ইডি-র ম্যারাথন জেরার মুখে রাহুল, কেন জোরালো হচ্ছে প্রতিহিংসার তত্ত্ব?

১৩ জুন, ১৪ জুন এবং ১৫ জুন। পরপর তিন দিন, মোট ২৫ ঘণ্টা ইডি-র জেরার মুখোমুখি কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। ন্যাশনাল হেরাল্ড দুর্নীতি মামলায় ১৩ জুন প্রথমবারের জন্য রাহুলকে ডেকে পাঠিয়েছিল ইডি। সেদিন বেলা ১১টা নাগাদ আকবর রোডের কংগ্রেস সদর কার্যালয় থেকে মিছিল করে ইডি অফিসের দিকে রওনা দিয়েছিলেন রাহুল৷ তাঁর সঙ্গে পা মেলান প্রিয়াঙ্কা গান্ধীও৷ দ্বিতীয় দিন একইভাবে হাজির হন তিনি। তৃতীয় দিন ইডি দপ্তরে তাঁকে ৩ ঘণ্টা জেরা করা হয়। দুপুর সাড়ে ৩টে নাগাদ লাঞ্চ ব্রেকে তিনি বের হন।

প্রশ্ন উঠছে, এবার 'ইডি অস্ত্র’ ব্যবহার করে কংগ্রেসকে ভেন্টিলেশনে পাঠাতে চাইছে বিজেপি? ন্যাশনাল হেরাল্ডের মতো পুরনো মামলা খুঁচিয়ে তোলার দায় রয়েছে তাদের?

রাহুলের প্রথম দিন
প্রথম দিন, ১৩ জুন এই মামলায় তদন্ত সংস্থা রাহুল গান্ধীকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। তাঁকে প্রায় ১০ ঘণ্টা ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। দলের শীর্ষ নেতা ও কর্মীরা সোমবার থেকেই রাজধানীতে বিক্ষোভ করছেন, অভিযোগ করা হচ্ছে যে কেন্দ্র রাহুল গান্ধীকে 'ভুয়া' মামলায় ফাঁসানোর চেষ্টা করছে। কংগ্রেস বলেছে যে, তদন্তকারী সংস্থার রাহুল গান্ধীকে জিজ্ঞাসাবাদ আসলে বিরোধীদের কণ্ঠকে স্তব্ধ করার জন্য এবং এটি ক্ষমতাসীন বিজেপির 'প্রতিহিংসার রাজনীতি'-র অংশ।

আরও পড়ুন: এবার ইডির নজরে রাহুল সোনিয়া, কী পরিণতি অপেক্ষা করছে?

রাহুলের দ্বিতীয় দিন
মঙ্গলবার রাহুল গান্ধীকে ১১ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। তদন্তকারী সংস্থার কর্মকর্তারা মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের (পিএমএলএ) অধীনে একাধিক সেশনে তাঁর বক্তব্য রেকর্ড করেন। সূত্র বলছে, তাঁর জবাব জমা দেওয়ার আগে তাঁর বক্তব্যের প্রতিলিপি পরীক্ষা করে দেখা হয়। দ্বিতীয় দিনের জিজ্ঞাসাবাদ শেষ হওয়ার পর, রাহুল গান্ধী তাঁর বোন এবং কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর সঙ্গে তাঁর মা এবং কংগ্রেস সভাপতি সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে দেখা করতে স্যার গঙ্গা রাম হাসপাতালে যান। সেখানে তিনি ভর্তি রয়েছেন।

রাহুলের তৃতীয় দিন
বুধবার সকাল ১১টা ৩৫-এ রাহুল গান্ধী দিল্লিতে ইডি দপ্তরে যান। এদিনও তাঁর সঙ্গে ছিলেন বোন প্রিয়াঙ্কা। ইডি দপ্তরের বাইরে ভিড় করেন দলের সমর্থকরা। তাঁরা ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করলে পুলিশ আটকায়। তদন্তকারী সংস্থার অফিসে ভাইকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়ে সেখান থেকে চলে যান প্রিয়াঙ্কা। রাজধানীজুড়ে চলতে থাকে বিক্ষোভ। পূর্ব পরিকল্পনা মতো রাহুলকে ইডির জেরার সময় দেশজুড়ে সত্যাগ্রহ প্রতিবাদ মিছিল করেছেন কংগ্রেস নেতা কর্মীরা। প্রথম থেকে এই মিছিলে কোনও অনুমতি দেয়নি দিল্লি পুলিস। কংগ্রেস নেতা সচিন পাইলটকে আটক করে দিল্লি পুলিস। জানা গিয়েছে, তিনি ও তাঁর সমর্থকরা কংগ্রেসের সদর দফতর আকবর রোডে যাচ্ছিলেন। সেই সময় তাঁদের আটক করে পুলিস বাসে করে নিয়ে যাওয়া হয়।

কী এই 'ন্যাশনাল হেরাল্ড' মামলা?
১৯৩৮ সালে 'ন্যাশনাল হেরাল্ড' পত্রিকাটি ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু শুরু করেন।

সংবাদপত্রটি প্রকাশ করে অ্যাসোসিয়েটেড জার্নালস লিমিটেড (এজেএল)। ১৯৩৭ সালে ৫,০০০ অন্যান্য স্বাধীনতা সংগ্রামীকে শেয়ারহোল্ডার হিসেবে রেখে প্রতিষ্ঠিত হয় এজেএল। সংস্থাটি আরও দু'টি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ করে। উর্দুতে 'কওম-এ-আওয়াজ' এবং হিন্দিতে 'নবজীবন' নামে প্রকাশিত হয় ওই দু'টি পত্রিকা।

সেই সময়ের সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতাদের দ্বারা চালিত ছিল ন্যাশনাল হেরাল্ড। উগ্র এবং তীক্ষ্ণ লেখার জন্য ব্রিটিশ সরকারের রোষে পড়ে ১৯৪২ সালে নিষিদ্ধ ঘোষিত হয় এই সংবাদপত্র। যদিও তিন বছর পরে আবার চালু হয় এই প্রকাশনা।

১৯৪৭ সালে দেশের স্বাধীনতার পরে এই পত্রিকার চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশের প্রধানমন্ত্রীর পদ গ্রহণ করেন জওহরলাল নেহেরু। কংগ্রেস দল এই সংবাদপত্রের মতাদর্শ গঠনে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। ১৯৬৩ সালে ন্যাশনাল হেরাল্ডের রজতজয়ন্তীতে একটি বার্তায় নেহরু নিজেই বলেন, 'স্বাধীন দৃষ্টিভঙ্গি' বজায় রেখে 'সাধারণত কংগ্রেস নীতির পক্ষে' বলে এই পত্রিকা।

কিন্তু আর্থিক সমস্যার কারণে পত্রিকাটি আবার বন্ধ হয়ে যায় ২০০৮ সালে।

কংগ্রেসের বিরুদ্ধে অভিযোগ
২০১২ সালে সুব্রহ্মণ্যম স্বামী ট্রায়াল কোর্টে এই মামলা করেন গান্ধীদের বিরুদ্ধে। স্বামীর অভিযোগ গান্ধীরা কংগ্রেস পার্টির তহবিল ব্যবহার করে ২০ বিলিয়নের বেশি টাকার সম্পত্তি দখলে চেষ্টায় এজেএল অধিগ্রহণ করেছে।

২০০৮ সালে ন্যাশনাল হেরাল্ড বন্ধ করার সময়, কংগ্রেসের কাছে এজেএল-এর ঋণ ছিল ৯০০ মিলিয়ন। ২০১০ সালে, কংগ্রেস এই ঋণটি ইয়ং ইন্ডিয়া প্রাইভেট লিমিটেডকে হস্তান্তর করে। এটি একটি অ-লাভজনক সংস্থা, যা ঘটনার কিছু মাস আগে তৈরি করা হয়। সোনিয়া এবং রাহুল গান্ধী এর পরিচালন পর্ষদে রয়েছেন এবং তাঁরা দু'জনেই কোম্পানির ৩৮ শতাংশ করে মোট ৭৬ শতাংশ শেয়ারের মালিক।

বাকি ২৪ শতাংশ রয়েছে কংগ্রেস নেতা মতিলাল ভোরা, অস্কার ফার্নান্ডেজ, সাংবাদিক সুমন দুবে এবং উদ্যোগপতি স্যাম পিত্রোদার হাতে। তাঁদের নামও রয়েছে এই মামলায়।

স্বামীর অভিযোগ, গান্ধীরা 'অনৈতিক' উপায়ে মূল্যবান সম্পদ 'দখল' করার জন্য সাবটারফিউজ ব্যবহার করে। বিজেপি নেতার অভিযোগ দিল্লি, লখনউ, মুম্বই এবং অন্যান্য শহরে অবস্থিত এজেএল এবং এর রিয়েল এস্টেটের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ইয়ং ইন্ডিয়া।

অভিযোগ অস্বীকার
এই মামলার মাধ্যমে বিজেপির বিরুদ্ধে 'রাজনৈতিক প্রতিহিংসা'-র অভিযোগ করেছে কংগ্রেস। তারা জানিয়েছে, হেরাল্ড প্রকাশক এজেএল-কে আর্থিক সমস্যায় সাহায্য করে কংগ্রেস। কংগ্রেস এজেএল-কে প্রায় ৯০০ মিলিয়ন টাকা ধার দেয়। তাদের আরও দাবি ২০১০ সালে, এজেএল ঋণমুক্ত হয় যখন তারা ইক্যুইটির সঙ্গে তাদের ঋণ বদল করে এবং নতুন তৈরি হওয়া ইয়ং ইন্ডিয়া প্রাইভেট লিমিটেডকে শেয়ার বরাদ্দ করে। কংগ্রেস জানিয়েছে, ইয়ং ইন্ডিয়া একটি 'অ-লাভজনক সংস্থা' এবং এর শেয়ারহোল্ডার এবং পরিচালকদের কোনও লভ্যাংশ দেওয়া হয়নি।

রাজনৈতিক প্রতিহিংসা?
এ কোন উন্মত্ত রাজনৈতিক প্রতিহিংসা? সোনিয়া গান্ধী হাসপাতালে। কংগ্রেসকে ভেন্টিলেশনে পাঠানোর এর চেয়ে ভালো সময় আর কী হতে পারে বিজেপির কাছে! তাই সচিন পাইলটরা যতই সত্যাগ্রহ আন্দোলন করে গলা ফাটান না কেন, তা কিন্তু বিজেপিকে এতটুকু কাহিল করতে পারছে না। বরং ইডি-র ম্যারাথন জেরায় জেরবার হয়ে চলেছেন কংগ্রেসের প্রাক্তন সভাপতি। এর আগে বারবার বিজেপির বিরুদ্ধে সিবিআই ও ইডি জুজু ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। উত্তরপ্রদেশে বুয়া, বাবুয়া, কিংবা বাংলায় পিসি-ভাইপোর গলার স্বর নরম করাতে তারা এই 'ভোঁতা অস্ত্র’-ই ব্যবহার করেছে। কংগ্রেসের অন্দরে ভাঙনের চোরা স্রোত বইছে। এবার কি শতাব্দীপ্রাচীন এই দলকে স্বখাত সলিলে পাঠানোর উন্মত্ত নেশায় মেতেছে শাসক দল? রাহুল, প্রিয়াঙ্কা পারবেন দলের গঙ্গাপ্রাপ্তি হওয়া আটকাতে?

More Articles

;