বেছে বেছে টার্গেট মহিলাদের 'নিলাম'-এ তোলার অ্যাপ! কী এই 'বুল্লিবাই'! কারা চালাত!

Sourish Das
৪ মিনিট
বেছে বেছে টার্গেট মহিলাদের 'নিলাম'-এ তোলার অ্যাপ! কী এই 'বুল্লিবাই'! কারা চালাত!

নতুন বছর শুরু হতে না হতেই শুরু হয়ে গিয়েছে বিতর্ক। আর এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি বিশেষ অ্যাপ। অ্যাপটির নাম বুল্লি বাই। এই বুলি বাই সারা ভারতে সাড়া ফেলে দিয়েছে মুহুর্তের মধ্যেই। তড়িঘড়ি বিশ্বের জনপ্রিয় হোস্টিং প্ল্যাটফর্ম গিটহাবের তরফে এই বিশেষ অ্যাপটিকে ব্লক করা হয়, এবং এই অ্যাপটি যে সংস্থা তৈরি করেছে তাকে সম্পূর্ণরূপে ব্যান করা হয় সেই হোস্টিং প্ল্যাটফর্ম থেকে। কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে। খবরের শিরোনামে উঠে আসে এই 'বুল্লি বাই'। অভিযোগ এই অ্যাপের মাধ্যমে নাকি বেছে বেছে ভারতীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ভুক্ত মহিলাদের ফটোশপ করা বিকৃত ছবি এবং মনগড়া কুৎসিত বিবরণ পোস্ট করে তাদেরকে 'ভার্চুয়াল নিলামে' তোলার ব্যবস্থা করা হচ্ছিল।

ওই দিনই অর্থাৎ ১ জানুয়ারি একটি বিতর্কিত ওয়েবসাইটও লঞ্চ করা হয়েছিল এই অ্যাপের পরিপ্রেক্ষিতে। সেই ওয়েবসাইটে মুসলিম ধর্মাবলম্বী সমাজকর্মী, সাংবাদিক, ছাত্রী থেকে শুরু করে জনপ্রিয় কিছু ব্যক্তিত্বের ছবি অত্যন্ত কুরুচিকর ভঙ্গিতে পোস্ট করা হয়েছিল। এই বিষয়টি নিয়ে শোরগোল পড়তেই, একজন মহিলা সাংবাদিক এই অ্যাপটির মাস্টারমাইন্ডকে গ্রেফতারের দাবি জানিয়ে সাইবার পুলিশের কাছে একটি লিখিত এইআইআর দায়ের করেন। কিন্তু কী এই 'বুল্লি বাই' অ্যাপ এবং কী ভাবে মুসলিম মহিলাদের 'নিলাম' করার এই কদর্য নকশা সাজানো হয়েছিল ওয়েবসাইটে? এই প্রশ্নগুলো হয়ত এখন আপনার মাথাতেও ঘোরাফেরা করছে।

কী আসলে এই 'বুল্লি বাই' অ্যাপ?

'বুল্লি বাই' এই লব্জটি আদতে ব্যবহার করা হয় মুসলিম মহিলাদের অসম্মান করার জন্য। হিন্দি ভাষায় ব্যবহৃত একটি অবমাননাকর শব্দ 'বুল্লি'। আর এই শব্দবন্ধটির মতই ওই বিশেষ ওয়েবসাইট এবং অ্যাপটিকেও ডিজাইন করা হয়েছিল মুসলিম মহিলাদের অবমাননা করার জন্যই। যারা নিয়মিত সাইবার জগতের অপরাধ নিয়ে চর্চা করেন তাদের হয়তো মনে থাকবে ২০২১ এর জুলাই মাসে 'সুল্লি ডিলস' নামের একটি ওয়েবসাইট ও অ্যাপ হঠাৎ করেই হয়ে উঠেছিল জনপ্রিয়। সেই সময়ই প্রথমবার ভারতে মুসলিম মহিলাদের নিলাম করার মত ঘটনা সামনে আসে। ওই অ্যাপে প্রায় ৮০ জনেরও বেশি মুসলিম নারীর প্রোফাইল তৈরি করে তাদের 'নিলাম' করার মত ঘটনা ঘটানো হতো।

সুল্লি ডিলস-র মতই এই বুল্লি বাই অ্যাপটিও মুসলিম মহিলাদের 'নিলাম' এর জন্য তৈরি হয়েছিল। একটি জনপ্রিয় ওপেনসোর্স সার্ভিস গিটহাবের মাধ্যমে এই ওয়েবসাইট এবং অ্যাপ অপারেট করা হতো। এই বুল্লি বাই অ্যাপে প্রায় ১০০ জনেরও বেশি মহিলাকে নিশানা করে তাদের প্রোফাইল বানানো হয়েছিল। যখন এই অ্যাপ কার্যকরী ছিল, তখন সেই অ্যাপ খুললেই মহিলাদের মুখমন্ডলের একাধিক ছবি দেখা যেত, যেগুলি প্রধানত নেওয়া হয়েছিল ট্যুইটার থেকে।

শুধু ছবিতেই ক্ষান্ত নয়, ছবির সঙ্গেই সেই ছবিতে যে মহিলার মুখমন্ডল রয়েছে তার ব্যাপারে নানান ধরনের অবমাননাকর বিবরণও দেওয়া থাকত। ট্যুইটারে যে সমস্ত মুসলিম মহিলাদের ফলোয়ার সংখ্যা ভালো, যাদের সোশ্যাল মিডিয়াতে একটা উল্লেখযোগ্য পরিচিতি রয়েছে, তাদেরকেই মূলত নিশানা করা হয়েছিল এই অ্যাপের মাধ্যমে। সাংবাদিক থেকে শুরু করে অভিনেত্রী, এমন বহু মুসলিম ধর্মাবলম্বী মহিলাদের নিশানা করে তাদেরকে এই অ্যাপে 'নিলামে' তোলা হয়েছিল। বহু মুসলিম ধর্মাবলম্বী মহিলা ট্যুইট করে জানিয়েছেন, তারা এই বিষয়টি নিয়ে অত্যন্ত আতঙ্কিত।

গত বছর যখন 'সুল্লি ডিলস' অ্যাপ এবং ওয়েবসাইট ভাইরাল হয়েছিল, সেই সময় দিল্লি এবং উত্তরপ্রদেশ পুলিশের কাছে দুটি লিখিত এফআইআর দায়ের করা হয়েছিল। এখনও পর্যন্ত 'সুল্লি ডিলস' কাণ্ডে কাউকে ধরা না গেলেও 'বুল্লি বাই' অ্যাপের পিছনে যার মাথা রয়েছে, তিনি ইতিমধ্যেই গ্রেফতার হয়েছেন।

কিন্তু, প্রশ্ন উঠছে, অশ্লীলবার্তাবহ অ্যাপে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ভুক্তদেরই কেনো নিশানা করা হচ্ছে? ধর্মীয় বিভেদের উদ্দেশ্যেই এরকম কাজ করা হতে পারে, মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। তবে এই ধরনের অ্যাপের নেপথ্যে লুকিয়ে রয়েছে আরও বেশ কিছু রহস্য। ইতিমধ্যেই, 'বুল্লি বাই' কাণ্ডে 'কে এসএফ খালসা শিখ ফোর্স' নামের একটি ট্যুইটার হ্যান্ডেলের যোগসুত্র মিলেছে। এই ট্যুইটার হ্যান্ডেল তৈরি করেছিলেন উত্তরাখণ্ডের দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্রী শ্বেতা সিং। ইতিমধ্যেই তাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। শ্বেতার সূত্র ধরে উত্তরাখণ্ডের আরও একজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

মনে রাখতে হবে 'বুল্লি বাই' কিংবা 'সুল্লি ডিলস' কোনও ভাবেই সত্যিকারের অর্থে কেনা বেচা করার কোন ওয়েবসাইট ছিল না। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল মুসলমান মহিলাদের ব্যক্তিগত ছবি শেয়ার করে তাদেরকে অপমান করা। শিবসেনা নেত্রী প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদী এই ঘটনা নিয়ে ট্যুইট করে বলেছেন, "প্ল্যাটফর্ম ব্লক করার পাশাপাশি এই ধরনের সাইট তৈরি করা অপরাধীদের শাস্তি দেওয়াটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।" ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব বলছেন, "পুলিশ সাইবার সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় স্থাপন করে নিশ্চিত করবে যেন পরবর্তীতে এ রকম কোনও ঘটনা আর না ঘটে।"

উল্লেখ্য অ্যামেনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের একটি সমীক্ষায় ২০১৮ সালে উঠে এসেছিল, ভারতে যে নারী যত বেশি সোচ্চার হবেন, তার 'টার্গেট' হওয়ার আশঙ্কা ততবেশি। এবং তিনি যদি ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং অনগ্রসর বর্ণের মহিলা হন তাহলে তার প্রতি অবমাননার পরিমাণ আরও বাড়বে। সমালোচকরা বলেন, সাম্প্রতিক সময়কালে ভারতের রাজনৈতিক পরিবেশ যেভাবে সম্পূর্ণরূপে ধর্মীয় মেরুকরণ বাড়ছে, সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে সংখ্যালঘুদের ট্রোল, ও সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের হেয় করার ঘটনা আরো বাড়বে। এই ঘটনা যে ভারতের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে গভীরভাবে আঘাত করবে অদূর ভবিষ্যতে তা বলাই বাহুল্য।

লিখেছেন
Sourish Das
Sourish Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

AI-এর যুগে মানুষ কি নিজের বুদ্ধিটাই মেশিনের হাতে তুলে দিচ্ছে?

Artificial Intelligence: ছোটবেলায় অনেকেই ভাবত রোবট এসে মানুষের কায়িক শ্রমের কাজগুলি করে দেবে। মানুষ অবসর পেয়ে গান শুনবে, কবিতা লিখবে কিংবা বারান্দায় বসে কফি খাবে। বাস্তবে দেখা গেল ঠিক তার উল্টো চিত্র। রোবট এখন কবিতা লিখছে, ছবি আঁকছে আর কোড তৈরি করছে। অন্যদিকে মানুষ সকাল থেকে রাত ল্যাপটপের সামনে বসে শিখছে প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং।

মহাকাশে রওনা নাসার টেলিস্কোপের, বদলে দিতে পারে মহাবিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি?

NASA’s Roman Space Telescope: নাসার নতুন ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ বদলে দেবে মহাবিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি? হাবল ও জেমস ওয়েবের পর কেন প্রয়োজন হলো এই নতুন মহাকাশ-চোখের? ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি, গ্যালাক্সি ও এক্সোপ্ল্যানেট সম্পর্কে কি নতুন তথ্য দেবে রোমান? মহাবিশ্বের প্রসারণের ইতিহাস বুঝতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে এই অত্যাধুনিক টেলিস্কোপ?

সৌরপৃষ্ঠ আসলে কেমন? ৩৩ বছর পর মিলল উত্তর

Sun’s surface mystery: সূর্যের পৃষ্ঠকে এতদিন দূর থেকে তুলোর মতো নরম ও শান্ত দেখালেও, তা কি সত্যিই এমন? বিশ্বের বৃহত্তম সৌর টেলিস্কোপ ড্যানিয়েল কে ইনোয়ের তোলা সর্বোচ্চ-রেজোলিউশনের ছবিতে দেখা গেল ছোট ছোট হিংস্র প্লাজমার ঘূর্ণি। ৩৩ বছর আগে করা জোয়ান কার্পেনের সেই ভবিষ্যদ্বাণী কি অবশেষে সত্যি প্রমাণিত হলো? এই আবিষ্কার কি বদলে দেবে সৌরপৃষ্ঠ সম্পর্কে ধারণা?

৩ অগাস্ট থেকে বদলে যাচ্ছে শেয়ার বাজারের নিয়ম!

Stock Market India: নতুন ব্যবস্থার অধীনে শেয়ার বাজার বন্ধের সময়কে তিনটি আলাদা অংশে ভাগ করা হয়েছে। তবে নন-এফএন্ডও (Non-F&O) স্টকগুলির ক্ষেত্রে আগের মতোই বিকেল ৩:৩০টা পর্যন্ত স্বাভাবিক লেনদেন চালু থাকবে, এতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। কিন্তু এফএন্ডও স্টকগুলির ক্যাশ মার্কেটে প্রতিদিন একটানা লেনদেন চলবে বিকেল ৩:১৫ মিনিট পর্যন্ত।

আইআইটি-র দুই প্রাক্তনীর বৈদ্যুতিক কৃষিযন্ত্রে একরপ্রতি খরচ মাত্র ৪০ টাকা

Electric Power Tiller: বাজারে যেসব ট্র্যাক্টর পাওয়া যায়, তা হয় বিশাল বড় জমির উপযোগী, না হয় কেনা ও চালানো দুটোই খুব ব্যয়বহুল। ভারতে ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ কৃষকের জমিই ছোট ও খণ্ড-বিখণ্ড, যেখানে বড় যন্ত্র ঢোকানোই সম্ভব নয়। আবার চিন থেকে আমদানি করা ছোট ছোট সস্তা মেশিনগুলিতে যন্ত্রাংশ ও সার্ভিসিংয়ের চূড়ান্ত সমস্যা তৈরি হয়। তাই বিদেশ থেকে আমদানির কথা না ভেবে, আইআইটি বোম্বের দুই প্রাক্তনী ঐশ্বর্য রামকৃষ্ণন ও কেদার গোখলে সিদ্ধান্ত নেন খাঁটি দেশীয় প্রযুক্তিতে ভারতের মাটির উপযোগী সমাধান তৈরি করার।

মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেও উষ্ণ থাকে সোনাম ওয়াংচুকের বাড়ি

Sonam Wangchuk House: সোনম ওয়াংচুক মানেই পাহাড়ঘেরা লাদাখের ছবি, বরফে ঢাকা জীবন আর নতুন এক ভাবনার আলো। পেশায় তিনি একজন প্রকৌশলী, শিক্ষাবিদ এবং উদ্ভাবক। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে তিনি যেন রূপকথার সেই মানুষটি, যিনি পাহাড়ের রুক্ষ জীবনের কঠিন সমস্যাগুলিকে বিজ্ঞানের সহজ ছোঁয়ায় অত্যন্ত সহজ করে তুলেছেন।

মহাকাশে মিলল চিনির সন্ধান, কেন গুরুত্বপূর্ণ এই আবিষ্কার?

natural sugar in space: ছায়াপথের কেন্দ্রের একটি আণবিক মেঘে প্রথমবারের মতো প্রকৃত মনোস্যাকারাইড ‘এরিথ্রুলোজ’-এর সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। এই আবিষ্কার জানাচ্ছে, নক্ষত্র ও গ্রহ তৈরির আগেই মহাকাশে জটিল জৈব অণু তৈরি হতে পারে। ফলে পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তি এবং মহাবিশ্বে জীবনের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে গবেষণার আগ্রহ বেড়েছে।

কর্মদক্ষতা মাপল এআই, চাকরি হারালেন কর্মীরা? মেটার বিরুদ্ধে বিস্ফোরক মামলা

Meta mass layoffs: কর্মীদের ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নেবে? মেটার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলায় অভিযোগ, এআই-নির্ভর মূল্যায়নের কারণে মাতৃত্বকালীন ও চিকিৎসাজনিত ছুটিতে থাকা কর্মীরা অন্যায্যভাবে চাকরি হারিয়েছেন।