শাসকের বিরুদ্ধে গলা তুলে আজ শাসকের ঘরেই কেন রাঘব চাড্ডা?
রাঘব চাড্ডার মতে, যে স্বপ্ন নিয়ে ১২ বছর আগে আম আদমি পার্টি গঠিত হয়েছিল, তা আজ ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছে। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, তাঁরা রাজনীতিতে কেরিয়ার গড়তে আসেননি, বরং কেরিয়ার ছেড়ে দেশসেবা করতে এসেছিলেন।
আম আদমি পার্টির (আপ) অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং রাজ্যসভার গুরুত্বপূর্ণ মুখ রাঘব চাড্ডা তাঁর দলের আরও ৬ জন সাংসদকে নিয়ে ভারতীয় জনতা পার্টিতে (বিজেপি) যোগ দিয়েছেন। রাজ্যসভায় আপ-এর মোট ১০ জন সাংসদের মধ্যে ৭ জন (অর্থাৎ দুই-তৃতীয়াংশের বেশি) দল ছাড়ায় সংবিধানের দশম তফসিল বা দলত্যাগ বিরোধী আইন অনুসারে তাঁদের সদস্যপদ বহাল থাকছে এবং তাঁরা বিজেপির সঙ্গে মিশে যেতে পারছেন।
কেন দল ছাড়লেন রাঘব চাড্ডা?
১. আদর্শগত বিচ্যুতি ও দুর্নীতির অভিযোগ: রাঘব চাড্ডার মতে, যে স্বপ্ন নিয়ে ১২ বছর আগে আম আদমি পার্টি গঠিত হয়েছিল, তা আজ ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছে। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, তাঁরা রাজনীতিতে কেরিয়ার গড়তে আসেননি, বরং কেরিয়ার ছেড়ে দেশসেবা করতে এসেছিলেন। কিন্তু বর্তমান 'আপ' আর আগের সেই দল নেই। দল এখন দুর্নীতির জালে আটকে পড়েছে এবং আপসকামী ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। চাড্ডার ভাষায়,
যে দল দুর্নীতিমুক্ত ভারত গড়তে এসেছিল, আজ তারাই দুর্নীতিতে ডুবে গিয়েছে।
রাঘব চাড্ডা অভিযোগ করেছেন, সাধারণ মানুষের ইস্যু নিয়ে কথা বলতে গেলে পুরনো দল তাঁর কণ্ঠরোধ করত। সম্প্রতি পঞ্জাব ইস্যু এবং রাজ্যসভায় ডেপুটি লিডার পদ থেকে তাঁকে সরিয়ে দেওয়াকে কেন্দ্র করে দলের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছয়। পার্টির অভ্যন্তরীণ কোন্দল জনসমক্ষে চলে আসে। তাঁদের সামনে দুটি পথ খোলা ছিল—হয় রাজনীতি ছেড়ে দেওয়া, নয়তো রাজনীতিতে অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে অন্য কোথাও থেকে জনসাধারণের জন্য কাজ করা। আর তাই তাঁরা দ্বিতীয়টি বেছে নিয়েছেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Raghav Chadha AAP controversy: এএপি রাজ্যসভা সচিবালয়কে চিঠি দিয়ে জানায়, পাঞ্জাবের সাংসদ অশোক কুমার মিত্তলকে ডেপুটি লিডার করা হচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে রাঘব চড্ডাকে পার্টির নির্ধারিত বলার সময় না দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়। পার্টির একাংশ এটাকে ‘রুটিন সাংগঠনিক পরিবর্তন’ বলে উড়িয়ে দিলেও, চড্ডার ঘনিষ্ঠ মহল একে ‘চুপ করানোর চেষ্টা’ হিসেবেই দেখছে।
চাড্ডা তাঁর বিবৃতিতে বিজেপির গত ১২ বছরের কাজের প্রশংসা করেছেন। তিনি মনে করেন, বিজেপি এমন অনেক কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছে যা অন্য দলগুলো নিতে ভয় পেত। দেশের স্বার্থে এবং সাধারণ মানুষের কথা সাহসের সঙ্গে বলার জন্যই তিনি বিজেপিকে বেছে নিয়েছেন।
রাঘব চাড্ডার নেতৃত্বে যে ৭ জন সাংসদ আজ রাজ্যসভার চেয়ারম্যানের কাছে সই করা চিঠি জমা দিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন:
রাঘব চাড্ডা: রাজ্যসভায় দলের প্রাক্তন ডেপুটি লিডার ও প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।
হরভজন সিং: বিশ্বখ্যাত ক্রিকেটার।
স্বাতী মালিওয়াল: বিশিষ্ট সমাজকর্মী ও দিল্লির প্রাক্তন মহিলা কমিশন প্রধান।
সন্দীপ পাঠক: আপ-এর প্রধান নির্বাচনী কৌশলবিদ।
অন্যান্যরা: রাজিন্দর গুপ্ত, বিক্রম সাহনি এবং অশোক মিত্তল (পদ্মশ্রী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব)।
রাঘব চাড্ডা বলেন, "আপনাদের প্রশ্ন ছিল, গত এক বছর ধরে আমি নিজেকে দলের গতিবিধি থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছি কেন? আজ আমি এর উত্তর দিচ্ছি, আমি পরিস্থিতি ভালো করার চেষ্টা করছিলাম। তাই, আমি চুপ ছিলাম এতদিন। আমি ওঁদের অপরাধের অংশ হতে চাইনি।"
মার্চ-এপ্রিল ২০২৬ থেকেই চাড্ডার বিজেপিতে যাওয়ার জল্পনা শুরু হয়েছিল। বিশেষ করে আবগারি দুর্নীতি বা 'শরাব ঘোটালা' মামলায় দলের অবস্থানের বিষয়ে তাঁর দীর্ঘ নীরবতা, বিজেপির বিরুদ্ধে কোনো কথা না বলা এবং সোশ্যাল মিডিয়া থেকে পুরনো পোস্ট ডিলিট করা এই সন্দেহকে আরও উসকে দিয়েছিল। আপ নেতারাও তাঁর বিরুদ্ধে 'পার্টি-বিরোধী' কার্যকলাপের অভিযোগ তুলেছিলেন।
এই দলবদলের ফলে রাজ্যসভায় আম আদমি পার্টি কার্যত শক্তিহীন হয়ে পড়ল। অন্যদিকে, বিজেপির শক্তি আরও বৃদ্ধি পেল। রাঘব চাড্ডার মতো একজন শিক্ষিত এবং তরুণ নেতাকে পাশে পাওয়া বিজেপির জন্য দিল্লির আসন্ন রাজনৈতিক লড়াইয়ে বড় অস্ত্র হতে পারে।
রাঘব চাড্ডার এই পদক্ষেপ কেবল একটি দলবদল নয়, বরং এটি আম আদমি পার্টির ভিতরকার গভীর ফাটলের বহিঃপ্রকাশ। একজন 'ফাউন্ডার মেম্বার' যখন বলেন
আমি ওঁদের বন্ধুত্বের যোগ্য ছিলাম না। কারণ ওঁদের অপরাধে আমি শামিল ছিলাম না।
তখন তা অরবিন্দ কেজরিওয়াল ও তাঁর দলের নৈতিকতার উপর বড় প্রশ্নচিহ্ন দাঁড় করিয়ে দেয়। এখন দেখার বিষয়, রাঘব তাঁর কথা মতো বিজেপির পতাকাতলে দাঁড়িয়ে তাঁর সেই পুরনো 'জোশ' এবং 'কমিটমেন্ট' নিয়ে সাধারণ মানুষের সাধারণ সমস্যার কথা গলা তুলে পারেন কি না?






