কতটা ভয়ঙ্কর করোনা ভ্যারিয়েন্ট নিওকোভ, জানা গেল নতুন গবেষণা থেকে

Madhurima Pattanayak
৪ মিনিট
কতটা ভয়ঙ্কর করোনা ভ্যারিয়েন্ট নিওকোভ, জানা গেল নতুন গবেষণা থেকে

নিওকোভ (NeoCoV) নিয়ে ইতিমধ্যেই অনেকে ভীত, কেউ কেউ আবার এখনও নিওকোভের ভয়াবহতা কতখানি হতে পারে সেই নিয়ে ধন্ধে। নিওকোভ আদতে কী ধরণের করোনাভাইরাস (Coronavirus)? কতটা ভয়াবহ হতে পারে এর প্রভাব? আমাদের কী সত্যি ভয় পাওয়া উচিত, এই সমস্ত প্রশ্নের জবাব দিলেন একদল বিজ্ঞানী।

প্রথমত, করোনাভাইরাসের শ্রেণিবিন্যাস (Classification) করলে দেখা যাবে, এদের একটি বিশাল গোত্র বা ফ্যামিলি রয়েছে। এই গোত্র বা ফ্যামিলির অন্তর্ভুক্ত করোনাভাইরাসগুলি হয় মানুষ এবং বিভিন্ন প্রাণীদের আক্রমণ করে। এদের আবার চার রকমের জেনাস (Genus) আছে। সেগুলি হল – আলফা (Alpha), বিটা (Beta), গামা (Gamma), এবং ডেল্টা (Delta)। সাধারণ ভাবে দেখতে গেলে আলফা এবং বিটা করোনাভাইরাস বাদুড় এবং মানুষের মতো বিভিন্ন স্তন্যপায়ী প্রাণীদের আক্রমণ করে। অন্যদিকে গামা এবং ডেল্টা প্রজাতির করোনাভাইরাস কেবল পাখিদের আক্রমণ করে।

বলা ভালো করোনাভাইরাসের জেনাস আলফা, বিটা, বা ডেল্টার সাথে কিন্তু নোভেলকরোনা ভাইরাসের (Novel Coronavirus) স্ট্রেইন (Strain) আলফা, বিটা বা ডেল্টার কোনো সম্পর্ক নেই। একটি ভাইরাস গ্রুপের (যাদের মধ্যে সমস্ত ধরনের করোনাভাইরাস অন্তর্ভুক্ত) একটি জেনাস (Genus) থেকে আরেকটি জেনাস আলাদা করা হয়, বিস্তর জেনেটিক (Genetic) তফাতের কারণে।

একটি ভাইরাসের (যেমন, নোভেল করোনাভাইরাস বা SARS-CoV-2) একটি স্ট্রেইন থেকে আরেকটি স্ট্রেনের মধ্যে মূল জেনেটিক গঠন একই থাকলেও, জিনের সামান্য কিছু জায়গায় অদল-বদল বা মিউটেশনের (Mutation) কারণে একই ভাইরাসেরই আলাদা-আলাদা স্ট্রেইনের উদ্ভব ঘটে।

যদিও বাদুড় এবং অন্যান্য প্রাণীদেরকেই মূলত করোনাভাইরাস আক্রমণ করে, তবে এই ভাইরাস কিন্তু নিজের জিনে মিউটেশনের মাধ্যমে মানুষকেও আক্রমণ করার ক্ষমতা অর্জন করতে পারে। এই ঘটনাকে বলে zoonotic spillover। ঠিক যেমন ব্যাট করোনাভাইরাস মিউটেট হয়ে মানুষকে আক্রমণ করার ক্ষমতা অর্জন করেছে।

যেহেতু করোনাভাইরাসের শরীরে আরএনএ (RNA) থাকে, এদের মধ্যে মিউটেশনের ঘটনা খুব দ্রুত ঘটে। ডিএনএ ভাইরাসের (DNA Virus) ক্ষেত্রে কিন্তু মিউটেশনের হার উল্লেখযোগ্য ভাবে কম।কী এই নিওকোভ? কতটাই বা মিল আছে অন্য করোনাভাইরাসের সাথে?

নিওকোভ হল ব্যাট করোনাভাইরাস (Bat Coronavirus), অর্থাৎ যারা বাদুড়কে আক্রমণ করে। নিওকোভের সন্ধান পাওয়া যায় ২০১১-তে। এদের পাওয়া গেছিলো নিওরোমিসিয়া (Neoromicia) জাতের বাদুড়ের শরীরে। আর এই নিওরোমিসিয়া থেকেই নিওকোভ নামটি এসেছে।

তবে নিওকোভের জিনের গঠনের সাথে ৮৫ শতাংশ মিল আছে মার্স-কোভ করোনাভাইরাসের (MARS-CoV), যা কি-না মানুষকে আক্রমণ করে এবং অসুস্থতার ভয়াবহতাও বেশি হয়। মার্স-কোভের মত সার্স-কোভ (SARS-CoV), OC43, HKU1, 229E, NL63-ও কিন্তু মানুষকে আক্রমণ করে।

তাহলে কি নিওকোভ মানুষকে আক্রমণ করতে পারে?

যতদূর দেখা গেছে এখনও নিওকোভ মানুষকে এখনও আক্রমণ করতে পারে না, শুধু বাদুড়কেই আক্রমণ করতে পারে। আর যেহেতু মানুষকে এখনও পর্যন্ত নিওকোভ আক্রমণ করতে পারেনি, এর ফলে কোনো মানুষের মৃত্যুও ঘটেনি।

বিজ্ঞানীদের নিওকোভ নিয়ে নতুন গবেষণা থেকে আমরা কী জানতে পারছি? এই গবেষণার গুরুত্ব কী?

গবেষণার মূল বিষয় নিয়ে আলোচনা করার আগে, আমাদের জানা প্রয়োজন নোভেল করোনাভাইরাস সহ অন্যান্য বিভিন্ন ধরণের করোনাভাইরাস কী ভাবে আমাদের শরীরে ঢোকে। করোনাভাইরাস আমাদের শরীরে প্রবেশ করে রিসেপটরের (receptor) সাহায্যে, যেগুলি আবার শরীরে বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কোশের বাইরে থাকে। রিসেপ্টরের মূল গঠনের জন্যে দায়ী প্রোটিন (Protein)। এদিকে করোনাভাইরাসের গায়েও থাকে কাঁটার মত দেখতে স্পাইক প্রোটিন (Spike Protein)। বিভিন্ন করোনাভাইরাসে, স্পাইক-প্রোটিনের গঠনের রকমফের দেখা যায়। তারা আবার শরীরে প্রবেশ করার জন্যে বিভিন্ন ধরণের রিসেপ্টর ব্যবহার করে। করোনাভাইরাসের স্পাইকপ্রোটিন আর এদিকে মানুষ বা অন্য প্রাণীর শরীরের রিসেপ্টরের গঠন তালা-চাবির মত খাপে-খাপে মিলে গেলে (Lock and key mechanism), তখনই শরীরে প্রবেশ করতে পারে।

ব্যাট করোনাভাইরাস নিওকোভ, বাদুড়ের শরীরে প্রবেশ করার জন্যে ব্যবহার করে ব্যাট ACE2 রিসেপ্টর। কিন্তু মানুষের শরীরে প্রবেশ করার জন্যে নোভেল করোনাভাইরাস ব্যবহার করে ACE2 রিসেপ্টর। দু'টি রিসেপ্টরের মধ্যে নামের সাদৃশ্য থাকলেও, মানুষের ACE2 রিসেপ্টর আর বাদুড়ের ACE2 রিসেপ্টরের গঠনের বিস্তর ফারাক। ফলে ব্যাট করোনাভাইরাস নিওকোভ কোনো মতেই মানুষের ACE2 রিসেপ্টরকে ব্যবহার করতে পারে না। ফলে সেই রিসেপ্টরকে ব্যবহার করে নিওকোভ মানুষের শরীরে ঢুকতেও পারে না।

নতুন এই গবেষণা থেকে জানা যাচ্ছে, নিওকোভ বা অন্যান্য ধরণের করোনাভাইরাস, যারা এখনও কেবল প্রাণীদেরকেই আক্রমণ করতে পারে এখনও, তারা কিন্তু সুযোগ পেলে - অর্থাৎ যখন মানুষের সংস্পর্শে আসে, মিউটেশনের মাধ্যমে বদলে গিয়ে মানুষকে আক্রমণ করার ক্ষমতা অর্জন করতে পারে।

আদতে অরণ্য ধ্বংস এবং নগরায়ণ বাড়ার সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে আমরা বন্যপ্রাণীর বাস্তুকে আক্রমণ করছি। আমরা তাদের সংস্পর্শে আসছি অনেক বেশি। গবেষকদের মতে ঘটনা খুবই বিরল, কিন্তু আমরা ক্রমশ প্রাণীদের (নিওকোভের ক্ষেত্রে বাদুড়) সংস্পর্শে যত বেশি আসব, সেই ঘটনা ঘটার পথ প্রস্বস্ত করে দেবো আরও। ভবিষ্যতে নিওকোভ থেকে মানুষের দেহে সংক্রমণ রুখতে নিওকোভের বৈশিষ্ট্যগুলিকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে, তাদের জিনে কোনো পরিবর্তন আসছে কি-না দেখতে হবে নিয়মিত। সমস্ত ধরনের করোনাভাইরাস যারা মানুষ এবং বন্যপ্রাণীদেরকে আক্রমণ করে, তাদের সবারই জেনেটিক গঠন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। তাহলেই জানা যাবে তাদের চারিত্রিক পরিবর্তন এবং মানুষকে আক্রমণ করার প্রবণতা। এবং সর্বোপরি মানুষের সাথে বাদুড়ের সংস্পর্শে আসার ঘটনা যথাসম্ভব কমাতে হবে।

তাহলেই হয়তো নোভেল করোনাভাইরাস থেকে পরবর্তী একটা মহামারীর ঘটার সম্ভাবনা আমরা কমাতে পারব।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

চিনির বিকল্প স্টেভিয়া! ঘরের বাগানে রাখা যায় যে ‘মধু পাতা’

Stevia benefits: গাছ থেকে সদ্য তোলা কাঁচা পাতা কিংবা রোদে শুকিয়ে নেওয়া পাতা সরাসরি চা বা যেকোনো পানীয়ের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা যায়। এতে চিনির মতো একই রকম মিষ্টতা পাওয়া যায়। স্টিভিয়ার নির্যাস থেকে তৈরি মিষ্টান্ন ডায়াবেটিস রোগীরা খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকি থাকে না বললেই চলে।

ফুটপাথের ধারের সেই খাবার যেভাবে হয়ে উঠল কলকাতার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

Kolkata Street food history: সুতানুটি-গোবিন্দপুর-কলিকাতার শ্রমজীবী মানুষের তৃপ্তির জন্য জন্ম হয়েছিল ফুটপাতের খাবারের। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের 'সংবাদ প্রভাকর' থেকে হুতোম প্যাঁচার নকশা, এফএও সমীক্ষা থেকে এফএসএসএআই আইন হয়ে ২০২৫ সালে রাসেল স্ট্রিটে প্লাস্টিক-মুক্ত ফুড হাবের জন্ম। কলকাতার স্ট্রিট ফুড আজও এই শহরের প্রাণ। এই শহরের অন্যতম ঐতিহ্য।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি কেন আরশোলার মৃত্যুতে দুঃখ পেয়েছিলেন?

Sanae Takaichi cockroach story: ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ। সরকারি বাসভবনে গভীর রাতে একা কাজ করতে গিয়ে তিনি একটি আরশোলা দেখতে পেয়েছিলেন। সচরাচর আরশোলা দেখলে তিনি চিৎকার করে ওঠেন, কিন্তু সেদিন তিনি সেটিকে মারেননি।

স্ট্রেস কি সবসময় খারাপ? কখন স্বাভাবিক চাপ হয়ে ওঠে মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি?

mental stress: একটি ইঁদুরের উপর পরীক্ষা করতে গিয়ে তারা দেখেছেন, একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ইঁদুরটির মধ্যে স্ট্রেস বাড়ানোর সঙ্গে তার কাজকর্মের মান আরও উন্নত হয়েছে। কিন্তু নির্দিষ্ট সীমা পার করবার পর পরই তার ফলাফল করার সর্বোচ্চ সম্ভাবনা ক্রমশ কমতে কমতে শেষে সেটা প্রায় শূন্যতে নেমে গিয়েছে।

নিজের সর্বস্ব দিয়ে হাসপাতাল গড়েছিলেন রাধাগোবিন্দ কর

History of RG Kar Medical College and Hospital: আজ যে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল বারবার খবরের শিরোনামে, তার দীর্ঘ ইতিহাস কী? কে ছিলেন রাধাগোবিন্দ কর, যিনি নিজের সম্পত্তি বিক্রি করে গরিব মানুষের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল গড়ে তুলেছিলেন? প্লেগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, বাংলায় চিকিৎসাবিজ্ঞান চর্চা ও সমাজসেবায় তাঁর অবদান আজ কতটা মনে রাখা হয়েছে?

হিরোশিমা-নাগাসাকির আগুন থেকে বেঁচে যাঁরা, কেমন ছিল তাঁদের পরের জীবন?

Hiroshima, Nagasaki: বিস্ফোরণের বহু বছর পর এমিকোর ঘরে মেয়ে এল, আর তারও পর জন্ম নিল এমিকোর নাতনি কাজুমি কুওয়াহারা। নবজাতক নাতনিকে দেখে চিকিৎসকেরা পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, "এই বাচ্চা তিন দিনের বেশি বাঁচবে না।" জিনের ভিতরে লুকিয়ে থাকা কোনো অজানা দুর্বলতা যেন জন্ম থেকেই জাপটে ধরেছিল ছোট কাজুমিকে।

কেন কম ঘুমেও কেউ সুস্থ, কেউ হারাচ্ছেন স্মৃতি? জানালেন গবেষকরা

sleep deprivation and brain health: গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে AQP4 (Aquaporin-4) নামে একটি জিন। এই জিনকে অনেকটা মস্তিষ্কের 'সাফাই কর্মী' বলা যায়। আমরা যখন গভীর ঘুমে থাকি, তখন মস্তিষ্কে শুরু হয় এক বিশেষ পরিষ্কার করার কাজ। সারাদিনে জমে থাকা বর্জ্য এবং আলঝাইমার্স রোগের সঙ্গে যুক্ত ক্ষতিকর প্রোটিন এই সময় ধীরে ধীরে শরীর থেকে বেরিয়ে যেতে সাহায্য করে। আর সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজে বড় ভূমিকা পালন করে AQP4 জিন।