কেন হারিয়ে গিয়েছিলেন হাওড়ার শ্যুটার কিশোরী?
Howrah Girl National shooter Damayanti Sen missing: দময়ন্তী সুস্থ শরীরে বাড়ি ফিরেছে, সন্দেহ নেই এটা অত্যন্ত স্বস্তির খবর। কিন্তু এই ঘটনার অন্তরালে যে রহস্য ও মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন লুকিয়ে আছে, তা আজকের সমাজ, পরিবার এবং নতুন প্রজন্মের মানসিকতার এক দলিল। কেন এক প্রতিভাবান কিশোরীকে এভাবে ঘর ছাড়তে হলো? এই ঘটনার প্রেক্ষিতে 'জেন জি'-র মনস্তত্ত্ব এবং প্যারেন্টিংয়ের কঠিন বাস্তব নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোকপাত করেছেন বিশিষ্ট মনোবিদ মোহিত রণদীপ এবং অন্বেষা বন্দ্যোপাধ্যায়।
১৬ জুলাইয়ের সকাল। আর পাঁচটা দিনের মতোই ঘরোয়া দরকারে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল ১৫ বছরের দময়ন্তী সেন। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও সে আর বাড়ি ফেরেনি। হাওড়া স্টেশনের সিসিটিভি ফুটেজে শেষ দেখা যাওয়ার পর, কেটে যায় টানটান উত্তেজনার দুটো দিন। অবশেষে ১৮ জুলাই ভোরে হাওড়ার রামকৃষ্ণপুর ঘাটে এক পরিচিত ব্যক্তি তাকে ধ্যানরত, প্রায় এক ঘোরের মাথায় দেখতে পান। উদ্ধার হয় জাতীয় স্তরের এই কিশোরী রাইফেল শ্যুটার।
দময়ন্তী সুস্থ শরীরে বাড়ি ফিরেছে, সন্দেহ নেই এটা অত্যন্ত স্বস্তির খবর। কিন্তু এই ঘটনার অন্তরালে লুকিয়ে আছে যে রহস্য ও মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন, তা আজকের সমাজ, পরিবার এবং নতুন প্রজন্মের মানসিকতার এক দলিল। কেন এক প্রতিভাবান কিশোরীকে এভাবে ঘর ছাড়তে হলো? এই ঘটনার প্রেক্ষিতে 'জেন জি'-র মনস্তত্ত্ব এবং প্যারেন্টিংয়ের কঠিন বাস্তব নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোকপাত করেছেন বিশিষ্ট মনোবিদ মোহিত রণদীপ এবং অন্বেষা বন্দ্যোপাধ্যায়।
দময়ন্তী কোনো সাধারণ চঞ্চল কিশোরী নয়। সে জাতীয় স্তরের রাইফেল শ্যুটার, অলিম্পিয়ান জয়দীপ কর্মকারের ছাত্রী, সম্প্রতি জাতীয় দলের ট্রায়ালও দিয়েছিল। তার বাবাও এক সরকারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক। আপাত শান্ত, মেধাবী এই মেয়ের জীবনের উপর আলো যতখানি ছিল, ভিতরের চাপও ছিল ততটাই।
কিশোরী নিজেই পুলিশকে জানিয়েছে, পড়াশোনা এবং খেলার দুনিয়ার কঠিন লাইফ-ব্যালেন্স করতে গিয়ে সে মানসিকভাবে মারাত্মক ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল।
এই প্রসঙ্গে মনোবিদ মোহিত রণদীপ আরও একটি বড় বাস্তব তুলে ধরেছেন। তিনি জানান,
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Baruipur case: বারুইপুরের ঘটনার অন্যতম অভিযুক্তের পুলিশের হেফাজতে মৃত্যুর পর নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। এনকাউন্টার কি সত্যিই ধর্ষণের মতো অপরাধ কমাতে পারে? নাকি বিচারবহির্ভূত হত্যাই আইনের শাসন ও গণতন্ত্রের জন্য আরও বড় বিপদ ডেকে আনে?
এখনকার ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশোনার চাপ অনেক। চারপাশের মানুষজন—তা সে স্কুল হোক, শিক্ষক হোক কিংবা বাবা-মা—সবাই মিলে বাচ্চার উপর অনবরত একটা চাপ তৈরি করতে থাকে। শুধু চারপাশের লোকই নয়, অনেক সময় বাচ্চারা নিজেরাও ভালো রেজাল্ট করার জন্য নিজেদের উপর নিজেরা অতিরিক্ত চাপ নিয়ে ফেলে। আর এই দুমুখী চাপের সাঁড়াশি আক্রমণেই তারা তীব্র উদ্বেগে ভুগতে শুরু করে।
মনোবিদ অন্বেষা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে,
১৫-১৬ বছরের এই বয়সটা আদতে 'অ্যাডোলেসেন্ট পিরিয়ড' বা বয়ঃসন্ধিকাল। এই সময়ে শরীরে তীব্র হরমোনাল বদল ঘটে। এই বয়সেই ছেলেমেয়েরা নিজেদের একটা আলাদা পরিচয় বা 'আইডেন্টিটি' তৈরি করার চেষ্টা করে। আর ঠিক এই সন্ধিক্ষণেই হরমোনের পরিবর্তনের কারণে তাদের মনে তীব্র উদ্বেগ, একাকিত্ব এবং কিছু ব্যক্তিগত বা পারস্পরিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। তার উপর যদি পড়াশোনা আর টুর্নামেন্টের দ্বিগুণ প্রেসার চেপে বসে, তবে স্নায়ুর চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে।
এছাড়াও ঘর ছাড়ার আগের রাতে কিশোরীর এবং তার বাবা-মায়ের মধ্যে মোবাইল ফোন ব্যবহার নিয়ে অল্প-বিস্তর বাক-বিতন্ডা হয় বলেও শোনা যাচ্ছে। যদিও এই দাবি নস্যাৎ করেছেন দময়ন্তীর বাবা-মা। কিন্তু এই সমস্যা এই সময়ের অনেক ছেলে-মেয়ের মধ্যেই দেখা যায়। তাই, মনোবিদ মোহিত রণদীপ এই বিষয়ে বলেন,
আজকের দিনে মধ্যবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলিতেও সন্তানদের যেকোনো জিনিস খুব সহজে পেয়ে যাওয়ার একটা প্রবণতা তৈরি হয়েছে। আমাদের ছোটবেলায় যেকোনো ভালো লাগার জিনিস পাওয়ার জন্য যে অপেক্ষা বা ধৈর্য ধরতে হতো, আজকের ছেলেমেয়েদের সেই অপেক্ষা খুব একটা করতে হয় না। তারা চাইলে অনেক কিছুই সহজে পেয়ে যায়।সমস্যাটা তৈরি হয় ঠিক এখানেই। পেতে পেতে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া সন্তানটি যখন হঠাৎ কোনো একটা বিষয়ে বাবা-মায়ের কাছ থেকে 'না' শোনে—যেমন এই ঘটনার ক্ষেত্রেও মোবাইল ব্যবহার নিয়ে আগের রাতে একটা আপত্তির কথা উঠে আসছে—তখন সে তীব্র হতাশায় ভেঙে পড়ে। আর সেই হতাশা থেকে জন্ম নেয় অভিমান ও রাগ। যেহেতু আজকের দিনে মাঠের খেলাধুলো প্রায় হারিয়েই গিয়েছে, তাই জেতার পাশাপাশি যে 'হারতেও শিখতে হয়'—সেই মানসিক সক্ষমতা বা টলারেন্স লেভেল বাচ্চাদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে না। আর এই না পাওয়াকে মেনে নিতে না পেরেই তারা ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়া বা কখনো কখনো আত্মহননের মতো হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে বসছে।
আজকের নতুন প্রজন্ম, যাদের আমরা 'জেন জি' বলছি, তাদের মানসিকতার সঙ্গে আগের প্রজন্মের একটা বড় দূরত্ব তৈরি হয়েছে। মনোবিদ অন্বেষা বন্দ্যোপাধ্যায় জানাচ্ছেন,
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Sonam Wangchuk hunger strike: যতীন দাস, ভগৎ সিং, কাজী নজরুল ইসলাম, মহাত্মা গান্ধী থেকে সোনম ওয়াংচুক—ভারতে অনশনের ইতিহাস এক শতাব্দীরও বেশি পুরোনো। সময়ের সঙ্গে বদলেছে আন্দোলনের দাবি। ভারতীয়দের অনশনের সুদীর্ঘ ইতিহাস মনে করাচ্ছেন সোনম ওয়াংচুক।
এই প্রজন্মের প্রধান সমস্যা হলো 'কমিউনিকেশন' বা যোগাযোগের অভাব। ডিজিটাল লাইফস্টাইলের কারণে এদের সিংহভাগ সময় কাটে স্ক্রিন টাইমে, ফলে মুখোমুখি বসে কথা বলার বা মনের ভাব প্রকাশ করার জায়গাটা অনেক কমে গিয়েছে। সম্পর্কের সমীকরণেও এই জেনারেশনের ভাবনা আলাদা। এরা তীব্রভাবে নিজেদের স্বাধীনতা ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য পছন্দ করে। এদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এমন কিছু শব্দ জড়িয়ে আছে—যেমন 'সিচুয়েশনশিপ' (situationship), 'ব্রেডক্রাম্বিং' (breadcrumbing) বা 'গোস্টিং' (ghosting)—যা আগের প্রজন্মের বাবা-মায়েদের মাথার উপর দিয়ে যায়। এই জেনারেশন মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে যেমন খুব বেশি সচেতন, তেমনই আবার খুব সহজে নিজেদের বঞ্চিত ভাবার একটা প্রবণতাও এদের মধ্যে থাকে। ফলে ঘরে বসে নিজেকে ঠিকমতো বুঝিয়ে উঠতে না পারার এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ক্রাইসিস তৈরি হচ্ছে এদের মনে।
দময়ন্তীর নিখোঁজ পর্বের আরও একটি রহস্যময় দিক হলো তার পোশাক বদলানো এবং শ্রীরামপুর বা মহেশের রথযাত্রা এলাকায় কোনো ভক্তিময়ী মহিলার সংস্পর্শে আসা। পুলিশ খতিয়ে দেখছে এর পিছনে অন্য কোনো প্ররোচনা ছিল কিনা।
এই প্রসঙ্গে মোহিত রণদীপ একটি বড় বিপদের দিকে আঙুল তুলেছেন। সোশ্যাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আজকের ছেলেমেয়েদের সামনে নানান রকমের প্রলোভন ও হাতছানি প্রবলভাবে দেখা দিচ্ছে। কিন্তু ভার্চুয়াল জগতের কোন বন্ধুত্ব আসল আর কোনটা নকল, তা আলাদা করার মতো সচেতনতা বাচ্চাদের মধ্যে নেই। আর এই অসচেতনতার সুযোগ নিয়ে আমাদের রাজ্য থেকে বহু মেয়ে প্রতিদিন পাচারের শিকার হচ্ছে। একটা বিশাল অপরাধচক্র এর পিছনে কাজ করছে। দময়ন্তী তো ভাগ্যবশত ফিরে এসেছে, কিন্তু যারা আর ফেরে না, তাদের সংখ্যা অনেক গুণ বেশি। তাই স্কুল স্তর থেকে এবং পাড়া-মহল্লার ক্লাব বা সামাজিক সংগঠনগুলির তরফ থেকে সোশ্যাল মিডিয়ার এই বিপদ সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তোলা এখন বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত।
কেমন হওয়া উচিত বাবা-মায়ের ভূমিকা?
এই ধরনের পারিবারিক ও মানসিক সংকট এড়াতে মনোবিদ অন্বেষা বন্দ্যোপাধ্যায় বাবা-মায়েদের কিছু অত্যন্ত জরুরি পরামর্শ দিচ্ছেন। মনস্তত্ত্বে মূলত তিন ধরনের প্যারেন্টিং দেখা যায়—'অথরিটেরিয়ান' (যেখানে শুধু শাসন ও কন্ট্রোলিং থাকে, আমার কথাই শেষ কথা), 'পারমিসিভ' (যেখানে অতিরিক্ত ছাড় দিয়ে সন্তানকে স্পয়েল্ড করে দেওয়া হয়) এবং 'ডেমোক্রেটিক' (গণতান্ত্রিক)। ডেমোক্রেটিক প্যারেন্টিংই হলো সেরা। যেখানে দু-পক্ষের কথাই গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়।
সন্তান কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিলে বা ভুল কিছু দাবি করলে তার সিদ্ধান্তের সঙ্গে আপনি দ্বিমত পোষণ করতেই পারেন। কিন্তু তার ভিতরের আবেগটাকে খাটো করবেন না, সেটাকে বোঝার চেষ্টা করুন।
সন্তানকে বিচার (Judge) না করে বা সারাক্ষণ উপদেশ না দিয়ে, সে কী বলতে চাইছে তা মন দিয়ে শুনুন। তাদের সঙ্গে সময় কাটান।
সন্তানকে স্বাধীনতা দিন, কিন্তু একটা সুস্থ সীমানা (Healthy Boundary) বজায় রেখে। পাশাপাশি, মোহিত রণদীপের পরামর্শ—যা দেওয়া সম্ভব বা যা প্রয়োজনীয়, তা নিশ্চয়ই দিন; কিন্তু সন্তানের অপ্রয়োজনীয় বা ক্ষতিকর চাহিদার ক্ষেত্রে শুরু থেকেই 'না' বলতে শিখুন। সন্তানদের 'না' শোনার অভ্যাস করানোটাও প্যারেন্টিংয়ের একটা বড় অংশ।
পড়াশোনা বা করিয়ারের ইঁদুরদৌড়ে আমরা যেন আমাদের সন্তানদের রোবট বানিয়ে না ফেলি। চারপাশের সবাই মিলে তাদের উপর সাফল্যের যে বোঝা চাপাচ্ছি, তা থেকে তাদের একটু নিশ্বাস নেওয়ার সুযোগ দেওয়া দরকার। দময়ন্তীর এই অন্তর্ধান আসলে আমাদের চোখ খুলে দেওয়ার জন্য একটা বড় সতর্কবার্তা।






