সব চোখ ২০২৪-এ, এখন থেকেই জোটের আশায় জল ঢালছে কংগ্রেস?

ইডি, সিবিআই জুজু না সাংগঠনিক দুর্বলতা?

 

বারবার এই প্রশ্ন পাক খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছে দিল্লির অলিন্দে। প্রায় সব রাজনৈতিক দল, রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মাথা নেড়ে একমত হচ্ছেন যে, দিল্লির মসনদ থেকে বিজেপিকে সরাতে প্রয়োজন মজবুত বিরোধী ঐক্য। কিন্তু কাকে সামনে রেখে লড়াই হবে, এর যে এখনও কোনও বাস্তব সমাধান সামনে আসেনি, তা বলাই যায়। সম্প্রতি দলের চিন্তন বৈঠকে হাত মজবুত করতে শক্ত হাতে হাল ধরেছিলেন সোনিয়া গান্ধী। কিন্তু সে গুড়ে যে বালি, তা প্রমাণ হয়ে গেল। কারণ?

 

কংগ্রেসকে চাঙ্গা করতে সোনিয়া গান্ধী যখন ফের সক্রিয়, ঠিক তখনই একের পর এক ধাক্কায় অস্বস্তিতে কংগ্রেস। গত সপ্তাহে রাজস্থানের উদয়পুরে তিনদিনব্যাপী ‘নব সংকল্প চিন্তন শিবির’ চলাকালীনই দল ছাড়েন পাঞ্জাবের প্রাক্তন প্রদেশ সভাপতি সুনীল জাখর। একইভাবে বুধবার ইস্তফা দিলেন গুজরাতের পতিদার আন্দোলনের নেতা হার্দিক প্যাটেলও। প্রশ্ন উঠছে, হার্দিকের পরবর্তী গন্তব্য কি বিজেপি?

 

সে যাই-ই হোক, দল ছাড়ার তালিকায় এবার কে, সেটাই এখন লাখ টাকার প্রশ্ন। এরপর কি কেরলের নেতা প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কে. ভি. থমাস?

 

আরও পড়ুন: ‘২৪ এ বিরোধী জোট হবে? ধরাশায়ী কংগ্রেসকে নিয়ে যে প্রশ্নগুলি উঠে আসছে

 

কংগ্রেস হাই কমান্ডের প্রবল সমালোচনা করেই দল ছাড়ার কথা ঘোষণা করেছেন হার্দিক। হার্দিকের ইস্তফা কংগ্রেসকে বিপাকে ফেলেছে, তা ঠিক, তবে কংগ্রেসও বসে না থেকে গুজরাতে অন্যভাবে ঘুঁটি সাজাচ্ছে। কিন্তু দিল্লির কথা যখন উঠল, তখন প্রশ্ন উঠে আসে যে, কংগ্রেসের সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণেই কি বিরোধী ঐক্য দানা বাঁধছে না?

 

এটা কোনও বিশেষ কারণ হলেও একমাত্র কারণ নয়। একথা ঠিক যে, বিরোধীদের একাংশ মমতাকে সামনে রেখে ঐক্যের রূপ দিতে চেয়েছেন। সোনিয়া যে রাহুলের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাববেন, তা বলাই বাহুল্য। আবার শতাব্দীপ্রাচীন দল হলেও, রাহুল, প্রিয়াঙ্কা কারও হাত শক্ত হতে পারেনি, উত্তরপ্রদেশ নির্বাচন তার প্রমাণ। তাই কি আসরে নামতে হল সোনিয়াকে? কংগ্রেসের সাংগঠনিকতা যে তলানিতে, তা বোঝার জন্য বোধহয় বেশি বুদ্ধি খরচের প্রয়োজন হয় না। এই প্রসঙ্গে বলা প্রয়োজন, কংগ্রেসকে বাদ দিয়ে বিরোধী ঐক্য হল, আর ২০২৪-এর লড়াই হল ত্রিমুখী, তাহলে কিন্তু আখেরে লাভ বিজেপিরই। লাভের গুড় ঘরে তুলতে অনেকদিন ধরেই চাল চালছেন মোদি-শাহ। কীভাবে? ওই সেই সিবিআই এবং ইডি জুজু।

 

২০২৪-এর আগে বড় প্রশ্ন, আদৌ কি বিজেপি-বিরোধী ঐক্য গড়ে উঠবে? যদি বিজেপি-বিরোধী দলগুলি মহাজোট বাঁধে, তবে সেই জোটের মুখ কে হবেন? অর্থাৎ, কে নেতৃত্ব দেবে বিরোধী ঐক্যকে? যদি ধরে নেওয়া যায়, কংগ্রেসকে রেখেই বিরোধী ঐক্য গড়ে উঠবে, তবে সেই জোটের নেতৃত্বে কে থাকবেন। তার স্পষ্ট ইঙ্গিত উঠে আসে 'মুড অফ নেশন'-এর এক সমীক্ষায়। তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর বিকল্প মুখ হয়ে ওঠার লড়াইয়ে পিছনের সারিতে থাকলেও বিরোধী ঐক্যের মুখ হিসেবে মুড অফ নেশন তাঁকে এগিয়ে রেখেছে অনেকটাই। বিরোধী ঐক্যের মুখ হিসেবে কে এগিয়ে রয়েছেন, এই প্রশ্নের উত্তরে সবার ওপরে রয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম। তিন নম্বরে রাহুল গান্ধী। মমতার ঘাড়ে কার্যত নিশ্বাস ছাড়ছেন অরবিন্দ কেজরিওয়াল। শুধুমাত্র কোনও সমীক্ষা নয়, বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতারা বলছেন, মমতাকে সামনে রেখে লড়াই হবে। আর তাই মমতাও বারবার ছুটে গেছেন দিল্লি।

 

এখন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘাড়ে সিবিআই ও ইডির খাঁড়া। সম্প্রতি তাঁকে ত্রিপুরায় বলতে শোনা গেছে, "সিবিআই, ইডি ১০ বার তলব করেছে, আমি ভয় পাই না। আমরা সবাই বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই করছি। এখানে সবাই কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূলে এসেছে। ফেসবুক, ট্যুইটারে লড়াই নয়, মাঠে নেমে লড়ে তৃণমূল। গত ৮ বছর ধরে কংগ্রেস বিজেপির কাছে হেরেছে। আর গত ৮ বছর ধরে বিজেপি তৃণমূলের কাছে হেরে চলেছে।‘’

 

বিরোধী ঐক্যের চেহারা নিয়ে যখন কথা হচ্ছে, তখন উত্তরপ্রদেশের দিকে নজর দেওয়া উচিত। সদ্য সেখানে ভোট হয়েছে। আবার সেই বিরোধী ঐক্য দানা না বাঁধায় ফের ক্ষমতায় আসেন যোগী আদিত্যনাথ। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের বলতে শোনা যায়, মায়াবতী তলে তলে বিজেপিকে সুবিধে করে দেওয়ায় নাকি এখানে বিরোধী ঐক্য গড়ার চেষ্টা ছিল ছিদ্রযুক্ত পাত্রে জল ভরার শামিল।

 

এই পরিস্থিতিতে তৃণমূল জাতীয় রাজনীতিতে কোনও সঙ্গী খুঁজে পায় কি না, সেদিকে তাকিয়ে রয়েছে রাজনৈতিক মহল। কংগ্রেস ও তৃণমূল যদি সমান্তরাল পথে চলতে শুরু করে, তবে জোটসঙ্গীরাও যে দু'-ভাগ হবে, তা বলাই যায়। এখন পর্যন্ত যে ছবি ধরা দিয়েছে, তাতে তৃণমূল একা হয়ে গিয়েছে, কংগ্রেসের সঙ্গে রয়েছে প্রায় ১৬টি দল।

 

এর মাঝে রবিবার রাহুল গান্ধী উদয়পুরে কংগ্রেসের চিন্তন শিবিরে বলে বসেছেন, আঞ্চলিক দলগুলো পারবে না বিজেপির মোকাবিলা করতে, কারণ তাদের কোনও মতাদর্শ নেই। এহেন মন্তব্যে বেশ ক্ষুব্ধ বিরোধী দলগুলো। এর কী প্রভাব আসন্ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বা অন্যান্য ক্ষেত্রে পড়বে, তা সময় বলবে।

 

কংগ্রেসের সঙ্গে রয়েছে শিবসেনাও। তৃণমূল এখনও জাতীয় রাজনীতিতে সঙ্গী খুঁজে পায়নি। সব বিরোধী দলই প্রায় মনে করছে, কংগ্রেস ছাড়া বিজেপিকে হারানো সম্ভব নয়। কারণ কংগ্রেসের সঙ্গে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ আসনে সরাসরি লড়াই হবে বিজেপির। আর তৃণমূলের সঙ্গে এখন পর্যন্ত ৪২। তা বেড়ে বড়জোড় হতে পারে ৪৪-৪৫।


কিন্তু এখনও প্রায় ২৫০ আসন রয়েছে। যেখানে অন্যান্য রাজনৈতিক দল একটা ফ্যাক্টর। সেইসব রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যেমন রয়েছে কংগ্রেস-বান্ধব দল, তেমনই রয়েছে বিজেপি-বান্ধব দলও। বামেরা যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে সপা, বসপা, আরজেডি, টিআরএস, টিডিপি, ওয়াইএসআর কংগ্রেস, বিজেডি, ডিএমকে, এআইএডিএমকে, আপ, শিবসেনার মতো বহু দল। তাই তৃণমূল বিরোধী ঐক্যে শামিল না হওয়ায় তৃতীয় শক্তির উত্থান হয় কি না সেটাও দেখার।


একদিকে বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ, অন্যদিকে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ হলে লড়াইটা অন্যরকম হতো। কিন্তু তৃণমূলের জাতীয় রাজনীতিতে প্রধান প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠার বাসনা, আরও একটি সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তুলেছে। সেক্ষেত্রে ২০২৪-এর লড়াই ত্রিমুখী হয়ে উঠতে পারে। সেক্ষেত্রে বিজেপি-বিরোধী দলগুলোর বিভক্ত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। তাতে কিন্তু আখেরে লাভ হবে বিজেপির। এর দায় শেষ পর্যন্ত কাকে বহন করতে হবে? এই নিয়ে ময়নাতদন্ত যখন হবে, তখন প্রথমেই আসবে এই প্রসঙ্গ যে, শতাব্দীপ্রাচীন দল হয়েও সাংগঠনিক শক্তি তলানিতে ঠেকেছে কংগ্রেসের। তাই হয়তো হার্দিকের সঙ্গে বিচ্ছেদ অনিবার্য হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে বলতে হয়, ক্ষমতা ধরে রাখতে বিজেপির মরণকামড়ের নাম সিবিআই ও ইডি।

More Articles

;