রাহুল পুরকায়স্থের জীবন ও বাড়ির দরজা সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল

Rahul Purkayastha : রাহুলের জীবনের মূল শব্দগুলি ছিল ভালোবাসা-বন্ধুত্ব-বিশ্বাস। রাহুলের জীবন ও বাড়ির দরজা সবার জন্য সব সময় খোলা থাকত।

Arunava Sarkar
৪ মিনিট
রাহুল পুরকায়স্থের জীবন ও বাড়ির দরজা সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল

২৫ জুলাই, ২০২৫, ভরা শ্রাবণে বৃষ্টিস্নাত দুপুরে চলে গেলেন মাইকেল মধুসূদন দত্তের সর্বশেষ বাঙালি উত্তরসূরি, বাংলা কবিতার অনন্য যুবরাজ রাহুল পুরকায়স্থ। শুধু কবিতা নয়, জীবন যাপনে ওঁর উত্তরাধিকার ছিল মাইকেল রাজত্বের। যে ছিন্ন-ভিন্ন জীবন থেকে মধুসূদন নিজের কবিতা তুলে এনেছেন, রাহুল-ও কি তা করেননি! কবিতার ক্ষেত্রে শুধু নয়, সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে শুধু নয়, সব ক্ষেত্রেই ফ্রেমের বাইরে গিয়ে রাহুল ভাবতে পারতেন, চিন্তা করতে পারতেন গড়পড়তা জীবন থেকে অনেক বেশি উচ্চতায়।

রাহুলের জীবনের মূল শব্দগুলি ছিল ভালোবাসা-বন্ধুত্ব-বিশ্বাস। রাহুলের জীবন ও বাড়ির দরজা সবার জন্য সব সময় খোলা থাকত। কবিতার মানুষদের, সাহিত্যের মানুষদের জন্য তো বটেই, কিন্তু তার বাইরে যে বৃহত্তর জগতের অধিবাসীরা— হয়তো তাঁরাই ছিল ওঁর মেলামেশার প্রকৃত জগৎ। রাহুল ছিলেন ভাবনায়-বিশ্বাসে শেষ পর্যন্ত বাম-অনুরাগী। তিনি সাহিত্য ও রাজনীতির ক্ষেত্রে কখনো গোঁড়ামিকে প্রশয় দেননি। আশির দশকের কবি হিসেবে রাহুল পুরকায়স্থ চিহ্নিত হন, এই দশক ছিল মেয়েদের দশক। উল্লেখযোগ্য যে মহিলা কবিদের দশকের মাঝখানে ছিলেন জয়দেব বসু, রাহুল পুরকায়স্থ ও আরও কয়েকজন। রাহুল প্রথম থেকেই চিহ্নিত হলেন আত্মগত কবি হিসেবে, যা যন্ত্রণাদায়ক, আত্মধ্বংসকারী বাংলা কবিতার এক বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা!

সারা জীবন ধরে অনুগত ছিলেন অক্ষরবৃত্ত ছন্দের কাছে। অক্ষরবৃত্তে ওঁর দক্ষতা এতটাই ছিল যে মনে হয় ইছা করলে ওই ছন্দেই পুরো কথাবার্তা বলে যেতে পারতেন। ইউরোপ-প্রবাসে মাইকেল মধুসূদন লিখেছিলেন চতুর্দশপদী কবিতা। কর্মসূত্রে নিউইয়র্কে গিয়ে রাহুল পুরকায়স্থ লিখলেন 'পোয়েট ইন নিউইয়র্ক’ যা ওঁর কাব্যধারার থেকে সম্পূর্ণ পৃথক এক অনন্য অভিজ্ঞতা। ‘ভাষালিপি’ পত্রিকার ১১ অক্টোবর ২০২০ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল এই লেখা। রাহুল পুরকায়স্থের প্রথম বই ‘অন্ধকার, প্রিয় স্বরলিপি’ থেকেই অভিনবত্ব চোখে পড়ে। এ-বইয়ে রয়েছে মাত্রাবৃত্ত ছন্দে লেখা কবিতা, যা থেকে পরবর্তী সময়ে রাহুল সরে এসেছিলেন। পরের বই, ‘৯-ই ভাদ্র ৯৫’। এর পরের বই ‘শ্বাসাঘাত তাঁতকল পুরনো হরফ’— এই শিরোনামটি পুরোপুরি অক্ষরবৃত্তের চোদ্দ মাত্রায় রয়েছে। এই বই থেকেই বলতে গেলে রাহুল পেয়ে গেলেন নিজস্ব ডিকশন, একজন প্রকৃত কবির ক্ষেত্রে যা অতি প্রয়োজনীয়। পরে ওঁর ডিকশন আরও সংহত ও অননুকরণীয় হয়ে ওঠে। ‘একটি জটিল আয়ু রেখা’ প্রকাশিত হয় ১৯৯৫ সালে, বাংলা কবিতার জগতে যা এক অনন্য অভিজ্ঞতা! একটি কবিতা আমি সে-বই থেকে এখানে তুলে দিচ্ছি:

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
নারীত্বের মন্ত্রোচ্চারণে বাংলা কবিতার বাঁক বদলাতে পারেন কবি অমৃতা ভট্টাচার্য

Review of Amrita Bhattacharya's Poetry: ‘কড়ি’ শব্দে যোনি-প্রতীক মনে আসে। অমৃতা তাঁর বইয়ের উৎসর্গ পৃষ্ঠায় ব্যবহার করেছেন ইভ এন্সলারের লেখা ভুবনবিখ্যাত বই ‘দ্য ভ্যাজাইনা মনোলগস’ –এর উদ্ধৃতি।

খনিশ্রমিক

একটি চকিত চোখ রশ্মিরেখা বেয়ে উঠে আসে

এই চোখ লবণ জাহাজ জানে, আর জানে রুটি আর মদ

রুটির নিভৃত সত্য, তার গতিপথ...

পথের দু-পাশে ভিড় এই চোখ কার

একটু দূরেই মৃত্যু, ধর্মহীন শুধু অন্ধকার

একবার রাজদীপ রায় সদ্য প্রকাশিত কোনো একটি বই থেকে একটি লেখা ফেসবুকে দিয়ে প্রশ্ন করেছিল, ‘এটি কার লেখা বলুন তো?’ ডিকশন বলে দিয়েছিল এই লেখা রাহুল পুরকায়স্থ-র। বাংলায় শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের পর এত এলিজি আর কে লিখেছেন? আমি প্রায় ওঁকে বাধ্য করি সমস্ত এলিজি একত্র করে প্রকাশ করতে। আমার সম্পাদনায় ‘সামান্য এলিজি’ প্রকাশিত হয় ভাষালিপি থেকে, প্রকাশ করেন ওঁর আরেক এক বন্ধু ও প্রিয় মানুষ নবনীতা সেন।রাহুল পুরকায়স্থ আমার সিনিয়র কন্টেম্পরারি, অগ্রজ-বন্ধু। খুব কাছ থেকে দেখা প্রকৃত বন্ধুবৎসল, সৎ, স্বচ্ছ ও অকপট এক মানুষ, যাঁর জীবনে ‘গোপনীয়তা’ শব্দটির কোনো স্থান ছিল না। খোলা খাতা বলতে যা বোঝায়, তাই ছিল ওঁর জীবন। আমাদের আড্ডা হত মূলত, কফি হাউজ, পার্বতীদার বাড়ি, প্রেস ক্লাব, হিরণদার বাড়ি, উৎপলদার বাড়ি এবং আরও অন্যান্য স্থানে।

কবি রাহুল পুরকায়স্থ

প্রকাশিত হবে ‘ও তরঙ্গ লাফাও’— এই নিয়ে কথাবার্তা, আড্ডা, পানাহার চলছে হিরণদার বাড়িতে, এবার কথা উঠল যে আমার নাম রাখতে হবে, কীভাবে রাখা যায়? দুজনে একত্রে প্রস্তাব দিলেন গ্রন্থসত্বে আমার নাম থাকবে। পরের দিন রাহুল পুরকায়স্থের ফোন, ‘শোন, তোর নাম হিরণদা প্রেসে দিয়ে এসেছে।’ পরবর্তী কালে এই বই অন্য প্রকাশনা থেকে বের হয়। তখনও রাহুল পুরকায়স্থের ফোন, ‘বইটা অন্য প্রকাশনা থেকে বেরচ্ছে।’ আমি বললাম, ‘তোমার লেখা, হিরণদার ছবি, তোমরাই ঠিক করবে।’ উত্তর এল, ‘না, তোর স্বত্ব, তোকে তো জানতেই হবে।’ এই হচ্ছে ভালবাসা, সততা, বন্ধুত্ব! হিরণদাই লিখেছিলেন, ‘আমরা হয়ে উঠেছিলাম নতুন ‘ত্রয়ী’’— সত্যিই তাই!

অরুনাভ সরকার

রাহুল পুরকায়স্থের শেষ দুটি বই ‘ভাষালিপি-র কবিতা’ ও ‘লেখাগুলি আমাকেই বলে’ প্রকাশিত হয়েছিল ২০২৫-এর বইমেলায় যথাক্রমে ভাষালিপি ও মাস্তুল থেকে। রাহুল পুরকায়স্থের জীবনাবসানে শোকাতুর পাঠককুল, অগ্রজ কবিরাও। ক্রন্দনরত কবিরা যতজন পারলেন ছুটে এসেছিলেন হাসপাতালে। টিভি চ্যানেল সারাদিন ধরে দেখাল ওঁর জীবন, ওঁর কবিতা। ওয়েব পোর্টালগুলির সেদিন ও পরবর্তী কয়েকদিনের চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছিল: রাহুল পুরকায়স্থ। রাহুল আমাদের ভরিয়ে দিয়ে গেলেন। কিন্তু নিজে কী পেলেন? পেলেন আস্থা, ভালোবাসা, প্রণয়, সম্পর্ক।

যখন ডায়লেসিস শুরু হল, তখন সংকট চরমে। শারীরিক অসুস্থতা, নিয়মিত দেখাশোনা করার অসুবিধা। সেই সময় রাহুল পেলেন, একজন কবি যা পেতে পারেন, পাঠিকা-প্রেমিকা বর্ণালী সেনগুপ্তকে। পরবর্তী কালে ওঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বর্ণালীর যত্নে, সাহচর্যে অনেক অসুস্থতা থাকা সত্ত্বেও আনন্দের সঙ্গে উদযাপন করলেন জীবনকে। ভ্রমণ করলেন বাংলাদেশ। অফিসের কাজে গেলেন দিল্লি। ডায়লিসিস চলা সত্ত্বেও জীবনের শেষ কয়েক বছর ছিলেন চূড়ান্ত সৃজনশীল। কর্মমুখর, আনন্দময়। শেষ কয়েক মাস প্রচুর ভুগলেন। রাহুল পুরকায়স্থ তবুও থেকে গেলেন, থেকে যাবেন। বর্ণালী সেনগুপ্ত আমাদের কৃতজ্ঞতা গ্রহণ করো, ভালো থেকো।

লিখেছেন
Arunava Sarkar
Arunava Sarkar
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

নারী টেস্টে এত অনীহা কেন, লর্ডসের ইতিহাসও বদলাবে না সেই ছবি?

Women’s Test Cricket: লর্ডসে ভারতের নারী ক্রিকেট দলের ঐতিহাসিক জয় নারী টেস্ট ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ বদলানোর সুযোগ এনে দিয়েছে? এত সাফল্য ও জনপ্রিয়তার পরও কেন এই ফরম্যাটে নিয়মিত ম্যাচ নেই?

শিব-পরশুরামের যুদ্ধবিদ্যা কালারিপায়াট্টু থেকেই জন্ম কুংফুর!

Kalaripayattu Indian Martial Art: ভারতীয় পৌরাণিক ঐতিহ্যে কালারিপায়াট্টুকে স্রেফ যুদ্ধের কৌশল হিসেবে দেখা হয়নি, বরং এটিকে মানব শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রাণশক্তিকে জাগিয়ে তোলার এক মহান সাধনা বলে মনে করা হয়।

দু'হাজার বছর পুরনো ‘আত্য পাত্যা’: এই খেলাই শিখিয়েছিল যুদ্ধের কৌশল!

Atya Patya Traditional Indian Game: আনুমানিক ১০০ থেকে ৩০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রচিত প্রাচীন তামিল সাঙ্গম সাহিত্য ‘নাটতৃণৈ’-তে এই খেলার প্রথম লিখিত প্রমাণ পাওয়া যায়। অতএব, এই খেলার বয়স প্রায় দুই হাজার বছরেরও বেশি। সেখানে বলা আছে, প্রাচীন চোল রাজবংশের সেনারা যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার আগে নিজেদের ক্ষিপ্রতা, দ্রুত দৌড়ানোর ক্ষমতা আর শরীরকে এক নিমেষে বাঁকানোর চপলতা বাড়াতে এই খেলায় মেতে উঠত।

১৬ বছর পর ফের ভারতের পথে ললিত মোদী

Lalit Modi return to India: দীর্ঘ সময় পর দিল্লির আপিল ট্রাইব্যুনাল তাঁর বিরুদ্ধে থাকা আর্থিক অনিয়মের বড় অভিযোগ ও জরিমানা বাতিল করে দেওয়ার পরেই এই আলোচনার সূত্রপাত। সোশ্যাল মিডিয়ায় ললিত মোদী নিজেই স্পষ্ট করেছেন, সমস্ত বড়সড় আইনি জটিলতা কাটার পর ২০২৬ সালের শেষ দিকে অথবা ২০২৭-এর শুরুতেই ফের তিনি ভারতে পা রাখতে চলেছেন।

গোলের আড়ালে ঘৃণার খেলা: ২০২৬ বিশ্বকাপে ট্রাম্প, ফিফা আর ফুটবলের পরাজয়

Trump FIFA World Cup: এই বিশ্বকাপ শুধুই একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; মাঠের লড়াই ছাপিয়ে তা হয়ে উঠেছে ভূ-রাজনীতি, বর্ণবিদ্বেষ এবং বাণিজ্যিক আধিপত্যের এক জটিল ময়দান।

একটা রাজপুত্তুর যার মুকুট হারিয়ে গিয়েছে

Lionel Messi Retirement: তিনটে ফাইনালের বোঝা। একে একে ছেড়ে যায় সহযোদ্ধারা। রক্তাক্ত মাসচেরানো চলে যান, কুন আগুয়েরোর অসুখ... তবু লিও পড়ে থাকে, আমরা পড়ে থাকি আর কিছুদিন। বৃত্ত সম্পূর্ণ করতে প্রয়োজন ছিল একজন স্ক্যালোনির, তিনি সেটুকু সেতু নির্মাণের দায়িত্ব নিলেন। আমরা অপেক্ষা করলাম লুসাইলে। আমরা তো কবেই হেরে গিয়েছিলাম, সৌদি আরব শুধু চিনিয়ে দিয়েছিল আশপাশটা।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: যেভাবে ১৫ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসায় পরিণত হল ফুটবল

FIFA Revenue 2026: 'কুইন্টেট প্রাইভেট ব্যাংক'-এর সাম্প্রতিক একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, শেয়ারবাজারের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের অনুঘটক হওয়ার চেয়ে বিশ্বকাপ আসলে একটি শক্তিশালী স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্যিক উদ্দীপক হিসেবেই বেশি কাজ করে। ফিফা, সম্প্রচারকারী সংস্থা, স্পোর্টসওয়্যার ব্র্যান্ড এবং আতিথেয়তা (হসপিটালিটি) ক্ষেত্রগুলি বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করলেও, কোম্পানির শেয়ারের দামে সেই ইতিবাচক প্রভাব দীর্ঘ সময় ধরে রাখা বেশ কঠিন।

যখন ইউরোপে নারীরা গৃহবন্দি, তখন অসমে মেয়েরা খেলছিলেন ধোপখেল

Dhop Khel Assam: আহোম রাজাদের রাজপ্রাসাদ থেকে বিহুর মেঠো মাঠ—অসমের মাটিতে একসময় গমগম করত ধোপখেলের আওয়াজ। ফুটবল, কাবাডি আর দূরন্ত নিশানার এই অদ্ভুত রোমাঞ্চকর খেলাটি শুধু পুরুষদের বীরত্ব প্রমাণের লড়াই ছিল না; যখন ইউরোপে নারীদের জীবন ছিল চার দেওয়ালে বন্দি, তখন অসমে মেয়েরাও মাঠে নেমে মেতে উঠতেন ধোপখেলে।