বাঙালির আবেগকে দুরমুশ করে দিয়ে গেল রবীন্দ্রনাথের 'পাষাণ হৃদয়'

Rabindranath Tagore Sculpture: ভাস্কর্যটি রবীন্দ্রনাথ তাঁর সুহৃদ অক্ষয়চন্দ্র চৌধুরীকে দিয়েছিলেন। এত বছর ধরে চিত্রশিল্পী অতুল বসুর পরিবারের কাছে ছিল এই ‘পাষাণ হৃদয়’ ভাস্কর্যটি।

Hiran Mitra
৩ মিনিট
বাঙালির আবেগকে দুরমুশ করে দিয়ে গেল রবীন্দ্রনাথের 'পাষাণ হৃদয়'

সারা জীবনে মাত্র একটি ভাস্কর্য গড়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তখন তাঁর বয়স মাত্র ২২। ‘পাষাণহৃদয় কেটে খোদিনু নিজের হাতে / আর কি মুছিবে লেখা অশ্রুবারিধারাপাতে’, এই পংক্তি খোদাই করেছিলেন সেই পাথর কেটে। 'পাষাণ হৃদয়', রবীন্দ্রনাথের একমাত্র সেই ভাস্কর্যটি সম্প্রতি নিলামে ওঠে। ১ কোটি ৪ লক্ষ ৫২ হাজার ২১০ টাকা দর ওঠে। মুম্বইয়ের অষ্টগুরু সংস্থা এই নিলামের ব্যাবস্থা করেছিল। কলকাতার প্রতিষ্ঠান দেবভাষা এই অষ্টগুরুর সঙ্গে, ভাস্কর্যের মূল মালিক শিল্পী অতুল বসুর পুত্র ও পুত্রবধূর সঙ্গে, যিনি আবার কবি বিষ্ণু দে-র কন্যা। আর এই যোগাযোগেই আমার সামান্য প্রাথমিক ভূমিকা ছিল। ২০০০ সালে আমি বাংলার শিল্পকলা বিষয় নিয়ে কলকাতার টাউন হলে প্রদর্শনীর দায়িত্ব পাই। সেখানে রবীন্দ্রনাথের একটি চিত্র প্রদর্শিত হয় যা আগে কখনও লোকসমক্ষে আসেনি। সেই কাজটি এই অতুল বসুর পরিবার থেকেই এসেছিল। সেই সংবাদ আমি দেবভাষাকে জানাই। সেই সূত্রেই দেবভাষা এই অমূল্য সম্পদ, রবিঠাকুরের একমাত্র ভাস্কর্যটির হদিশ পায়। দেবভাষা তা প্রদর্শিতও করে। এর পর থেকেই শকুনি আর্ট মাফিয়ারা সজাগ হয়ে ওঠে স্বাভাবিকভাবেই। পাষাণ হৃদয় আমার আর দেখা হয়নি। এই খেদ রয়েই গেল।

এখানে উল্লেখ্য, দেবভাষা সেই বহু মূল্যবান চিত্রটিও প্রদর্শনীতে রাখে। সেই ছবির ঠিকানা এখন কী, তাও আমি জানি না। এ শহরের বহু এমন পারিবারিক সম্পদ বেহাত হয়েছে, যা আমার নিজের চোখে দেখা। চোখের সামনে থেকে হেমেন মজুমদার, হরেন দাসের ব্যক্তিগত চিত্র সংগ্রহ, যামিনী রায়ের চিত্র— সব চলে যেতে দেখেছি। নতুন কিছু নয়। তবে, পাষাণ হৃদয়ের নিলামের সংবাদটি আনন্দবাজার পত্রিকার প্রতিবেদনেই জানতে পারি।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
প্রদীপশিখার গানে যে অস্বস্তিকর দ্বন্দ্ব রেখে গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ

Rabindra Sangeet: পাখির নীড়ের মতো একটি প্রদীপ শিখাও যে গানের চরিত্র হয়ে উঠতে পারে আশ্চর্য এক নীরবতার ভাষা নিয়ে, তার উদাহরণ আছে রবীন্দ্রনাথের এক বসন্তের গানে।

এ এক ভয়ংকর সংবাদ। এই জন্য ভয়ংকর নয় যে রবি ঠাকুরের একমাত্র ভাস্কর্য আসলে একটি জাতীয় সম্পদ। আশঙ্কে এখানে যে, পাষাণ হৃদয় লোকচক্ষুর আড়ালে চলে গেল এবংএই আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না যে খুবই দক্ষভাবে তা বিদেশে পাচারও হয়ে যেতে পারে, আরও বহু কোটিতে। অষ্টগুরুর দাবি, পাষাণ হৃদয় দেশেই থাকবে। কোন দেশে যে থাকবে, কেই বা তার নিশ্চয়তা দেবে! নিলামের নিয়ম অনুসারে, বর্তমান মালিকের নাম প্রকাশ করা যাবে না।

কোয়ার্টজাইট পাথর কেটে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাতে তৈরি সেই ভাস্কর্য।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
নিজের বইয়ের 'অন্ত্যেষ্টি সৎকার' করতে চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ

Rabindranath Tagore: আর কত কাল রবীন্দ্রনাথ কেবল ওই বঙ্গদর্শন-সাধনা-ভারতী-বালক-সপ্তাহ-হিতবাদীর সম্পাদক হয়ে থাকবেন?

অর্থাৎ, বহু অর্থের লোভে পাষাণ হৃদয় এক অজানা ঠিকানায় হারিয়ে গেল। বা বলা যায়, আত্মগোপন করল। আর এই নিয়ে দেশের সরকার বা রাজ্যের সরকার যা আদতে মাফিয়াদের হাতেই নিয়ন্ত্রিত—তাদের কোনও হেলদোল থাকার কথাও নয়। দুই সরকারেরই প্রাথমিক কাজ, চুরি করা,ব্যাঙ্ক লুট করা,ভোটে জেতা ও ক্ষমতায় থাকা, জনগণের করের টাকায় বিদেশ ঘোরা ও নানাবিধ ধ্যাষ্টামো করা— রবীন্দ্রনাথের হাতে গড়া একমাত্র ভাস্কর্যের কদর করা বা এই সব জাতীয় সম্পদের মূল্য বোঝে এদের কর্মসূচিই নয়! দুর্ভাগ্য আমাদেরই, আমাদের মানে আমরা যারা আবেগে ভাসি, সাংস্কৃতিক মনকে প্রশ্রয় দিই— আমরা ব্যাথিত হই, দুঃখ পাই। এটুকুই মাত্র!

রবীন্দ্রনাথের প্রভূত ভালোবাসায় সৃষ্ট এই ভাস্কর্য ১৮৮৩ সালে তৈরি করা, সেই শেষবার তিনি ও কাদম্বরী দেবী অর্থাৎ নতুন বৌঠান একত্রে ভ্রমণ করেন। রবীন্দ্রনাথের তখন বাইশ বছর বয়স। বোম্বাই প্রেসিডেন্সির অন্যতম প্রধান শহর কারোয়ারে যান তাঁরা, সপরিবারে। দাদা সত‍্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে থাকার সময়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটি কোয়ার্টজাইট পাথর উপহার পান। সেই পাথর রবীন্দ্রনাথ হৃদয়ের আকারে কেটে লিখেছিলেন ওই কবিতা— ‘পাষাণ হৃদয় কেটে/ খোদিনু নিজের হাতে/ আর কি মুছিবে লেখা/ অশ্রুবারিধারাপাতে?’

জানা যায়, ভাস্কর্যটি রবীন্দ্রনাথ তাঁর সুহৃদ অক্ষয়চন্দ্র চৌধুরীকে দিয়েছিলেন। এত বছর ধরে চিত্রশিল্পী অতুল বসুর পরিবারের কাছে ছিল এই ‘পাষাণ হৃদয়’ ভাস্কর্যটি। অক্ষয় চৌধুরী রবীন্দ্রনাথের এই ভাস্কর্য পাওয়ার পর তা দিয়ে যান স্ত্রী শরৎকুমারী চৌধুরানীকে। পরে তা কন্যা উমারানির হস্তগত হয়। উত্তরাধিকার সূত্রে দম্পতির কন্যা দেবযানী পাথরটির মালিকানা পান। তাঁরই স্বামী বিখ্যাত শিল্পী অতুল বসু। তাঁর তিন সন্তান— অভিজিৎ, সঞ্জীব ও দীপঙ্কর। মৃত্যুর আগে দেবযানী তাঁর বড় ছেলে অভিজিতের স্ত্রী ইলোরার হাতে পাষাণ হৃদয়ের স্বত্ব তুলে দেন। অভিজিৎ ও ইলোরা কর্মসূত্রে প্রবাসী, থাকেন আমেরিকার ব্লুমিংটনে। সেখানকারই একটি ব্যাঙ্কের লকারে প্রায় ৪৪ বছর ‘পাষাণ হৃদয়’ রাখা ছিল বলে জানা গেছে।

১৯৪১ সালে রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণের ঠিক পরেই ক‍্যালকাটা মিউনিসিপ্যাল গেজেটের বিশেষ সংখ‍্যায় ছবি-সহ পাষাণ হৃদয় ভাস্কর্যটির কথা বেরোয়। তারপরে, অভিজিৎ ও ইলোরা দেশে ফিরে এলে দেবভাষার সেই প্রদর্শনীর আয়োজন হয় গত বছর। এবং তারপর এই নিলাম। পাষাণ হৃদয়ের ঠিকানা আর গোচরে এল না আমাদের।

লিখেছেন
Hiran Mitra
Hiran Mitra
1 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।