বন্যার বার্তায় ভারতকে সতর্ক করে কী বললেন নেপালের বিদেশমন্ত্রী

Nepal Flood Crisis: নেপালের ভয়াবহ বন্যার পর ভারতকেও কেন সতর্ক করলেন নেপালের বিদেশমন্ত্রী শিশির খানাল? জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমবাহ গলে যাওয়া ও হঠাৎ বন্যার ঝুঁকি কি আগামী দিনে ভারতের জন্যও বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে?

inscript
৩ মিনিট
বন্যার বার্তায় ভারতকে সতর্ক করে কী বললেন নেপালের বিদেশমন্ত্রী

হিমালয়কে আমরা সাধারণত বরফে ঢাকা বিশাল পাহাড়শ্রেণি হিসেবেই দেখি। কিন্তু এই পাহাড় শুধু সৌন্দর্যের জন্যই পরিচিত নয়। হিমালয় থেকে নেমে আসা নদীর জলেই বেঁচে আছে কোটি কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা। তাই হিমালয়ে বড় কোনো পরিবর্তন হলে তার প্রভাব শুধু একটি দেশে সীমাবদ্ধ থাকে না। নেপালের সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যা সেই আশঙ্কাই আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

২৭ অগাস্ট নেপাল-চিন সীমান্তের কাছের হিমালয় অঞ্চল থেকে হঠাৎ নেমে আসে বিপুল জলরাশি। মুহূর্তের মধ্যে নদীর জল বেড়ে গিয়ে ভাসিয়ে দেয় রাস্তা, সেতু, বাড়িঘর এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা। নেপালের বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, বহু মানুষ এখনও নিখোঁজ। এই বিপর্যয়ের প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের দিকেও পৌঁছতে শুরু করেছে। কারণ পাহাড় থেকে নেমে আসা নদীগুলির কোনো সীমান্ত নেই।

এই পরিস্থিতিতেই নেপালের বিদেশমন্ত্রী শিশির খানাল গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল কথা, হিমালয়ের পরিবেশ রক্ষা শুধু নেপালের দায়িত্ব নয়। ভারত, নেপাল, চিন এবং ভুটান—এই চারটি দেশ একই পরিবেশব্যবস্থার অংশ। হিমালয়ে যে পরিবর্তন হচ্ছে, তার প্রভাব চার দেশের মানুষের উপরই পড়বে।

২৭ অগাস্ট কাঠমান্ডুতে আয়োজিত NDTV World Anviksha Summit-এ খানাল বলেন,

নেপাল ও ভারতের সম্পর্ককে আমরা সবসময় ‘রোটি-বেটি’, ‘সীতা-রাম’-এর মতো শব্দবন্ধের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছি। ধর্মীয় ও সভ্যতাগত যোগসূত্র বরাবরই আমাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু এখন আমাদের এই সম্পর্ককে পরিবেশগত বা প্রতিবেশগত দৃষ্টিকোণ থেকে নতুন করে ভাবতে হবে।

তাঁর কথায়,

সৌভাগ্যবশত, এবারের বন্যার জল নেপালের আরও নিচের দিকে নেমে ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলিকে প্রভাবিত করেনি। তবে অতীতে এমন ঘটনা ঘটেছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
আকাশে বৃষ্টি নেই, তবু হড়পা বান! তিব্বত থেকে কীভাবে নেপালে নামল জল-কাদা-পাথরের স্রোত?

Nepal flash flood today: ২৬ অগাস্ট সকাল ৮টা ৩৭ মিনিট নাগাদ নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী পাহাড়ি অঞ্চলে ৪.৪ মাত্রার একটি মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এর ঠিক আধ ঘণ্টার মধ্যেই তিব্বতের উজান থেকে প্রবল বেগে ঘোলা জলের স্রোত নামতে শুরু করে।

তিনি বলেন,

চিন, নেপাল, ভারত এবং ভুটান পরিবেশগতভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। এই অঞ্চলের মানুষের অভিন্ন অস্তিত্ব ও ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে হিমালয়ের পরিবেশ রক্ষার উপর। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকতে পারে, কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিমালয় অঞ্চলকে রক্ষা করতে আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

খানালের কথায়,

পরিস্থিতি যত বদলাবে, ঝুঁকিও তত বাড়বে। এর প্রভাব পড়তে পারে এই অঞ্চলের প্রায় ২০০ কোটি মানুষের মিষ্টি জলের প্রাপ্যতার উপর।

এই পরিস্থিতিকে তিনি 'সভ্যতার জন্য হুমকি' বলে উল্লেখ করে বলেন,

আমরা কীভাবে একসঙ্গে এগিয়ে এসে এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করি, সেটিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমে মনে করা হয়েছিল, ভূমিকম্পের কারণে এই বিপর্যয় ঘটেছে। পরে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা জানায়, যে কম্পন রেকর্ড হয়েছিল, সেটি সম্ভবত ভূমিকম্পের কারণে নয়। বরং পাহাড়ের একটি বড় অংশ ধসে পড়ার সঙ্গে সেই কম্পনের সম্পর্ক ছিল। বরফ, পাথর ও মাটি একসঙ্গে নেমে এসে নদীর গতিপথে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করে। তার পরেই দ্রুতগতিতে জল ও ধ্বংসাবশেষ নেমে আসে নিচের দিকে।

সাধারণ বন্যায় নদীর জল ধীরে ধীরে বাড়তে পারে। কিন্তু পাহাড়ে হিমবাহ বা বরফ-পাথরের বিশাল অংশ ভেঙে পড়লে কয়েক মিনিটের মধ্যে নদীর চরিত্র বদলে যেতে পারে। জল, বরফ, পাথর ও কাদার মিশ্রণ তখন এক ধরনের ধ্বংসাত্মক স্রোতে পরিণত হয়। পাহাড়ি উপত্যকার সরু পথ দিয়ে সেই স্রোত নেমে এলে তার সামনে থাকা বাড়ি, সেতু বা রাস্তা রক্ষা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।

নেপালের নদীগুলির একটি বড় অংশ ভারতের উত্তরাঞ্চলের নদীব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। যেমন নেপালে যে নদীকে নারায়ণী বলা হয়, সেটিই ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রবেশের পর গণ্ডক নামে পরিচিত। অর্থাৎ নেপালের পাহাড়ে কোনো বড় বিপর্যয় ঘটলে সেই জলরাশির প্রভাব ভারতের বিহার, উত্তরপ্রদেশের মতো রাজ্যেও পৌঁছতে পারে।

এই কারণেই নেপালের বিদেশমন্ত্রীর বক্তব্যকে শুধুমাত্র একটি কূটনৈতিক মন্তব্য হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। এর মধ্যে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার একটি বড় প্রশ্ন। হিমালয় দ্রুত বদলাচ্ছে। তাপমাত্রা বাড়ছে, হিমালয়ের বরফ গলছে। এর ফলে হিমবাহ-সংক্রান্ত হঠাৎ বন্যার ঝুঁকিও বাড়ছে।

গত কয়েক বছরে হিমালয় অঞ্চলে একের পর এক এমন ঘটনা সামনে এসেছে। কোথাও হিমবাহ-হ্রদ ভেঙে বন্যা হয়েছে, কোথাও পাহাড় ধসে নদীর গতিপথ আটকে গিয়ে পরে সেই বাধ ভেঙে ভয়াবহ জলস্রোত তৈরি হয়েছে। ২০২৪ সালেও নেপালের থামে এলাকায় হিমবাহ-হ্রদ থেকে জল বেরিয়ে বড় ধরনের বন্যা হয়েছিল।

এবারের বিপর্যয়ের পর আরও একটি আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, নেপাল-চিন সীমান্তের কাছে নদীর উজানে বরফ ও পাথরের একটি বাধ এখনও থাকতে পারে। সেটি ভেঙে গেলে দ্বিতীয় দফায় আরও বড় জলস্রোত নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে প্রথম বিপর্যয়ের পরেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিরাপদ বলা যাচ্ছে না।

ভারতের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। দেশের উত্তরাঞ্চলের বহু বড় নদীর উৎস হিমালয়। গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার সঙ্গে হিমালয়ের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। ফলে হিমবাহের পরিবর্তন একদিকে ভবিষ্যতে জলসংকটের আশঙ্কা তৈরি করতে পারে, অন্যদিকে হঠাৎ অতিরিক্ত জল নেমে এসে বন্যার ঝুঁকিও বাড়াতে পারে। একই পরিবেশগত পরিবর্তন কখনও অতিরিক্ত জল, আবার কখনও জলের অভাব তৈরি করতে পারে।

নেপালের বন্যা ভারত-সহ গোটা হিমালয় অঞ্চলের জন্য একটি সতর্কবার্তা। আজ যে জল নেপালের একটি উপত্যকাকে ভাসিয়ে দিচ্ছে, কাল তার প্রভাব ভারতের কোনো নদী অববাহিকায় দেখা যেতে পারে।

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

রেকর্ড ভাঙা সমুদ্রের উষ্ণতা: কতটা বিপদের মুখে পৃথিবী?

super el nino 2026: অক্টোবরে নিনো ৩.৪ অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার পার্থক্য, ২০১৫-১৬-র রেকর্ড ভেঙে ৩.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়াতে চলেছে। ডব্লিউএমও বলছে, এই এল নিনো ২০২৭ পর্যন্ত প্রভাব ফেলবে। ভারতে বর্ষায় ১৩% ঘাটতি, ৩৯.৮% কৃষিজমিতে খরা, ফসল উৎপাদন ৪% কমার আশঙ্কা রয়েছে।

ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’? কোন কোন জেলায় ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস?

Cyclone Arnab: ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’-এর প্রভাবে বুধবার ও বৃহস্পতিবার দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস। দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রামে বৃষ্টি বাড়তে পারে। উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলাতেও ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা। কলকাতা-সহ বিভিন্ন জেলায় বইতে পারে ঝোড়ো হাওয়া। কোন উপকূলবর্তী জেলাগুলিতে ভারী বৃষ্টির সতর্কতা জারি হয়েছে?

এগোচ্ছে ঘূর্ণিঝড় অর্ণব, কোথায় ল্যান্ডফল, কতটা ভয়ংকর হবে?

Cyclone Arnab: বঙ্গোপসাগরে শক্তি বাড়াচ্ছে ঘূর্ণিঝড় অর্ণব। ২৮ অক্টোবর অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলে আছড়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ঝড়ের গতিপথ ও শক্তির দিকে নজর রাখছেন আবহাওয়াবিদরা। বাংলার আবহাওয়ায় কি পড়বে অর্ণবের প্রভাব?

জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ‘ইয়েরেভান ঘোষণা', কী ঘটছে ইয়েরেভানের কপ-১৭তে?

yerven biodiversity conference; ১৯ থেকে ৩০ অক্টোবর আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরেভানে, কপ-১৭ জীববৈচিত্র্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। জাতিসংঘের হিসাবে, বর্তমান গতিতে চললে, ২০৩০ নাগাদ পৃথিবীর মাত্র ২৬% স্থল ও ১২% সমুদ্র সুরক্ষিত থাকবে। ইয়েরেভান ঘোষণার ‘অপর্যাপ্ত’ পরীক্ষা এখন আটকে বাজেটের অঙ্কে।

মধু সংগ্রহে ‘দাদাগিরি’! উষ্ণ পৃথিবীতে বাড়ছে বিপদ

Honeybee Behaviour: উষ্ণ পৃথিবীতে ফুলের দখল নিতে মধুমৌমাছির আগ্রাসী আচরণ কি বন্য পরাগবাহী পতঙ্গদের খাবারের সংকট আরও বাড়িয়ে তুলবে? গবেষণায় উঠে এসেছে, তাপমাত্রা বাড়লে ফুলের মধুরস নিয়ে প্রতিযোগিতা তীব্র হতে পারে, যার প্রভাব পড়তে পারে ভোমরা, একা মৌমাছি ও হোভারফ্লাইয়ের মতো পতঙ্গদের উপর।

নেপালের জন্য রাষ্ট্রপুঞ্জের ২ কোটি ডলার কি যথেষ্ট?

FRLD fund for Nepal: ২৬ অগাস্ট ভোটকোশিতে গ্লেসিয়াল লেকে ধস নামলে নেপালে ১,৫০০ জনের মৃত্যু হয় এবং নিখোঁজ হন ৫,০০০ জন। ক্ষতি হয় ২.৬৯ বিলিয়ন ডলারের। ২২ অক্টোবর এফআরএলডি বোর্ড প্রথমবার কোনো দেশকে ২০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করল। কিন্তু, এই টাকা নেপালের প্রাথমিক ক্ষতির ১ শতাংশেরও কম।

দেড় মাসের মধ্যে ফের জোড়া ভূমিকম্প, মৃত ১৮, কতটা ক্ষতিগ্রস্ত তিব্বত?

Tibet Earthquake: দেড় মাসের মধ্যে ফের জোড়া ভূমিকম্প তিব্বতে। বাড়িঘর ধসে পড়া, রাস্তা অবরোধ, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া-সহ কী কী ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে? এই অঞ্চলে বারবার প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আসল কারণটা ঠিক কী?

জলবায়ু বদলেছে, নদীর প্রবাহ বদলেছে: ৩০ বছরের পুরনো ভারত-বাংলাদেশ গঙ্গা জলবণ্টন চুক্তিতে কোন কোন পরিবর্তন দরকার?

A Flawed Pact of Farakka: ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে ১৯৯৬ সালের গঙ্গা জলবণ্টন চুক্তির ৩০ বছরের মেয়াদ। বাংলাদেশের নদী বিশেষজ্ঞ মনজুর এ চৌধুরীর মতে, চুক্তিটি 'ত্রুটিপূর্ণ', এতে নেই গ্যারান্টি ক্লজ, নেই পরিবেশগত প্রবাহের হিসাব, নেই জলবায়ু পরিবর্তনের বিধান। তাঁর প্রস্তাব, তিন বছরের নতুন অন্তর্বর্তী চুক্তি হোক, তারপর নেপালকে যুক্ত করে তৈরি করা হোক ত্রিপাক্ষিক কাঠামো।