কী ভাবে তৈরি হল কোভিড ভাইরাস ডেল্টাক্রন? কতটা ক্ষতিকর নতুন এই ভ্যারিয়েন্ট?

Madhurima Pattanayak
৩ মিনিট
কী ভাবে তৈরি হল কোভিড ভাইরাস ডেল্টাক্রন? কতটা ক্ষতিকর নতুন এই ভ্যারিয়েন্ট?

ফেব্রুয়ারি মাসে ওয়াশিংটনের পাব্লিক হেল্থ ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানী স্কট ন্যুয়েন করোনা ভাইরাসের আন্তর্জাতিক জিনোমের ডেটাবেস পরীক্ষা করছিলেন। সোজা কথায় বোঝালে এখনও অবধি যত রকমের করোনাভাইরাস পাওয়া গেছে, তাদের প্রত্যেকের জিনের গঠন কীরকম, তারই বিস্তারিত তথ্য আছে এই ডেটাবেসে। পরীক্ষা চলাকালে উনি হঠাৎ খেয়াল করেন, ফ্রান্সে এই বছরেই জানুয়ারি নাগাদ সংগ্রহ করা কিছু নমুনাতে নোভেল করোনাভাইরাসের ডেল্টা এবং ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের মিশ্রণ রয়েছে। দেখা যাচ্ছে যখন কেউ এই দুই ভ্যারিয়েন্টের দ্বারাই আক্রান্ত হন, তখনই এমন মিশ্রণ দেখতে পাওয়া যায় - অন্তত প্রাথমিক ভাবেই এই রকমই সিদ্ধান্তে আসেন গবেষকরা। কিন্তু গভীর ভাবে জেনোমিক ডেটা খুঁটিয়ে দেখতেই ন্যুয়েন বুঝতে পারেন, প্রাথমিক ভাবে গবেষকরা ভুল বুঝে এই রকম দাবী করেছিলেন যে স্যাম্পেলে ওমিক্রন ও ডেল্টার মিশ্রণ আছে।

তাহলে আদতে কী ঘটেছে? ন্যুয়েন প্রত্যেকটি ভাইরাস স্যাম্পেল আলাদা আলাদা করে পরীক্ষা করে দেখেন, একই ভাইরাসে ওমিক্রণ এবং ডেল্টা দুই ভ্যারিয়েন্টেরই জিন উপস্থিত আছে। অর্থাৎ ডেল্টা এবং ওমিক্রণ, এই দুইয়ের জিনই মিলিত হয়ে একটি নতুন নোভেল করোনাভাইরাসের ভ্যারিয়েন্টের জন্ম দিয়েছে। বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় এই ঘটনাকে বলে জিন রিকম্বিনেশন। আর যেহেতু দুই ভ্যারিয়েন্টেরই জিন উপস্থিত আছে, তাই এদের নাম দেওয়া হয়েছে ডেলমাইক্রন বা ডেল্টাক্রন।

ন্যুগেন নিউ ইয়র্ক টাইমসকে জানিয়েছেন, ডেল্টা ও ওমিক্রনের জিন রিকম্বিনেশনের ঘটনার সূত্রপাত মূলত নেদারল্যান্ড ও ডেনমার্কেই। এর পাশাপাশি ন্যুগেন কোভ- লিনিয়েজ নামের একটি অনলাইন ফোরামে নিজের নতুন এই অবিষ্কারের কথা উল্লেখও করেছেন। এখানে উল্ল্যেখ্য, কোভ- লিনিয়েজ ফোরামটিরে সারা পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা একে-অপরকে নতুন কোভিড ভ্যারিয়েন্ট চিহ্নিত করতে সাহায্য করেন।

ডেলমাইক্রন বা ডেল্টাক্রন যে আসলে ডেল্টা এবং ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের জিনের রিকম্বিনেশনের ফলেই তৈরি তা নিশ্চিত করেছেন প্যারিসের পাস্তুর ইনস্টিটিউটের ভাইরোলজিস্ট এটিয়েন সাইমন- লরিয়ের। এবং অবশেষে গত ৮ ই মার্চ কোভিড জিনোমের আন্তর্জাতিক ডেটাবেসে ডেলমাইক্রন বা ডেল্টাক্রনের জিনের পূর্ণ গঠন নথিভুক্ত করা হয়।

ড: এটিয়েন সাইমন- লরিয়ের, নিউ ইয়র্ক টাইমসকে জানিয়েছেন নতুন ভ্যারিয়েন্ট ডেলমাইক্রন বা ডেল্টাক্রনকে নিয়ে নতুন করে চিন্তার কিছু নেই, এবং এরা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে ওমিক্রনের মতই। অর্থাৎ ওমিক্রনের মতই দ্রুত ছড়ালেও, রোগের প্রকোপ খুব বেশি হবে না। এবং ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের জিন থাকলেও, ডেল্টার মত আগ্রাসী এবং ক্ষতিকর এই ভ্যারিয়েন্ট নয়।

এর কারণ বিশদে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ড: সাইমন জানাচ্ছেন, করোনাভাইরাসের বাইরে কাঁটার মত দেখতে স্পাইক প্রোটিন থাকে। ডেল্টাক্রন বা ডেলমাইক্রনের ক্ষেত্রে সেই স্পাইক প্রোটিন গঠনের জন্যে দায়ী ডেলমাইক্রনে উপস্থিত ওমিক্রন থেকে আসা জিন। তাই ওমিক্রন ও ডেলমাইক্রনের স্পাইক প্রোটিনের গঠন একই হবে। এই স্পাইক প্রোটিনই নোভেল করোনাভাইরাসকে সাহায্য করে আমাদের শরীরের কোশে প্রবেশ করার সময়, তাই এই প্রোটিনের গঠনের উপরই নির্ভর করে আছে কত দ্রুত ছড়াবে এই ভাইরাস। সুতরাং বলার অপেক্ষা রাখে না, ডেল্টাক্রন বা ডেলমাইক্রনের আক্রমণ করার ক্ষমতা ওমিক্রনের মতই হবে।

অন্যদিকে নতুন ভ্যারিয়েন্টের বাদবাকি অংশ গঠন নিয়ন্ত্রণ করে, এর মধ্যে উপস্থিত ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট থেকে আসা জিনের অংশ।

এই সব কারণেই স্পাইক প্রোটিনের গঠনের কথা মাথায় রেখেই ভ্যাক্সিনের রাসায়নিক নকশা বানানো হয়, যাতে যে গঠনকে অস্ত্র করে ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করে, সেই অস্ত্রের বিরুদ্ধেই লড়তে পারে ভ্যাক্সিন।

ওমিক্রন খুব সহজে নাক এবং শ্বাসনালির উপরের অংহ আক্রমন করলেও, সহজে ফুসফুস অবধি পৌঁছতে পারে না। এর দৌড় নাক থেকে গলা অবধি, বা খুব বেশী হলে গলার সামান্য নীচের অংশ। অবশ্য শ্বাসজনিত অসুখ থাকলে আলাদা কথা। গবেষকদের ধারণা ডেলমাইক্রনকে নিয়েও তাই এখনই বিশেষ ভয় পাওয়ার কারণ নেই।

তবে নেচারে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়, শিশুদের ক্ষেত্রে ওমিক্রনের প্রভাব ভিন্ন হতেই পারে। যেহেতু তাদের শ্বাসনালির দৈর্ঘ্য প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় কম, তাই ওমিক্রন সহজে পৌঁছে যায় ফুসফুসে। অবশ্য ডেলমাইক্রন বা ডেল্টাক্রন শিশুদের কী ভাবে প্রভাবিত করবে তা এখনও অজানা।

ওমিক্রন ও ডেল্টার জিনের মিলন বা রিকম্বিনেশন হতে পারে? গবেষকদের ধারণা, জনবহুল এলাকায় তো সব রকম ভ্যারিয়েন্টই একসাথে থাকতে পারে। দেখা গেল এই ভীড়ে মিশে থাকা কেউ, এই দুই ভ্যারিয়েন্ট দ্বারাই আক্রান্ত হল। তাঁর শরীরে দুই ভ্যারিয়েন্ট প্রবেশ করলে তখনই ঘটতে পারে দুটি আলাদা আলাদা ভ্যারিয়েন্ট থেকে আসা জিনের মিলন। যদিও রিকম্বিনেশনের সম্ভাবনা খুবই স্বল্প, এমনই দাবি করছেন ড: সাইমন।

খুব সম্প্রতি ফ্রান্সের একদল গবেষক দাবি করেন ডেল্টা এবং ওমিক্রনের জিন রিকম্বিনেশনে তৈরি নতুন এই ভ্যারিয়েন্টের অদ্ভুত কিছু নাম দেন এবং দাবি করেন এগুলি গবেষণাকারে কৃত্রিম ভাবে বানানো। ড: ন্যুগেন জানান এই ভ্যারিয়েন্ট আদৌ ল্যাবে তৈরি করা হয়নি।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

করোনা সেরে গেলেও পিছু ছাড়ছে না ক্লান্তি! লং কোভিড নিয়ে নতুন গবেষণায় কী জানা গেল?

Long COVID: করোনা সংক্রমণ থেকে সুস্থ হওয়ার পরেও অনেকের শরীরে থেকে যাচ্ছে ক্লান্তি, শ্বাসকষ্ট ও স্মৃতিশক্তির সমস্যা। লং কোভিড নিয়ে নতুন মার্কিন গবেষণায় দেখা গেল, তিন বছরে প্রায় অর্ধেক রোগীর উপসর্গ কমেছে এবং এক-চতুর্থাংশ সম্পূর্ণ সুস্থ হয়েছেন। কিন্তু কোন ধরনের উপসর্গ থাকলে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি? কী বলছে গবেষণা?

কলকাতা বন্দরে উদ্ধার সাড়ে ১৩ কোটি টাকার ই-সিগারেট, শরীরের কী কী ক্ষতি করে এই ইলেকট্রনিক সিগারেট?

E-Cigarette Side Effects: কলকাতা বন্দরে প্রায় ৫৫ হাজার ই-সিগারেট উদ্ধার করেছে রাজস্ব গোয়েন্দা দফতর (DRI)। উদ্ধার হওয়া পণ্যের আনুমানিক বাজারমূল্য ১৩.৫ কোটি টাকা। ভারতে নিষিদ্ধ এই ইলেকট্রনিক সিগারেট শরীরের কী কী ক্ষতি করতে পারে?

ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসায় DT-109 কতটা কার্যকর হতে পারে?

Fatty liver: ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসায় DT-109 কতটা কার্যকর? অন্ত্রের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া নিয়ন্ত্রণ করে কীভাবে এই পরীক্ষাধীন ওষুধ লিভারের প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে? প্রাণীর শরীরে আশাব্যঞ্জক ফল মিললেও মানুষের ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা কি প্রমাণিত হয়েছে? ভবিষ্যতে কি গুরুতর ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসায় নতুন দিশা দেখাতে পারবে DT-109?

ইউক্রেনকে বিসর্জন দিয়ে পুতিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াচ্ছেন ট্রাম্প?

Trump Putin relationship: ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভ্লাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠতা বর্তমান বিশ্বরাজনীতির জটিল সমীকরণকে নতুন করে নির্ধারণ করতে পারে?

বাংলার স্বাস্থ‍্যরক্ষায় সরকারি স্বাস্থ্যব‍্যবস্থা সংহত হওয়া জরুরি: অভিজিৎ চৌধুরী

Abhijit Chowdhury Interview: তিনি বাঙালির ‘লিভারের ডাক্তারবাবু’ বলেই সমধিক পরিচিত। দীর্ঘদিন সরকারি ক্ষেত্রে কাজ করেছেন। অবসরের পরেও জড়িয়ে রয়েছেন চিকিৎসা পরিষেবার সঙ্গে। সোনারপুরে গড়ে তুলেছেন ‘লিভার ফাউন্ডেশন’। সহযোদ্ধাদের সঙ্গে মিলে তাঁর পরবর্তী স্টেশন ‘স্বাস্থ্য বিশ্ববিদ্যালয়’।

হঠাৎ হৃদযন্ত্র বন্ধ হলে কী করবেন? নানা পাটেকরের মৃত্যুর পর জেনে নিন CPR-এর জরুরি নিয়ম

How to perform CPR: ধরুন, হঠাৎ কেউ জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন। ডাকলেও সাড়া দিচ্ছেন না, স্বাভাবিকভাবে শ্বাসও নিচ্ছেন না। এমন অবস্থায় আতঙ্কিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার সময় নেই। তাহলে, কী করবেন তখন?

থালায় খাবার, নাকি বিষ? খাদ্যব্যবস্থার ভিতরে যেভাবে ঢুকছে কীটনাশক ও কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ

Poison on the Plate: বায়ার-মনসান্টো ও সিনজেনটার মতো 'বিগ সিক্স' কর্পোরেটের নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছে বিশ্বের বীজ বাজার। ২০২৩ সালে ভারতে ১০,৭৮৬ জন খাদ্য উৎপাদক কৃষক ও কৃষিশ্রমিকের আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। ২৮ শতাংশ খাদ্য নমুনায় কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ পাওয়া যাচ্ছে। কৃষিকাজে ব্যবহৃত গ্লাইফোসেটকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ক্ষতিকারক ‘সম্ভাব্য কার্সিনোজেন’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, তবুও এর ব্যবহার থামেনি। অন্যদিকে, প্রচারের অন্তরালে সিকিম আমাদের দেশের প্রথম শতভাগ জৈব কৃষির রাজ্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। সারা বিশ্বজুড়ে কৃষিবিদ বন্দনা শিবার ‘পয়জন-ফ্রি ফুড অ্যান্ড ফার্মিং ২০৩০’ অভিযানের ডাক আমাদের খাবারের থালাকে বিষমুক্ত করার আহ্বান জানাচ্ছে।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।