কোন মারাত্মক অভিযোগের জেরে বিপুল জরিমানার মুখে গুগল

Google Lawsuit: মোবাইলের মালিকানা আপনার হতে পারে, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আপনি ক্ষমতাহীন।

Satyaki Tat
৩ মিনিট
কোন মারাত্মক অভিযোগের জেরে বিপুল জরিমানার মুখে গুগল

No one ever makes a billion dollars. You take a billion dollars.

-Alexandria Ocasio-Corte

মার্কিন এই রাজনীতিবিদ এই কথাটা বলেছিলেন এক সম্মেলনে। যদিও বক্তব্যটি ধনকুবের শিল্পপতিদের উদ্দেশে, কোনও সংস্থার উদ্দেশে নয়, কিন্তু শিল্পপতিরা ধনকুবের হন তাদের ফুলে-ফেঁপে ওঠা ব্যাবসার মাধ্যমেই। মজার বিষয় হলো, যে 'Multi billion dollar' সংস্থাগুলি শিল্পবিপ্লবের পর থেকে আজ পর্যন্ত পৃথিবী শাসন করে এসেছে, তার মধ্যে একটিও সংস্থা নেই, যার গায়ে কাদার দাগ লাগেনি। কোনও না কোনও অভিযোগে তারা বিদ্ধ হয়েছে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেই সমস্ত অভিযোগ সঠিক প্রমাণ হয়েছে। তবে এটাই কি ধনতন্ত্রের সবথেকে বড় ব্যর্থতা? না কি এটাই ধনতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থার প্রথাসিদ্ধ আচরণ?

কম্পিটিশন কমিশন অফ ইন্ডিয়া ২০ অক্টোবর পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম প্রযুক্তি সংস্থা গুগলকে ১,৩৩৭.৭৬ কোটি টাকা জরিমানা করেছে। গুগলের অপরাধ? অনৈতিক এবং অপ্রতিযোগিতামূলক কাজ, যা ভারতে অন্যান্য প্রযুক্তি সংস্থাগুলিকে ব্যবসায়িক ভাবে প্রতিযোগিতা করার সুযোগই দিচ্ছে না। গুগল অনৈতিকভাবে তার অ্যানড্রয়েড মোবাইল ফোনগুলিতে এমন ব্যবস্থা করে রেখেছে, যাতে গুগলের পুরো মোবাইল স্যুট অ্যানড্রয়েড ফোনগুলিতে আগে থেকে ইনস্টল করা থাকে এবং সেটিকে চাইলেও ব্যবহারকারী আনইনস্টল করে অন্য কোনও সংস্থার মোবাইল স্যুট ইনস্টল করতে পারবেন না।

অ্যানড্রয়েড একটি ওপেন সোর্স মোবাইল ওপারেটিং সিস্টেম। গুগল এই প্রযুক্তির উদ্ভাবনের জন্য দায়ী ঠিকই, কিন্তু এই প্রযুক্তি গুগলের একার সৃষ্টি নয়। বাইডু, অ্যান্ডি রুবিন, আগোডা, ওপেন হ্যান্ডসেট অ্যালায়েন্স, গেমলফ্টের মতো সংস্থাও এই প্রযুক্তিকে দিনের আলো দেখাতে সহায়তা করেছিল। কিন্তু বিগত কয়েক বছর ধরেই বিষয়টা এমন একটা জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে অ্যানড্রয়েড মানেই গুগল এবং গুগলের যাবতীয় যা অ্যাপ্লিকেশন এবং সব ধরনের প্রোগ্রাম তাতে মজুত থাকবে। মোবাইলের মালিকানা আপনার হতে পারে, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আপনি ক্ষমতাহীন।

সেই কারণেই Section 4, Competition Act অনুযায়ী গুগলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এই আইনে স্পষ্টভাবে কোনও সংস্থার অনৈতিক এবং অন্যায্য ব্যবসায়িক কার্যকলাপ, তার বাজারের আধিপত্যকে অন্যায়ভাবে কাজে লাগিয়ে প্রতিযোগিতাহীন করে তোলার প্রবণতাকে রুখে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

গুগল শুধুমাত্র মোবাইল স্যুটের ক্ষেত্রেই নিজের প্রভাবকে কাজে লাগায়নি। নিজের অ্যাপ স্টোর এবং গুগল ক্রোম ব্রাউজারকেও একইভাবে ব্যবহারকারীদের ওপর আরোপ করেছে। কোনও ব্যবহারকারীই মোবাইল কেনার পর এই বিষয়গুলি নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামান না। বিশেষ করে পণ্যটি যেহেতু গুগলের। সবাই বিনা প্রশ্নে গুগলের সতর্ক ভাবে আমাদের ওপর আরোপিত পণ্য গুলিকে আপন করে নেন। যেহেতু বাজারে গুগলের ভীষণ সুনাম রয়েছে, সেই কারণেই কেউ এই বিষয়টি ভেবে দেখার প্রয়োজনই মনে করেন না। এই মনস্তত্ত্বকে এবং নিজের সুনামকে এইভাবেই কাজে লাগিয়ে গুগল, দিনের পর দিন। কম্পিটিশন কমিশন অফ ইন্ডিয়া বা CCI এই কারণেই এত টাকার জরিমানা করেছে এই মার্কিন সংস্থাকে। সেই সঙ্গে নির্দেশ দিয়েছে, অতি দ্রুত যাতে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়। বিগত দুই বছর ধরে চলতে থাকা এই তদন্তে CCI দেখেছে, কীভাবে গুগল ইন্ডিয়া ইন্টারনেট অ্যাপ্লিকেশনের বেশিরভাগ দিক, যেমন সার্চ ইঞ্জিন, মিউজিক, ব্রাউজার, অ্যাপ লাইব্রেরি এবং বাকি সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিজের একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করেছে। কীভাবে মোবাইল প্রস্তুতকারক এবং অ্যাপ প্রস্তুতকারকদের ওপর একতরফা শর্ত চাপিয়ে দিয়েছে।

গুগলের বিরুদ্ধে অভিযোগ শুধুমাত্র ভারতের সীমানাতেই সীমাবদ্ধ নেই। অতীতে গুগলের সিইও সুন্দর পিচাই-কে মার্কিন কংগ্রেসের সামনে হাজিরা দিতে হয়েছে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ নিয়ে ওঠা অভিযোগের কারণে। সম্প্রতি আমেরিকার টেক্সাসে অভিযোগ উঠেছে, গুগল লক্ষ লক্ষ টেক্সাসবাসীর বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ করেছে তাদের অনুমোদন ছাড়াই। সেই সঙ্গে গুগলের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, জার্মানি এবং জাপানেও।

গুগল না হয় দোষী সাব্যস্ত হলো। কিন্তু CCI-এর কি সেই ক্ষমতা আছে, যাতে গুগলকে দেওয়া শাস্তির কার্যকারিতা নিশ্চিত হয়? সংবিধান কতটা ক্ষমতা দিয়েছে তাদের? সরকারই বা কতটুকু সাহায্য করে এই প্রতিষ্ঠানকে?

জরিমানা ১,৩৩৭.৭৬ কোটি হলেও, CCI এর কতটা অর্থ সত্যিই আদায় করতে পারবে তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় থেকে যাচ্ছে। ২০১১-'১২ অর্থবর্ষ থেকে ২০১৭-'১৮ অর্থবর্ষের তথ্য যদি দেখা যায়, তাহলে দেখা যাবে যে, CCI এই ছয় বছরে মোট ১৩,৫২৩ কোটি টাকার জরিমানা ঘোষণা করেছে। কিন্তু আদায় করতে পেরেছে মাত্র ৫৫ কোটি টাকা। যা মোট জরিমানার অঙ্কের মাত্র ০.৪%। তবে এটাও ঠিক, ২০০৩ সালে এর প্রতিষ্ঠার পর খুব ধীরে হলেও CCI নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। ক্রেতার অধিকার রক্ষা এবং বাজারে কোনও সংস্থার একচেটিয়া আধিপত্যের কথা সামনে আনার মতো কাজও খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং তা দায়িত্ব নিয়ে পালন করার সর্বতো চেষ্টা করেছে CCI। তার সাফল্য নির্ভর করছে প্রশাসন কতটা তার নির্দেশকে কার্যকর করতে সাহায্য করছে, তার ওপর। সুতরাং প্রশাসনের ভূমিকাও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়।

লিখেছেন
Satyaki Tat
Satyaki Tat
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

AI-এর যুগে মানুষ কি নিজের বুদ্ধিটাই মেশিনের হাতে তুলে দিচ্ছে?

Artificial Intelligence: ছোটবেলায় অনেকেই ভাবত রোবট এসে মানুষের কায়িক শ্রমের কাজগুলি করে দেবে। মানুষ অবসর পেয়ে গান শুনবে, কবিতা লিখবে কিংবা বারান্দায় বসে কফি খাবে। বাস্তবে দেখা গেল ঠিক তার উল্টো চিত্র। রোবট এখন কবিতা লিখছে, ছবি আঁকছে আর কোড তৈরি করছে। অন্যদিকে মানুষ সকাল থেকে রাত ল্যাপটপের সামনে বসে শিখছে প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং।

মহাকাশে রওনা নাসার টেলিস্কোপের, বদলে দিতে পারে মহাবিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি?

NASA’s Roman Space Telescope: নাসার নতুন ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ বদলে দেবে মহাবিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি? হাবল ও জেমস ওয়েবের পর কেন প্রয়োজন হলো এই নতুন মহাকাশ-চোখের? ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি, গ্যালাক্সি ও এক্সোপ্ল্যানেট সম্পর্কে কি নতুন তথ্য দেবে রোমান? মহাবিশ্বের প্রসারণের ইতিহাস বুঝতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে এই অত্যাধুনিক টেলিস্কোপ?

সৌরপৃষ্ঠ আসলে কেমন? ৩৩ বছর পর মিলল উত্তর

Sun’s surface mystery: সূর্যের পৃষ্ঠকে এতদিন দূর থেকে তুলোর মতো নরম ও শান্ত দেখালেও, তা কি সত্যিই এমন? বিশ্বের বৃহত্তম সৌর টেলিস্কোপ ড্যানিয়েল কে ইনোয়ের তোলা সর্বোচ্চ-রেজোলিউশনের ছবিতে দেখা গেল ছোট ছোট হিংস্র প্লাজমার ঘূর্ণি। ৩৩ বছর আগে করা জোয়ান কার্পেনের সেই ভবিষ্যদ্বাণী কি অবশেষে সত্যি প্রমাণিত হলো? এই আবিষ্কার কি বদলে দেবে সৌরপৃষ্ঠ সম্পর্কে ধারণা?

৩ অগাস্ট থেকে বদলে যাচ্ছে শেয়ার বাজারের নিয়ম!

Stock Market India: নতুন ব্যবস্থার অধীনে শেয়ার বাজার বন্ধের সময়কে তিনটি আলাদা অংশে ভাগ করা হয়েছে। তবে নন-এফএন্ডও (Non-F&O) স্টকগুলির ক্ষেত্রে আগের মতোই বিকেল ৩:৩০টা পর্যন্ত স্বাভাবিক লেনদেন চালু থাকবে, এতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। কিন্তু এফএন্ডও স্টকগুলির ক্যাশ মার্কেটে প্রতিদিন একটানা লেনদেন চলবে বিকেল ৩:১৫ মিনিট পর্যন্ত।

আইআইটি-র দুই প্রাক্তনীর বৈদ্যুতিক কৃষিযন্ত্রে একরপ্রতি খরচ মাত্র ৪০ টাকা

Electric Power Tiller: বাজারে যেসব ট্র্যাক্টর পাওয়া যায়, তা হয় বিশাল বড় জমির উপযোগী, না হয় কেনা ও চালানো দুটোই খুব ব্যয়বহুল। ভারতে ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ কৃষকের জমিই ছোট ও খণ্ড-বিখণ্ড, যেখানে বড় যন্ত্র ঢোকানোই সম্ভব নয়। আবার চিন থেকে আমদানি করা ছোট ছোট সস্তা মেশিনগুলিতে যন্ত্রাংশ ও সার্ভিসিংয়ের চূড়ান্ত সমস্যা তৈরি হয়। তাই বিদেশ থেকে আমদানির কথা না ভেবে, আইআইটি বোম্বের দুই প্রাক্তনী ঐশ্বর্য রামকৃষ্ণন ও কেদার গোখলে সিদ্ধান্ত নেন খাঁটি দেশীয় প্রযুক্তিতে ভারতের মাটির উপযোগী সমাধান তৈরি করার।

মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেও উষ্ণ থাকে সোনাম ওয়াংচুকের বাড়ি

Sonam Wangchuk House: সোনম ওয়াংচুক মানেই পাহাড়ঘেরা লাদাখের ছবি, বরফে ঢাকা জীবন আর নতুন এক ভাবনার আলো। পেশায় তিনি একজন প্রকৌশলী, শিক্ষাবিদ এবং উদ্ভাবক। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে তিনি যেন রূপকথার সেই মানুষটি, যিনি পাহাড়ের রুক্ষ জীবনের কঠিন সমস্যাগুলিকে বিজ্ঞানের সহজ ছোঁয়ায় অত্যন্ত সহজ করে তুলেছেন।

মহাকাশে মিলল চিনির সন্ধান, কেন গুরুত্বপূর্ণ এই আবিষ্কার?

natural sugar in space: ছায়াপথের কেন্দ্রের একটি আণবিক মেঘে প্রথমবারের মতো প্রকৃত মনোস্যাকারাইড ‘এরিথ্রুলোজ’-এর সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। এই আবিষ্কার জানাচ্ছে, নক্ষত্র ও গ্রহ তৈরির আগেই মহাকাশে জটিল জৈব অণু তৈরি হতে পারে। ফলে পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তি এবং মহাবিশ্বে জীবনের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে গবেষণার আগ্রহ বেড়েছে।

কর্মদক্ষতা মাপল এআই, চাকরি হারালেন কর্মীরা? মেটার বিরুদ্ধে বিস্ফোরক মামলা

Meta mass layoffs: কর্মীদের ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নেবে? মেটার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলায় অভিযোগ, এআই-নির্ভর মূল্যায়নের কারণে মাতৃত্বকালীন ও চিকিৎসাজনিত ছুটিতে থাকা কর্মীরা অন্যায্যভাবে চাকরি হারিয়েছেন।