এই পাথরে জলের উপস্থিতিই এর ভেঙে যাওয়ার কারণ। আর জলের উপস্থিতি জেনে আনন্দে চোখ জ্বলজ্বল করে উঠেছে বিজ্ঞানীদের। কারণ জলের উপস্থিতি ইঙ্গিত দেয় প্রাণ হয়তো কখনও ছিলো লাল গ্রহের বুকে, বা আজও আছে অন্তত মাটির তলায় আণুবীক্ষণিক জীবের রূপে।

আর সেই জন্যেই যেখান থেকে পাওয়া গেছে এই পাথরের স্যাম্পেল, সেই জেজে়রো খাদই হয়ে উঠেছে প্রাণ সন্ধানের আদর্শ ক্ষেত্র। কয়েক মিলিয়ন বছর আগে এই জেজে়রো খাদের উপর দিয়েই বয়ে গেছিলো কলোল্লিনী নদী।

আর কী জানান দিলো পার্সিভারেন্স রোভার লাল গ্রহের সম্পর্কে? পাথর সংগ্রহের পরেই বিজ্ঞানীরা ধন্দে ছিলেন এই পাথর পাললিক শিলা না-কি আগ্নেও শিলা। পাললিক শিলা বা সেডিমেন্টারি রক একের পর এক স্তরের উপর, অন্য একটি স্তর জমা হয়ে তৈরি হয়। আর আগ্নেয় শিলা তৈরি হয় অগ্নুৎপাত থেকে উদগীরিত লাভা যখন সময়ের সাথে সাথে ঠান্ডা হয়ে জমাট বেঁধে কঠিন হয়ে ওঠে, তখন। জেজে়রো খাদ থেকে খানিক এগিয়ে গেলেই একটি নদী আর তার ব-দ্বীপের চিহ্ন। বিজ্ঞানীরা এ যাবৎ ধারণা করেছিলেন লাল গ্রহ তৈরি নদীর স্রোতে বয়ে যাওয়া পলি আর জলে তৈরি পাললিক শিলায়। কিন্তু গত ডিসেম্বরে পার্সিভারেন্স রোভার একটি মারাত্মক কাজ করে ফেলেছে। নতুন সংগ্রহ করা একটি পাথরের নমুনা বিজ্ঞানীদের সেই পুরোনো ধারণাকে ফেলেছে প্রশ্নের মুখে। কারণ সেই নমুনা পাথরে উপস্থিত পাইরক্রিন ক্রিস্টাল বলে দিচ্ছে, সেই পাথর আদতে আগ্নেয়শিলা। আর এই আগ্নেয়শিলা সাহায্য করবে রেডিওঅ্যাক্টিভ ডিকের মাধ্যমে এই পাথরগুলির বয়স নির্ধারণ করতে।

নাসার জেট প্রোপালশান ল্যাবরেটরির সাথে যুক্ত, প্রিসার্ভেরেন্স মিশনের ডেপুটি প্রজেক্ট সায়েন্টিস্ট কেটি স্ট্যাক মর্গ্যানের মতে পার্সিভেরেন্স রোভার আমাদের সেই রকম এক পাথরের নমুনা দিয়েছে যেখানে আগ্নেয়শিলাও জলের সংস্পর্শে এসেছিল, আর সেখান থেকে ধারণা করা যায় সেই জলের সংস্পর্শে আগ্নেয়শিলা থাকা সত্ত্বেও হয়তো প্রাণের উদ্ভব ঘটেছিল। তাছাড়াও পাথরের নমুনাগুলি জানিয়ে দিচ্ছে মঙ্গলের একাধিক জৈব ও অজৈব রাসায়নিক পদার্থের উপস্থিতি, যা প্রাণের স্পন্দন ঘটার জন্যে আবশ্যক। কিন্তু এই রাসায়নিক পদার্থের উপস্থিতি কখনও জোর গলায় দাবি জানাতে পারে না মঙ্গলে প্রাণ ছিলই, কারণ প্রাণের সৃষ্টি হতে গেলে জৈব ও অজৈব রাসায়নিক পদার্থ ছাড়াও একাধিক অনুকূল পরিস্থির প্রয়োজন হয়।

শোনা যাচ্ছে ২০৩০ নাগাদ মঙ্গলে প্রথম মানুষ পাঠাতে চলেছে নাসা। কিন্তু তার আগে পার্সিভেরেন্সের পাঠানো নমুনা দিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে জানা হবে মঙ্গল মানুষের বাসের যথোপযুক্ত জায়গা কি-না। মঙ্গল নাকি আমাদের জানতে সাহায্য করবে জলবায়ু পরিবর্তন, বিশ্বউষ্ণায়ণের কারণে পৃথিবীর ভবিষ্যত কী হতে চলেছে। কারণ মঙ্গলে একসময় বয়ে গেছে একাধিক কল্লোলিনী নদী - বস্তুতই মঙ্গলের পাথরেই তারা লিখে গেছে তাদের উপস্থিতির কথা। কিন্তু লাল গ্রহ আজ শুষ্ক, নিথর। আর সেখানেই একটা পরস্পরবিরোধী বিষয় কাজ করছে - মঙ্গলের বর্তমান অবস্থা দেখে, আমরা আমাদের নীল গ্রহের অবস্থা নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত নই, তার সুস্থতার জন্যে আমাদের হেলদোল নেই। আরেকটি আপাত সুস্থ গ্রহকে এক দশকের মধ্যেই দখল করার কথা ভাবছি। বলার অপেক্ষা রাখে না যে আমরা তাকেও কলুষিত করবো।

পার্সিভেরেন্স রোভার নির্দ্বিধায় মঙ্গল সম্পর্কে জানার জন্যে, আমাদের উৎসাহ পূরণের দরজা খুলে দিয়েছে। কিন্তু আমাদের বাসভূমি সম্পর্কে চেতনা না হলে, আমাদের মঙ্গলের দরজা চিরতরেই বন্ধ থাকবে। যদি কাল মঙ্গলে বসবাসের দরজা উন্মুক্তও হয়, তা গুটিকয় মুষ্টিমেয় লোকের জন্যেই হবে। আপনার আমার বা আমাদের মত সাধারণ মানুষের জন্যে নয়।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

AI-এর যুগে মানুষ কি নিজের বুদ্ধিটাই মেশিনের হাতে তুলে দিচ্ছে?

Artificial Intelligence: ছোটবেলায় অনেকেই ভাবত রোবট এসে মানুষের কায়িক শ্রমের কাজগুলি করে দেবে। মানুষ অবসর পেয়ে গান শুনবে, কবিতা লিখবে কিংবা বারান্দায় বসে কফি খাবে। বাস্তবে দেখা গেল ঠিক তার উল্টো চিত্র। রোবট এখন কবিতা লিখছে, ছবি আঁকছে আর কোড তৈরি করছে। অন্যদিকে মানুষ সকাল থেকে রাত ল্যাপটপের সামনে বসে শিখছে প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং।

মহাকাশে রওনা নাসার টেলিস্কোপের, বদলে দিতে পারে মহাবিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি?

NASA’s Roman Space Telescope: নাসার নতুন ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ বদলে দেবে মহাবিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি? হাবল ও জেমস ওয়েবের পর কেন প্রয়োজন হলো এই নতুন মহাকাশ-চোখের? ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি, গ্যালাক্সি ও এক্সোপ্ল্যানেট সম্পর্কে কি নতুন তথ্য দেবে রোমান? মহাবিশ্বের প্রসারণের ইতিহাস বুঝতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে এই অত্যাধুনিক টেলিস্কোপ?

সৌরপৃষ্ঠ আসলে কেমন? ৩৩ বছর পর মিলল উত্তর

Sun’s surface mystery: সূর্যের পৃষ্ঠকে এতদিন দূর থেকে তুলোর মতো নরম ও শান্ত দেখালেও, তা কি সত্যিই এমন? বিশ্বের বৃহত্তম সৌর টেলিস্কোপ ড্যানিয়েল কে ইনোয়ের তোলা সর্বোচ্চ-রেজোলিউশনের ছবিতে দেখা গেল ছোট ছোট হিংস্র প্লাজমার ঘূর্ণি। ৩৩ বছর আগে করা জোয়ান কার্পেনের সেই ভবিষ্যদ্বাণী কি অবশেষে সত্যি প্রমাণিত হলো? এই আবিষ্কার কি বদলে দেবে সৌরপৃষ্ঠ সম্পর্কে ধারণা?

৩ অগাস্ট থেকে বদলে যাচ্ছে শেয়ার বাজারের নিয়ম!

Stock Market India: নতুন ব্যবস্থার অধীনে শেয়ার বাজার বন্ধের সময়কে তিনটি আলাদা অংশে ভাগ করা হয়েছে। তবে নন-এফএন্ডও (Non-F&O) স্টকগুলির ক্ষেত্রে আগের মতোই বিকেল ৩:৩০টা পর্যন্ত স্বাভাবিক লেনদেন চালু থাকবে, এতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। কিন্তু এফএন্ডও স্টকগুলির ক্যাশ মার্কেটে প্রতিদিন একটানা লেনদেন চলবে বিকেল ৩:১৫ মিনিট পর্যন্ত।

আইআইটি-র দুই প্রাক্তনীর বৈদ্যুতিক কৃষিযন্ত্রে একরপ্রতি খরচ মাত্র ৪০ টাকা

Electric Power Tiller: বাজারে যেসব ট্র্যাক্টর পাওয়া যায়, তা হয় বিশাল বড় জমির উপযোগী, না হয় কেনা ও চালানো দুটোই খুব ব্যয়বহুল। ভারতে ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ কৃষকের জমিই ছোট ও খণ্ড-বিখণ্ড, যেখানে বড় যন্ত্র ঢোকানোই সম্ভব নয়। আবার চিন থেকে আমদানি করা ছোট ছোট সস্তা মেশিনগুলিতে যন্ত্রাংশ ও সার্ভিসিংয়ের চূড়ান্ত সমস্যা তৈরি হয়। তাই বিদেশ থেকে আমদানির কথা না ভেবে, আইআইটি বোম্বের দুই প্রাক্তনী ঐশ্বর্য রামকৃষ্ণন ও কেদার গোখলে সিদ্ধান্ত নেন খাঁটি দেশীয় প্রযুক্তিতে ভারতের মাটির উপযোগী সমাধান তৈরি করার।

মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেও উষ্ণ থাকে সোনাম ওয়াংচুকের বাড়ি

Sonam Wangchuk House: সোনম ওয়াংচুক মানেই পাহাড়ঘেরা লাদাখের ছবি, বরফে ঢাকা জীবন আর নতুন এক ভাবনার আলো। পেশায় তিনি একজন প্রকৌশলী, শিক্ষাবিদ এবং উদ্ভাবক। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে তিনি যেন রূপকথার সেই মানুষটি, যিনি পাহাড়ের রুক্ষ জীবনের কঠিন সমস্যাগুলিকে বিজ্ঞানের সহজ ছোঁয়ায় অত্যন্ত সহজ করে তুলেছেন।

মহাকাশে মিলল চিনির সন্ধান, কেন গুরুত্বপূর্ণ এই আবিষ্কার?

natural sugar in space: ছায়াপথের কেন্দ্রের একটি আণবিক মেঘে প্রথমবারের মতো প্রকৃত মনোস্যাকারাইড ‘এরিথ্রুলোজ’-এর সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। এই আবিষ্কার জানাচ্ছে, নক্ষত্র ও গ্রহ তৈরির আগেই মহাকাশে জটিল জৈব অণু তৈরি হতে পারে। ফলে পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তি এবং মহাবিশ্বে জীবনের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে গবেষণার আগ্রহ বেড়েছে।

কর্মদক্ষতা মাপল এআই, চাকরি হারালেন কর্মীরা? মেটার বিরুদ্ধে বিস্ফোরক মামলা

Meta mass layoffs: কর্মীদের ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নেবে? মেটার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলায় অভিযোগ, এআই-নির্ভর মূল্যায়নের কারণে মাতৃত্বকালীন ও চিকিৎসাজনিত ছুটিতে থাকা কর্মীরা অন্যায্যভাবে চাকরি হারিয়েছেন।