যুদ্ধবিরতি ভেঙে ফের হামলা, কোথায় দাঁড়িয়ে আমেরিকা-ইরান সংঘাত?

US Iran Conflict: যুদ্ধবিরতির আশা যখন জোরদার হচ্ছিল, তখনই কেন নতুন করে মুখোমুখি আমেরিকা ও ইরান? হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে সংঘাত কতটা গুরুতর আকার নিতে পারে? বিমান হামলা ও পাল্টা আঘাতের পর পশ্চিম এশিয়া কি আবার পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে, নাকি এখনও কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ রয়েছে?

inscript
৩ মিনিট
যুদ্ধবিরতি ভেঙে ফের হামলা, কোথায় দাঁড়িয়ে আমেরিকা-ইরান সংঘাত?

মাত্র কয়েকদিন আগেও মনে হচ্ছিল, দীর্ঘ সংঘাতের পর হয়তো অবশেষে আলোচনার পথে এগোতে পারে আমেরিকা ও ইরান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স দু’জনেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে একটি শান্তি চুক্তি খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে। কিন্তু সেই আশার মধ্যেই নতুন করে যুদ্ধের আগুন ছড়িয়ে পড়েছে পশ্চিম এশিয়ায়।

সংঘাতের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয় হরমুজ প্রণালীর কাছে একটি মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে। আমেরিকার অভিযোগ, ইরানের একটি ড্রোন ওই হেলিকপ্টারটিকে আঘাত করে। যদিও হেলিকপ্টারের দুই পাইলটই নিরাপদে উদ্ধার হন, তবুও ওয়াশিংটন এই ঘটনাকে সরাসরি উসকানি হিসেবে দেখে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা করেন, এই ঘটনার জবাব দেওয়া হবে।

এর পরেই মার্কিন বাহিনী ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে একাধিক বিমান হামলা চালায়। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের দাবি, তারা ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, র ্যাডার কেন্দ্র এবং সামরিক নিয়ন্ত্রণ পরিকাঠামোকে লক্ষ্য করেই হামলা চালিয়েছে। ওয়াশিংটনের বক্তব্য, এটি ছিল ‘প্রতিক্রিয়া’, অর্থাৎ ইরানের পদক্ষেপের জবাবেই এই হামলা।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ইজরায়েলকে স্বীকৃতি দিয়েছিল ইরান! কেন দুই দেশের সর্ম্পকের অবনতি হলো?

Iran-Israel War: এমনকি ১৯৪৮ সালে যখন ইজরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হয়, তখন তুরস্কের পর ইজরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়া দ্বিতীয় মুসলিম দেশ ইরান। দুই দেশের মধ্যে গড়ে উঠেছিল অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক।

তবে তেহরান এই ব্যাখ্যা মানতে রাজি নয়। ইরানের বিদেশ মন্ত্রক বলেছে, এই হামলা আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রসঙ্ঘ সনদের লঙ্ঘন। তাদের অভিযোগ, একটি অজুহাত তৈরি করে আমেরিকা আবারও সংঘাতকে উসকে দিয়েছে। ইরানের দাবি, হামলায় শুধু সামরিক পরিকাঠামো নয়, জল সংরক্ষণের মতো বেসামরিক পরিকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দক্ষিণ ইরানের কয়েকটি এলাকায় পানীয় জলের সংকট দেখা দিয়েছে এবং প্রায় ২০ হাজার মানুষ সরাসরি সমস্যার মুখে পড়েছেন।

আমেরিকার হামলার পর ইরানও দ্রুত পাল্টা জবাব দেয়। ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি জানায়, তারা বাহরিনে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহরকে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। পাশাপাশি জর্ডন, কুয়েত এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের আরও কয়েকটি মার্কিন ঘাঁটিকেও নিশানা করা হয়েছে বলে দাবি করেছে তারা। ফলে যে যুদ্ধবিরতি কয়েক মাস ধরে টিকে ছিল, তা এখন কার্যত ভেঙে পড়ার মুখে।

গত ফেব্রুয়ারি মাসে শুরু হওয়া যুদ্ধের পর এপ্রিলে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল। তার মূল উদ্দেশ্য ছিল হরমুজ প্রণালীকে পুনরায় খুলে দেওয়া এবং বৃহত্তর শান্তি আলোচনার পথ তৈরি করা। কিন্তু যুদ্ধবিরতির পরেও বারবার ছোট-বড় সংঘর্ষ ঘটেছে। কখনও ড্রোন হামলা, কখনও ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ, কখনও আবার সমুদ্রপথে উত্তেজনা মিলিয়ে শান্তির পরিবেশ কখনওই পুরোপুরি তৈরি হয়নি।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
চরকে দিয়ে গোপন তথ্য হাসিল ইজরায়েলের? যেভাবে খুন হলেন হিজবুল্লাহ প্রধান নাসরাল্লাহ

Hezbollah Chief Hassan Nasrallah Killed: তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে হিজবুল্লাহকে নেতৃত্ব দেওয়া নাসরাল্লাহ খুন হলেন ২৭ সেপ্টেম্বর, বেইরুটে ইজরায়েলি বিমান হামলায়।

গত কয়েক সপ্তাহে অবশ্য কূটনৈতিক স্তরে কিছু অগ্রগতি হয়েছিল। আলোচনায় উঠে এসেছিল ৬০ দিনের জন্য যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর প্রস্তাব। একই সঙ্গে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু করার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। ট্রাম্প প্রশাসনও ইঙ্গিত দিয়েছিল একটি সমঝোতা প্রায় প্রস্তুত। কিন্তু সাম্প্রতিক সামরিক সংঘর্ষ সেই প্রক্রিয়াকে নতুন করে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে।

যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালী, তা এখন আর কারোর অজানা নয়। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়। ইরান বহুদিন ধরেই দাবি করে আসছে, এই জলপথে তাদের বিশেষ অধিকার রয়েছে। অন্যদিকে আমেরিকা ও তার মিত্ররা একে আন্তর্জাতিক নৌপথ হিসেবে দেখতে চায়। ফলে হরমুজ নিয়ে উত্তেজনা কেবল সামরিক নয়, অর্থনৈতিকও।

এই সংঘাতের প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেলের দামের ওঠানামা শুরু হয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলির শেয়ার বাজারেও তার প্রভাব পড়েছে। যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা দেখা দিলে তেলের দাম কমেছিল, কিন্তু নতুন হামলার পর ফের উদ্বেগ বাড়তে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় বহু দেশ পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে।

ভারতের জন্যও এই পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালী হয়ে আসে। শুধু তাই নয়, উপসাগরীয় দেশগুলিতে লক্ষাধিক ভারতীয় কর্মরত। ফলে সংঘাত আরও বাড়লে জ্বালানির দাম থেকে শুরু করে প্রবাসী ভারতীয়দের নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই প্রভাব পড়তে পারে।

এদিকে ইজরায়েলও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে লেবাননে নতুন হামলা চালিয়েছে তারা। ইরান বারবার বলেছে, লেবানন এবং হেজবোল্লা ইস্যুতে স্থায়ী সমাধান না হলে বৃহত্তর শান্তি চুক্তি সম্ভব নয়। ফলে আমেরিকা-ইরান আলোচনা এখন শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে গোটা পশ্চিম এশিয়ার ভূরাজনীতি।

পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত স্পর্শকাতর। একদিকে ট্রাম্প প্রশাসন এখনও বলছে, শান্তি চুক্তির দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। অন্যদিকে যুদ্ধক্ষেত্রে নতুন হামলা ও পাল্টা হামলা সেই আশাকে ক্রমশ দুর্বল করে দিচ্ছে। এই দুইয়ের টানাপোড়েনের মধ্যেই দাঁড়িয়ে আছে আমেরিকা-ইরান সম্পর্ক।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ব্রিকস: অর্থনীতির হিসেব-নিকেশ

BRICS Economic Power: মার্কিন শুল্কনীতি, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, ডলারের আধিপত্য ও পশ্চিমী নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে কি ব্রিকস সত্যিই বিকল্প অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে? গ্লোবাল সাউথের স্বার্থ রক্ষায় ব্রিকসের ঘোষিত নীতিগুলি কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে? নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্ক, ডি-ডলারাইজেশন, বৈশ্বিক করব্যবস্থা এবং সদস্য দেশগুলির পারস্পরিক স্বার্থের সংঘাত কি ব্রিকসের সেই সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করছে? ভবিষ্যতে এর ভূমিকা কতটা কার্যকর হবে?

১৯৬৯-এর কংগ্রেস থেকে ২০২৬-এর তৃণমূল: যেভাবে ভারতে দল ভেঙেছে বারবার

Politics of Party Splits in India: ১৯৬৯ সালে কংগ্রেস ভাঙার মধ্য দিয়ে যে প্রক্রিয়া শুরু, ২০২৬ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের ভাঙন তারই ধারাবাহিকতা। নেতৃত্বের লড়াই, মতাদর্শিক সংঘাত ও নির্বাচনী কৌশল—প্রতিটি ভাঙনের পিছনে একাধিক কারণ। দশম তফসিল ও নির্বাচন কমিশনের নিয়ম ভাঙনকে আইনি কাঠামোয় বাঁধতে চেয়েছে, তবুও 'প্রকৃত দল' বা আদি প্রতিষ্ঠাতা নির্ণয়ে বিভ্রান্তি রয়ে গিয়েছে বহুবার।

মমতা ফিরে পাবেন তাঁর আঁকা জোড়াফুল?

Mamata Banerjee TMC Symbol: তৃণমূল কংগ্রেসের ঐতিহ্যবাহী জোড়াফুল প্রতীক কি শেষ পর্যন্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে ফিরবে? জোড়াফুলের ভবিষ্যৎ কী? কী বলছে আইন?

EXCLUSIVE: দলের নেতাদের উপর নজর রাখতে আমায় ব্যবহার করেছেন মমতা : ঋতব্রত

Ritabrata Banerjee: ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, তৃণমূল নেতাদের উপর আড়ি পাতার কাজে তাঁকে ব্যবহার করা হয়েছিল। কাদের কাছে সেই তথ্য পৌঁছে দিতেন তিনি? ২০২১-এর ভোট পর্যন্ত চলা সেই নজরদারির নেপথ্যে কারা ছিলেন?

EXCLUSIVE: ১৪ জনকে হারাতে চেয়েছিল ক্যামাক স্ট্রিট, তালিকায় প্রথম মমতা: ঋতব্রত

Ritabrata Banerjee: তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরেই ১৪ জনকে নির্বাচনে হারিয়ে দেওয়ার তালিকা তৈরি হয়েছিল। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি অনুযায়ী, সেই তালিকায় প্রথম নাম ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। আর কারা ছিলেন ওই তালিকায়? নির্দেশ এসেছিল কোথা থেকে?

তিন মাসে ২৬ নির্যাতনের ঘটনা, খ্রিস্টানদের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে কে?

মুখ্যমন্ত্রী ও সংখ্যালঘু দফতরের মন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে বঙ্গীয় খ্রিস্টীয় পরিষেবা। স্মারকলিপিতে গত তিন মাসে অন্তত ২৬টি নির্যাতনের ঘটনা এবং ১১টি এফআইআর নথিভুক্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সংগঠনের অভিযোগ, আরও বেশ কিছু ঘটনা ভুক্তভোগীদের ভয় বা নানা কারণে পুলিশের কাছে নথিভুক্ত হয়নি। অভিযোগগুলির মধ্যে রয়েছে প্রার্থনা সভায় হামলা, উপাসনাস্থলে ভাঙচুর, ধর্মীয় সামগ্রী নষ্ট করা এবং খ্রিস্টান ধর্মযাজক ও উপাসকদের হেনস্থা।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।

কর্নওয়ালিস স্ট্রিট থেকে বিধান সরণি, ধর্মতলা থেকে লেনিন সরণি: যেভাবে ক্ষমতাসীনরা বদলেছে কলকাতার রাস্তার নাম

Renaming politics of kolkata's street: লটারি কমিটির কর্নওয়ালিস স্ট্রিট নির্মাণ থেকে বামফ্রন্টের লেনিন সরণি, হো চি মিন সরণি—কলকাতার রাস্তার নামকরণ প্রথম থেকেই রাজনৈতিক ছিল। ২০২৬ সালে, বিজেপি সরকারের উৎসাহে দশ সদস্যের কমিটি গঠিত হয়েছে লেনিন, কার্ল মার্কস ও হো চি মিন সরণির নাম বদলের সুপারিশ করতে। কিন্তু নাম বদলালেই কি মানুষের স্মৃতি বদলায়?