কেমন হলো বাংলাদেশের নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন?
Bangladesh 13th Parliament: কেমন হলো বাংলাদেশের নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন? এই সংসদ কি সত্যিই বদলে দেবে বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ?
বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনকে নানা কারণেই ঐতিহাসিক বলা হচ্ছে। গত দেড় দশকের রাজনৈতিক অস্থিরতা, একতরফা নির্বাচন, আন্দোলন-অভ্যুত্থান, সাংবিধানিক পুনর্বিন্যাস এবং ক্ষমতার পালাবদলের পর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাষ্ট্র পরিচালনার প্রথম বড় প্রাতিষ্ঠানিক পরীক্ষা ছিল এই অধিবেশন। প্রায় ১৮ বছর পর ‘অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ’ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদের এই প্রথম বৈঠক তাই সংসদ কক্ষের ভেতরের চেয়ে বাইরে বেশি নজর কেড়েছে।
২৫ দিন ধরে চলা এই অধিবেশনে সংখ্যার বিচারে যেমন ছিল ব্যস্ততা, তেমনই রাজনৈতিক বার্তার দিক থেকেও ছিল তাৎপর্য। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ অধিবেশন সমাপ্তির ঘোষণা দিতে গিয়ে জানান, এই এক অধিবেশনেই ৯৪টি বিল পাস হয়েছে এবং ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদে উপস্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি গঠন করা হয়েছে সাতটি সংসদীয় কমিটি—যার মধ্যে পাঁচটি স্থায়ী কমিটি এবং দু'টি বিশেষ কমিটি। নতুন সরকারের প্রশাসনিক ও আইনগত কাঠামোকে দ্রুত স্থিতিশীল করতে যে তাড়াহুড়ো রয়েছে, এই পরিসংখ্যানই তার প্রমাণ।
এই অধিবেশনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল, এটি আসলে পরিবর্তনের এক নতুন সংসদ। পুরনো রাজনৈতিক পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে এসে দেশের শাসনব্যবস্থা কোন পথে এগোবে, তার স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে এই সংসদের মধ্যেই। কারণ, গত বছরের গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনীতি একেবারে নতুন ছকে সাজানো হয়েছে। পরবর্তী অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার নানা পদক্ষেপ, ‘জুলাই সনদ’কে ঘিরে গণভোট, সাংবিধানিক সংশোধন এবং অবশেষে ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে নতুন ক্ষমতার বিন্যাস তৈরি হয়েছে, তার প্রথম আনুষ্ঠানিক আইনসভা রূপ এই সংসদ। ফলে এই অধিবেশনের প্রতিটি আলোচনা ছিল অতীতের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি এবং নতুন শাসনদর্শনকে প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Bangladesh MP Murder Case: প্রাথমিক তদন্তের পর পুলিশের অনুমান, নিউ টাউনের ফ্ল্যাটে ডাকা হয়েছিল বাংলাদেশের সাংসদ আনওয়ারুলকে। সেখানেই তাঁকে খুন করে দেহ টুকরো টুকরো করে ফেলা হয়।
রাষ্ট্রপতির ১২ মার্চের ভাষণের উপর দীর্ঘ ৪০ ঘণ্টার আলোচনা এই অধিবেশনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অংশ। মোট ২৮০ জন সংসদ সদস্য এতে অংশ নেন। বাংলাদেশের সংসদীয় সংস্কৃতিতে এত বড় সংখ্যক সদস্যের অংশগ্রহণ সাম্প্রতিক সময়ে খুব একটা দেখা যায়নি। আলোচনায় সরকারদল, মিত্রদল, ইসলামপন্থী শক্তি, আঞ্চলিক প্রতিনিধি এবং স্বতন্ত্র সদস্য—সবাই নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন। যদিও সরকারপক্ষের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা সংসদের সামগ্রিক সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করেছে, তবু বিতর্কহীন একরৈখিকতা এবার পুরোপুরি দেখা যায়নি। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের বয়ান, রাষ্ট্রের পরিচয়, বিচারপ্রক্রিয়া, প্রশাসনিক পুনর্গঠন এবং নির্বাচনী সংস্কার নিয়ে মতভেদ স্পষ্ট হয়েছে।
এখানেই আসে ‘জুলাই সনদ’-এর প্রসঙ্গ। গণভোটে অনুমোদিত এই সনদকে ঘিরে দেশের নতুন সাংবিধানিক কাঠামো নির্মাণের যে পরিকল্পনা, তার অনেকটাই এই সংসদের মাধ্যমে বাস্তব রূপ পেতে শুরু করেছে। সংসদে উত্থাপিত ও পাস হওয়া একাধিক বিল সেই সনদের নীতিগত ধারাগুলির সঙ্গে সাযুজ্য রেখে তৈরি হয়েছে।
এই অধিবেশনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো নতুন মুখেরা। স্পিকার জানিয়েছেন, মোট ২২০ জন সদস্য প্রথমবারের মতো সংসদে এসেছেন। অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যই সংসদীয় রাজনীতিতে নবীন। এই নতুন প্রজন্মের এমপিদের মধ্যে অনেকেই জুলাই আন্দোলনের পর উদীয়মান রাজনৈতিক শক্তির প্রতিনিধি, কেউ আবার দীর্ঘদিনের বিরোধী রাজনৈতিক দল থেকে উঠে এসেছেন। তাঁদের আচরণকে স্পিকার ‘সহনশীল ও গঠনমূলক’ বলে বর্ণনা করেছেন। যদিও এই মূল্যায়ন রাজনৈতিকভাবে সৌজন্যমূলক, তবু সংসদে তুলনামূলক কম হট্টগোল এবং দীর্ঘ বক্তব্য বিনিময় একটি ভিন্ন পরিবেশের ইঙ্গিত দিয়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Khaleda Zia’s Funeral: এই জানাজায় যারা যোগ দিয়েছিলেন তারা সকলেই বিএনপি কর্মী ছিলেন না। কোনো রাজনৈতিক নেতৃত্বের অন্তিম বিদায়ে এমন ছবি এই উপমহাদেশে খুব কমই তৈরি হয়েছে।
তবে এই সংসদকে শুধুই প্রশংসার চোখে দেখলে ভুল হবে। কারণ, এত বিপুল সংখ্যক বিল এক অধিবেশনে পাস হওয়া নিয়ে ইতোমধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে—এত দ্রুত আইন প্রণয়নের ফলে পর্যাপ্ত আলোচনা কি সম্ভব হয়েছে? বিরোধী কণ্ঠ তুলনামূলক দুর্বল হওয়ায় অনেক বিল প্রায় বিনা বাধায় পাস হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। সরকার চাইছে দ্রুত প্রশাসনিক সংস্কার ও ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসকে আইনি সুরক্ষা দিতে; কিন্তু তার ফলে সংসদীয় যাচাই-বাছাইয়ের জায়গা কতটা সংকুচিত হচ্ছে, তা ভবিষ্যতে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর উপস্থিতিও এই অধিবেশনে আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে। সংসদীয় প্রশ্নোত্তরে ৯৩টি নোটিসের মধ্যে তিনি ৩৫টি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অতীতে প্রধানমন্ত্রীদের সংসদে এমন নিয়মিত অংশগ্রহণ খুব বেশি দেখা যায়নি। এর মাধ্যমে সরকার সংসদকে সক্রিয় গণতান্ত্রিক মঞ্চ হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে, এমন বার্তা স্পষ্ট। তবে সমালোচকেরা বলছেন, সংসদে উপস্থিতি আর প্রকৃত জবাবদিহি এক জিনিস নয়; কঠিন প্রশ্নের মুখে সরকারকে কতটা কোণঠাসা করা গিয়েছে, সেটাই আসল পরীক্ষা।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে এই অধিবেশন, আওয়ামী লীগ-পরবর্তী বাংলাদেশে রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক ভাষা বদলে যাচ্ছে। গত দেড় বছরে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’, পুরনো শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দমননীতি, রাষ্ট্রীয় স্থাপনার নাম পরিবর্তন, জুলাই আন্দোলনের স্মৃতির রাজনৈতিক ব্যবহার—নতুন ক্ষমতাকাঠামো নিজেদের বৈধতা প্রতিষ্ঠায় ইতিহাস পুনর্লিখনের পথে হাঁটছে। সংসদের আলোচনাতেও তার প্রতিফলন দেখা গিয়েছে। অতীতের শাসনকে ‘দমনমূলক অধ্যায়’ এবং বর্তমানকে ‘গণতান্ত্রিক পুনর্জন্ম’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা বারবার হয়েছে।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, বাংলাদেশের ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন ছিল নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিচয় দেওয়ার একটি বড় মঞ্চ। এই অধিবেশনে একদিকে সরকার দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে, অন্যদিকে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান ও বার্তাও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।
বাংলাদেশের মানুষ এই সংসদের দিকে তাকিয়ে আছে একটি কারণে—দীর্ঘ অস্থিরতার পর কি সত্যিই সংসদ আবার জনমতের জায়গা হয়ে উঠবে, নাকি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে এটি কেবল সরকারের সিলমোহর দেওয়ার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে?






