ভিকো টারমারিক, নেহি কসমেটিক: একটি বিজ্ঞাপন যেভাবে আদালতে সরকারের বিরুদ্ধে অস্ত্র হয়ে উঠল
Vicco Turmeric Case: ১৯৭০-এর দশক। সেই সময় ভারতে কসমেটিকের উপর সরকার প্রচুর পরিমাণে এক্সাইজ ডিউটি অর্থাৎ কর চাপাত। বিলাসিতা পণ্যের তালিকায় থাকায় কসমেটিকের ট্যাক্স ছিল আকাশছোঁয়া। অন্যদিকে, ভেষজ বা আয়ুর্বেদিক ওষুধের উপর এই কর ছিল প্রায় শূন্য।
“ভিকো টারমারিক, নেহি কসমেটিক
ভিকো টারমারিক আয়ুর্বেদিক ক্রিম!”
নব্বইয়ের দশকের দূরদর্শনের দিনগুলি যাঁদের মনে আছে, তাঁরা এই সুরটা ভোলেননি। বিয়েবাড়ির হলুদের গন্ধ আর এই চেনা জিঙ্গেল যেন একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছিল। কিন্তু এটা হয়তো অনেকেরই অজানা, বিজ্ঞাপনের এই চটজলদি সুর আর লাইনের পিছনে লুকিয়ে রয়েছে ভারত সরকারের সঙ্গে একটি কোম্পানির দীর্ঘ ৩১ বছরের এক আইনি লড়াইয়ের ইতিহাস। যে লড়াইয়ে সাধারণ এক ব্যবসায়ী পরিবার দেশের সরকারকে এক নয়, দুবার নয়, ছ-ছবার আদালতে হারিয়ে দিয়েছিল!
এটি শুধু একটি সফল বিজ্ঞাপনের গল্প নয়, বরং কীভাবে আইনের ফাঁসিকে ব্যবসার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার বানিয়ে নেওয়া যায়—তার এক অনবদ্য রূপকথা।
ট্যাক্স বাঁচানোর চাল
১৯৭০-এর দশক। সেই সময় ভারতে কসমেটিকের উপর সরকার প্রচুর পরিমাণে এক্সাইজ ডিউটি অর্থাৎ কর চাপাত। বিলাসিতা পণ্যের তালিকায় থাকায় কসমেটিকের ট্যাক্স ছিল আকাশছোঁয়া। অন্যদিকে, ভেষজ বা আয়ুর্বেদিক ওষুধের উপর এই কর ছিল প্রায় শূন্য।
১৯৫২ সালে কেশব বিষ্ণু পেন্ধারকর নাগপুরে একটি ছোট মুদি দোকান দিয়ে যে ব্যবসার শুরু করেছিলেন, তাঁর ছেলে গজানন পেন্ধারকর ১৯৭১ সালে এসে বাজারে আনলেন ‘ভিকো টারমারিক স্কিন ক্রিম’। হলুদ আর চন্দনের গুণে ভরা এই ক্রিমটিকে কোম্পানি বাজারে এনেছিল ‘আয়ুর্বেদিক ওষুধ’ হিসেবে, যাতে চড়া করের হাত থেকে বাঁচা যায়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Made in India A Titan Story: আমাজন এমএক্স প্লেয়ারে (Amazon MX Player) রিলিজ হওয়া ৬ এপিসোডের এই সিরিজটি মাত্র তিন সপ্তাহেই বাজিমাত করেছে। ওরম্যাক্স মিডিয়ার রিপোর্ট অনুযায়ী, ১ কোটি ৩৭ লক্ষেরও বেশি ভিউ নিয়ে এটি এই বছরের অন্যতম সফল এবং সবচেয়ে বেশি দেখা ভারতীয় ওয়েব সিরিজ হয়ে উঠেছে।
কিন্তু সরকার তো এত সহজে ছাড়ার পাত্র নয়! ১৯৭৬ সালের ৮ নভেম্বর সেন্ট্রাল এক্সাইজ ডিপার্টমেন্ট ভিকো ল্যাবরেটরিজকে একটি কড়া নোটিশ পাঠায়।
"নামে কেমিক্যাল, বিজ্ঞাপনে রূপচর্চা!"
ট্যাক্স দপ্তরের যুক্তি ছিল বেশ কড়া। প্রথমত, কোম্পানির পুরো নাম ‘বিষ্ণু ইন্ডাস্ট্রিয়াল কেমিক্যাল কোম্পানি’ (VICCO)—যার নামের মধ্যেই রয়েছে ‘কেমিক্যাল’। দ্বিতীয়ত, তাদের বিজ্ঞাপনে ত্বকের উজ্জ্বলতা এবং রূপচর্চার কথা বলা হচ্ছে। সরকার দাবি করল, এটি কোনো ওষুধ নয়, বরং একটি নিখাদ কসমেটিক বা প্রসাধন সামগ্রী। সুতরাং, কোম্পানিকে কসমেটিকের চড়া হারেই ট্যাক্স দিতে হবে।
সাধারণ কোনো কোম্পানি হলে হয়তো ভয় পেয়ে সরকারের দাবি মেনে নিত। কিন্তু ভিকো কর্তৃপক্ষ হাঁটলেন উল্টো পথে। তাঁরা সরকারের নোটিশের জবাবে উল্টে সরকারের নামেই মামলা ঠুকে দিলেন!
আদালত যখন কুরুক্ষেত্র
১৯৭৮ সালে ভিকো কোম্পানি থানের দেওয়ানি আদালতে মামলা করে। আদালতে তারা স্রেফ মুখের কথা বলেনি, রীতিমতো অকাট্য সব প্রমাণ হাজির করেছিল।
তারা এমন সব নামী ডাক্তারদের সাক্ষী হিসেবে নিয়ে আসে, যাঁরা বিভিন্ন চর্মরোগের চিকিৎসায় এই ক্রিমটি রোগীদের প্রেসক্রিপশনে লিখে দিতেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
আজকের দিনে বলপয়েন্ট বা ডট পেন ব্যবহারের সময় এই সমস্যায় আমাদের খুব একটা পড়তে হয় না। কিন্তু গত শতাব্দীর তিরিশের দশকেও এই একটা যন্ত্রণায় দুনিয়ার সমস্ত লেখক, সাহিত্যিক আর সাংবাদিকদের রাতের ঘুম উড়ে যেত। ঠিক এই সাধারণ বিরক্তি থেকেই জন্ম নিয়েছিল ডট পেন।
নিয়ে আসা হয় দেশের বড় বড় আয়ুর্বেদিক বিশেষজ্ঞদের, যাঁরা প্রমাণ করেন যে এই ক্রিমের প্রতিটি উপাদান সম্পূর্ণ লাইসেন্সপ্রাপ্ত আয়ুর্বেদিক ফর্মুলা মেনে তৈরি।
ফল যা হওয়ার তাই হলো। ১৯৮২ সালে নিম্ন আদালত এবং ১৯৮৮ সালে বোম্বে হাইকোর্ট ভিকোর পক্ষেই রায় দেয়। আদালত স্পষ্ট জানায়, এটি একটি আয়ুর্বেদিক ওষুধ। ১৯৯৩ সালে সুপ্রিম কোর্টও সরকারের করা আপিল খারিজ করে এই রায় বহাল রাখে।
আইনি লড়াই যখন বিজ্ঞাপনের স্লোগান
সরকার যখন আদালতে ভিকোকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করছে, ভিকো তখন সেই লড়াইকেই বদলে দিল তাদের বিজ্ঞাপনে। তারা সাধারণ মানুষকে বোঝাতে চাইল—সরকার যাই বলুক, আমাদের পণ্য কোনো ক্ষতিকর কেমিক্যাল বা প্রসাধন নয়, এটি খাঁটি আয়ুর্বেদ।
এই ভাবনা থেকেই জন্ম নিল সেই লাইন: "ভিকো টারমারিক, নেহি কসমেটিক।"
রেডিও এবং সিনেমা হলের পর্দা ছাড়িয়ে এই জিঙ্গেল ছড়িয়ে পড়ল ভারতের ঘরে ঘরে। ১৯৮৪ সালে দূরদর্শনের অসম্ভব জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘ইয়ে জো হ্যায় জিন্দেগি’-র স্পনসরশিপ এবং তার আশেপাশের সব কটি বিজ্ঞাপনের স্লট মোটা টাকায় কিনে নেয় ভিকো। সিরিয়ালের একটি বিয়ের দৃশ্যে অভিনেত্রী সংগীতা বিজলানির গায়ে হলুদ দেওয়ার সময় ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজিয়ে দেওয়া হয় এই গান। ব্যাস! ভারতীয় সংস্কৃতির গায়ের হলুদের আচারটির সঙ্গে ভিকো ক্রিমের নাম চিরতরে জুড়ে গেল।
নতুন আইন এবং চূড়ান্ত নিষ্পত্তি
ট্যাক্স বিভাগ অবশ্য হাল ছাড়েনি। ১৯৮৬ সালে সরকার নতুন কর আইন (Central Excise Tariff Act) নিয়ে আসে। এরপর ‘বৈদ্যনাথ’ মামলার একটি রায়কে হাতিয়ার করে ১৯৯৭ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে ভিকোকে আবারও নতুন করে নোটিশ পাঠানো শুরু হয়।
কিন্তু ততদিনে ভিকোর জিঙ্গেল দেশের মানুষের মনে একটা গভীর প্রভাব ফেলে দিয়েছে। অবশেষে ২০০৭ সালের ২৬ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি অরিজিৎ পাসায়াত এবং বিচারপতি পি. সদাশিবমের বেঞ্চ এই দীর্ঘ লড়াইয়ের চূড়ান্ত রায় দেয়।
সুপ্রিম কোর্ট সরকারকে তীব্র ভর্ৎসনা করে জানায়, একই বিষয় নিয়ে বারবার নোটিশ পাঠিয়ে কোম্পানিকে হয়রানি করা আইনের অপব্যবহার। আদালত পণ্যের শ্রেণিবিভাগের জন্য একটি ঐতিহাসিক নীতি দেয়। আদালত বলে—কোনো পণ্য ওষুধ নাকি প্রসাধন, তা শুধু তার প্যাকেজিং বা বিক্রির জায়গা দেখে ঠিক করা যায় না। দেখতে হবে তার উপাদান কী, চিকিৎসায় তার ভূমিকা কী এবং সবচেয়ে বড় কথা, দেশের সাধারণ মানুষ পণ্যটিকে কীভাবে দেখছে।
আর দেশের মানুষ তো ভিকোর জিঙ্গেল শুনে জেনেই গিয়েছে যে এটা "নেহি কসমেটিক"! ফলে, দীর্ঘ ৩১ বছরের আইনি যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে ভিকো জিতে নেয় চূড়ান্ত বিজয়।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ভিকো ল্যাবরেটরিজ শুধু একটি ক্রিম বা টুথপেস্টের ব্র্যান্ড নয়, এটি একটি পারিবারিক ব্যবসার সফলতার প্রতীক। নাগপুরের সেই ছোট দোকান থেকে শুরু করে আজ থানে, নাগপুর এবং গোয়াতে বিশাল ফ্যাক্টরি নিয়ে বিশ্বের প্রায় ৪০টিরও বেশি দেশে পণ্য রপ্তানি করে এই ‘সম্পূর্ণ দেশি’ ব্র্যান্ড। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা ‘ভিকো নারায়ণী’-র মতো পেইন রিলিফ ক্রিম বা আধুনিক ফেসওয়াশও বাজারে এনেছে।
ভিকোর এই ৩১ বছরের লড়াই প্রমাণ করে, ব্যবসার দুনিয়ায় শুধু ভালো পণ্য থাকলেই চলে না, প্রতিকূল পরিস্থিতিকে বুদ্ধিমত্তা দিয়ে কীভাবে বিজ্ঞাপনে বদলে দিতে হয়, তাও জানতে হয়। সরকার আদালত কক্ষের লড়াই জিততে চেয়েছিল, কিন্তু ভিকো তাদের আইকনিক জিঙ্গেল দিয়ে আদালত আর সাধারণ মানুষ—দুটোর মনই একবারে জিতে নিয়েছিল।







