‘এসআইআর বৈধ এবং সংবিধানসম্মত’-জানাল সুপ্রিম কোর্ট
SIR Supreme Court verdict: সুপ্রিম কোর্ট এসআইআর বা ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়াকে সাংবিধানিক বলে মান্যতা দিল। আদালতের মতে, নির্ভুল ভোটার তালিকাই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ভিত্তি।
ভারতের নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বা এসআইআর নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক বিতর্ক চলছিল। বিরোধীদের অভিযোগ ছিল, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে এবং তা গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করার সামিল। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের দাবি ছিল, ভোটার তালিকাকে আরও নির্ভুল ও স্বচ্ছ করতেই এই উদ্যোগ। সেই বিতর্কের মাঝেই বুধবার (২৭ মে) গুরুত্বপূর্ণ রায় দিল সুপ্রিম কোর্ট। শীর্ষ আদালত জানিয়ে দিল, এসআইআর প্রক্রিয়া সংবিধানসম্মত এবং আইনসম্মত।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চ এই মামলার শুনানি করে। আদালতের পর্যবেক্ষণ, গণতন্ত্র শুধু ভোটগ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সঠিক ও নির্ভুল ভোটার তালিকাও তার অন্যতম ভিত্তি। আদালত বলেছে, যদি ভোটার তালিকায় ভুয়ো নাম, মৃত ব্যক্তির নাম বা একই ব্যক্তির একাধিক নাম থেকে যায়, তাহলে নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সেই কারণেই নির্বাচন কমিশনের এই বিশেষ সংশোধনী প্রক্রিয়াকে বেআইনি বলা যায় না।
আদালত আরও জানিয়েছে, সংবিধানের ৩২৪ নম্বর অনুচ্ছেদ এবং জনপ্রতিনিধিত্ব আইন অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের এমন সংশোধনী প্রক্রিয়া চালানোর ক্ষমতা রয়েছে। বিচারপতিরা স্পষ্ট বলেন, এসআইআর কোনোভাবেই আইনের বাইরে গিয়ে করা হয়নি। এটি নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনেরই অংশ।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Voter List Revision in Bengal: কারগিল যুদ্ধে লড়া এক প্রাক্তন সেনাকর্মীর নামই যদি ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ে, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়? এসআইআর প্রক্রিয়ায় কি সত্যিই নিরপেক্ষতা বজায় থাকছে, নাকি নির্দিষ্ট এলাকাকেই লক্ষ্য করা হচ্ছে?
এই মামলায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল, নির্বাচন কমিশন কি নাগরিকত্ব সংক্রান্ত বিষয়ে তদন্ত করতে পারে? কারণ বিরোধীদের অভিযোগ ছিল, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে সাধারণ মানুষের নাগরিকত্ব নিয়েই প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। এই প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, নির্বাচন কমিশন নাগরিকত্বের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখে না। তবে ভোটার তালিকায় কার নাম থাকবে বা থাকবে না, সেই সীমিত ক্ষেত্রের মধ্যে কমিশন নাগরিকত্ব সম্পর্কিত নথি খতিয়ে দেখতে পারে। অর্থাৎ, কমিশনের এই তদন্ত শুধুমাত্র ভোটার তালিকার উদ্দেশ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।
এসআইআর নিয়ে বিতর্ক প্রথম বড় আকার নেয় বিহারে। সেখানে বিধানসভা নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধনী শুরু হয়েছিল। অভিযোগ ওঠে, লক্ষ লক্ষ মানুষের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। পরে এই প্রক্রিয়া পশ্চিমবঙ্গ-সহ একাধিক রাজ্যে চালু হয়। বিরোধীরা অভিযোগ তোলে, এর মাধ্যমে বিশেষ কিছু সম্প্রদায়কে টার্গেট করা হচ্ছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে এই ইস্যু রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে। কারণ সেখানে প্রায় ৯০ লক্ষ নাম বাদ যাওয়ার দাবি সামনে আসে।
যদিও নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য ছিল ভিন্ন। কমিশনের দাবি, বহু বছর ধরে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন হয়নি। ফলে মৃত ভোটার, অন্যত্র চলে যাওয়া মানুষ বা ডুপ্লিকেট নামের সংখ্যা বেড়ে গিয়েছে। দ্রুত নগরায়ণ, অভ্যন্তরীণ স্থানান্তর এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলে জনসংখ্যার পরিবর্তনের কারণে তালিকাকে নতুন করে যাচাই করা প্রয়োজন হয়ে পড়ে। আদালতও কমিশনের এই যুক্তিকে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করেনি। বরং রায়ে বলা হয়েছে, দীর্ঘ সময় পর তালিকা পুনর্বিবেচনা করার মধ্যে অসাংবিধানিক কিছু নেই।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Matua citizenship issue: নিজের দেশেই পরবাসী হয়ে যাচ্ছেন মতুয়ারা? ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়লে কী হবে তাঁদের ভবিষ্যৎ? নাগরিকত্ব, কাজ, অধিকার—সবই কি এখন অনিশ্চিত? এসআইআর প্রক্রিয়া শুধু মুসলিম নয়, প্রান্তিক হিন্দুদেরও টার্গেট করছে? তাহলে কারা সত্যিই নিরাপদ?
তবে আদালত নির্বাচন কমিশনকে সম্পূর্ণ অবাধ স্বাধীনতাও দেয়নি। এর আগেই অন্তর্বর্তী নির্দেশে সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল, আধার কার্ডকে বৈধ নথি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। কারণ শুরুতে কমিশন যে নথির তালিকা দিয়েছিল, সেখানে আধার ছিল না। বিরোধীরা বলেছিল, সাধারণ মানুষের কাছে সব ধরনের সরকারি নথি নাও থাকতে পারে। পরে আদালতের হস্তক্ষেপে আধার অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
রাজনৈতিকভাবে এই রায়কে বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে বিরোধী শিবিরের জন্য। কারণ কংগ্রেস-সহ একাধিক বিরোধী দল এসআইআর-এর বিরুদ্ধে সরব হয়েছিল। তাঁদের অভিযোগ ছিল, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দিয়ে নির্বাচনী ফল প্রভাবিত করার চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের পর নির্বাচন কমিশনের অবস্থান অনেকটাই শক্তিশালী হলো। ইতোমধ্যেই তৃতীয় দফার এসআইআর শুরু হওয়ার কথা রয়েছে ১৬টি রাজ্য ও কয়েকটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে।
অন্যদিকে রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এই রায়ের ফলে আগামী দিনে ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রশ্নে নির্বাচন কমিশন আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে। কারণ আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, 'অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন' শুধু ভোটগ্রহণের দিনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করলেই হয় না, তার ভিত্তি তৈরি হয় নির্ভুল ভোটার তালিকার মাধ্যমে।
তবে বিতর্ক এখানেই শেষ হচ্ছে না। সমালোচকদের একাংশ এখনও মনে করছেন, বাস্তবে এই ধরনের প্রক্রিয়ায় দরিদ্র, প্রান্তিক ও নথিহীন মানুষেরাই সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল, সীমান্ত এলাকা বা অভিবাসী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নথি দেখানো কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ফলে আইনগত বৈধতা পেলেও এসআইআর-এর বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।






