এদেশে 'সাইয়ারা'-র মতো ছবি আরও বেশি কেন বানানো উচিত?

Saiyaara : ছবিটির নাম ‘সাইয়ারা’। উন্মুক্ত হিংসার বিপন্ন সময়ে দাঁড়িয়ে ইতিমধ্যেই দেশের তরুণ প্রজন্মের অন্তরকে এই ছবিটি বেশ নাড়িয়ে দিয়েছে।

Suvankar Das
৩ মিনিট
এদেশে 'সাইয়ারা'-র মতো ছবি আরও বেশি কেন বানানো উচিত?

একটা ছায়াছবি, যা ‘কিসসা কুর্সি কা’ বা ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’-র মতো বিতর্কিত নয়। আদ্যোপান্ত নির্ভেজাল ভালোবাসার ছবি। ছবিটির নাম ‘সাইয়ারা’। উন্মুক্ত হিংসার বিপন্ন সময়ে দাঁড়িয়ে ইতিমধ্যেই দেশের তরুণ প্রজন্মের অন্তরকে এই ছবিটি বেশ নাড়িয়ে দিয়েছে। ছবি চলাকালীন প্রেক্ষাগৃহের মধ্যেই দর্শকদের কান্না এক শ্রেণির কাছে বিদ্রুপের বিষয় হয়ে উঠেছে। আগে ব্যক্তির জীবনযাপনে সমাজের নাক গলানো বাধ্যতামূলক হয়ে উঠেছিল। এখন কাঁদতে গেলেও সমাজের অনুমতি নিতে হচ্ছে। ব্যক্তি জীবনের ইচ্ছা-অনিচ্ছা চাওয়া-পাওয়াও নিয়ন্ত্রণ করবে সমাজ? এ তো আসলে অনধিকার চর্চা!

'সাইয়ারা'-র পোস্টার

স্বাধীন ভারতের ইতিহাস সাক্ষী রয়েছে যে সমাজের মধ্যে যখনই হিংসা-বিদ্বেষ হানাহানি তীব্র পর্যায় উন্মোচিত হয়েছে তখনই সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ ভালোবাসার গল্প দিয়ে গড়ে তোলা প্রেমের ছায়াছবিকে আরও বেশি করে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চেয়েছে। নব্বইয়ের দশকে বাবরি মসজিদ ধ্বংস, মুম্বাই বিস্ফোরণ ও দাঙ্গা, অশান্ত হয়ে ওঠা কাশ্মীর উপত্যকা আবহের মধ্যেই শাহরুখ খান অভিনীত ‘দিলবালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’-র মধ্যে মানুষ প্রেমময়তার আশ্বাসকে খুঁজে পেয়েছিল। একইভাবে ১৯৯৯ সালের কার্গিল যুদ্ধ ও কান্দাহার বিমান অপহরণকাণ্ডের ঠিক পরের বছর মুক্তি পায় ‘কহনা পেয়ার হে’। সে-সময় বলিউড পেয়েছিল হৃত্বিক রোশনকে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সর্বজয়া নয়, বাংলা ছবির ইতিহাসে গর্ভধারণ ছাড়াই 'মা' হয়ে উঠেছিল এই চরিত্র

Titash Ekti Nadir Naam: ব্যতিক্রম বাসন্তী। বাসন্তীর মাতৃত্বের জন্য কোনও গর্ভধারণের প্রয়োজনই পড়েনি।

প্রেমিক নায়ক হিসেবে তাঁর উন্মাদনা সেই সময় তুঙ্গস্পর্শী পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। বলিউডের ধারাবাহিক ইতিহাস ঘাটলে লক্ষ্য করা যাবে ১৯৬৯ সালে দেশজুড়ে যখন অশান্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে ঠিক সেই সময় রাজেশ খান্না ও শর্মিলার ঠাকুরের ‘আরাধনা’ মানুষের ক্রমাগত জীবন সংগ্রামের মধ্যে মরুদ্দ্যানের মতন কাজ করেছিল।

'দিল ওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে'

সাম্প্রতিক সময় বলিউডে প্রোপাগান্ডামূলক ছায়াছবির ভিড়ে প্রেমের ছবিগুলো হারিয়ে যেতে শুরু করেছিল। বিক্ষিপ্ত ভাবে কয়েকটি ছবিকে বাদ দিলে বেশিরভাগ হিন্দি ছবি অনেকটা হয়ে উঠেছিল মাংসের দোকানের মতো। যেখানে শরীরের তীব্র যৌন আবেদন ও অপরিসীম হিংসা মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছিল। ঠিক সেই সময় ‘সাইয়ারা’-র মতন ছবি মাংসের দোকানের মধ্যে একটা গোলাপ ফুল হয়ে যেন প্রস্ফুটিত হল। ‘সাইয়ারা’ আবারও প্রমাণ করে দিল যে মানুষ আজও হৃদয়ের অকৃত্রিম আন্তরিক অনাবিল অবিশ্রান্ত ভালোবাসার প্রতি আস্থা রেখেছে। ভালোবাসা মানে কেবল যৌনতা নয়। প্রেম আসলে একে-অন্যকে আগলে রাখাও। মানব-মানবীর সম্পর্কে বিরহ অভিসার থাকবে। আর সেটাই মানুষের চোখটাকে ভিজিয়ে দেয় প্রেক্ষাগৃহের মধ্যে। আর যারা সেই শর্তহীন ভালোবাসার প্রতি বিদ্বেষ ছিটিয়ে দেয় তারা আদতে মানবতার শত্রু।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বাংলা সিনেমার উচ্চতা থেকে পতন নিয়ে দু'চার কথা

Future of Bengali Movies : উন্নত মানের সিনেমা থাকতে গেলে উন্নত মানের সিনেমা চাইতে হয়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির কি আদপেও সিনেমা থেকে কিছু চাহিদা আছে?

'কাহোনা প্যার হে'

নিন্দুকেরা বলতেই পারে, ছবিটির গল্প বিদেশি ছবির অনুকরণে বানানো হয়েছে। কিন্তু উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো আমাদের দেশে বিশেষ করে হিন্দি ছবির সিংহভাগ ছবি এই পদ্ধতিতে তৈরি হয়। সেখানে দাঁড়িয়ে মানুষের মনকে ‘সাইয়ারা’র ছুঁয়ে যাওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে পরিচালকের গল্প বলার মুন্সিয়ানা। প্রথমদিকে ধীর গতির হলেও পরবর্তীতে ছবিটি চিত্রনাট্য টানটান উত্তেজনায় ভরে ওঠে। সারা সপ্তাহের পরিশ্রমের পর প্রতিটা মানুষের মধ্যে যে জীবনানন্দ বসত করে তারা এই ছবিটির মধ্যেই ভালোবাসার বনলতাকে খুঁজে পেয়েছে। সমস্ত দিনের শেষে ক্লান্ত শরীরে ভালোবাসার আশ্রয় মানুষ যেতে চায়। আর সেখানে এই ছায়াছবিটি বাজিমাত করে গেছে।

বাংলা ছবিতেও এমন নিদর্শন রয়েছে। ষাটের দশকে আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া বাংলায় ‘সপ্তপদী’-র রোমান্টিসিজম তরুণ বাঙালি মনকে আন্দোলিত করে দিয়ে গিয়েছিল। এমনকি ৯০-এর দশকের শুরুর দিকে চিরঞ্জিত অভিনীত ‘বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না’ দেখে অশ্রু প্লাবিত হয়েছিল পল্লী বাংলার দুই চোখ। শূন্য দশকের শেষের দিকে রিজানু, তাপসী মালিক, সিঙ্গুরে কৃষক আন্দোলন, নন্দীগ্রামে পুলিশের গুলি, নেতাইয়ে দলীয় হিংসার আবহে রাজ চক্রবর্তীর পরিচালিত ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’ এবং তার পরবর্তীতে ছবি ‘প্রেম আমার’ সেই সময় তরুণ মনকে অশান্ত পরিস্থিতির মধ্যে ভালোবাসার আশ্বাস দিতে চেয়েছিল।

'বেদের মেয়ে জোসনা'

তখনও মানুষ চোখে জল নিয়ে প্রেক্ষাগৃহ থেকে বের হত। ফলে আজকে যারা ভালোবাসার প্রতি তীব্র বিদ্বেষ পোষণ করে চলেছে আর চোখের জলের প্রতি যারা তীব্র ব্যঙ্গ করছে তারা আদতে নিজেদের নেতিবাচক মনোভাবেরই উদাহরণ দিয়ে চলেছে। পাশাপাশি এটাও মনে রাখতে হবে আপনাকে টর্চ লাইট দিয়ে যে ব্যক্তি অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে আসন দেখিয়ে দিচ্ছে, যে কাউন্টার থেকে আপনি টিকিট কাটছেন তার মধ্যে বসে থাকা ব্যক্তিটিরও সংসার দাঁড়িয়ে এইসব সিনেমার সাফল্যের ওপর। কলকাতা সহ রাজ্যের অন্যান্য শহরে একটা প্রেক্ষাগৃহকে ঘিরে একটা অর্থনীতি কাঠামো গড়ে ওঠে। কারণ সেখানে মানুষের সমাগম বেশি। হল-এর বাইরে যারা বিরিয়ানি-ডিমটোস্ট-বাটার টোস্ট রাস্তায় দাঁড়িয়ে বিক্রি করছে তাদের সংসারটা সুন্দরভাবে চলে যখন অন্ধকার মায়াবি প্রেক্ষাগৃহ জনগণের কলতানে ভরে ওঠে।

‘সাইয়ারা’ সাধারণ মানুষের ছবি। সাধারণ প্রেমের গল্প কীভাবে অসাধারণ হয়ে উঠতে পারে,তার গল্প। যে গল্পের ভেতর অনেকেই তাঁদের জীবনের খণ্ড খণ্ড সময় চিত্রকে খুঁজে পাচ্ছেন। চোখ জলে ভরে যাচ্ছে তাঁদের। দর্শকের এই কান্না, সিনেমার সংযোগের সার্থকতাকেই প্রমাণ করে!

লিখেছেন
Suvankar Das
Suvankar Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ঋত্বিক: ফিরে দেখা

Ritwik Ghatak: আমরা যখন ছোট ছিলাম, মানে ষাটের দশকের সেই শেষ দিকে বা সত্তরের দশকে, তিনি কত না অদ্ভুতভাবে আমাদের প্রভাবিত করতেন। যেমন একদিন আমাদের রবীন্দ্রসদনের সামনে দেখতে পেয়ে তিনি হঠাৎ বললেন, আমাকে একটা ট্যাক্সি ধরে দেবে?

কলকাতায় চালু হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস

West Bengal School of Magic: মুখ্যমন্ত্রী ‘পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক, ইল্যুশন অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস’ স্থাপনের প্রস্তাবে অনুমোদন করেছেন। পুজোর পর উপদেষ্টা কমিটির সদস্যরা বৈঠক করবেন।

বিভূতিভূষণের উপন্যাস কেবল দৃশ্যের নয়, শব্দেরও এক জগৎ তৈরি করে

Bibhutibhushan Bandyopadhyay: বাংলা সাহিত্যে বিভূতিভূষণকে আমরা সাধারণত প্রকৃতির কবি বলেই চিনি। তাঁর বর্ণনায় নদী, মাঠ, বন, আকাশ, ঋতু আর গ্রামীণ জীবনের যে ছবি ফুটে ওঠে, তা নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তাঁর সাহিত্যকে যদি একটু অন্য দিক থেকে দেখা যায়? যদি আমরা শুধু দৃশ্যের দিকে না তাকিয়ে শোনার চেষ্টা করি?

স্ট্যাচু অব লিবার্টি ও আমেরিকার অভিবাসন: আমেরিকার ইতিহাসে আশ্রয়প্রার্থীদের জায়গা কোথায়?

Statue of Liberty: স্ট্যাচু অব লিবার্টির ধারণার সূত্রপাত ১৮৬৫ সালে। ফরাসি রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এদুয়ার্দ দ্য লাবুলে আমেরিকার স্বাধীনতার শতবর্ষ এবং ফ্রান্স-আমেরিকার বন্ধুত্বকে স্মরণ করে স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ধারণা দেন।

এশিয়ার সেরা মিউজিয়ামের স্বীকৃতি পাটনার, কীভাবে বিশ্বসেরাদের টেক্কা দিল বিহার মিউজিয়াম?

Patna Outranks paris: বিশ্বের সেরা ১০০টি মিউজিয়ামের তালিকায় নবম স্থান অর্জন করে কীভাবে ল্যুভর ও মেটের মতো বিখ্যাত জাদুঘরকে পিছনে ফেলে এশিয়ার সেরা মিউজিয়াম হয়ে উঠল পাটনার বিহার মিউজিয়াম?

দেশভাগের ইতিহাসকে নারীর চোখে দেখা: অংশুমান করের ‘হিরণবালা’

Hiranbala Novel Review: বাংলা উদ্বাস্তু-আখ্যানের বড় অংশে দেশভাগের অভিজ্ঞতা এসেছে পুরুষের জীবন, তার মনস্তত্ত্ব ও তার গতিবিধির ভিতর দিয়ে। ‘হিরণবালা’ প্রথমেই এই কাঠামো ভেঙে দেয়। উদ্বাস্তু পরিবারের গল্পে একজন নারীকে নিষ্ক্রিয় বা পরোক্ষ ভূমিকায় না দেখিয়ে, উদ্বাস্তু হওয়ার অভিজ্ঞতাটিকে প্রত্যক্ষভাবে বুনে দেয় নারীটির জীবন। দেশভাগকে প্রায় অদৃশ্য করে হিরণকে উদ্বাস্তু করা শুরু হয় ১৯৪৬ সালে, বিয়ের মধ্য দিয়ে।

সুকুমার রায়ের সঙ্গে চার্লি চ্যাপলিনের ভীষণ মিল পাই: স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্ত

Sukumar Ray Literature: কেউ যদি অনেক বড় বয়সেও ছোট থাকতে চায়— যেমন আমি বলি যে আমার বয়স বাড়েনি— আর যদি নিজের বয়সটাকে একই জায়গায় ধরে রাখতে ইচ্ছে করে, তবে মনে হয় সুকুমার রায়ের সমগ্র তাঁর সারাজীবন বিছানার পাশে গীতবিতানের মতোই চিরসঙ্গী হয়ে থাকতে পারে।

বাংলার দেশি খাসির মাংস থেকে চিংড়ি শুঁটকি, জিআই তকমার অপেক্ষায় কোন কোন খাবার?

GI Tag Registration: বাংলার দেশি খাসির মাংস, ইলিশের বিভিন্ন পণ্য ও চিংড়ি শুঁটকি জিআই স্বীকৃতি পেতে চলেছে। আবেদন প্রক্রিয়া এগিয়েছে, আগামী এক বছরের মধ্যে স্বীকৃতি পাওয়ার আশা। কিন্তু জিআই তকমা কী এবং এই স্বীকৃতি পেলে বাংলার উৎপাদকদের কী লাভ হবে?