মুর্শিদাবাদে বিক্ষোভ: পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ভাঙচুর, আক্রান্ত সংবাদমাধ্যম
Murshidabad Unrest: ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে সোমা মাইতি বলেন, “এত বছর সাংবাদিকতা করছি, কিন্তু জীবনে এমন ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি কখনও হইনি। দু’জন লোক আমাকে ধরে তুলে নিয়েছিল। একজন আমার চুল টানছিল, আর অন্যরা আমার পা ধরে জামাকাপড় টানতে শুরু করে। তারা শরীরের সর্বত্র হাত দিচ্ছিল।”
ঝাড়খণ্ডে ফেরিওয়ালার কাজ করতে গিয়ে নিহত এক পরিযায়ী শ্রমিকের দেহ উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে মুর্শিদাবাদের বেলডাঙায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। এই ঘটনার প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভের জেরে সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছে। পাশাপাশি ভাঙচুরের নতুন অভিযোগ উঠেছে এবং সাংবাদিকদের উপর বারবার হামলার ঘটনায়, এমন উত্তেজনাপ্রবণ এলাকায় জনতার হিংসা ঠেকাতে প্রশাসনের সক্ষমতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠছে।
১৬ জানুয়ারি অশান্তি হিংসাত্মক রূপ নেয়, বিক্ষোভের খবর সংগ্রহ যাওয়া জি ২৪ ঘণ্টা-র সাংবাদিক সোমা মাইতি ও তাঁর ক্যামেরাপার্সনের উপর হামলা চালানো হয়। ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে সোমা মাইতি বলেন,
এত বছর সাংবাদিকতা করছি, কিন্তু জীবনে এমন ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি কখনও হইনি। দু’জন লোক আমাকে ধরে তুলে নিয়েছিল। একজন আমার চুল টানছিল, আর অন্যরা আমার পা ধরে জামাকাপড় টানতে শুরু করে। তারা শরীরের সর্বত্র হাত দিচ্ছিল।
তিনি আরও বলেন,
ওরা আমার মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়। আমি বারবার পুলিশদের সাহায্যের জন্য ডাকলেও কেউ এগিয়ে আসেননি। যাঁরা দু’একজন স্থানীয় মানুষ আমাকে বাঁচাতে চেষ্টা করেছিলেন, তাঁদেরও মারধর করা হয়। আমাদের ক্যামেরাপার্সনের উপরও হামলা চালানো হয়— তাঁর মাথা ফেটে যায়।
গ্রাউন্ট রিপোর্ট অনুযায়ী, ১৬ জানুয়ারির ওই অশান্তির ঘটনায় যাঁরা আহত হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে বেশিরভাগই সংবাদমাধ্যমের কর্মী।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Pregnant Migrant Worker Sunali Khatun: বাংলাদেশ সরকারের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “বাংলাদেশ সরকারও চায়, সোনালি ও তাঁর পরিবার যেন নিজেদের দেশে ফিরতে পারে।”
পশ্চিমবঙ্গের আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে থাকে। সমালোচকদের মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে যখন বেগ পেতে হচ্ছিল, তখন তিনি দায়িত্ব নেওয়ার বদলে এড়িয়ে যাওয়ার মতো মনোভাব দেখিয়েছেন। সাধারণ মানুষ ও সংবাদমাধ্যমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্পষ্ট বার্তা না দিয়ে, হামলার শিকার হওয়া সাংবাদিককেই ওই ঝামেলা থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন,
আমি এই ঘটনার সমর্থন করছি না। তবে জনগণের উদ্দেশ্যে বলছি, ঝামেলায় না জড়াতে। এটা আমার হাতে নেই। আমি এই ঘটনা ঘটাইনি, কাউকে ঝামেলায় যেতেও বলিনি।
মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্য ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক সমালোচনা শুরু হয়েছে। সমালোচকেরা তাঁর বক্তব্যকে অতীতের সেই বিতর্কিত মন্তব্যগুলির সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন। সমালোচকেরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, তিনি মহিলাদের রাতে বাইরে না বেরোনোর পরামর্শ দিয়েছিলেন। সেই সময়ও এই মন্তব্যগুলিকে তীব্রভাবে নিন্দা করা হয়েছিল, কারণ এতে প্রশাসনের দায়িত্বের বদলে নারীদের উপরই নিরাপত্তার ভার চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছিল।
রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন,
পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর নির্যাতন করা হচ্ছে। বিজেপি দাঙ্গা উসকে দিচ্ছে, আর এর পেছনে ভারতের সরকারের বিভিন্ন সংস্থা জড়িত।
তিনি দাবি করেন, বাংলায় অশান্তি ছড়ানোর জন্য পরিকল্পিত চেষ্টা চলছে এবং এর জন্য বিজেপি ও কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলিই দায়ী।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Murshidabad migrant worker Ashik Mohammed: “হামলার শুরুটাই হয়েছিল একটি ধর্মীয় স্লোগান বলার দাবিকে কেন্দ্র করে,” ইনস্ক্রিপ্ট-কে জানান আশিক মহম্মদ। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এখনও তাঁর গলা কেঁপে ওঠে।
তবে অস্থিরতা এখনও কমেনি। ১৭ জানুয়ারি, বিক্ষোভের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে ফের সাংবাদিকদের উপর হামলার ঘটনা ঘটে। অভিযোগ, বিক্ষোভকারীরা বেলডাঙা স্টেশনের কাছে রেলগেট ভাঙচুর করে এবং একটি রেল সিগন্যাল ক্ষতিগ্রস্ত করে। অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন থাকা সত্ত্বেও কৃষ্ণনগর-লালগোলা রুটে রেল পরিষেবা ব্যাহত হয়।
কংগ্রেসের বর্ষীয়ান নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী বলেন,
পুলিশের সামনেই এমন ঘটনা ঘটেছে— এটা আরও বেশি নিন্দনীয়। কোনো সাংবাদিকের অধিকার কেড়ে নেওয়ার অধিকার কারও নেই।
তিনি অভিযোগ করেন, তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ ও মুখ্যমন্ত্রীর ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বহরমপুরের সমাবেশের কারণে পুলিশের মোতায়েন দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তাঁর কটাক্ষ,
মুর্শিদাবাদ পুলিশ এখন খোকাবাবুর নিরাপত্তা সামলাতেই ব্যস্ত।
আলাউদ্দিন শেখের মৃত্যু
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Bangladeshi: আসলে খাদ্য, বস্ত্র, অর্থনীতি, লোকাচার, সংস্কৃতি, স্থাননাম ভারতীয় জনজীবনের সর্বত্র আরবি ফারসির সহজাত ভাবেই ঢুকেছে। বাংলা হোক বা হিন্দি, ভাষাকাঠামোকে সমৃ্দ্ধ করেছে।
১৫ জানুয়ারি আলাউদ্দিন শেখের মৃত্যুর খবর সামনে আসার পর থেকেই অশান্তির সূচনা হয়। ঝাড়খণ্ডে তাঁর ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের সদস্য ও গ্রামের বাসিন্দাদের অভিযোগ, তাঁকে মারধর করে খুন করা হয়েছে এবং পরে আত্মহত্যা বলে চালাতে দেহ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারি দেহ গ্রামে ফিরলে দ্রুত গ্রেফতার ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ শুরু হয়। প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা ধরে জাতীয় সড়ক ও রেললাইন অবরোধ করা হয়। এর জেরে হাজার হাজার যাত্রী আটকে পড়েন এবং সংঘর্ষ ও ইট-পাটকেল ছোড়ার ঘটনা ঘটে।
পরে জেলাশাসক নিতিন সিংহানিয়া মুর্শিদাবাদ থেকে অন্য রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া পরিযায়ী শ্রমিকদের পরিস্থিতি নজরদারির জন্য ২৪ ঘণ্টার কন্ট্রোল রুম খোলার কথা ঘোষণা করেন এবং প্রশাসনিক সহায়তার আশ্বাস দেন। তিনি বলেন,
কাজের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। অভিযুক্তদের যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। আজই একটি কন্ট্রোল রুম খোলা হচ্ছে। সন্ধ্যার মধ্যে একটি আইনি টাস্ক ফোর্স কাজ শুরু করবে।
তবে স্থানীয়দের বক্তব্য, বেলডাঙার এই সংঘর্ষ শুধু একটি মৃত্যুকে ঘিরে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অসন্তোষেরই প্রতিফলন। অভিযোগ, কাজের অভাবে পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে অন্য রাজ্যে যেতে বাধ্য হওয়া বাংলা ভাষাভাষী মুসলিম শ্রমিকরা মাসের পর মাস হয়রানি ও নিরাপত্তাহীনতার শিকার হচ্ছেন। পরিযায়ী শ্রমিক ঐক্য মঞ্চের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে এ পর্যন্ত মুর্শিদাবাদের অন্তত ২২ জন পরিযায়ী শ্রমিক ভিনরাজ্যে মারা গিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে গণপিটুনির শিকার হওয়া জুয়েল রানা ও রিতু শেখও রয়েছেন।
পরিযায়ী শ্রমিক ঐক্য মঞ্চের আসিফ ফারুক বলেন,
পরিযায়ী শ্রমিকদের সমস্যা স্থায়ীভাবে সমাধান করা দরকার। ২০২৫ সালের মে মাসে সন্দেহভাজন বাংলাদেশিদের নিয়ে কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের বিতর্কিত সার্কুলারের পর থেকেই পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর হামলা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার ওই সার্কুলারকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে কোনো পদক্ষেপ করেনি। আর একের পর এক যে হেল্পলাইনগুলি খোলা হচ্ছে, তা আসলে তাৎক্ষণিক ও ভাসা-ভাসা প্রতিক্রিয়া ছাড়া কিছুই নয়।
তিনি আরও বলেন,
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কোনো নৈতিক দৃঢ়তা দেখাতে পারেননি। বিক্ষোভকারীদের ক্ষোভ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক, এ কথা কেউ অস্বীকার করছে না। আমরা বারবার পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে এমন ঘটনা রুখতে সতর্ক করেছিলাম। একটি বিশেষ পরিচয়পত্র চালু করার কথা বলেছিলাম। প্রতিটি রাজ্যে আধিকারিক নিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছিলাম। প্রতিটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার কথা বলেছিলাম। কিন্তু কিছুই হয়নি।
বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন থাকা সত্ত্বেও বারবার পরিবহণ যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ায়, বেলডাঙায় টানা দু’দিনের অশান্তি একটি বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
(মূল প্রতিবেদনটি প্রাথমিক ভাবে দ্য ওয়্যার-এ প্রকাশিত হয়েছিল।)







