নিজের দেশেই বিদেশি: ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে পরিযায়ী শ্রমিকদের খুনের রাজনীতি
Bengali Migrant Workers: ২০২৫-এর ডিসেম্বরে সুতির তিন পরিযায়ী শ্রমিক গণপিটুনির শিকার হন। তাদের মধ্যে মৃত্যু হয় একজনের (জুয়েল রানা)। ২০২৬-এর ১৫ জানুয়ারি, ঝাড়খণ্ডের পলামুর জেলার বিশ্রামপুর এলাকায় পরিযায়ী শ্রমিক আলাউদ্দিন শেখের (বয়স ৩৫) রহস্যজনক মৃত্যুর খবর প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই অশান্তির সূত্রপাত হয়।
পেটের দায়ে ভিনরাজ্যে পাড়ি দেওয়া, আর ফেরার পথে কফিনে বন্দি হয়ে ফেরা—এটাই কি আজ বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকদের ললাটলিখন? পকেটে সচিত্র ভোটার কার্ড, আধার কার্ড, অর্থাৎ ভারতীয় নাগরিকত্বের সমস্ত প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও, দেশের মাটিতেই তাঁরা আজ 'পরবাসী'। অপরাধ? তাঁরা বাংলায় কথা বলেন, তাঁরা সংখ্যালঘু। রুজিরুটির সন্ধানে ঘর ছাড়া মানুষগুলো ভিন রাজ্যে গিয়ে শিকার হচ্ছেন ‘বাংলাদেশি’ তকমা, গণপিটুনি এবং রাষ্ট্রীয় অবহেলার। জুয়েল রানা থেকে আলাউদ্দিন শেখ—নামগুলো আলাদা হলেও, তাঁদের পরিণতি এক ভয়াবহ বাস্তবতাকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। নিজের দেশেই এই অস্তিত্বের সংকট কেন?
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই উত্তরই খুঁজছে। এই উত্তরের খোঁজেই উঠে আসে বেশ কিছু মর্মান্তিক দৃশ্য। ২০২৫-এর ডিসেম্বরে সুতির তিন পরিযায়ী শ্রমিক গণপিটুনির শিকার হন। তাদের মধ্যে মৃত্যু হয় একজনের (জুয়েল রানা)। ২০২৬-এর ১৫ জানুয়ারি, ঝাড়খণ্ডের পলামুর জেলার বিশ্রামপুর এলাকায় পরিযায়ী শ্রমিক আলাউদ্দিন শেখের (বয়স ৩৫) রহস্যজনক মৃত্যুর খবর প্রকাশ্যে আসে। কর্মস্থলের আবাসন থেকে তাঁর রক্তাক্ত ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয়। প্রশাসনের প্রাথমিক বক্তব্যে আত্মহত্যার ইঙ্গিত থাকলেও পরিবারের সদস্য ও গ্রামবাসীদের অভিযোগ, আলাউদ্দিন শেখকে বাংলাদেশি সন্দেহে মারধর করে খুন করা হয়েছে এবং পরে এই ঘটনাকে আত্মহত্যার রূপ দিতে দেহ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। এই অভিযোগ নতুন নয়, বিচ্ছিন্নও নয় বরং সাম্প্রতিক সময়ে দেশের নানা প্রান্তে পরিযায়ী বাঙালি শ্রমিকদের উপর ঘটে চলা একের পর এক নিপীড়নের ধারাবাহিকতার অংশ।
শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারি আলাউদ্দিন শেখের দেহ গ্রামে পৌঁছতেই গ্রামবাসীদের ক্ষোভ ফেটে পড়ে। দ্রুত গ্রেফতার ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে শুরু হয় বিক্ষোভ। প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা ধরে জাতীয় সড়ক ও রেললাইন অবরোধ করে রাখা হয়। ফলে হাজার হাজার যাত্রী চরম ভোগান্তির শিকার হন। কয়েকজন সাংবাদিকের দাবি, বিক্ষোভ চলাকালীন তাঁদের হেনস্থা করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অনেকের প্রশ্ন, এই ক্ষোভ কি শুধুই একটি মৃত্যুর প্রতিক্রিয়া, নাকি বহুদিনের জমে থাকা বঞ্চনা ও নিরাপত্তাহীনতার বহিঃপ্রকাশ?
বিক্ষোভকারীদের বক্তব্য স্পষ্ট, এই আন্দোলন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ভিন রাজ্যে কাজ করতে গিয়ে বাঙালি গরিব পরিযায়ী শ্রমিকদের বারবার ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে নিগৃহীত করা হচ্ছে। ভারতীয় নাগরিকত্বের বৈধ নথি, এমনকি নির্বাচন কমিশন প্রদত্ত ভোটার পরিচয়পত্র দেখানোর পরও বিজেপি শাসিত রাজ্যে তাঁদের আটক করা হচ্ছে। পুলিশ আদালতে পেশ না করে ‘নথি যাচাই’-এর নামে দিনের পর দিন ডিটেনশন ক্যাম্পের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রেখে দেয়। অভিযোগ উঠেছে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনেরও। এমনকি মহিলা পরিযায়ী শ্রমিক অন্তঃসত্ত্বা সুনালী খাতু্ন, তাঁর স্বামী দানেশ সেখ, সুইটি খাতুন, তাঁদের নাবালক সন্তান সহ ছয়জনকে বাংলাদেশি তকমা দিয়ে দিল্লি পুলিশ এফআরআরওর মাধ্যমে বাংলাদেশে পুশ আউট করে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে গত ডিসেম্বরে অন্তঃসত্ত্বা সুনালী খাতুন ও তাঁর নাবালক পুত্র ফিরলেও সুনালী খাতুনের স্বামী দানেশ সেখ সহ সুইটিরা বাংলাদেশে রয়ে গেছেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Murshidabad Unrest: ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে সোমা মাইতি বলেন, “এত বছর সাংবাদিকতা করছি, কিন্তু জীবনে এমন ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি কখনও হইনি। দু’জন লোক আমাকে ধরে তুলে নিয়েছিল। একজন আমার চুল টানছিল, আর অন্যরা আমার পা ধরে জামাকাপড় টানতে শুরু করে। তারা শরীরের সর্বত্র হাত দিচ্ছিল।”
২০২৪ সালের জুন মাসে, উত্তর ২৪ পরগনার তাসলিমা মন্ডল ও তাঁর স্বামী ফৈজার মন্ডলকে মহারাষ্ট্র পুলিশ আটক করে। তাঁদের এক নাবালিকা সন্তানকে ভারতে রেখে বিএসএফের মাধ্যমে ঐ দম্পতিকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়। বিজেপি শাসিত মহারাষ্ট্র পুলিশ পশ্চিমবঙ্গের মোট পাঁচ জন পরিযায়ী শ্রমিককে বাংলাদেশে পুশ আউট করে। বিজেপি শাসিত রাজস্থান থেকে মালদার বাসিন্দা আমির সেখকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ভারতীয় নাগরিক পশ্চিমবঙ্গের মোট ১৪ জন পরিযায়ী শ্রমিককে 'বাংলাদেশি' সন্দেহ করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের সহায়তায় ফিরিয়ে নিয়ে আসা হয় তাদের, শুধু রয়ে গেছে সুইটি দানেশ সহ চারজন। ভারতীয় নাগরিক হয়েও শুধুমাত্র বাংলা ভাষায় কথা বলার কারণে পরিযায়ী শ্রমিকরা আজ কর্মের অনিশ্চিয়তা ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।
পরিযায়ী শ্রমিক সংগঠনগুলির মতে, এই বিক্ষোভ আসলে বাংলাদেশি তকমা লাগিয়ে দিয়ে হেনস্থা, অপমান, খুন হয়ে যাওয়ার ভয় এবং সঙ্গে রুজি-রুটি হারানোর আতঙ্কের বহিঃপ্রকাশ। কাজ করতে গিয়ে যদি প্রাণের নিরাপত্তাই না থাকে, তবে জীবিকা অর্জনের পথ কোথায়? তবুও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, এই রাজ্যের লক্ষ লক্ষ মানুষ কাজের তাগিদে ভিন রাজ্যে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষিত ‘শ্রমশ্রী’ প্রকল্পে রাজ্যের প্রায় ৩১ লক্ষ ৩৭ হাজার পরিযায়ী শ্রমিককে বছরে ৫০০০ টাকা ভাতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।রেজিনগর ও বেলডাঙা সহ রাজ্যের শ্রমিকরা সেই ভাতা পেতে শুরু করেছে। তবুও ভিন রাজ্যে যাওয়ার প্রবণতা কমছে না। কারণ, এই ভাতা জীবনের নিরাপত্তা বা স্থায়ী কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। এর পাশাপাশি বাস্তব আর্থিক চাহিদাও অস্বীকার করা যায় না। যেমন- রাজমিস্ত্রি, নির্মাণ শ্রমিকদের গোটা দেশে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে, বিশেষ করে আবাসন শিল্পে। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের অভ্যন্তরে কাজের বাজারের বড় অংশ দখল করে রেখেছেন উত্তরপ্রদেশ, বিহার, ওড়িশাসহ বিভিন্ন রাজ্যের শ্রমিকরা। মুর্শিদাবাদ, মালদা, উত্তর দিনাজপুরের মতো সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জেলাগুলোয় শিল্পের অভাব, কৃষিভিত্তিক কাজের স্বল্প মজুরির কারণে স্থানীয় শ্রমিকদের কাছে ভিন রাজ্যই হয়ে উঠেছে একমাত্র বিকল্প পথ।
পরিযায়ী ফেরিওয়ালাদের উপর অত্যাচার, মারধর করে 'জয় শ্রীরাম' বলানো, গণপিটুনির ঘটনা ওড়িশা, গুজরাট, রাজস্থান,উত্তরপ্রদেশ প্রভৃতি বিজেপি শাসিত রাজ্যে ঘটেছে। ওড়িশার কেন্দ্রপাড়া পলিটেকনিক কলেজকে অস্থায়ী ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরি করে, সেখানে আটক করে রাখছে বাংলাদেশি সন্দেহ করা পশ্চিমবঙ্গের পরিযায়ী শ্রমিকদের। বিহারের ভাগলপুরে মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুরের বাসিন্দা পরিযায়ী ফেরিওয়ালা ফারুখ সেখকে বাংলাদেশি তকমা দেয় স্থানীয় বজরঙ দলের সদস্যরা। তারপর মারধর করে জোর করে 'জয় শ্রীরাম' স্লোগান তুলে গায়ে পেট্রল ঢেলে দেয় ও আগুন জ্বালানোর চেষ্টা করে তারা। কোনোক্রমে প্রাণে বেঁচে বাড়ি ফেরে ফারুখ সেখ। রাজস্থানে ২০১৯ সালে মালদার আফরাজুলকেও জ্যান্ত জ্বালিয়ে দিয়েছিল উগ্রবাদীরা। ২০২৪ সালে হরিয়ানায় দক্ষিণ ২৪ পরগনার পরিযায়ী শ্রমিক সাবির মল্লিককে গোমাংস খাওয়ার সন্দেহে পিটিয়ে মারা হয়, পরে প্রমাণিত হয়, সেটি গোমাংস ছিলই না। সম্প্রতি মুর্শিদাবাদের জুয়েল রানাকে ওড়িশায় শুধুমাত্র বাংলা ভাষায় কথা বলার জন্য পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ২০২৪ সালে ওড়িশায়, বাংলাদেশি তকমা লাগিয়ে সামশেরগঞ্জের পরিযায়ী শ্রমিক সুজন সরকারকে বস্ত্রহীন করে মারধর করা হয়। ২০২৫ সালের নভেম্বরে ওড়িশার গঞ্জাম জেলায় কিছু হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সদস্যরা মুর্শিদাবাদের বাসিন্দা রুহুল ইসলামের পরিচয়পত্র যাচাই করে এবং তা দেখানো সত্ত্বেও তাকে 'বাংলাদেশি' এবং 'রোহিঙ্গা' তকমা দিয়ে মারধর করে 'জয় শ্রীরাম' এবং 'ভারতমাতা কি জয়' বলানো হয়। প্রত্যেকটি ঘটনার ক্ষেত্রে বিজেপি শাসিত রাজ্যের পুলিশকে কোনো দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে তো দেখা যায়ই না বরং বিজেপি শাসিত সরকারের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের মদতের অভিযোগ পাওয়া যায়। পুশ আউটের ঘটনাও পুলিশ ও বিএসএফ আনুষ্ঠানিক ভাবে স্বীকার করেনি। বাংলাদেশি সন্দেহে আটক ও পুশ আউটের সংখ্যা জানার জন্য আরটিআই করেও উত্তর দেয়নি সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রীয় দপ্তরগুলো।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Sakina Begum Gets Bail in Bangladesh: সাকিনার পরিবার বারবার জানিয়েছে, তিনি জীবনে কখনও বাংলাদেশে যাননি। গত মে মাসের শেষদিকে অসুস্থ অবস্থায় বাড়ির বাইরে বেরোতেই স্থানীয় পুলিশ তাঁকে ধরে নিয়ে যায়।
মুর্শিদাবাদ, মালদা ও উত্তর দিনাজপুরে পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। এখানে শিল্পের অভাব প্রকট। কৃষকরা ফসলের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় কৃষিকাজে আগ্রহ হারাচ্ছেন। একসময় অর্থকরী ফসল হিসেবে পরিচিত ছিল পাট, কিন্তু এখন তা নিয়েও কেন্দ্রীয় স্তরে কার্যত কোনো পরিকল্পনাই নেই। 'জুট কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া' আজ প্রায় বন্ধের মুখে। ফলে কৃষি ও শিল্প দুই ক্ষেত্রেই অনিশ্চয়তা শ্রমিকদের ঠেলে দিচ্ছে ভিন রাজ্যের দিকে।
তবে কর্মহীনতার এই অনিশ্চয়তা নতুন নয়। ২০১৮ সালে কেরলের ভয়াবহ বন্যায় আটকে পড়েছিলেন বাংলার হাজার হাজার পরিযায়ী শ্রমিক। কেরলে বর্তমানে প্রায় ৩৫ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক কাজ করেন, যাঁদের বেশিরভাগই বাঙালি। ২০১৯ সালে কাশ্মীরে সাগরদীঘির বাহালনগরের পাঁচজন শ্রমিক সন্ত্রাসবাদী হামলায় প্রাণ হারান। তাঁরা আপেল চাষের কাজে যুক্ত ছিলেন। সেই বছর রাজ্যে আপেল চাষের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা আর বাস্তব রূপ পায়নি। ২০২৩ সালের অগাস্টে মিজোরামে সাইরাংয়ে রেলের ব্রিজ নির্মাণের সময় মালদার ২৩জন পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যু গোটা রাজ্যকে নাড়িয়ে দেয়। অভিযোগ, রেল কর্তৃপক্ষের দায়িত্বজ্ঞানহীনতায় দেহগুলি পচে-গলে বাড়ি পৌঁছয়। ২০২৫ সালে সেপটিক ট্যাঙ্কে কাজ করতে গিয়ে মুর্শিদাবাদ জেলার প্রায় ছয়জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়। একই বছরে কর্ণাটকে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে একে একে ছয়জনের মৃত্যু ঘটে। এই তালিকা দীর্ঘ, ভয়াবহ এবং লজ্জাজনক। কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষাবিধি না মানার কারণে, প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে সন্ত্রাসবাদী হামলা, গণপিটুনি, নির্মাণ দুর্ঘটনা থেকে পরিকল্পিত হত্যা প্রতিটি ক্ষেত্রেই মৃত্যুর শিকার হচ্ছেন বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকরা। সাম্প্রতিককালে, বিশেষ করে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে বাংলাদেশি সন্দেহে আটক, মারধর, গণপিটুনি, এমনকি বাংলাদেশে পুশ আউটের অভিযোগ ক্রমেই বাড়ছে। এবং এই ঘটনার অধিকাংশ শিকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পরিযায়ী শ্রমিক।
বর্তমানে কেন এই পরিস্থিতি?
রাজনৈতিক মহলের ধারণা বিজেপি বাঙালি বিদ্বেষী ও বাংলা ভাষা বিরোধী। পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর হওয়া হামলার সংখ্যা নেহাত কম নয়, এর সঙ্গে এখন আবার যোগ হয়েছে ২০২৫ সালের মে মাসে সন্দেহভাজন বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা চিহ্নিতকরণ ও আটক করা। এই সম্পর্কিত কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের বিতর্কিত সার্কুলারের পর থেকেই এই হামলা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। তার উপর বিজেপি শাসিত রাজ্যের পুলিশ ও পুলিশের মদতে উগ্র বাঙালি বিদ্বেষী সংগঠনগুলো বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর হামলা করছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার এই সার্কুলারকে চ্যালেঞ্জ জানাতে কার্যকর কোনো আইনি বা রাজনৈতিক পদক্ষেপ এখনও নেয়নি। কেন্দ্রের বিরোধীদল সহ অন্যান্য দলগুলোও এ বিষয়ে চুপ। রাজ্য সরকার ভিন রাজ্যে বিপদে পড়া পরিযায়ী শ্রমিকদের উদ্ধারের জন্য একের পর এক হেল্পলাইন চালু করলেও, তা স্থায়ী সমাধান নয় বরং তাৎক্ষণিক ও ভাসা-ভাসা প্রতিক্রিয়াতেই সীমাবদ্ধ। পরিযায়ী শ্রমিক সংগঠনগুলির অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার এই প্রশ্নে প্রয়োজনীয় নৈতিক দৃঢ়তা দেখাতে পারেননি। তাঁরা বারবার বিশেষ পরিচয়পত্র চালু করার দাবি জানিয়েছেন, প্রতিটি রাজ্যে শ্রমিক কল্যাণ আধিকারিক নিয়োগের ও হেল্পডেস্কসহ আইনি সহায়তা কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছেন, কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী এবং ভিন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার কথা বলেছেন। কিন্তু বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি।
জুয়েল রানা বা আলাউদ্দিন শেখের মৃত্যু আমাদের সামনে একটি প্রশ্ন তুলে ধরেছে, এই দেশের নাগরিক হয়েও কি পরিযায়ী শ্রমিকদের বারবার নিজেদের ভারতীয় প্রমাণ করতে হবে? ভাষা, ধর্ম বা অঞ্চলের কারণে কি তাঁদের জীবনের মূল্য কমে যায়? যদি এই প্রশ্নগুলির উত্তর না মেলে, তবে আতঙ্ক, ভয় থেকেই যাবে আর তৈরি হবে রাষ্ট্রের প্রতি অবিশ্বাস। কারণ- ক্ষুধা, ভয় ও অপমান এই তিনের মিশ্রণই সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি তৈরি করে। আলাউদ্দিন শেখের মৃত্যু সেই সতর্কবার্তাই দিয়ে গেল। আলাউদ্দিনের পরিবারের মতো জুয়েল রানার পরিবারও শূন্য দৃষ্টিতে বিচারের আশায় পথ চেয়ে উঠোনে বসে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে'
আমার দেশের মাটিতে বিদেশি তকমা দিয়ে মেরে ফেলল এই যন্ত্রণা ভোলার নয়। যেন আর কোনো বাংলা ভাষী শ্রমিকদের ভিন রাজ্যে খুন হতে না হয়।







