সন্তানের জন্মের পিছনে বাবা-মা ছাড়াও থাকবেন তৃতীয় মহিলা! যুগান্তকারী আবিষ্কারের পথে এই দেশ

ব্রিটেনের পর এবার অস্ট্রেলিয়া! ডিম্বাণু নিষিক্তকরণের এমন
একটি প্রক্রিয়া আইনসিদ্ধ করতে চলেছে এই দেশ, যেখানে
তিনজন ব্যক্তির জিন একসঙ্গে উপস্থিত থাকবে। প্রচলিত ডিম্বাণু নিষিক্তকরণের ক্ষেত্রে কী হয়? সেখানে মায়ের থেকে একটি
ডিম্বাণু ও বাবার থেকে একটি শুক্রাণু অংশগ্রহণ করে। স্বাভাবিকভাবেই এই নিষিক্তকরণ প্রক্রিয়ায় দু'জন, অর্থাৎ বাবা ও মায়ের জিনই অপত্যের দেহে সঞ্চারিত হয়।

 

 

নতুন এই পদ্ধতিতে মা, বাবার জিন ছাড়াও তৃতীয় একটি মহিলার শরীর থেকে জিন অপত্যের দেহে সঞ্চারিত হবে। তৃতীয় জন, অর্থাৎ, তৃতীয় মহিলার দেহ থেকে সংগ্রহ করা হবে মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ।

 

 

কেন এই মহিলার মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ দরকার, সেই প্রসঙ্গে আসার আগে আলোচনা করা দরকার, আমাদের কোশের কোন কোন অংশে এই ডিএনএ থাকে?

 

আরও পড়ুন: মানুষের বাসস্থান মিশে যাচ্ছে সমুদ্রগর্ভে, কতটা বিপদ আছে সামনে?

 

 

আমাদের শরীরে মূল ডিএনএ থাকে ক্রোমোজো়মে, যা আসলে আমাদের দৈহিক ও চারিত্রিক গঠনের পিছনে মূল ভূমিকা পালন
করে। ক্রোমোজো়মে অবস্থিত ডিএনএ-কে বলে ক্রোমোজো়মাল
ডিএনএ।

 

 

ক্রোমোজো়ম আবার অবস্থিত কোশের নিউক্লিয়াস নামের অংশে, বলা যেতে পারে, এই নিউক্লিয়াসই কোনো কোশের 'হেড
কোয়ার্টার'। সে-ই কোশের কার্যপ্রণালী থেকে কোশের ভবিষ্যৎ
নিয়ন্ত্রণ করে।

 

 

অপত্যের শরীরে ক্রোমোজো়মাল ডিএনএ মা ও বাবা- উভয়ের শরীর থেকেই আসে।

 

 

ক্রোমোজোম ছাড়াও কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে ডিএনএ থাকে মাইটোকন্ড্রিয়া নামের একটি অঙ্গাণুতে। মাইটোকন্ড্রিয়া হল কোশের শক্তিঘর। খাদ্যগ্রহণের ফলে এখানে তৈরি
এটিপি (ATP) তৈরি হয় বলেই আমাদের শরীরে শক্তি সঞ্চারিত হয়।

 

 

কোশের এই শক্তি-উৎপাদনকারী অঙ্গাণু, অর্থাৎ মাইটোকন্ড্রিয়াতেও থাকে ডিএনএ। এই ডিএনএ কিন্তু ক্রোমোজোম-স্থিত ডিএনএ-র অংশ নয়। তাই এদের এক্সট্রাক্রোমোজো়মাল ডিএনএ. বা ক্রোমোজো়ম-বহিঃস্থ ডিএনএ বলা হয়।

 

 

ডিম্বাণু নিষেকের সময়, বাবা আর মায়ের দু'জনের জননকোশ, অর্থাৎ যথাক্রমে শুক্রাণু ও ডিম্বাণু থেকে বাকি সব কিছু সমান-সমান অনুপাতে এলেও, মাইটোকন্ড্রিয়াটি কিন্তু আসে কেবল মায়ের থেকেই। স্বাভাবিকভাবেই মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ-ও আসে মায়ের শরীর থেকেই।

 

 

মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ-তে ত্রুটি থাকলে বেশ কিছু কঠিন অসুখ দেখা যায় সন্তানের শরীরে। মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ-জনিত অসুখ মায়ের শরীর থেকেই বাহিত হয়। এই অসুখগুলো সাধারণত বিরল হলেও, এই অসুখগুলির চিরস্থায়ী উপশম কিন্তু নেই।

 

 

এই অসুখগুলির মধ্যে অন্যতম টোসিস, এক্সটার্নাল অফথ্যালমোপ্লেজিয়া, প্রক্সিমাল মায়োপ্যাথি, কার্ডিওমায়োপ্যাথি, বিশেষ কিছু ধরনের বধিরতা এবং অন্ধত্ব। এমনকী, ডায়াবেটিসও (ডায়াবেটিস মেলিটাস) বেশ কিছু ক্ষেত্রে মাইটোকন্ড্রিয়াল জিনের ত্রুটির কারণে হয়।

 

 

উদাহরণ দেওয়া যাক লে সিন্ড্রোমের। এটি মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ-এর ত্রুটিজনিত একটি অসুখ, যার ফলে মানসিক ক্রিয়াকলাপ বিঘ্নিত হয় শিশুদের মধ্যে। এবং শৈশবের পরে লে সিন্ড্রোমে ভোগা রোগীরা বাঁচে না।

 

 

এসব ত্রুটিপূর্ণ মাইটোকন্ড্রিয়া বাদ দিতেই নিষেকের
প্রক্রিয়ায় তৃতীয় ব্যক্তি, যিনি বাধ্যতামূলকভাবে
একজন মহিলাই, তাঁর মাইটোকনড্রিয়াল ডিএনএ-র
প্রয়োজন। বাবার শরীরের মাইটোকন্ড্রিয়া কাজে লাগবে না,
যা প্রতিবেদনের শুরুতেই বলা হয়েছে?

 

 

কীভাবে সম্পন্ন হবে নিষেকের এই নতুন প্রক্রিয়া? যে মহিলাটি মাইটোকন্ড্রিয়া দান করবেন, তাঁর ডিম্বাণু থেকে নিউক্লিয়াসটি সরিয়ে ফেলা হবে শুরুতেই। ফলে নিউক্লিয়াসের মধ্যে থাকা ক্রোমোজো়মাল ডিএনএ-ও সরিয়ে ফেলা যাবে। পড়ে
থাকবে কোশরস, যেখানে ভেসে বেড়াচ্ছে মাইটোকন্ড্রিয়া।
এবার এই মহিলার নিউক্লিয়াসের জায়গায় মায়ের ডিম্বাণুর নিউক্লিয়াস প্রবেশ করানো হবে। খেয়াল রাখতে হবে, মায়ের মাইটোকন্ড্রিয়া যেন প্রবেশ না করে এবং মায়ের ডিম্বাণু
থেকে আসা নিউক্লিয়াসটি যেন পারতপক্ষে অক্ষত থাকে। তারপর দুই মহিলার ডিম্বাণুর সাহায্যে যুগ্মভাবে বানানো ডিম্বাণুটি নিষিক্ত করা হবে বাবার শুক্রাণু দিয়ে। এই প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণভাবে শরীরের বাইরেই করা হবে। সবশেষে নিষিক্ত ডিম্বাণু মায়ের জরায়ুতে পাঠানো হবে।

 

 

মার্ডক চিলড্রেন রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মাইটোকন্ড্রিয়াল রোগ-বিষয়ক গবেষক ডেভিড থরবার্ন ওয়ার্ড-কে জানিয়েছেন, এই পদ্ধতির প্রাথমিক একটি আশঙ্কা হল, নিষিক্তকরণের পদ্ধতিটির সময়ে মায়ের ত্রুটিপূর্ণ মাইটোকন্ড্রিয়াল জিন থেকে যেতে পারে ডিম্বাণুতে। যা আবার অপত্যের দেহে সঞ্চারিত হলে, আবার শিশুটি রোগে আক্রান্ত হবে। আরও একটি সমস্যা হল, মায়ের ক্রোমোজোমাল ডিএনএ এবং মাইটোকন্ড্রিয়া দাতার
মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ আদৌ পরস্পরের জন্য উপযুক্ত হবে কি না। কোশের ভেতর তাদের সহাবস্থানের দরুণ, কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া ঘটবে না তো? সেই আশঙ্কা থাকছেই।

 

 

আশার বিষয় হল, অস্ট্রেলিয়া এবং ইংল্যান্ড, দুই দেশের ডাক্তার
এবং গবেষকদের মতে এই দুই আশঙ্কা সত্যি হওয়ার প্রবণতা খুবই কম।

 

 

গ্রিস এবং ইউক্রেনের কিছু হাসপাতালও নিষিক্তকরণের
জন্য এই পদ্ধতি অবলম্বন করেছে ২০১৫ সাল নাগাদ।
২০১৬ সালে একটি শিশুপুত্র জন্মগ্রহণ করে। আনন্দের বিষয়,
শিশুটির মায়ের মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ-তে ত্রুটি থাকায় তিনি লে সিন্ড্রোমে আক্রান্ত হলেও, সন্তানটি সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় জন্মগ্রহণ করে। অথচ এর আগে যখন তিনি প্রথাগত
পদ্ধতিতেই গর্ভধারণ করেছিলেন, তাঁর গর্ভজাত দুই সন্তানই মারা গেছিল শৈশবে।

More Articles

;