যুদ্ধবিরতি ভেঙে ফের হামলা, কোথায় দাঁড়িয়ে আমেরিকা-ইরান সংঘাত?
US Iran Conflict: যুদ্ধবিরতির আশা যখন জোরদার হচ্ছিল, তখনই কেন নতুন করে মুখোমুখি আমেরিকা ও ইরান? হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে সংঘাত কতটা গুরুতর আকার নিতে পারে? বিমান হামলা ও পাল্টা আঘাতের পর পশ্চিম এশিয়া কি আবার পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে, নাকি এখনও কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ রয়েছে?
মাত্র কয়েকদিন আগেও মনে হচ্ছিল, দীর্ঘ সংঘাতের পর হয়তো অবশেষে আলোচনার পথে এগোতে পারে আমেরিকা ও ইরান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স দু’জনেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে একটি শান্তি চুক্তি খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে। কিন্তু সেই আশার মধ্যেই নতুন করে যুদ্ধের আগুন ছড়িয়ে পড়েছে পশ্চিম এশিয়ায়।
সংঘাতের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয় হরমুজ প্রণালীর কাছে একটি মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে। আমেরিকার অভিযোগ, ইরানের একটি ড্রোন ওই হেলিকপ্টারটিকে আঘাত করে। যদিও হেলিকপ্টারের দুই পাইলটই নিরাপদে উদ্ধার হন, তবুও ওয়াশিংটন এই ঘটনাকে সরাসরি উসকানি হিসেবে দেখে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা করেন, এই ঘটনার জবাব দেওয়া হবে।
এর পরেই মার্কিন বাহিনী ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে একাধিক বিমান হামলা চালায়। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের দাবি, তারা ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, র ্যাডার কেন্দ্র এবং সামরিক নিয়ন্ত্রণ পরিকাঠামোকে লক্ষ্য করেই হামলা চালিয়েছে। ওয়াশিংটনের বক্তব্য, এটি ছিল ‘প্রতিক্রিয়া’, অর্থাৎ ইরানের পদক্ষেপের জবাবেই এই হামলা।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Iran-Israel War: এমনকি ১৯৪৮ সালে যখন ইজরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হয়, তখন তুরস্কের পর ইজরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়া দ্বিতীয় মুসলিম দেশ ইরান। দুই দেশের মধ্যে গড়ে উঠেছিল অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক।
তবে তেহরান এই ব্যাখ্যা মানতে রাজি নয়। ইরানের বিদেশ মন্ত্রক বলেছে, এই হামলা আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রসঙ্ঘ সনদের লঙ্ঘন। তাদের অভিযোগ, একটি অজুহাত তৈরি করে আমেরিকা আবারও সংঘাতকে উসকে দিয়েছে। ইরানের দাবি, হামলায় শুধু সামরিক পরিকাঠামো নয়, জল সংরক্ষণের মতো বেসামরিক পরিকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দক্ষিণ ইরানের কয়েকটি এলাকায় পানীয় জলের সংকট দেখা দিয়েছে এবং প্রায় ২০ হাজার মানুষ সরাসরি সমস্যার মুখে পড়েছেন।
আমেরিকার হামলার পর ইরানও দ্রুত পাল্টা জবাব দেয়। ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি জানায়, তারা বাহরিনে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহরকে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। পাশাপাশি জর্ডন, কুয়েত এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের আরও কয়েকটি মার্কিন ঘাঁটিকেও নিশানা করা হয়েছে বলে দাবি করেছে তারা। ফলে যে যুদ্ধবিরতি কয়েক মাস ধরে টিকে ছিল, তা এখন কার্যত ভেঙে পড়ার মুখে।
গত ফেব্রুয়ারি মাসে শুরু হওয়া যুদ্ধের পর এপ্রিলে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল। তার মূল উদ্দেশ্য ছিল হরমুজ প্রণালীকে পুনরায় খুলে দেওয়া এবং বৃহত্তর শান্তি আলোচনার পথ তৈরি করা। কিন্তু যুদ্ধবিরতির পরেও বারবার ছোট-বড় সংঘর্ষ ঘটেছে। কখনও ড্রোন হামলা, কখনও ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ, কখনও আবার সমুদ্রপথে উত্তেজনা মিলিয়ে শান্তির পরিবেশ কখনওই পুরোপুরি তৈরি হয়নি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Hezbollah Chief Hassan Nasrallah Killed: তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে হিজবুল্লাহকে নেতৃত্ব দেওয়া নাসরাল্লাহ খুন হলেন ২৭ সেপ্টেম্বর, বেইরুটে ইজরায়েলি বিমান হামলায়।
গত কয়েক সপ্তাহে অবশ্য কূটনৈতিক স্তরে কিছু অগ্রগতি হয়েছিল। আলোচনায় উঠে এসেছিল ৬০ দিনের জন্য যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর প্রস্তাব। একই সঙ্গে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু করার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। ট্রাম্প প্রশাসনও ইঙ্গিত দিয়েছিল একটি সমঝোতা প্রায় প্রস্তুত। কিন্তু সাম্প্রতিক সামরিক সংঘর্ষ সেই প্রক্রিয়াকে নতুন করে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে।
যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালী, তা এখন আর কারোর অজানা নয়। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়। ইরান বহুদিন ধরেই দাবি করে আসছে, এই জলপথে তাদের বিশেষ অধিকার রয়েছে। অন্যদিকে আমেরিকা ও তার মিত্ররা একে আন্তর্জাতিক নৌপথ হিসেবে দেখতে চায়। ফলে হরমুজ নিয়ে উত্তেজনা কেবল সামরিক নয়, অর্থনৈতিকও।
এই সংঘাতের প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেলের দামের ওঠানামা শুরু হয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলির শেয়ার বাজারেও তার প্রভাব পড়েছে। যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা দেখা দিলে তেলের দাম কমেছিল, কিন্তু নতুন হামলার পর ফের উদ্বেগ বাড়তে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় বহু দেশ পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে।
ভারতের জন্যও এই পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালী হয়ে আসে। শুধু তাই নয়, উপসাগরীয় দেশগুলিতে লক্ষাধিক ভারতীয় কর্মরত। ফলে সংঘাত আরও বাড়লে জ্বালানির দাম থেকে শুরু করে প্রবাসী ভারতীয়দের নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই প্রভাব পড়তে পারে।
এদিকে ইজরায়েলও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে লেবাননে নতুন হামলা চালিয়েছে তারা। ইরান বারবার বলেছে, লেবানন এবং হেজবোল্লা ইস্যুতে স্থায়ী সমাধান না হলে বৃহত্তর শান্তি চুক্তি সম্ভব নয়। ফলে আমেরিকা-ইরান আলোচনা এখন শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে গোটা পশ্চিম এশিয়ার ভূরাজনীতি।
পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত স্পর্শকাতর। একদিকে ট্রাম্প প্রশাসন এখনও বলছে, শান্তি চুক্তির দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। অন্যদিকে যুদ্ধক্ষেত্রে নতুন হামলা ও পাল্টা হামলা সেই আশাকে ক্রমশ দুর্বল করে দিচ্ছে। এই দুইয়ের টানাপোড়েনের মধ্যেই দাঁড়িয়ে আছে আমেরিকা-ইরান সম্পর্ক।







