এসএসসি দুর্নীতি বনাম হাই কোর্ট, যে কারণে এই লড়াই ঐতিহাসিক হয়ে থাকবে

এইবার একের পর এক সরকারি আমলা, তৃণমূলের নেতা-মন্ত্রীর বিরুদ্ধে যেভাবে আইনি পদক্ষেপের নির্দেশ দিয়েছে আদালত, তা অতীতে ঘটেনি।

Aritra Dasgupta
৩ মিনিট
এসএসসি দুর্নীতি বনাম হাই কোর্ট, যে কারণে এই লড়াই ঐতিহাসিক হয়ে থাকবে

কথা ছিল পরীক্ষা দিয়ে চাকরি হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হয়েও দিনের পর দিন নিয়োগপত্র হাতে পায়নি বহু চাকরিপ্রার্থী। দীর্ঘদিন স্কুল সার্ভিস কমিশনের কাছে দাবি জানিয়েও মেলেনি সদুত্তর। অথচ এসএসসি-তে নিয়োগ হয়েছে। চাকরি পেয়েছেন মন্ত্রীর কন্যা, শাসক দলের নেতার আত্মীয়রা।

শিক্ষায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ইতিহাস এই রাজ্যে প্রথম নয়।বাম আমলে গোটা রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালনা হতো আলিমুদ্দিন থেকে। সিপিএমের হয়ে যাবতীয় নিয়োগ, ছাঁটাই- সব নিয়ন্ত্রণ করতেন অনিল বিশ্বাস। তৃণমূল আমলেও এই ছবি বদলায়নি। এসএসসি থেকে শুরু করে গ্রুপ ডি কর্মচারী পদে অন্তত ৬০৯টি বেআইনি নিয়োগ- তৃণমূল সরকারের আমলে এমন দুর্নীতির অভিযোগ বিস্তর।

দীর্ঘদিন সরকারের কাছে দাবি জানিয়েও ফল মেলেনি। তাই বিচারের আশায় কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন পরীক্ষার্থীরা। চাকরিপ্রার্থী সন্দীপ প্রসাদ, সাবিনা ইয়াসমিন এবং সেতাবউদ্দিন নিয়োগ- দুর্নীতি মামলায় হাই কোর্টে তিনটি আলাদা পিটিশন ফাইল করেন। মূল মামলাকারী ছিলেন ববিতা সরকার। মামলার শুনানির সময় নিয়োগ-দুর্নীতিতে উঠে আসে আরও তথ্য।

এই প্রসঙ্গে ১৮ মে কলকাতা হাই কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ তাদের রায়ে জানিয়েছে, "নিয়োগ সংক্রান্ত ক্ষেত্রে দুর্নীতি হয়েছে। সেই দুর্নীতির তদন্তের জন্য কোর্ট বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের দেওয়া সিবিআই তদন্তের নির্দেশ বহাল রাখল।" এর আগেও সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন কেসে ২০২১-এর নভেম্বরের থেকে এপ্রিল ২০২২-এর মধ্যে সাতটি কেসের ক্ষেত্রে সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিলেন বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সাধারণ মেয়ের জেদের কাছে হারতে হল মন্ত্রীর মেয়েকে! প্রতিবাদের নাম ববিতা

পরেশ অধিকারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তৃণমূলে যোগ দেওয়ার পরেই পরেশ অধিকারী প্রভাব খাটিয়ে মেয়েকে চাকরি পাইয়ে দিয়েছেন।

কোর্টের এই কড়া মনোভাব সরকারকে বাধ্য করেছে এই বিষয়ে পদক্ষেপ করতে। ইতিমধ্যেই বেআইনিভাবে নিযুক্ত শিক্ষকদের চাকরি থেকে ছাঁটাইয়ের নির্দেশ দিয়েছে আদালত। শুধু তাই নয়, চাকরি পাওয়া থেকে আজ অবধি যে পরিমাণ বেতন এঁদের প্রত্যেকের অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছে, তাও সরকারকে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে আদালত। এই দুর্নীতিতে প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়েরও নাম জড়িয়েছে। ইতিমধ্যেই সিবিআইয়ের জেরার সম্মুখীন হয়েছেন পার্থ চট্টোপাধ্যায়। শুধু তাই নয়, শিক্ষা মন্ত্রকের রাষ্ট্রমন্ত্রী পরেশ অধিকারীর মেয়ে অঙ্কিতা অধিকারীর বেআইনি নিয়োগকেও বাতিল করে দিয়েছে হাই কোর্টের সিঙ্গল বেঞ্চ।

কোর্টের নিয়োগ করা বাগ কমিটির রিপোর্ট বলছে, তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের অনুমোদনে যে নিয়োগ কমিটি তৈরি হয়েছিল, তা বেআইনি। মধ্যশিক্ষা পর্ষদের সভাপতি কল্যাণময় গঙ্গোপাধ্যায়ের হাতেই সকলের নিয়োগপত্রের সুপারিশের চিঠি তুলে দিতেন শিক্ষা দপ্তরের আধিকারিকরা। এরপর স্কুল সার্ভিস কমিশনের টেকনিক্যাল অফিসার রাজেশ লায়েক সেগুলোর হিসেব রাখতেন। ধ্রুব চক্রবর্তী ও রাজেশ লায়েক এই সুপারিশপত্রগুলোর সফট কপি, সিডি, ইমেল ইত্যাদি তৈরি করে রাখতেন। সব দেখেশুনে অ্যাপ্রুভ করতেন পর্ষদ-সভাপতি কল্যাণময় গঙ্গোপাধ্যায়। জাল নিয়োগপত্র পাঠাতেন এসএসসি-র প্রাক্তন কর্তা শান্তিপ্রসাদ সিনহা। সেই অনুযায়ী লিস্ট তৈরি হতো।

এঁদের সকলের বিরুদ্ধেই ৪১৫, ৪১৬ ও ৩৪ নম্বর ধারায় শাস্তি দেওয়ার সুপারিশ হয়েছে কমিটির রিপোর্টে। এছাড়াও স্কুল সার্ভিস কমিশনের আঞ্চলিক চেয়ারম্যান শর্মিলা মিত্র, শুভজিৎ চট্টোপাধ্যায়, শেখ সিরাজউদ্দিন, মহুয়া বিশ্বাস, চৈতালি ভট্টাচার্যর বিরুদ্ধেও বিভাগীয় তদন্তের সুপারিশ করা হয়েছে বাগ কমিটির রিপোর্টে।

কলকাতা হাই কোর্ট প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী-সহ একাধিক সরকারি কর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়ার পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ‍্যোপাধ্যায় কিন্তু আঙুল তুলেছেন অতীতের বাম সরকারের দিকেই। ২০ মে ঝাড়গ্রামের একটি জনসভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, "আগের ৩৪ বছরে সিপিএম আমলে তো মন্ত্রীদের পাঠানো চিরকুটের ভিত্তিতে নিয়োগ হতো। সেই পরিস্থিতি এখন বদলেছে। কোথায় কোথায় কী কী দুর্নীতি হয়েছে, সেই ব্যাপারে তদন্ত চলছে। আস্তে আস্তে সব আপনাদের সামনে আসবে।"

ঘটনাচক্রে মুখ্যমন্ত্রী যখন জনসভা থেকে বামেদের দিকেই এসএসসি দুর্নীতির আঙুল তুলছেন, ঠিক সেদিনই বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের সিঙ্গল বেঞ্চ নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগে মন্ত্রী পরেশ অধিকারীর মেয়ে অঙ্কিতা অধিকারীকে চাকরি থেকে বরখাস্তর নির্দেশ দিচ্ছেন।

আগেও বিভিন্ন সময়ে তৃণমূল সরকারের আমলে হওয়া দুর্নীতিতে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে কলকাতা হাই কোর্টকে। কিন্তু এইবার একের পর এক সরকারি আমলা, তৃণমূলের নেতা-মন্ত্রীর বিরুদ্ধে যেভাবে আইনি পদক্ষেপের নির্দেশ দিয়েছে আদালত, তা অতীতে ঘটেনি।

লিখেছেন
Aritra Dasgupta
Aritra Dasgupta
1 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই আপত্তি, ১০ মাসে দুই কমিশনারের ১৪ বার প্রশ্ন

Election Commission SIR: এসআইআর ঘিরে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই তৈরি হয়েছে মতপার্থক্য। গত ১০ মাসে দুই নির্বাচন কমিশনার ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছেন বলে দাবি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। ফর্ম ৬ বদল, ভোটার তথ্যভান্ডারের কেন্দ্রীয়করণ, পশ্চিমবঙ্গের আপিল এবং প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা নিয়েও উঠেছে একাধিক প্রশ্ন। ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও আইন মেনে চলার বিষয়টি ফের আলোচনায়।