বন্যার বার্তায় ভারতকে সতর্ক করে কী বললেন নেপালের বিদেশমন্ত্রী
Nepal Flood Crisis: নেপালের ভয়াবহ বন্যার পর ভারতকেও কেন সতর্ক করলেন নেপালের বিদেশমন্ত্রী শিশির খানাল? জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমবাহ গলে যাওয়া ও হঠাৎ বন্যার ঝুঁকি কি আগামী দিনে ভারতের জন্যও বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে?
হিমালয়কে আমরা সাধারণত বরফে ঢাকা বিশাল পাহাড়শ্রেণি হিসেবেই দেখি। কিন্তু এই পাহাড় শুধু সৌন্দর্যের জন্যই পরিচিত নয়। হিমালয় থেকে নেমে আসা নদীর জলেই বেঁচে আছে কোটি কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা। তাই হিমালয়ে বড় কোনো পরিবর্তন হলে তার প্রভাব শুধু একটি দেশে সীমাবদ্ধ থাকে না। নেপালের সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যা সেই আশঙ্কাই আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
২৭ অগাস্ট নেপাল-চিন সীমান্তের কাছের হিমালয় অঞ্চল থেকে হঠাৎ নেমে আসে বিপুল জলরাশি। মুহূর্তের মধ্যে নদীর জল বেড়ে গিয়ে ভাসিয়ে দেয় রাস্তা, সেতু, বাড়িঘর এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা। নেপালের বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, বহু মানুষ এখনও নিখোঁজ। এই বিপর্যয়ের প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের দিকেও পৌঁছতে শুরু করেছে। কারণ পাহাড় থেকে নেমে আসা নদীগুলির কোনো সীমান্ত নেই।
এই পরিস্থিতিতেই নেপালের বিদেশমন্ত্রী শিশির খানাল গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল কথা, হিমালয়ের পরিবেশ রক্ষা শুধু নেপালের দায়িত্ব নয়। ভারত, নেপাল, চিন এবং ভুটান—এই চারটি দেশ একই পরিবেশব্যবস্থার অংশ। হিমালয়ে যে পরিবর্তন হচ্ছে, তার প্রভাব চার দেশের মানুষের উপরই পড়বে।
২৭ অগাস্ট কাঠমান্ডুতে আয়োজিত NDTV World Anviksha Summit-এ খানাল বলেন,
নেপাল ও ভারতের সম্পর্ককে আমরা সবসময় ‘রোটি-বেটি’, ‘সীতা-রাম’-এর মতো শব্দবন্ধের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছি। ধর্মীয় ও সভ্যতাগত যোগসূত্র বরাবরই আমাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু এখন আমাদের এই সম্পর্ককে পরিবেশগত বা প্রতিবেশগত দৃষ্টিকোণ থেকে নতুন করে ভাবতে হবে।
তাঁর কথায়,
সৌভাগ্যবশত, এবারের বন্যার জল নেপালের আরও নিচের দিকে নেমে ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলিকে প্রভাবিত করেনি। তবে অতীতে এমন ঘটনা ঘটেছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Nepal flash flood today: ২৬ অগাস্ট সকাল ৮টা ৩৭ মিনিট নাগাদ নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী পাহাড়ি অঞ্চলে ৪.৪ মাত্রার একটি মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এর ঠিক আধ ঘণ্টার মধ্যেই তিব্বতের উজান থেকে প্রবল বেগে ঘোলা জলের স্রোত নামতে শুরু করে।
তিনি বলেন,
চিন, নেপাল, ভারত এবং ভুটান পরিবেশগতভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। এই অঞ্চলের মানুষের অভিন্ন অস্তিত্ব ও ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে হিমালয়ের পরিবেশ রক্ষার উপর। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকতে পারে, কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিমালয় অঞ্চলকে রক্ষা করতে আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
খানালের কথায়,
পরিস্থিতি যত বদলাবে, ঝুঁকিও তত বাড়বে। এর প্রভাব পড়তে পারে এই অঞ্চলের প্রায় ২০০ কোটি মানুষের মিষ্টি জলের প্রাপ্যতার উপর।
এই পরিস্থিতিকে তিনি 'সভ্যতার জন্য হুমকি' বলে উল্লেখ করে বলেন,
আমরা কীভাবে একসঙ্গে এগিয়ে এসে এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করি, সেটিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমে মনে করা হয়েছিল, ভূমিকম্পের কারণে এই বিপর্যয় ঘটেছে। পরে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা জানায়, যে কম্পন রেকর্ড হয়েছিল, সেটি সম্ভবত ভূমিকম্পের কারণে নয়। বরং পাহাড়ের একটি বড় অংশ ধসে পড়ার সঙ্গে সেই কম্পনের সম্পর্ক ছিল। বরফ, পাথর ও মাটি একসঙ্গে নেমে এসে নদীর গতিপথে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করে। তার পরেই দ্রুতগতিতে জল ও ধ্বংসাবশেষ নেমে আসে নিচের দিকে।
সাধারণ বন্যায় নদীর জল ধীরে ধীরে বাড়তে পারে। কিন্তু পাহাড়ে হিমবাহ বা বরফ-পাথরের বিশাল অংশ ভেঙে পড়লে কয়েক মিনিটের মধ্যে নদীর চরিত্র বদলে যেতে পারে। জল, বরফ, পাথর ও কাদার মিশ্রণ তখন এক ধরনের ধ্বংসাত্মক স্রোতে পরিণত হয়। পাহাড়ি উপত্যকার সরু পথ দিয়ে সেই স্রোত নেমে এলে তার সামনে থাকা বাড়ি, সেতু বা রাস্তা রক্ষা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
নেপালের নদীগুলির একটি বড় অংশ ভারতের উত্তরাঞ্চলের নদীব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। যেমন নেপালে যে নদীকে নারায়ণী বলা হয়, সেটিই ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রবেশের পর গণ্ডক নামে পরিচিত। অর্থাৎ নেপালের পাহাড়ে কোনো বড় বিপর্যয় ঘটলে সেই জলরাশির প্রভাব ভারতের বিহার, উত্তরপ্রদেশের মতো রাজ্যেও পৌঁছতে পারে।
এই কারণেই নেপালের বিদেশমন্ত্রীর বক্তব্যকে শুধুমাত্র একটি কূটনৈতিক মন্তব্য হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। এর মধ্যে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার একটি বড় প্রশ্ন। হিমালয় দ্রুত বদলাচ্ছে। তাপমাত্রা বাড়ছে, হিমালয়ের বরফ গলছে। এর ফলে হিমবাহ-সংক্রান্ত হঠাৎ বন্যার ঝুঁকিও বাড়ছে।
গত কয়েক বছরে হিমালয় অঞ্চলে একের পর এক এমন ঘটনা সামনে এসেছে। কোথাও হিমবাহ-হ্রদ ভেঙে বন্যা হয়েছে, কোথাও পাহাড় ধসে নদীর গতিপথ আটকে গিয়ে পরে সেই বাধ ভেঙে ভয়াবহ জলস্রোত তৈরি হয়েছে। ২০২৪ সালেও নেপালের থামে এলাকায় হিমবাহ-হ্রদ থেকে জল বেরিয়ে বড় ধরনের বন্যা হয়েছিল।
এবারের বিপর্যয়ের পর আরও একটি আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, নেপাল-চিন সীমান্তের কাছে নদীর উজানে বরফ ও পাথরের একটি বাধ এখনও থাকতে পারে। সেটি ভেঙে গেলে দ্বিতীয় দফায় আরও বড় জলস্রোত নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে প্রথম বিপর্যয়ের পরেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিরাপদ বলা যাচ্ছে না।
ভারতের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। দেশের উত্তরাঞ্চলের বহু বড় নদীর উৎস হিমালয়। গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার সঙ্গে হিমালয়ের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। ফলে হিমবাহের পরিবর্তন একদিকে ভবিষ্যতে জলসংকটের আশঙ্কা তৈরি করতে পারে, অন্যদিকে হঠাৎ অতিরিক্ত জল নেমে এসে বন্যার ঝুঁকিও বাড়াতে পারে। একই পরিবেশগত পরিবর্তন কখনও অতিরিক্ত জল, আবার কখনও জলের অভাব তৈরি করতে পারে।
নেপালের বন্যা ভারত-সহ গোটা হিমালয় অঞ্চলের জন্য একটি সতর্কবার্তা। আজ যে জল নেপালের একটি উপত্যকাকে ভাসিয়ে দিচ্ছে, কাল তার প্রভাব ভারতের কোনো নদী অববাহিকায় দেখা যেতে পারে।






