বারবার লজ্জার হার, যে ভাবে অতীতেও ল্যাজেগোবরে হয়েছে পাকিস্তান
Pakistan Cricket Team: ১৯৯২ সালে ইমরান খানের নেতৃত্বে ক্রিকেট বিশ্বকাপ জিতেছিল পাকিস্তান। কিন্তু এই বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে তারা পরপর বেশ কয়েকটি ম্যাচ অত্যন্ত জঘন্যভাবে হেরে যায়।

এশিয়া কাপ জিততে না পারলেও নিজেদের পারফরম্যান্স দিয়ে সকলের মন কেড়েছিল পাকিস্তান। বাবর আজম, মহম্মদ রিজওয়ান, মহম্মদ নওয়াজদের খেলা দেখে মনে হয়েছিল এটি একটি বদলে যাওয়া পাকিস্তান। আত্মসমর্পণ করে নয় বরং লড়াই করে ম্যাচ আনার ক্ষমতা আছে এই তরুণ পাকিস্তান দলের। সকল ক্রিকেটবোদ্ধারা আশা করছিলেন এই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভালো কিছু পারফরম্যান্স করে দেখাতে পারে আমাদের প্রতিবেশীরা। কিন্তু বিশ্বকাপ শুরু হতেই দেখা গেল পুরো অন্য গল্প। ভারত এবং জিম্বাবয়ের বিরুদ্ধে কার্যত জেতা ম্যাচ মাঠে ফেলে চলে এল বাবর আজমের দল। ভারতের বিরুদ্ধে টপ অর্ডারকে বিধ্বস্ত করে দিয়েছিল পাকিস্তান। কিন্তু বিরাট এবং হার্দিকের বিরুদ্ধে বোকার মতো বোলিং করানোর খেসারত দিতে হলো ম্যাচ খুইয়ে। আবার জিম্বাবয়ের কাছে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের কারণে হার হল পাক দলের। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ১৩০ রান তাড়া করতে নেমে ম্যাচ শেষ ওভার পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়ার কোনও মানে ছিল কি ? এই কারণে প্রাক্তন ক্রিকেটার থেকে শুরু করে ক্রিকেট বিশ্লেষক, প্রত্যেকেই কটাক্ষ করছেন অধিনায়ক বাবর আজম-সহ সম্পূর্ণ পাকিস্তান ক্রিকেট টিমকে। তবে এরকম ভাবে ম্যাচ খুইয়ে আসা পাকিস্তানের ক্রিকেট ইতিহাসে নতুন নয়। দেখে নেওয়া যাক এমনই কয়েকটি ঘটনা-
• পাকিস্তান বনাম অস্ট্রেলিয়া (দ্বিতীয় টেস্ট, অক্টোবর ২০০২, শারজাহ)
২০০২ সালে অস্ট্রেলিয়া পাকিস্তান ট্যুরে এসেছিল স্টিভ ওয়ার নেতৃত্বে। এই ট্যুরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তিনটি টেস্ট ম্যাচ খেলে অস্ট্রেলিয়া। প্রথম টেস্টে লড়াই করে হেরে যায় পাকিস্তান। কিন্তু দ্বিতীয় টেস্টে অত্যন্ত বিশ্রী ভাবে হারে পাকিস্তান। এই সিরিজে পাকিস্তানের অধিনায়ক ছিলেন ওয়াকার ইউনিস। টস জিতে ব্যাটিং করার সিদ্ধান্ত নেন ওয়াকার। ব্যাটিং করতে নেমেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইন আপ। প্রথম ইনিংসে ৫৯ রানে অলআউট হয়ে যায় পাকিস্তান। ব্যাট হাতে পাকিস্তানি অলরাউন্ডার আব্দুর রাজ্জাক একমাত্র দুই অঙ্কের সংখ্যায় রান (২১ রান) করতে পেরেছিলেন। ৪ উইকেট নিয়ে শেন ওয়ার্ন একাই তছনছ করে দেন পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইন আপ। জবাবে ব্যাট করতে নেমে অস্ট্রেলিয়ার ম্যাথু হেডেন ১১৯ রানের একটি দারুণ ইনিংস খেলেন। প্রথম ইনিংসে ৩১০ রান করে অলআউট হয়ে যায় অস্ট্রেলিয়া। দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে আরও দুর্দশায় পড়ে পাকিস্তান, মাত্র ৫৩ রানে অলআউট হয়ে যায় তারা। এবার দু'জন দুই অঙ্কের সংখ্যায় রান করতে পেরেছিলেন, ইমরান নাজির (১৬ রান) এবং মিসবা উল হক (১২ রান)। এই ইনিংসেও বল হাতে ৪ উইকেট নেন শেন ওয়ার্ন। অস্ট্রেলিয়া এক ইনিংস এবং ১৯৮ রানে টেস্টটি জিতে যায়। তৃতীয় টেস্টেও ভরাডুবি হয় পাকিস্তানের। এই সিরিজে শেন ওয়ার্ন একাই ধ্বংস করে দিয়েছিলেন পাকিস্তানকে। ৩টি টেস্ট ম্যাচে মোট ২৭ উইকেট নেন তিনি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
FIFA World Cup 2022 Qatar: ইকুয়েডর-চিলি দ্বন্দ্ব থেকে সবচেয়ে কম সংখ্যক স্টেডিয়াম- ফিফা বিশ্বকাপের নানা তথ্য।
• পাকিস্তান বনাম ইংল্যান্ড (বেনসন অ্যান্ড হেজেস ওয়ার্ল্ড কাপ ১৯৯২, অ্যাডিলেড)
১৯৯২ সালে ইমরান খানের নেতৃত্বে ক্রিকেট বিশ্বকাপ জিতেছিল পাকিস্তান। কিন্তু এই বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে তারা পরপর বেশ কয়েকটি ম্যাচ অত্যন্ত জঘন্যভাবে হেরে যায়। এরই মধ্যে গ্রুপ পর্বে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সবচেয়ে খারাপ পারফরম্যান্সের নিদর্শন দেয় পাকিস্তান। এই ম্যাচে দলের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন জাভেদ মিঁয়াদাদ। প্রথমে ব্যাট করতে নেমে ৪০.২ ওভারে ৭৪ রানে অলআউট হয়ে যায় জাভেদ মিঁয়াদাদের দল। ব্যাট হাতে দুই অঙ্কের সংখ্যায় পৌঁছন সেলিম মালিক (১৭ রান), ওয়াসিম হায়দার (১৩ রান) এবং মুস্তাক আহমেদ (১৭ রান)। সেলিম মালিককে বাদ দিলে প্রত্যেকেই ৪০-এর বেশি বল খেলেছিলেন। অধিনায়ক জাভেদ মিঁয়াদাদ স্বয়ং ২২ বলে ৩ রান করে আউট হয়ে যান। ডেরেক প্রিঙ্গেল, ইয়ান বোথামরা ক্রিজে সামান্য নড়তেও দেননি পাকিস্তানকে। এরপর ইংল্যান্ড ব্যাট করতে নামলে মাত্র ৮ ওভার ব্যাট করতে পারে তারা। ৮ ওভার পর ইংল্যান্ডের স্কোর ছিল ২৪/১। এরপর বৃষ্টি না নামলে আর ম্যাচ ওয়াশআউট না হয়ে গেলে সেবার পাকিস্তানের বিশ্বকাপ জেতা অসম্ভব ছিল।
• পাকিস্তান বনাম বাংলাদেশ (আইসিসি ক্রিকেট ওয়ার্ল্ড কাপ ১৯৯৯, নর্থহ্যাম্পটন)
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Mankading Debate: আজও কেন এই ধরনের আউট নিয়ে বিতর্ক দানা বাঁধে? মানকরিং পদ্ধতি ব্যবহার না হলে কি কোনও বাড়তি সুবিধা রয়েছে?
১৯৯৯ আইসিসি ক্রিকেট ওয়ার্ল্ড কাপের অন্যতম ফাইনালিস্ট ছিল পাকিস্তান। কিন্তু গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশের কাছে অত্যন্ত বাজেভাবে হেরে যায় সেবারের রানার্স আপরা। ওয়াসিম আক্রমের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান খাতায় কলমে অনেক এগিয়েছিল তরুণ বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমের থেকে। পাকিস্তান দলে ছিলেন সৈয়দ আনোয়ার, ইনজামামুল হক, ওয়াসিম আক্রম, সেলিম মালিক শহিদ আফ্রিদি, শোয়েব আখতারদের মতো ক্রিকেটাররা। কিন্তু ম্যাচ শুরু হতেই দেখা গেল অন্য পরিস্থিতি। প্রথমে ব্যাটিং করতে নেমে ওয়াসিম-ওয়াকার-শোয়েবের ত্রয়ীকে বিষহীন করে দিল শাহরিয়ার হোসেন, আক্রম খান, খালেদ মাহমুদরা। তবে পাকিস্তানের বোলিংয়ের খানিকটা সারপ্রাইজ প্যাকেজ ছিলেন সাকলিন মুস্তাক। বল হাতে ৫ উইকেট নেন তিনি। প্রথম ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে ৫০ ওভারে ৯ উইকেটের বিনিময়ে ২২৩ রান করে বাংলাদেশ। দ্বিতীয় ইনিংসে পাকিস্তান ব্যাট করতে নামলে তাদের টপ অর্ডারকে একাই তছনছ করে দেন খালেদ মাহমুদ। শাহিদ আফ্রিদি, সৈয়দ আনোয়ার, ইনজামামুল হক, সেলিম মালিক কেউই ব্যাট হাতে চলতে পারেননি। শেষের দিকে ওয়াসিম আক্রম, আজহার মেহমুদ এবং সাকলিন মুস্তাক কিছুটা প্রতিরোধের চেষ্টা করলেও শেষমেষ আর লাভ হয়নি। ৪৪.৩ ওভারে ১৬১ রান করে অলআউট হয়ে যায় পাকিস্তান। ম্যাচের সেরার পুরস্কার পান বাংলাদেশের খালেদ মাহমুদ (ব্যাট হাতে ২৭ রান এবং বল হাতে ৩ উইকেট)।
• পাকিস্তান বনাম অস্ট্রেলিয়া (তৃতীয় টি-টোয়েন্টি, সেপ্টেম্বর ২০১২, দুবাই)
এই তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজের প্রথম দু'টি ম্যাচ জিতে সিরিজ পকেটস্থ করে নিয়েছিল পাকিস্তান। তৃতীয় টি-টোয়েন্টিতে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নেমেছিল তারা। ফলত এমন এক রেকর্ড গড়ল পাকিস্তান যা লজ্জার সঙ্গে আজীবন বয়ে নিয়ে যেতে হবে তাদের (যদি না এর থেকেও খারাপ পারফরম্যান্স তারা কখনও করে)। প্রথমে ব্যাট করতে নেমে ডেভিড ওয়ার্নার (৫৯ রান) এবং শেন ওয়াটসনের (৪৭ রান) দুরন্ত ব্যাটিংয়ের সুবাদে পাকিস্তানকে ১৬৯ রানের টার্গেট দেয় অস্ট্রেলিয়া। জবাবে ব্যাট করতে নেমে মিচেল স্টার্ক এবং প্যাট কামিন্সের আগুনে বোলিংয়ের সামনে কার্যত অসহায় হয়ে পড়েন মহম্মদ হাফিজ, শোয়েব মালিক, উমর আকমলরা। মাত্র ৭৪ রানে অলআউট হয়ে যায় পাকিস্তান। ৯৪ রানে ম্যাচ জিতে নেয় অস্ট্রেলিয়া। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে পাকিস্তানের তরফে সর্বনিম্ন স্কোর এটিই।
• পাকিস্তান বনাম ভারত (এশিয়া কাপ ২০১৬, মিরপুর)
২০১৬ এশিয়া কাপ খেলা হয়েছিল টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে। এই টুর্নামেন্টেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কামব্যাক করেছিলেন মহম্মদ আমির। সেবারের এশিয়া কাপে ভারত বনাম পাকিস্তান ম্যাচ ঘিরে অত্যন্ত উত্তেজনা ছিল দুই দেশে। প্রথমে ব্যাট করতে নেমে মাত্র ৮৩ রানে অলআউট হয়ে যায় পাকিস্তান। অধিনায়ক শাহিদ আফ্রিদি, মহম্মদ হাফিজ, উমর আকমল, শোয়েব মালিকদের নাকানি-চোবানি খাইয়ে দেয় দুই তরুণ ভারতীয় বোলার জসপ্রীত বুমরাহ (১/৮) এবং হার্দিক পাণ্ড্য (৩/৮)। হার্দিক এবং বুমরাহ দু'জনেই দু'টি করে মেইডেন ওভার করেছিলেন। পাকিস্তানের হয়ে ব্যাটিংয়ে হাল ধরেন সরফরাজ আহমেদ (২৫ রান)। কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসের শুরুতেই ভারতীয় ব্যাটিং অর্ডারকে জোর ধাক্কা দেন মহম্মদ আমির। নিজের স্পেলের প্রথম দুই ওভারেই তুলে নেন রোহিত শর্মা, অজিঙ্ক রাহানে এবং সুরেশ রায়নাকে। কিন্তু অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে ক্রিজে টিকে থাকেন বিরাট কোহলি। বিরাটের ৪৯ রানের ইনিংসের সুবাদে মাত্র ১৫ ওভারের ৫ উইকেট খুইয়ে ৮৫ রান তুলে নেয় ভারত।







