৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চিনি রফতানি বন্ধ, কেন এই সিদ্ধান্ত কেন্দ্র সরকারের?

India sugar export ban: চিনির দাম বাড়া ঠেকাতে কেন্দ্র ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চিনি রফতানি বন্ধ করেছে। কেন এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো?

inscript
৫ মিনিট
৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চিনি রফতানি বন্ধ, কেন এই সিদ্ধান্ত কেন্দ্র সরকারের?

পশ্চিম এশিয়ার উত্তেজনা, অনিশ্চিত বর্ষা এবং আগামী মৌসুমে চিনি উৎপাদন কমতে পারে—এই আশঙ্কায় ভারত সরকার হঠাৎ চিনি রফতানি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে। কেন্দ্রের দাবি, দেশের বাজারে চিনির পর্যাপ্ত জোগান নিশ্চিত করা এবং সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধি রোধ করাই এই সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য।

চিনি ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৃষি-শিল্প পণ্য। মহারাষ্ট্র, উত্তরপ্রদেশ, কর্নাটক, তামিলনাড়ু ও বিহারের লক্ষ লক্ষ আখচাষি এবং শত শত চিনিকল এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। ফলে চিনি রফতানি বন্ধের সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নয়, দেশের কৃষক, শিল্প এবং ভোক্তা— সবার উপরই পড়বে।

বাণিজ্য মন্ত্রকের অধীন ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ ফরেন ট্রেড (DGFT) ১৩ মে একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানায়, কাঁচা চিনি, সাদা চিনি এবং পরিশোধিত চিনির রফতানি নীতিকে সীমিত অনুমতির তালিকা থেকে সরিয়ে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞা ৩০ সেপ্টেম্বর অবধি বহাল থাকবে। যদিও সরকার চাইলে তার আগেও সিদ্ধান্ত বদল করতে পারে।

এর অর্থ হলো, ভারত থেকে আর চিনি বিদেশে পাঠানো যাবে না। তবে কিছু ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিশেষ কোটা ব্যবস্থার আওতায় যে সীমিত পরিমাণ চিনি রফতানি হয়, তা চালু থাকবে। এছাড়া সরকার-টু-সরকার চুক্তি, অ্যাডভান্স অথরাইজেশন স্কিম এবং ইতোমধ্যেই বন্দরে পৌঁছে যাওয়া কিছু চালানও এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে রাখা হয়েছে।

প্রশ্ন উঠছে, এমন সিদ্ধান্ত এখন কেন? কারণ, আপাতদৃষ্টিতে দেশে চিনির বড় ঘাটতি নেই। শিল্প সংগঠনগুলির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ বছরে (অক্টোবর থেকে সেপ্টেম্বর) ভারতের মোট চিনি উৎপাদন প্রায় ২৭.৫ থেকে ২৮ মিলিয়ন টনের কাছাকাছি হতে পারে। এর সঙ্গে আগের বছরের উদ্বৃত্ত মজুত যোগ করলে দেশীয় চাহিদা মেটানোর মতো পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। তবুও সরকার আগাম সতর্কতা হিসেবে এই পদক্ষেপ করেছে।

সরকারের উদ্বেগ মূলত আগামী মৌসুমকে ঘিরে। আবহাওয়া দফতর এবার তুলনামুলক কম বৃষ্টির সম্ভাবনার কথা বলেছে। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও সার সরবরাহেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সার যদি সময়মতো না পৌঁছয়, তাহলে আখচাষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে ২০২৬-২৭ মৌসুমে উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
এক মাস চিনি বাদ দিলে ঠিক কী পরিবর্তন হবে জীবনযাত্রায়?

30 days no sugar: ৩০ দিন চিনি পুরোপুরি বাদ দিলে শরীর ও মনে কী কী পরিবর্তন ঘটে? প্রথম সপ্তাহের উইথড্রয়াল ফেজে মাথাব্যথা, ক্লান্তি ও ব্রেন ফগ কি স্বাভাবিক? দ্বিতীয় সপ্তাহে কি সত্যিই এনার্জি ও মনোযোগ বাড়ে? তৃতীয় সপ্তাহে ত্বক ও ওজনেরও পরিবর্তন হয়?

এই প্রেক্ষাপটে কেন্দ্র কোনো ঝুঁকি নিতে চাইছে না। চিনি এমন একটি পণ্য, যার দাম বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খরচে। চা, মিষ্টি, বিস্কুট, ঠান্ডা পানীয়, বেকারি— সব ক্ষেত্রেই চিনির ব্যবহার ব্যাপক। ফলে চিনির দাম বৃদ্ধি খাদ্য মূল্যস্ফীতিকেও উসকে দিতে পারে।

গত কয়েক মাসে সরকার প্রথমে সীমিত রফতানির অনুমতি দিয়েছিল। নভেম্বর মাসে ১৫ লক্ষ টন রফতানির অনুমোদন দেওয়া হয়। পরে ফেব্রুয়ারিতে আরও ৫ লক্ষ টন রফতানির অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু এর কিছুদিনের মধ্যেই নীতি বদলে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এই আকস্মিক পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে কৃষক সংগঠন ও শিল্পমহল।

তারা বলছেন, রফতানির জন্য ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে বহু চুক্তি হয়েছিল। হঠাৎ নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়ায় সেই চুক্তি রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। এতে ভারতীয় সরবরাহকারীদের নিয়ে বিশ্বাসযোগ্যতা হারাতে হতে পারে। এর ফলে ভবিষ্যতে বিদেশি ক্রেতারা ভারত থেকে চিনি কিনতে কিছুটা অনিশ্চয়তায় ভুগতে পারেন।

কৃষক সংগঠনগুলিও অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। তাদের যুক্তি, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম তুলনামূলকভাবে বেশি থাকলে রফতানি কৃষকদের ভালো মূল্য পেতে সাহায্য করে। রফতানি বন্ধ হলে চিনিকলগুলির আয় কমতে পারে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত আখচাষিদের পাওনা পরিশোধেও পড়তে পারে।

তবে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। তাদের মতে, কৃষকদের স্বার্থ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই দেশের কোটি কোটি ভোক্তার স্বার্থও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যদি বাজারে সরবরাহ কমে যায় এবং দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করে, তাহলে তা সামগ্রিক অর্থনীতির উপর প্রভাব ফেলবে।

আন্তর্জাতিক বাজারেও ভারতের এই সিদ্ধান্তের তাৎপর্য রয়েছে। ব্রাজিলের পর ভারত বিশ্বের অন্যতম বড় চিনি উৎপাদক এবং রফতানিকারক দেশ। ভারতীয় চিনি বাজার থেকে সরে গেলে বিশ্ববাজারে সরবরাহ কমে যায়, ফলে আন্তর্জাতিক দাম বাড়তে পারে। এই সুযোগে ব্রাজিল, থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলি বেশি রফতানির সুযোগ পেতে পারে।

শেয়ার বাজারেও ইতোমধ্যেই প্রভাব পড়েছে। বেশ কয়েকটি বড় চিনি কোম্পানির শেয়ারদরে পতন হয়েছে। বিনিয়োগকারীরা আশঙ্কা করছেন, রফতানি বন্ধ থাকলে সংস্থাগুলির আয় ও লাভের উপর চাপ পড়তে পারে।

ভারতে চিনি নীতি বরাবরই জটিল। একদিকে আখচাষিদের ন্যূনতম মূল্য নিশ্চিত করতে হয়, অন্যদিকে ভোক্তাদের জন্য বাজারদর নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। আবার চিনিকলগুলিকে টিকিয়ে রাখাও জরুরি। তার উপর এখন ইথানল উৎপাদনের জন্যও প্রচুর আখ ব্যবহার হচ্ছে।

বর্তমান সিদ্ধান্তকে তাই অনেক বিশেষজ্ঞ সতর্কতামূলক পদক্ষেপ বলছেন। দেশে চিনির সরবরাহ এখনই সংকটজনক নয়, কিন্তু ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা বিবেচনা করেই সরকার আগাম ব্যবস্থা নিয়েছে।

আগামী কয়েক মাসে বর্ষার পরিস্থিতি, আখের উৎপাদন এবং বাজারদরের উপর নজর রেখে সরকার পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে। যদি উৎপাদনের সম্ভাবনা ভালো থাকে এবং মজুত স্বস্তিদায়ক হয়, তাহলে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হতে পারে। অন্যথায় তা আরও দীর্ঘায়িতও হতে পারে।

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

রেকর্ড ভাঙা সমুদ্রের উষ্ণতা: কতটা বিপদের মুখে পৃথিবী?

super el nino 2026: অক্টোবরে নিনো ৩.৪ অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার পার্থক্য, ২০১৫-১৬-র রেকর্ড ভেঙে ৩.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়াতে চলেছে। ডব্লিউএমও বলছে, এই এল নিনো ২০২৭ পর্যন্ত প্রভাব ফেলবে। ভারতে বর্ষায় ১৩% ঘাটতি, ৩৯.৮% কৃষিজমিতে খরা, ফসল উৎপাদন ৪% কমার আশঙ্কা রয়েছে।

ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’? কোন কোন জেলায় ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস?

Cyclone Arnab: ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’-এর প্রভাবে বুধবার ও বৃহস্পতিবার দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস। দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রামে বৃষ্টি বাড়তে পারে। উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলাতেও ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা। কলকাতা-সহ বিভিন্ন জেলায় বইতে পারে ঝোড়ো হাওয়া। কোন উপকূলবর্তী জেলাগুলিতে ভারী বৃষ্টির সতর্কতা জারি হয়েছে?

এগোচ্ছে ঘূর্ণিঝড় অর্ণব, কোথায় ল্যান্ডফল, কতটা ভয়ংকর হবে?

Cyclone Arnab: বঙ্গোপসাগরে শক্তি বাড়াচ্ছে ঘূর্ণিঝড় অর্ণব। ২৮ অক্টোবর অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলে আছড়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ঝড়ের গতিপথ ও শক্তির দিকে নজর রাখছেন আবহাওয়াবিদরা। বাংলার আবহাওয়ায় কি পড়বে অর্ণবের প্রভাব?

জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ‘ইয়েরেভান ঘোষণা', কী ঘটছে ইয়েরেভানের কপ-১৭তে?

yerven biodiversity conference; ১৯ থেকে ৩০ অক্টোবর আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরেভানে, কপ-১৭ জীববৈচিত্র্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। জাতিসংঘের হিসাবে, বর্তমান গতিতে চললে, ২০৩০ নাগাদ পৃথিবীর মাত্র ২৬% স্থল ও ১২% সমুদ্র সুরক্ষিত থাকবে। ইয়েরেভান ঘোষণার ‘অপর্যাপ্ত’ পরীক্ষা এখন আটকে বাজেটের অঙ্কে।

মধু সংগ্রহে ‘দাদাগিরি’! উষ্ণ পৃথিবীতে বাড়ছে বিপদ

Honeybee Behaviour: উষ্ণ পৃথিবীতে ফুলের দখল নিতে মধুমৌমাছির আগ্রাসী আচরণ কি বন্য পরাগবাহী পতঙ্গদের খাবারের সংকট আরও বাড়িয়ে তুলবে? গবেষণায় উঠে এসেছে, তাপমাত্রা বাড়লে ফুলের মধুরস নিয়ে প্রতিযোগিতা তীব্র হতে পারে, যার প্রভাব পড়তে পারে ভোমরা, একা মৌমাছি ও হোভারফ্লাইয়ের মতো পতঙ্গদের উপর।

নেপালের জন্য রাষ্ট্রপুঞ্জের ২ কোটি ডলার কি যথেষ্ট?

FRLD fund for Nepal: ২৬ অগাস্ট ভোটকোশিতে গ্লেসিয়াল লেকে ধস নামলে নেপালে ১,৫০০ জনের মৃত্যু হয় এবং নিখোঁজ হন ৫,০০০ জন। ক্ষতি হয় ২.৬৯ বিলিয়ন ডলারের। ২২ অক্টোবর এফআরএলডি বোর্ড প্রথমবার কোনো দেশকে ২০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করল। কিন্তু, এই টাকা নেপালের প্রাথমিক ক্ষতির ১ শতাংশেরও কম।

দেড় মাসের মধ্যে ফের জোড়া ভূমিকম্প, মৃত ১৮, কতটা ক্ষতিগ্রস্ত তিব্বত?

Tibet Earthquake: দেড় মাসের মধ্যে ফের জোড়া ভূমিকম্প তিব্বতে। বাড়িঘর ধসে পড়া, রাস্তা অবরোধ, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া-সহ কী কী ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে? এই অঞ্চলে বারবার প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আসল কারণটা ঠিক কী?

জলবায়ু বদলেছে, নদীর প্রবাহ বদলেছে: ৩০ বছরের পুরনো ভারত-বাংলাদেশ গঙ্গা জলবণ্টন চুক্তিতে কোন কোন পরিবর্তন দরকার?

A Flawed Pact of Farakka: ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে ১৯৯৬ সালের গঙ্গা জলবণ্টন চুক্তির ৩০ বছরের মেয়াদ। বাংলাদেশের নদী বিশেষজ্ঞ মনজুর এ চৌধুরীর মতে, চুক্তিটি 'ত্রুটিপূর্ণ', এতে নেই গ্যারান্টি ক্লজ, নেই পরিবেশগত প্রবাহের হিসাব, নেই জলবায়ু পরিবর্তনের বিধান। তাঁর প্রস্তাব, তিন বছরের নতুন অন্তর্বর্তী চুক্তি হোক, তারপর নেপালকে যুক্ত করে তৈরি করা হোক ত্রিপাক্ষিক কাঠামো।