এসএসসি দুর্নীতি বনাম হাই কোর্ট, যে কারণে এই লড়াই ঐতিহাসিক হয়ে থাকবে

কথা ছিল পরীক্ষা দিয়ে চাকরি হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হয়েও দিনের পর দিন নিয়োগপত্র হাতে পায়নি বহু চাকরিপ্রার্থী। দীর্ঘদিন স্কুল সার্ভিস কমিশনের কাছে দাবি জানিয়েও মেলেনি সদুত্তর। অথচ এসএসসি-তে নিয়োগ হয়েছে। চাকরি পেয়েছেন মন্ত্রীর কন্যা, শাসক দলের নেতার আত্মীয়রা।

শিক্ষায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ইতিহাস এই রাজ্যে প্রথম নয়।বাম আমলে গোটা রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালনা হতো আলিমুদ্দিন থেকে। সিপিএমের হয়ে যাবতীয় নিয়োগ, ছাঁটাই- সব নিয়ন্ত্রণ করতেন অনিল বিশ্বাস। তৃণমূল আমলেও এই ছবি বদলায়নি। এসএসসি থেকে শুরু করে গ্রুপ ডি কর্মচারী পদে অন্তত ৬০৯টি বেআইনি নিয়োগ- তৃণমূল সরকারের আমলে এমন দুর্নীতির অভিযোগ বিস্তর।

দীর্ঘদিন সরকারের কাছে দাবি জানিয়েও ফল মেলেনি। তাই বিচারের আশায় কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন পরীক্ষার্থীরা। চাকরিপ্রার্থী সন্দীপ প্রসাদ, সাবিনা ইয়াসমিন এবং সেতাবউদ্দিন নিয়োগ- দুর্নীতি মামলায় হাই কোর্টে তিনটি আলাদা পিটিশন ফাইল করেন। মূল মামলাকারী ছিলেন ববিতা সরকার। মামলার শুনানির সময় নিয়োগ-দুর্নীতিতে উঠে আসে আরও তথ্য।

আরও পড়ুন: সাধারণ মেয়ের জেদের কাছে হারতে হল মন্ত্রীর মেয়েকে! প্রতিবাদের নাম ববিতা

এই প্রসঙ্গে ১৮ মে কলকাতা হাই কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ তাদের রায়ে জানিয়েছে, "নিয়োগ সংক্রান্ত ক্ষেত্রে দুর্নীতি হয়েছে। সেই দুর্নীতির তদন্তের জন্য কোর্ট বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের দেওয়া সিবিআই তদন্তের নির্দেশ বহাল রাখল।" এর আগেও সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন কেসে ২০২১-এর নভেম্বরের থেকে এপ্রিল ২০২২-এর মধ্যে সাতটি কেসের ক্ষেত্রে সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিলেন বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায়।

কোর্টের এই কড়া মনোভাব সরকারকে বাধ্য করেছে এই বিষয়ে পদক্ষেপ করতে। ইতিমধ্যেই বেআইনিভাবে নিযুক্ত শিক্ষকদের চাকরি থেকে ছাঁটাইয়ের নির্দেশ দিয়েছে আদালত। শুধু তাই নয়, চাকরি পাওয়া থেকে আজ অবধি যে পরিমাণ বেতন এঁদের প্রত্যেকের অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছে, তাও সরকারকে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে আদালত। এই দুর্নীতিতে প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়েরও নাম জড়িয়েছে। ইতিমধ্যেই সিবিআইয়ের জেরার সম্মুখীন হয়েছেন পার্থ চট্টোপাধ্যায়। শুধু তাই নয়, শিক্ষা মন্ত্রকের রাষ্ট্রমন্ত্রী পরেশ অধিকারীর মেয়ে অঙ্কিতা অধিকারীর বেআইনি নিয়োগকেও বাতিল করে দিয়েছে হাই কোর্টের সিঙ্গল বেঞ্চ।

কোর্টের নিয়োগ করা বাগ কমিটির রিপোর্ট বলছে, তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের অনুমোদনে যে নিয়োগ কমিটি তৈরি হয়েছিল, তা বেআইনি। মধ্যশিক্ষা পর্ষদের সভাপতি কল্যাণময় গঙ্গোপাধ্যায়ের হাতেই সকলের নিয়োগপত্রের সুপারিশের চিঠি তুলে দিতেন শিক্ষা দপ্তরের আধিকারিকরা। এরপর স্কুল সার্ভিস কমিশনের টেকনিক্যাল অফিসার রাজেশ লায়েক সেগুলোর হিসেব রাখতেন। ধ্রুব চক্রবর্তী ও রাজেশ লায়েক এই সুপারিশপত্রগুলোর সফট কপি, সিডি, ইমেল ইত্যাদি তৈরি করে রাখতেন। সব দেখেশুনে অ্যাপ্রুভ করতেন পর্ষদ-সভাপতি কল্যাণময় গঙ্গোপাধ্যায়। জাল নিয়োগপত্র পাঠাতেন  এসএসসি-র প্রাক্তন কর্তা শান্তিপ্রসাদ সিনহা। সেই অনুযায়ী লিস্ট তৈরি হতো।

এঁদের সকলের বিরুদ্ধেই ৪১৫, ৪১৬ ও ৩৪ নম্বর ধারায় শাস্তি দেওয়ার সুপারিশ হয়েছে কমিটির রিপোর্টে। এছাড়াও স্কুল সার্ভিস কমিশনের আঞ্চলিক চেয়ারম্যান শর্মিলা মিত্র, শুভজিৎ চট্টোপাধ্যায়, শেখ সিরাজউদ্দিন, মহুয়া বিশ্বাস, চৈতালি ভট্টাচার্যর বিরুদ্ধেও বিভাগীয় তদন্তের সুপারিশ করা হয়েছে বাগ কমিটির রিপোর্টে।

কলকাতা হাই কোর্ট প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী-সহ একাধিক সরকারি কর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়ার পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ‍্যোপাধ্যায় কিন্তু আঙুল তুলেছেন অতীতের বাম সরকারের দিকেই। ২০ মে ঝাড়গ্রামের একটি জনসভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, "আগের ৩৪ বছরে সিপিএম আমলে তো মন্ত্রীদের পাঠানো চিরকুটের ভিত্তিতে নিয়োগ হতো। সেই পরিস্থিতি এখন বদলেছে। কোথায় কোথায় কী কী দুর্নীতি হয়েছে, সেই ব্যাপারে তদন্ত চলছে। আস্তে আস্তে সব আপনাদের সামনে আসবে।"

ঘটনাচক্রে মুখ্যমন্ত্রী যখন জনসভা থেকে বামেদের দিকেই এসএসসি দুর্নীতির আঙুল তুলছেন, ঠিক সেদিনই বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের সিঙ্গল বেঞ্চ নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগে মন্ত্রী পরেশ অধিকারীর মেয়ে অঙ্কিতা অধিকারীকে চাকরি থেকে বরখাস্তর নির্দেশ দিচ্ছেন।

আগেও বিভিন্ন সময়ে তৃণমূল সরকারের আমলে হওয়া দুর্নীতিতে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে কলকাতা হাই কোর্টকে। কিন্তু এইবার একের পর এক সরকারি আমলা, তৃণমূলের নেতা-মন্ত্রীর বিরুদ্ধে যেভাবে আইনি পদক্ষেপের নির্দেশ দিয়েছে আদালত, তা অতীতে ঘটেনি।

 

More Articles

;