জিআই ট্যাগ কতটা বদলে দেবে ছৌ শিল্পীদের ভাগ্য

করোনা এবং আরও নানা কারণে মুখ থুবড়ে পড়া ছৌ শিল্পে নিঃসন্দেহে বাড়তি অক্সিজেন জোগাবে ‘জিআই ট্যাগ’।

আমাদের গ্রামবাংলার লোকজীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একাধিক লৌকিক সংস্কৃতি এবং ইতিহাস। তার মধ্যে কিছু সংস্কৃতি নিজগুণে পাড়ি দিয়েছে আন্তর্জাতিক মঞ্চে। সাত-আটের দশক থেকেই চরিদার ছৌশিল্পী গম্ভীর সিং মুড়ার হাত ধরে ‘পুরুলিয়ার ছৌ’ প্রথম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়। সম্প্রতি পুরুলিয়ার ‘ছৌ নাচ’-কে স্বীকৃতি দিয়ে তাকে জিআই ট্যাগ প্রদান করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। পুরুলিয়ার লোকাচারের সঙ্গেই অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে ছৌ। পুরাণের বিভিন্ন কাহিনি থেকে শুরু করে মহাকাব্যের বর্ণনা সবই উঠে আসে ছৌ নাচের উপস্থাপনায়। ছৌ নাচের আর একটি বিশেষত্ব হলো ছৌ নাচের মুখোশ।

ছৌ নাচের শুরুর কথা
বাঘমুন্ডির রাজপরিবারের দুর্গাপুজোর প্রতিমা তৈরি করতে এসেছিলেন বর্ধমানের শিল্পীরা। তাঁদের হাত ধরেই প্রথম ছৌ নাচের মুখোশ তৈরি শুরু হয়। নাচের মুখোশ এবং পোশাক তৈরি করা হয় বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনির ওপর ভিত্তি করে। ছৌ নাচের মুখোশে, পোশাক-পরিচ্ছদে উঠে আসে মহিষাসুরমর্দিনী, শিব-পার্বতীর গল্প, রামায়ণ, মহাভারত ও আরও নানা কাহিনি।

ছৌ নাচের মধ্যে মিশে রয়েছে একাধিক লৌকিক উপাদান। পুরাণের বিভিন্ন দেব-দেবীর কাহিনি নাচের মাধ্যমে তুলে ধরলেও তাতে ছৌ শিল্পীরা যুক্ত করেন নিজেদের ভাবনা। দেবতারা লাভ করেন মনুষ্যেতর রূপ। ভারতের মূলত তিনটি জায়গাতেই ছৌ নাচ উপস্থাপনা করা হয়। উড়িষ্যার ময়ুরভঞ্জের ছৌ নাচ, ঝাড়খণ্ডের সরাইকেল্লার ছৌ নাচ এবং পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়ার ছৌ নাচ। পুরুলিয়ার ছৌ নাচের বিশেষত্ব হলো তার মুখোশ নির্মাণে। ময়ুরভঞ্জ বা সরাইকেল্লার ছৌ নাচে মুখোশ ব্যবহারের তেমন চল নেই।

আরও পড়ুন: যেখানে মুসলমান পটুয়াদের তুলিতে মূর্ত হয়ে ওঠেন হিন্দু দেব-দেবীরা

চরিদা গ্রামের কথা
অযোধ্যা পাহাড়ের কোলে শান্ত একটি গ্রাম চরিদা। চরিদা গ্রামে ঢোকার প্রবেশপথের দু'ধারে সারি সারি মুখোশের দোকান। এখানকার গ্রামের বাসিন্দাদের প্রায় সকলেরই জীবিকা ছৌ নাচের মুখোশ নির্মাণ। চরিদায় তৈরি মুখোশের খ্যাতি এখন বিশ্বজুড়ে। ছৌ নাচ তো আছেই, আলাদা করে বিক্রি করার জন্যও মুখোশ তৈরি করেন চরিদার সূত্রধররা। কাগজ, কাপড় এবং মাটির প্রলেপের রঙের তুলির ছোঁয়ায় প্রাণ পায় ছৌ নাচের মুখোশগুলি।

কিছু বছর আগে ও প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে কমে আসছিল ছৌ নাচের জনপ্রিয়তা। সেই সঙ্গে ভাটা পড়েছিল মুখোশ নির্মাণেও। বছরে সাজ-পোশাক, মুখোশ বাবদ একটি দলের প্রায় ১ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা থেকে ২ লক্ষ টাকা খরচ হয়। সামর্থের অভাবে তাই বন্ধ হতে বসেছিল ঐতিহ্যবাহী ছৌ নাচ। পরে রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্তে আবার নতুন উদ্যমে ছৌ নাচের মুখোশ নির্মাণ শুরু হয়েছে চরিদায়।

চরিদায় শখানেক পরিবার মুখোশ তৈরি করে। শিল্পীর সংখ্যা প্রায় ৩০০ জন। কোনও পরিবারে তৈরি হয় কেবল ঘোর সাজানোর মুখোশ আবার কোনও পরিবার তৈরি করে ছৌ নাচের দলের মুখোশ। কোনও কোনও পরিবার আবার দুই ধরনের মুখোশ নির্মাণ করে থাকে। এই নির্মিত মুখোশগুলি শিল্পীদের কাছ থেকে কখনও সরাসরি কেনেন পর্যটক বা ক্রেতারা আবার মুখোশ বিক্রির জন্য সরকারের তরফে ও বিভিন্ন মেলার আয়োজন করা হয়।

গম্ভীর সিং মুড়া ও ছৌ নাচ
যাঁর হাত ধরে আন্তর্জাতিক ময়দানে ছৌ নাচের পদার্পণ তিনিই গম্ভীর সিং মুড়া। গম্ভীরের বাবা জীপা সিং মুড়া ও ছিলেন ছৌ শিল্পী। কিন্তু গম্ভীরের মাত্র আড়াই বছর বয়সেই মারা যান জীপা। ফলে বাবার কাছ থেকে তালিম নেওয়া হয়ে ওঠেনি তাঁর। বাবার ছাত্র মধুভাট রায়ের কাছ থেকেই ছৌ নাচে হাতেখড়ি হয়েছিল গম্ভীরের। বাঘমুন্ডির রাজা তখন ক্ষেত্রমোহন। গম্ভীর সিং এর বয়স মাত্র ১৫। রাজার সামনে ছৌ নাচ উপস্থাপনা করলেন ইনি। একক নৃত্যে ১০০টা ভল্ট। শারীরিক কসরত ও উপস্থাপনায় সেদিন ছৌ নাচকে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন গম্ভীর। সেই শুরু, তারপর থেকে বিদেশের বিভিন্ন জায়গায় ছৌ নাচের উপস্থাপনা করেচেন তিনি। বর্তমানে যেভাবে ছৌ নাচের মুখোশ তৈরি হয় তাও খানিক গম্ভীরেরই মস্তিস্কপ্রসূত। সারাজীবনে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি।কখনও কংস, কখনও দুর্গা আবার কখনও মহিষাসুর। গম্ভীর সিং মুড়ার নির্দেশনায় ইতিহাস হয়ে আছে মহিষাসুর বধ, অভিমন্যু বধ, কীরাত-অর্জুন পালা। কিন্তু এইসব চরিত্রের মধ্যে তাঁর বিশেষ পছন্দ ছিল রাবণের চরিত্র। প্রচলিত ছৌ নাচের ঘরানায় বৈল্পবিক বদল নিয়ে আসেন গম্ভীর। এতদিনের প্রথা ভেঙে রিভার্স ভল্টকে যুক্ত করেন নাচের উপস্থাপনায়। কীরাত নাচের একক ভূমিকায় যেন অনন্য হয়ে উঠেছিলেন গম্ভীর সিং মুড়া। কীরাত নাচের ক্ষেত্রে শরীরের একদিকের অংশ সঞ্চালনা করতেন গম্ভীর তখন অন্য পাশ থাকত সম্পূর্ণ স্থির। পায়ের ঘুঙুর পদচারনার সময় ইচ্ছেমত বাজাতেন আবার কখনও বাজাতেন। শারীরিক কসরতের ওপর এরকমই ছিল তাঁর নিয়ন্ত্রণ।

ছৌ নাচের একাল-সেকাল
শুরুর দিন গুলো থেকে সময়ের নিয়ম মেনেই ছৌ বদলেছে। আগে আনুষ্ঠানিকভাবে চৈত্র মাসের সংক্রান্তির দিন ছৌ নাচ শুরু হতো। গোটা বৈশাখ মাস এবং জ্যৈষ্ঠ মাসের ১৩ তারিখ অবধি ছৌ নাচ হত। বর্তমানে বানিজ্যকীকরণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে  বছরজুড়েই চলে ছৌ নাচ। রুজির টানে ছৌ নাচ করতে গিয়ে তার পুরনো ঐতিহ্যকেও বদলে ফেলতে হচ্ছে শিল্পীদের।

আগে ছৌ নাচের ক্ষেত্রে দেশজ যন্ত্রের বাজনাই বাজানো হতো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নাচের দৃশ্যে জাঁকজমক বাড়াতে ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রের ব্যবহার শুরু হয়েছে। আগে ছৌ নাচে মূলত ছয়টি যন্ত্র ব্যবহার করা হত। ঢোল, ধামসা, সানাই, ঘুঙুর, পোশাক ও মুখোশের তালে তালে ছৌ নাচ মন জয় করে নিত দর্শকদের। কিন্তু যুগের বদলের সঙ্গে সঙ্গে এসেছে নতুন প্রযুক্তি। শারীরিক কসরতের থেকে মুখোশের জৌলুস এবং স্থানীয় বাদ্যযন্ত্রের বদলে বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রের ব্যবহার ছৌ নাচকে অনেকটাই কমার্শিয়াল করে দিয়েছে।

করোনা এবং আরও নানা কারণে মুখ থুবড়ে পড়া ছৌ শিল্পে নিঃসন্দেহে বাড়তি অক্সিজেন জোগাবে ‘জিআই ট্যাগ’। ‘কলকাতার রসগোল্লা’ অথবা ‘দার্জিলিংয়ের চা’ এর মতই নতুন করে বিশ্বের দরবারে পৌঁছবে ‘পুরুলিয়ার ছৌ’।

More Articles