আড়াআড়ি ভাঙবে কংগ্রেস? যে কারণে এই আশঙ্কা দানা বাঁধছে

Split বা Defection, আড়াআড়ি ভাঙন অথবা কয়েকজন হেভিওয়েটের দলত্যাগ। কিছু একটা সম্ভবত হচ্ছেই। শতাব্দীপ্রাচীন জাতীয় কংগ্রেসের অন্দরে বইছে ঠিক এমন শঙ্কার বাতাস। সোনিয়া গান্ধীর প্রস্তাব সবিনয়ে ফিরিয়েছেন বর্ষীয়ান গুলাম নবি আজাদ৷ আর তার পরেই জল্পনা তুঙ্গে, আজাদ একাই দল ছাড়ছেন? না কি সদলবলে দলত্যাগ করে টুকরো করছেন কংগ্রেস?

রাজনৈতিক মহল বলছে, গরু মেরে আজাদকে জুতো 'উপহার' দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন সোনিয়া। ওদিকে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্ভবত পাকা করে ফেলেছেন আজাদ‌। তাই সোনিয়া গান্ধীর উপহার প্রত্যাখ‍্যান করেছেন তিনি। ফেরানোর কারণ হিসেবে আজাদ যা বলেছেন, সেটাই দলের অন্দরের জি-২৩ গোষ্ঠীর মূল কথা৷ এই ইস্যুতেই গড়ে উঠেছে জি-২৩ লবি৷ বলেছেন, আমাদের সঙ্গে দলের তরুণ নেতৃত্বের চওড়া ফারাক তৈরি হয়েছে। নবীন নেতাদের আপত্তি আছে তাঁর নামে। ওই গোষ্ঠী কিছুতেই তাঁকে মেনে নেবে না। তাই এই প্রস্তাব গ্রহণ করতে পারছেন না। 'নবীন নেতৃত্ব' বলতে গুলাম নবি আজাদ স্পষ্টতই রাহুল গান্ধী ও তাঁর ঘনিষ্ঠদের দিকেই ইঙ্গিত করেছেন বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।

ঠিক কী প্রস্তাব সোনিয়া গান্ধী দিয়েছিলেন? সর্বভারতীয় কংগ্রেসের তরফে কাশ্মীরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা রাজ্যসভায় দলের প্রাক্তন নেতা গুলাম নবি আজাদকে দলের ‘নম্বর টু’ পদে কাজ করার প্রস্তাব দেন স্বয়ং সোনিয়া গান্ধী। জানা গিয়েছে, সোনিয়া বলেছিলেন, এবার থেকে দলে আমার পরে আপনার হাতেই থাকবে যাবতীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার। সংগঠন দেখার দায়িত্বে থাকা কেসি বেণুগোপালকে সরিয়ে আজাদের হাতে সেই ভার তুলে দেওয়ার কথা বলেন৷ সোনিয়া বলেন,"আপনি এখনই শক্ত হাতে দলের হাল ধরুন।" রাজ্যসভায় এবার তাঁকে প্রার্থী না করার সিদ্ধান্তে চরম ক্ষুব্ধ প্রবীণ এই নেতা প্রস্তাব শোনামাত্রই ধরে ফেলেন, এসবই আসলে পুলটিস দেওয়ার চিত্রনাট্য। তাই দলের চেয়ারপার্সনের মুখের ওপরই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। আর দলে ‘নম্বর টু’ পদে কাজ করার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ার খবর প্রকাশ্যে আসতেই জল্পনা তুঙ্গে, জি-২৩ গোষ্ঠীর সতীর্থ কপিল সিবালের পথেই কি হাঁটতে চলেছেন গুলাম নবি আজাদ? দল বদল করলে তিনি কোথায় যাবেন ? তিনি কি একাই কংগ্রেস ছাড়ছেন? না কি এবার 'মড়া' কংগ্রেসের ঘাড়ে কোপ মেরে দলকে দু'টুকরো করবেন?

আরও পড়ুন: সেন্সরড দিলীপ এবার পাল্টা বিঁধছেন বিজেপিকেই! কত দূর গড়াতে পারে জল?

কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বে বদলের দাবি জানিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই গান্ধী পরিবারের কাছে 'ভিলেন' হয়েছেন গুলাম নবি আজাদ। এই আওয়াজ তোলার ফলে তাঁর গায়ে বিক্ষুব্ধ জি-২৩ শিবিরের অন্যতম শীর্ষ নেতার স্ট্যাম্প লেগে যায়। রাজনৈতিক মহলের ব্যাখ্যা, এবার রাজ্যসভার টিকিট না দিয়ে এরই বদলা নিয়েছে হাই কম্যান্ড। ওদিকে আজাদকে প্রার্থী না করলেও গান্ধী পরিবার কিন্তু ওই জি-২৩ গোষ্ঠীরই অন্য দুই নেতা, মুকুল ওয়াসনিক এবং বিবেক তনখাকে প্রার্থী করেছে৷ ঠান্ডা মাথায় ছেঁটেছে আজাদ এবং আনন্দ শর্মাকে। জি-২৩ গোষ্ঠীর অভ্যন্তরে ঝগড়া লাগানোর জন্যই গান্ধী-পরিবারের এই চাল বলেই অনেকের ব্যাখ্যা। রাজ্যসভার প্রার্থীতালিকায় গুলাম নবির মতো অভিজ্ঞ নেতাকে বাদ দিয়ে প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর পছন্দের এক বিতর্কিত নেতাকে প্রার্থী করায় আজাদ ক্ষুব্ধ হন। হাই কম্যান্ডের এই সিদ্ধান্তে অভিমানাহত আজাদ সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে যান। রাজস্থানের উদয়পুরে সদ্য হয়ে যাওয়া দলের চিন্তন শিবিরেও দেখা যায়নি তাঁকে। তবে দলের একাংশ ইতিমধ্যেই বলেছে, চিন্তন শিবিরে ডাকাই হয়নি আজাদকে। এরপরই নাকি গান্ধী পরিবারের সঙ্গেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেন আজাদ।

এদিকে এআইসিসি'র সূত্রে খবর, আজাদের সঙ্গে এই ধরনের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার উদ্যোগ সোনিয়া গান্ধী নিজে থেকে নেননি অথবা আজাদকে ডেকেও পাঠাননি। বরং সোনিয়া গান্ধী এবং প্রিয়াঙ্কা গান্ধী কোভিড-আক্রান্ত হয়েছেন খবর পেয়ে সৌজন্যবশত আজাদই যোগাযোগ করেছিলেন। তখনই কথা প্রসঙ্গে আজাদের ক্ষোভ কমাতে তাঁকে দলের দু'নম্বর পদের দায়িত্ব নেওয়ার প্রস্তাব দেন কংগ্রেস সভানেত্রী। সোনিয়ার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ার কথা শুক্রবার সোশ্যাল মিডিয়ায় আজাদ নিজেই জানান৷ ব্যাখ্যা দিয়ে আজাদ বলেছেন, দলে এখন নবীন প্রজন্মের নেতাদের কর্তৃত্ব চলছে। নবীন নেতাদের মর্জির সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব। তাছাড়া এই প্রজন্ম তাঁকেও ঠিকভাবে মেনে নিতে পারবেন না। এর ফলে দলে সমস্যা আরও বৃদ্ধি পাবে। তাই এই প্রস্তাব তিনি গ্রহণ করতে অপারগ।

এত কথা বললেও আজাদ কিন্তু দলবদল সংক্রান্ত কোনও ইঙ্গিতই প্রকাশ্যে দেননি। তবে দিল্লির অলিন্দের খবর, ঘনিষ্ঠ বৃত্তে আজাদ দলবদলের মতো সিরিয়াস বিষয় নিয়ে মুখ খুলেছেন‌। এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন বলেও জানান। ওদিকে নাকি কয়েকটি রাজনৈতিক দল যোগাযোগও করেছে গুলাম নবি আজাদের সঙ্গে। রাজনৈতিক মহলের ধারণা, আজাদকে এই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে অঙ্ক কষেই। রাজ্যসভার প্রাক্তন বিরোধী দলনেতা গুলাম নবি আজাদের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক রয়েছে। এমন শোনা গিয়েছিল যে, রাষ্ট্রপতি বা উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এনডিএ নাকি আজাদকে প্রার্থীও করতে পারে। এই জল্পনা সত্যি হলে কংগ্রেস চরম বিপাকে পড়বেই‌। আজাদের মতো হেভিওয়েট ‘সংখ্যালঘু মুখ’ এনডিএ-র প্রার্থী হলে লোকসভা ভোটে গোটা দেশে কংগ্রেস আরও বিপাকে পড়বে৷ মুসলিম ভোট তলানিতে ঠেকতে পারে। আজাদকে সামনে রেখে বিজেপি এই সুযোগ নিতেই পারে। সেই আতঙ্কেই কংগ্রেস আজাদকে 'ধরে রাখার' জন্য এই প্রস্তাব দিতে পারে বলেই রাজনৈতিক মহলের ধারণা।

এখন দেখার, প্রবীণ কংগ্রেস নেতা গুলাম নবি আজাদ ঠিক কোন রাজনৈতিক পদক্ষেপ করেন। তবে এটাও মাথায় রাখতে হবে, রাজনীতির বাইশ গজে দ্বিতীয় ইনিংস খেলার প্রস্তুতি আজাদ সম্ভবত নিয়েই ফেলেছেন।

 

More Articles

;